ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

 পালাপার্বন

এই সংখ্যা থেকে শুরু হল ইচ্ছামতীর নতুন বিভাগ -পালা-পার্বন। কি থাকবে এই পাতায়? এখানে চোখ বুলিয়ে আমরা চট করে জানতে পেরে যাব বাংলার নিজস্ব পালা-পার্বনের দিন-তারিখ গুলি। তার সাথে পেয়ে যাব আমাদের কিছু জাতীয় উতসবের দিন-তারিখ, এবং কিছু আন্তর্জাতিক ভাবে পালিত বিশেষ দিনের খোঁজ। যেহেতু বাংলার নিজস্ব ধর্মীয় এবং সামাজিক উতসবগুলি বাংলা মাসের দিন-ক্ষণ মেনে পালন করা হয়, আবার সাথে সাথে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দিন বা উতসব গুলি ইংরাজি তারিখ মেনে পালন করা হয়, তাই ইচ্ছামতীর এই নিজস্ব ক্যালেন্ডারে, বাংলা এবং ইংরাজি দিন হাত ধরাধরি করেই থাকবে।

এই বিভাগ শুরু হল আগামি দুই-তিন মাসের বিশেষ দিনগুলির তালিকা দিয়ে। আমরা ধীরে ধীরে এই তালিকাটিকে বড় করে তুলবো।

 

২৫শে বৈশাখ -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন
১লা জৈষ্ঠ্য - অক্ষয় তৃতীয়া
৭ই জৈষ্ঠ্য -রাজা রামমোহন রায়ের আবির্ভাব দিবস
১১ই জৈষ্ঠ্য -কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন
১২ই জৈষ্ঠ্য -বুদ্ধ পূর্নিমা
১৩ই আষাঢ় - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন
১৪ই আষাঢ় - স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন
১৬ ই আষাঢ়/১লা জুলাই- ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের জন্মদিন ও মৃত্যুদিন
২১শে আষাঢ় -শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন
২৮শে আষাঢ়- রথযাত্রা উতসব
৩রা শ্রাবন - উলটো রথ

 

১লা মে -শ্রমিক দিবস (May Day; Labour Day)
১৫মে- বিশ্ব পরিবার দিবস (International Day of Families)
৫ই জুন - বিশ্ব পরিবেশ দিবস (World Environment Day)
১৪ই জুন- বিশ্ব রক্তদাতা দিবস (World Blood Donor Day)
১৭ই জুন- বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস (World Day to combat Desertification and Drought)
২০ জুন- বিশ্ব গৃহহীন দিবস (World Refugee Day)

চিন্ময়ী
চিন্ময়ী ভট্টাচার্যি,  ৪ বছর,  উলান বাটার, মঙ্গোলিয়া
 
 
সৃজণী
সৃজনী ঘোষ,   চতুর্থ শ্রেনী,বি ডি মেমোরিয়াল স্কুল, কলকাতা
শীত-গরমের চক্কর

শীত আর গরমের চক্করটা কেমন বুঝছ ? এই মাস দু'এক আগেই ঠান্ডায় হি হি  করে কাঁপছিলে, সোয়েটার-জ্যাকেট না চাপালে চলছিল না,আবার এখন দেখ গায়ে একটা জামা রাখতেই হিমসিম খেতে হচ্ছে।

একটা প্রশ্ন করি ? বলতে পারো, শীতকালে শীত আর গরমকালে গরম লাগে কেন ? কি ভাবছ! বোকা বোকা প্রশ্ন হয়ে গেল ? মোটেই না। বুঝিয়ে বলি আগে, তারপর বলো প্রশ্নটা ঠিক, না বোকা বোকা।

এটা ত জানা কথা যে রোদে দাঁড়ালে গরম লাগে কারণ রোদে আলো ছাড়াও আছে আরও একটা জিনিষ, যার নাম হল 'তাপ'- এই তাপের জন্যই গরম লাগে। তাই ছাতার তলায় বা গাছের নীচের ছায়াতে দাঁড়ালে গায়ে তাপ লাগতে পারে না আর সেজন্য গরমও লাগে না।

