খেলাঘরখেলাঘর

 

সে আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগের কথা। কলকাতার চিতপুর এলাকার ঠাকুরবাড়ির দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবথেকে ছোট ছেলে ছিল রবি। ছোট্ট রবির ইস্কুলে যেতে বা বাঁধাধরা নিয়মে পড়শোনা করতে কিছুতেই ভাল লাগত না। বরং বাইরের দিকের বারান্দার এক কোনে পড়ে থাকা ঠাকুরমার আমলের পাল্কিটা ছিল অনেক বেশি পছন্দের জায়গা। তার ভেতরে ঢুকে বসলেই রবি চলে যেত অন্য এক জগতে। সেখানে সে যেন একলা দ্বীপে আটকা পড়া রবিন্সন ক্রুসো, কখনও বা সে চলে যাচ্ছে বিশ্বনাথ শিকারীর সঙ্গে বাঘ ধরতে, আবার কখনও সে চলেছে উত্তাল নদীর ওপর আব্দুল মাঝির সঙ্গে কুমির ধরার গল্প শুনতে শুনতে...। আরেকটা খেলা খেলে চলে যেত ছুটির দিনের অনেক সময়। বারান্দার রেলিংগুলো হত ছাত্র, আর পড়াশোনা করে না বলে রবি মাস্টার দিত তাদেরকে আচ্ছা করে বকুনি, এমনকি মাঝে মাঝে পিটুনিও পড়ত তাদের পিঠে ।

কি ভাবছ? আরে- এরকম তো আমিও মাঝে মাঝেই পড়াতে বসি আমার পুতুলগুলোকে! পড়া না পারলে কত বকেও দি, ঠিক স্কুলের ম্যাডামের মত...



কিশোর রবি

অবশ্য রবি যে একেবারেই পড়াশোনা করত না তা কিন্তু নয়। রবি স্কুলে নিয়মিতই যেত, আর বাড়িতেও নানারকম বই পড়ত। তার সাথে চলত গান শেখা, আর নিয়ম করে কুস্তি শেখা...সারাটাদিন ছিল একদম রুটিন বাঁধা, প্রায় তোমারি মতন। কিরকম শুনবে?

শীত হোক কি গ্রীষ্ম, দিনের আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে উঠে কুস্তি লড়তে হত শহরের ডাকসাইটে কুস্তিগীর কানা পালোয়ানের সাথে। সেখান থেকে ফিরে এক ডাক্তারি পড়া ছাত্রে কাছে শিখতে হত মানুষের হাড় কিভাবে চিনতে হয় -একেবারে একটা আস্ত কঙ্কাল নেড়েচেড়ে! সকাল সাতটায় আসতেন নীলকমল মাস্টার, শেখাতেন অঙ্ক; সঙ্গে 'সাহিত্য' আর 'প্রাকৃত বিজ্ঞান'। এছাড়া মাঝে মাঝেই অন্য অনেকে নানা বিষয়ে পড়াতে আসতেন। ন'টা বাজলে স্নান আর সাড়ে ন'টায় ভাত খাওয়া। দশটায় পাল্কি-গাড়ি চেপে স্কুলে যাওয়া। সাড়ে চারটের পর স্কুল থেকে ফিরে এসে অভ্যাস করতে হত জিমনাসটিক। তারপর আসতেন ছবি আঁকার মাস্টারমশাই। সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠলে ইংরাজি পড়াতে আসতেন অঘোর মাস্টার। সেই পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই চোখ ঢুলে আসত ঘুমে...

এরকম ভাবেই ছোটবেলাটা কেটেছিল ভারতবর্ষের জাতীয় কবি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ছোটবেলার এই সব ঘটনাগুলিকে মনে রেখে আর শাসনে বাঁধা নিয়ম কানুনগুলোকে নিয়ে নানারকমের সুন্দর কবিতা লিখেছিলেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠা করা শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে তাই  শুরু হয় অন্য রকম পড়াশোনা- গাছের নিচে, খোলা মাঠের মধ্যে, চারিপাশে প্রকৃতিকে নিয়ে।

তুমি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতা পড়েছ? যদি তুমি স্কুলে 'সহজ পাঠ' পড়, তাহলে তো কিছুটা তুমি তাঁকে চিনেই গেছ। আবার 'শিশু' এবং 'শিশু ভোলানাথ' নামের দুটি সঙ্কলনে যেসব কবিতাগুলো আছে, সেগুলি যেন সব একদম তোমারি মনের কথা। একটা কবিতার একটুখানি শুনবে নাকি?-

যত ঘন্টা, যত মিনিট, সময় আছে যত
শেষ যদি হয় চিরকালের মতো,
তখন স্কুলে নাই বা গেলেম; কেউ যদি কয় মন্দ
আমি বলব,'দশটা বাজাই বন্ধ।'
তাধিন তাধিন তাধিন।
(সময়হারা, শিশু ভোলানাথ, পৃঃ২৫)

-কি, এক্কেবারে মনের কথা না? সত্যি যদি সময় গোনাটা শেষ হয়ে যায়, আর স্কুলে না যেতে হয়, তাহলে কেমন হয়?