তাপ কি জান ? তাপ এক ধরনের 'শক্তি' ইংরাজিতে যাকে বলে এনার্জি ( energy)। একে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়, মানে বুঝতে পারা যায়। এখন যেমন বুঝতে পারছ যে গরম পড়েছে-  কারন চারপাশে তাপ বেড়েছে। এই তাপ কিছু কিছু ধর্ম (property) মেনে চলে। তার মধ্যে প্রধান হল যে, সে সব সময় গরম জিনিষ থেকে ঠান্ডা জিনিষের দিকে চলে যেতে চায়। যার মধ্যে যায়, সে জিনিষটা গরম হয়ে ওঠে। সুতরাং যা থেকে তাপ চলে যায় সে যে ঠান্ডা হবে এটাই স্বাভাবিক। হয়েও যায়। 

এখানে একটা কথা বলে রাখি। 'তাপের ' সংগে 'গরম', 'ঠান্ডা' বা 'উষ্ণতা' কিন্তু গুলিয়ে ফেলো না,ঠিক যেমন 'চিনির' সাথে 'মিষ্টি' গুলিয়ে ফেলা যায় না। চিনি আর মিষ্টি কি এক জিনিষ ? চিনি থাকলে তবে না মিষ্টি হবে! ঠিক তেমনি তাপ পেলে কোন জিনিষ গরম হবে আবার চলে গেলে সে জিনিষটা ঠান্ডা হয়ে পড়বে।

রান্নাঘরে গ্যাসের উনুনের তাপে তার ওপরে কোন পাত্রে রাখা ঠান্ডা জল গরম হয়ে যাবার কারণ এটাই। তাই বলে আবার ভেবে বসো না যে গ্যাসের উনুনটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। সেটা হয়ই বা কি করে ?  গ্যাস পুড়ে পুড়ে ওখানেই ত তাপ তৈরী হচ্ছে কিনা! আর জানই ত সিলিন্ডার থেকে অনবরত গ্যাস এসেই যাচ্ছে। তবে হ্যাঁ, গ্যাস শেষ হয়ে গেলে বা গ্যাসের যোগান বন্ধ করে দিলে, উনুনটা আর গরম থাকবে না।

এখন আমাদের শরীরের কথা ভাব। এটা সব সময় গরম থাকে। শরীরের উষ্ণতা কত জান ত ? ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কাছা কাছি। শরীর উষ্ণ থাকে কি করে ? আমরা নানা ধরনের খাবার খাই। সেই খাবার আমাদের শরীরে শক্তি জোগায়, আর সেই জন্য আমাদের দেহ উষ্ণ থাকে।তাই যতদিন আমরা জীবিত থাকি ততদিন শক্তি পাবার জন্য আমাদের খাওয়া দাওয়া করে যেতে হয়। আগে যে গ্যাস উনুনের কথা বললাম, ঠিক সেটার মত। খাবার থেকে অনবরত শক্তি এসেই যাচ্ছে।
         
এবার ভাবা যাক যে এখন শীতকাল। এ সময়ে বাতাসের উষ্ণতা শরীরের উষ্ণতা থেকে কম থাকে। ধরি কোন সময়ের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। সে সময় শরীরের উষ্ণতা তো সেই ৩৭ ডিগ্রীতেই আছে। অর্থাৎ শরীরের উষ্ণতা বাতাসের চেয়ে বেশী। তাহলে তাপের নিয়মমত(যেটা আগে বলেছি) এবার তাপ শরীর থেকে বাইরে বেরোতে থাকবে। এতে শরীরটা ঠান্ডা হতে থাকবে অর্থাৎ শীত করবে। এই জন্যই ত শীতকালে শীত লাগে।
        
এমন সময়ে আমরা কি করি ? গরম জামা গায়ে দিই। কেন বল দেখি ? এটাতো সহজ কথা, যাতে তাপটা বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারে। তাহলে গরম জামাটা এমন কি বস্তু যে শীতকে আটকে দেয় ?
গরম জামা বললেও আসলে জামাটা সত্যিই গরম নাকি ? মোটেও না। তবে জামাটা শরীরের তাপকে কি ভাবে আটকায় ? তা বলি এবার।

গরম জামা

গরম জামা


আগে একটা সংখ্যায় 'সুপরিবাহি' আর 'কুপরিবাহি' বস্তুর কথা বলেছিলাম, মনে আছে ? নেই ? যার মধ্যে দিয়ে তাপ সহজে চলাচল করতে পারে সেটা তাপের সুপরিবাহি। যেমন কোন ধাতব জিনিষ। আর যার ভিতর দিয়ে তাপ চলতে পারে না সেটা তাপের কুপরিবাহি। কাচ, কাগজ বা কাপড়চোপড়--এ রকম জিনিষ হল কুপরিবাহি। আর বাতাসও এই রকমই একটা বস্তু।
         
একটা গরম জামা, ধর উলের সোয়েটার, দেখ। সুতো গুলো কেমন মোটা মোটা আর কোঁচকানো। শুধু তা-ই নয় জামাটা কেমন ঢিলাঢালা করে বোনা। কোঁচকানো,মোটা মোটা সুতো আর ঢিলাঢালা বুনোটের ফাঁকফোকড়ে আটকে থাকে প্রচুর বাতাস যা কিনা তাপের একেবারে হদ্দ বাজে কুপরিবাহি। এর ভিতর দিয়ে তাপ  সহজে বাইরে যেতে পারে না। তাপ বাইরে যেতে না পারলে শরীর তো গরম থাকবেই, না কি বল ? সেজন্যই সোয়েটারকে বলি গরমজামা।
শীত যদি খুব বেশী পড়ে, একটা সোয়েটারে কাজ না চলে, তখন একটা জ্যাকেট চাপিয়ে নিলে শীত একদম জব্দ। কারণ সোয়েটার আর জ্যাকেটের ফাঁকে আটকে যায় পুরু বাতাসের স্তর,যেটা মোটা কুপরিবাহির কাজ করে।

রাতে ঘুমোবার সময় কম্বল বা লেপও একই রকমভাবে কাজ করে। কম্বলের উলের ফাঁকে বা লেপের তুলোর ফাঁকে আটকে থাকা বাতাস দারুন সুন্দর কুপরিবাহির কাজ করে থাকে।
         
লক্ষ্য করে দেখেছ কিনা জানি না যে যখন বেশি শীত পড়ে মা তখন লেপ-কম্বল-কাঁথা রোদে দেন। কেন বলত ? যাতে তুলো ফেঁপে উঠে আরও বেশি বেশি বাতাস নিজের ভিতর ঢুকিয়ে নেয়, যাতে লেপটা আরও কুপরিবাহি হয় আর বেশি গরম আর আরামদায়ক হয়।
         
তুলো ফেঁপে ওঠে কেন ? এর কারণ, আমাদের চারপাশের প্রায় সব জিনিষ তাপ পেলে আয়তনে বেড়ে যায় অর্থাৎ বড়সড় হয়ে যায়। এটা খুব সহজেই বুঝতে পারবে যদি একটা কাজ কর।  একটা বেলুনকে অল্প বাতাস ভরে মুখটা ভাল করে বেঁধে রোদে ফেলে রাখো, কিছুক্ষন পরে দেখবে যে সেটা ফুলে বড় হয়ে গেছে।

কোম্বোল
শীতে কম্বলের তলায় শুয়ে ভারি আরাম হয়

         
কেন হল এমন ? ঐযে বললাম, তাপ পেলে সব জিনিষ আয়তনে বেড়ে যায়! এখানে রোদের তাপে বাতাস আয়তনে বড় হয়ে বেলুনকে বেশি করে ফুলিয়ে দিল। ঠিক এমনি করে লেপের ভেতরে আটকে থাকা বাতাস তাপ পেয়ে ফুলে উঠে তুলোকে ফাঁপিয়ে দেয়, আর সেই জায়গায় আরও বাতাস ঢুকে পড়ে।
        