খালি ছোটদের জন্যই কবিতাই না, বড়দের জন্যও কত কিছু লিখেছেন তিনি - গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক। খুব ভাল ছবি আঁকতে পারতেন তিনি। এছাড়া লিখেছেন প্রায় কয়েক হাজার গান, যেগুলি পরিচিত 'রবীন্দ্রসঙ্গীত' নামে। তার মধ্যে কয়েকটা অন্ততঃ গান তো তুমি জানই -

'মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি...' বা 'ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল...'। কবিগুরুর লেখা দুটি গান - "জন-গণ-মন-অধিনায়ক-জয় হে" আর "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি" -যথাক্রমে ভারতবর্ষ আর বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। এরকম আরো অনেক অনেক গান আছে, আর জানো কি - অনেক গানের পেছনেই একটা করে গল্প আছে। ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ হয়, তখন রাখী উতসব পালন করার জন্য কবিগুরু লিখেছিলেন -

"বাংলার মাটি, বাংলা জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল
পূণ্য হউক, পূণ্য হউক, পূণ্য হউক হে ভগবান..."

আবার ১৯১৫ সালে ইংল্যান্ডের রানী তাঁকে "নাইট" উপাধি দেন। কিন্তু ১৯১৯ সালে যখন বৃটীশ সরকার পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে অনেক নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলেন, তার প্রতিবাদ করে কবিগুরু সেই "নাইট" উপাধি ফিরিয়ে দেন। আর লেখেন একটি গান -" এ মনিহার আমায় নাহি সাজে..."



কবিগুরুর এই চেহারাটাই আমরা বেশি চিনি

১৮৬১ সালের ৭ই মে, বাংলার ২৫শে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তাই প্রতি বছর এই দিনটিকে আমরা নানারকম অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে কবিগুরুকে স্মরন করি।

শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রিরা ভালবেসে রবি ঠাকুরকে  ডাকতো 'গুরুদেব' নামে। আর যখন তিনি 'গীতাঞ্জলি' বইটির জন্য এশিয়া মহাদেশের থেকে প্রথম সাহিত্যে 'নোবেল' পুরষ্কার পেলেন ১৯১৩ সালে, তখন থেকে তিনি হয়ে গেলেন 'বিশ্বকবি'।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভাল করে জানতে হলে তাঁর লেখা  পড়তে হবে। সব লেখা তো আর এখনি পড়ে বুঝতে পারবে না, কিছু কিছু লেখা বড় হয়েই পড়তে হবে। বরং এখন তোমাকে আরেকটা মনের মতন কবিতার হদিশ দিয়ে দিইঃ

সোম মঙ্গল বুধ এরা সব
আসে তাড়াতাড়ি,
এদের ঘরে আছে বুঝি
মস্ত হাওয়া -গাড়ি?
রবিবার সে কেন , মা গো,
এমন দেরি করে?
ধীরে ধীরে পৌঁছয় সে
সকল বারের পরে।
আকাশ-পারে তার বাড়িটি
দূর কি সবার চেয়ে?
সে বুঝি, মা, তোমার মতো
গরিব-ঘরের মেয়ে?
(রবিবার, শিশু ভোলানাথ, পৃঃ২৩)


এই কবিতার বাকিটুকু নাহয় নিজেই খুঁজে পড়ে নাও না, কেমন?

 

 

 

মহাশ্বেতা রায়
পাটুলী, কলকাতা

 

ছবিঃ
উইকিপিডিয়া

লেখক পরিচিতি

মহাশ্বেতা রায়

মহাশ্বেতা রায় চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ওয়েব ডিজাইন, ফরমায়েশি লেখালিখি এবং অনুবাদ করা পেশা । একদা রূপনারায়ণপুর, এই মূহুর্তে কলকাতার বাসিন্দা মহাশ্বেতা ইচ্ছামতী ওয়েব পত্রিকার সম্পাদনা এবং বিভিন্ন বিভাগে লেখালিখি ছাড়াও এই ওয়েবসাইটের দেখভাল এবং অলংকরণের কাজ করেন। মূলতঃ ইচ্ছামতীর পাতায় ছোটদের জন্য লিখলেও, মাঝেমধ্যে বড়দের জন্যেও লেখার চেষ্টা করেন।