উত্তর মেরু অঞ্চলের গ্রীনল্যান্ডের নাম শুনেছ ত, যেখানে এস্কিমোরা থাকে ? ওদের ছবি দেখেছ ? কেমন লোমশ পোষাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখে যাতে কোন প্রকারেই শরীরের সামান্য তাপও বাইরে যেতে না পারে। ঐ মোটা লোমশ পোষাক সেই কাজটা করে। তবে ওখানে এতই ঠান্ডা যে এত কিছু করেও তাপ শরীরে ধরে রাখা ভারি মুশকিল হয়ে যায়। তাই শরীরের তাপ বাড়াতে ওরা অনেক চর্বি খায়, এমনকি শীল মাছের চর্বি কাঁচাও চিবিয়ে খায়।

এস্কিমো
এস্কিমো

         
এভারেস্ট শৃঙ্গজয়ী তেনজিং নোরগে বা স্যার এডমন্ড হিলারীর ছবি দেখেছ নিশ্চয়ই। দেখবে সেইরকম মোটা মোটা ফাঁপা পোষাক পড়া ওঁদের।
         
শীতকালে একটা কাজ করে দেখতে পার। একটা সোয়েটার না পরে তার বদলে দু'টো পাতলা জামা পরে দেখো, প্রায় একই ফল পাবে। কারণটাও একই। দু'টো জামার ফাঁকে অনেকটা বাতাস আটকে থাকতে পারে।

শীতের ব্যাপারটা তো বোঝা গেল, নাকি। আর গরমের ব্যাপারটা ? এতে উলটো কান্ড ছাড়া আর কি হবে ?
          
এখন এই গরমের সময় ধর বাইরের উষ্ণতা ৪০ ডিগ্রী। আর তোমার শরীরের তাপমাত্রা ত সেই ৩৭ ই আছে। তার অর্থ তোমার দেহ বাইরের তুলনায় ঠান্ডা। তাহলে নিজের ধর্ম অনুযায়ী তাপ কি করবে ? তোমার ঠান্ডা দেহে ঢুকে পড়বে। তখন গরমে প্রানটা আইঢাই করবে। এই কারণেই গরমকালে গরম লাগে। বুঝতে পারলে কথাটা ? তাহলে প্রশ্নটা খুব একটা বোকা বোকা ছিল না, কি বল ?
           
কিন্তু গরমের এই কষ্ঠ থেকে রক্ষা পাবার উপায় কি ? শীত আটকাবার গরম জামার মত 'ঠান্ডা জামা' পাওয়া যায় না আমাদের আবহাওয়ায়, তবে যারা মরুভূমি অঞ্চলে থাকে তারা একরকম পোষাক ব্যবহার করে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত মোটা কাপড়ের পোষাক পরে থাকে সবসময়। কাপড় আর তার মধ্যে আটকে থাকা বাতাস বাইরের তাপকে ভেতরে আসতে দেয় না। মরুভূমিতে দিনে যেমন গরম রাতে আবার তেমনি ঠান্ডা। এই মোটা কাপড়ের পোষাকটা ঠান্ডা বা গরম - দুটো থেকেই দেহকে বাঁচায়।

 

বেদুইন 
বেদুইন       

আমরা অবশ্য নানা রকম ঠান্ডা পানীয়, আইসক্রিম-- এ সব খেয়ে আরাম পাবার চেষ্টা করে থাকি। একটু ভাল লাগলেও সেটা একেবারেই সাময়িক ব্যাপার কোন স্থায়ী সমাধান নয়।

আইসক্রিম
গরমকালে খেতে ভারি মজা

          
অফিস-কাছারি, বাড়িঘর, সিনেমা বা থিয়েটার হল - এ সব যন্ত্রের সাহায্যে ঠান্ডা করা হয়ে থাকে। এমন জায়গায় কিছুক্ষন থাকার পর বাইরে এলে শরীর ভীষন খারাপ হয়। হঠাত গরম লেগে সর্দিগর্মি হয়ে যেতে পারে। হিতে বিপরীত যাকে বলে আর কি। পড়াশোনা,স্কুল, খেলা - এ সব ছেড়ে বিছানায় বেশ কয়েক দিনের জন্য পড়ে থাকা, আর বিশ্রী সব ওষুধ গেলার ব্যবস্থা পাকা!
         
কিন্তু  গরমের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য প্রকৃতি মা একটা ব্যবস্থা করে রেখেছেন। যখন খুব গরম পড়ে তখন খেয়াল করেছ নিশ্চয়ই যে আমাদের শরীর দরদর করে ঘামতে থাকে। ঘাম কিন্তু এমনি এমনি হয় না। ঘাম শরীর থেকে বেরিয়ে বাষ্প হয় উড়ে যাওয়ার সময় দেহ থেকে তাপ নিয়ে যায়। এতে দেহ ঠান্ডা হয়। তাই উপযুক্ত পরিমান জল পান করতে হয়। তাতে শরীর ঠান্ডাও থাকে আর ঘামের জন্য উবে যাওয়ার ফলে দেহে জলের ঘাটতিও হয় না।
        
এই ঘাম আর তার ফলে শরীর ঠান্ডা হওয়ার ব্যাপারটা উঁচু শ্রেনীতে যখন পড়বে তখন আরও ভাল করে জানতে পারবে। ঘাম কোথা থেকে বার হয় বল দেখি! আমাদের দেহের চামড়ায় অনেক ছোট্ট ছোট্ট ছিদ্র আছে, যা খালি চোখে দেখতে পাবে না। এই ছিদ্রপথে ঘাম বাইরে আসে। সেই জন্য খেয়াল রাখতে হয় যাতে এই সব ছিদ্র পথ বন্ধ হয়ে না যায়।
         
গরমের নানা সমস্যা থেকে শরীরকে বাঁচাবার জন্য আমরা অনেকরকম প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার করে থাকি, যা অনেক সময় ঘাম বেরোবার পথকে বন্ধ করে দিতে পারে। এটা হলে দেহ ঠান্ডা ত হবেই না বরং গরমে হাঁসফাঁস  করে অসুখে পড়ে যাবে। তাই বেশী গরমে কি কি করা উচিত-অনুচিত, তা ডাক্তার কাকুদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া খুব জরুরী।    
         
খুব গরম পড়েছে, তাই সাবধানে থেক সবাই।     

 

 

সন্তোষ কূমার রায়
রূপনারায়ণপুর, বর্ধমান

প্রাণ ভরে...

এই ধরো পঞ্চাশ বছর আগের কথা,  ভারতে তখন কমিক্স বলতে শুধুই স্পাইডারম্যান, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান। এর মধ্যে অবশ্য রামায়ণ,মহাভারত কমিক্স আকারে প্রকাশ করা হয়েছিলো। কিন্তু ভারতীয় নতুন কমিক্স ছিলো না বললেই চলে।

ঠিক এই রকম এক সময়ে মুম্বাইয়ের 'স্যার যে যে  স্কুল অব আর্টে' প্রাণকুমার শর্মা নামের এক যুবক ফাইন আর্ট নিয়ে পড়াশুনো করছিলো। তার কেনো জানি না সব সময় মনে হতো এখানে কমিক্স সেভাবে কেউ উপভোগ করতে  পারে না। কমিক্স পড়ে কেউ আনন্দ পাচ্ছে না, উপভোগ করতে পারছে না। তার মনে হলো সবার হয়তো বিদেশী সুপার হিরোদের গল্প ভালো লাগছে না। কিন্তু সেই সময় খুব কম লোকই নতুন কমিক্স নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতো বা বিদেশী কমিক্সের সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করতো।

আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর প্রাণ 'মিলাপ' নামের এক দৈনিকে কার্টুনিস্ট হিসাবে যোগ দেন। এখানেই প্রাণ একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেললেন। ডাব্বু নামের এক কমিক্স স্ট্রিপ তৈরী করে ফেললেন কিছু দিনের মধ্যে। তাঁর কমিক্সের চরিত্ররা হলো পাশের বাড়ির দুষ্টু ছেলেটা, পাড়ার ছোট্ট মেয়েটা, জেঠিমা, কাকু, কাকিমা। গল্প গুলো শহর কেন্দ্রিক অর্থাত শহরকে ঘিরে গড়ে উঠলো। ঠিক এর পরেই এলো চাচা চৌধুরী হিন্দি 'লটপট' ম্যাগাজিনের হাত ধরে।

চাচা চৌধুরীর কিন্তু কোনো অদ্ভুত ক্ষমতা নেই অন্যান্য সুপার হিরোদের মতো। তিনি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ, বলতে পারো প্রবীন নাগরিক বা সিনিয়র সিটিজেন যাঁর একমাত্র ভরসা  ‘মগজাস্ত্র’, উপস্থিত বুদ্ধি। তাঁর বুদ্ধি সুপার কমপিউটারের থেকেও প্রখর। চাচী আর রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটি নেড়ি  কুকুর রকেটকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। তাঁর একমাত্র ছায়া সঙ্গী  সাবু, যে কিনা বৃহস্পতি গ্রহের বাসিন্দা। জানো তো বৃহষ্পতি হলো সবচেয়ে বড় গ্রহ, আর তাই সাবুও লম্বা, চওড়া আর বেশ শক্তিশালী। চাচা চৌধুরীর প্রখর বুদ্ধি আর সাবুর শক্তি এই দুইয়ে  মিলে গুন্ডা বদমাইশদের সাজা দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। রাকা নামের  এক ডাকাত হলো তাদের প্রধান শত্রু। লাল পাগড়ি, হাতে ছড়ি আর সাদা গোঁফ চাচা চৌধুরী মনে হয় সবচেয়ে প্রবীণ হিরো।

চাচা


তিনি জনতেন কমিক্সের চরিত্রদের কখোনো বয়স বাড়ে না বা কমে  না তাই তিনি বিভিন্ন বয়সের চরিত্রদের সৃষ্টি করলেন। যেমন পাঁচ বছরের ছোট্ট পিঙ্কি। বয়সে ছোট হলে কি হবে। সে আর তার ছোট্ট  কাঠবেড়ালী কুটকুট সাড়া পাড়া দাপিয়ে বেড়ায়। প্রশ্ন করে করে  সবাইকে ব্যাতিব্যস্ত করে তোলে।

আরেকদিকে আছে বিল্লু। সে স্কুলে যায়। তার আদরের কুকুরের নাম মোতি। বন্ধুরা মিলে যখন পাড়ায় ক্রিকেট খেলে তখন আশেপাশে  বাড়ির জানলার কাঁচ আর আস্ত থাকে না। পালোয়ান বজরঙ্গির  সঙ্গে তার যত ঝামেলা। কিন্তু বাড়িতে থাকলে বিল্লু শুধু টিভি দেখে।

এই সমস্ত কমিক্স পাঞ্জাব কেশরী, জগবানী, হিন্দ সমাচার, সন্ধ্যা টাইমস, ময়ূরা, লটপট প্রভৃতি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। পরে ডায়মন্ড কমিক্স এই গুলোকে বই হিসাবে প্রকাশ করে।

ভারতের কমিক্সের জগতে যিনি এত কান্ড ঘটিয়েছিলেন সেই প্রাণকে  ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়ার সম্পাদক মরিস হর্ণ(Maurice Horn)  বলেছেন “Walt Disney of India”।
১৯৯৫ সালে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব কার্টুনিস্ট তাঁকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। লিমকা বুক অব রেকর্ডে প্রাণের নাম পাওয়া যায় ভারতীয় কমিক্সস্ট্রিপে তাঁর অবদানের জন্য। শুধু তাই নয় তিনি অষ্ট্রেলিয়া কার্টুনিস্ট সোসাইটির অন্যতম সদস্য। এখন  প্রাণের বয়স হয়েছে কিন্তু এখোনো থেমে থাকেনি তাঁর কলম... তুলি...কোনো কিছুই। এখোনো চাচা চৌধুরী, সাবু, রাকা বিল্লু তাদের কেরামতি দেখিয়ে চলেছে। আর আমরাও পথ হাঁটছি তাদের সাথে।

 

 

পূর্বাশা
নিউ আলিপুর, কলকাতা

বেনহুর - হলিউড ধ্রূপদী ছবি


ছবি,ছায়াছবি, চলচ্চিত্র, ফিল্ম বা সিনেমা, যে নামেই ডাকো - এই মাধ্যমের একটা মায়া আছে। এ যেন এক আধুনিক রূপকথা। যন্ত্রের সাহায্যে অবাস্তব কে বাস্তব সাজিয়ে দিলে যে ম্যাজিক তৈরি হয়, তাকেই তো সিনেমা বলে! না হলে আর কেন ছোট বড় সবাই সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে? আমি অতীতের কথাই বলছি। কেননা আমাদের ছোটবেলাতেও তো টিভি ছিলনা। এখনকার মত আলো ঝলমলে বৈঠকখানায় বসে গল্প করতে করতে টিভি দেখা, আর অন্ধকারে রুদ্ধশ্বাসে বিশাল পর্দার সামনে জমজমাট কাহিনির টানাপোড়েনে জুড়ে থাকা আরেক জিনিষ।

এরকমই ছিল আমাদের ছোটবেলা। কমলালেবু কি বাদাম হাতে আমরা মামা বা পিসেমশাইয়ের সঙ্গে সাহেবপাড়ায় মেট্রো বা এলিটে ভীড় জমাতাম 'বেনহুর' দেখব বলে। 'বেনহুর' গল্পটা পড়েছ কি? বা দেখেছ? ১৮৮০ সালে লেখা লিউ ওয়ালেসের উপন্যাস বেনহুরঃ এ টেল অব দ্য ক্রাইস্ট অবলম্বনে এই ছবিটি ১৯৫৯ সালে তৈরি করেন বিখ্যাত চিত্র পরিচালক উইলিয়াম ওয়াইলার।

পোস্টার
ছবির পোস্টার

এই গল্প অবলম্বনে এই নিয়ে তৃতীয়বার ছবিটি তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এই ছবিটির সঙ্গে আগের দুইটি প্রচেষ্টার কোন তুলনাই চলে না। এই ছবিটা ছিল এক অসাধারন ছবি, যেখানে এক অসাধারন গল্প বলা হয়েছিল। কি নেই সে গল্পে? বন্ধুতা-শত্রুতা, রাজনীতি-ধর্ম, খেলা-বাজি, দ্বন্দ্ব-মিল, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, আশা-নিরাশা, আনন্দ-দুঃখ, ভালবাসা-হিংসা - মানুষের জীবনের সব রকম অনুভূতির ছোট ছোট গল্প ছড়িয়ে আছে এই বিশাল গল্পের মধ্যে;

বেনহুর
বেনহুর এর ভূমিকায় চার্লটন হেস্টন
 
মেসালাহ্‌
মেসালাহ্‌ চরিত্রে স্টিফেন বয়েড
 
 

আছে যীশুখ্রীষ্টের গল্প;

যীশু

আছে রোম সাম্রাজ্যের গল্প;

রোমাণ

আছে মানবসভ্যতার গল্প।

মানবসভ্যতা

আর তাই এই গল্পটা, বা সেই গল্প নিয়ে তৈরি এই ছবিটা, আমাদের কাছে কখনও পুরোনো হয়না।

কি সেই রহস্যটা কি, যা যুগে যুগে বেনহুরের মত বানানো গল্পের সঙ্গে আমাদের বেঁধে রাখে? আসলে যেকোন ছবি বা ফিল্মের মধ্যে কোন অতীত বা ভবিষ্যত থাকেনা। যেকোন গল্পই আমাদের কাছে সে মূহুর্তের গল্প। তাই বেনহুর যখন শিকল বাঁধা অবস্থায় দাঁড় টানতে থাকে, বা মেসালা যখন রথের দৌড়ে অংশ নেয়, আমরাও মনে মনে দৌড়াই। আমাদেরও গায়ে যেন কৃতদাসের মত ঘামের দানা ফুটে ওঠে।

বেনহুর


হলিউড যে সারা বিশ্বকে প্রথম থেকেই জিতে নিল, তার প্রধান কারন এই যে, সেই ছবিগুলির মধ্যে আমরা মিশে যেতে পারি। নিজেদের সনাক্ত করতে পারি। আর কোথাও মনের গোপনে আমরা চাই-যে ভালরা জিতে যাক, আর খারাপরা হেরে যাক। আমরা যে আসলে নিজেদের জীবনেও সেইরকমই ঘটনা চাই। হলিউড ধ্রূপদী ছবি আমাদের এই ইচ্ছাকেই পূরণ করে। এ যেন এক ইচ্ছাপূরণের ম্যাজিক।

কিভাবে এই ইচ্ছাপূরণ হয়? কিভাবে গল্প বলে হলিউডের ধ্রূপদী ছবি? দেখা যাবে, প্রত্যেকটা ছবিরই একটা শুরু, একটা নাটকীয় মধ্যভাগ, ও একটা সুন্দর সমাপ্তি থাকে। এর ফলে, আমরা যারা দর্শক, আমাদের ওপর কোন চাপ থাকে না। আমরা জানি, বেনহুর শেষ পর্যন্ত বন্দীদশা কাটাতে পারবেই। সে তার মা আর বোনের কাছে ফিরতে পারবে, তার বাড়ি-ঘর ফিরে পাবে। যখন রথ চালানোর প্রতিযোগিতা হয়, আমরা টানটান হয়ে বসে দেখি বেনহুরের রথের চাকা প্রায় খুলে যাচ্ছে, কিন্তু তখনও আমরা মনে মনে জানি এবং আশা করতে থাকি যে, বেনহুর ঠিক জিতে যাবে।

এইভাবেই, হলিউডের কোন ছবিই আমাদের মধ্যে কোন আলাদা করে দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করেনা। ছবির শুরুতে যত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, সবগুলির সুন্দর সমাধান হয়ে যায়। ঠিক যেন, কঠিন পরীক্ষা বা পরিশ্রমের শেষে এক সুন্দর ফলাফল। একেই ভারি ভাষায় নিষ্পত্তি বা closure বলে।

তাই বলে এইরকম ভাবে গল্প বলা সহজ কথা নয়। বিভিন্ন আলাদা আলাদা দৃশ্যগুলিকে যেমন তেমন ভাবে জুড়ে দিলেই এইরকম মসৃন ভাবে গল্প বলা যায়না। ছবির বিভিন্ন শট বা দৃশ্যগুলিকে জোড়ারও নিয়ম আছে, যাকে বলে continuity। সেই নিয়ম মেনে তৈরি করা ছবি দেখলে মনে হয় - ঠিকই তো, এই ঘটনার পরেই তো ওই ঘটনা দেখানো উচিত।

ছোটবেলায় বেনহুর দেখে এরকম ভাবে অবাক হওয়ায়, বিস্ময়ে, মুগ্ধতায় তলিয়ে গেছিলাম। সব যুগেই এইরকম হয়। আজকের দিনে, তুমি যখন 'হ্যারি পটার' বা 'তারে জমিন পর' দেখ, তখন তুমিও ঠিক একইরকম অবাক হয়ে যাও, তাই না?

একদিন থেকে দেখতে গেলে, 'বেনহুর' কিন্তু প্রায় স্বপ্নের কারখানা থেকে তৈরি হওয়া এক শিল্প। আসলে '৬০ এর দশকের শেষে , বিখ্যাত এমজিএম কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছিল। তারা বেপরোয়া হয়ে, শেষ চেষ্টা হিসাবে, ১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে 'বেনহুর' তৈরি করে। আর কি আশ্চর্য, 'বেনহুর', ঠিক যেন নোয়া'র নৌকার মত তাদেরকে বাঁচিয়ে দেয় ৭৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিয়ে !

'বেনহুর'-এর সাফল্য অবিশ্বাস্য। অস্কারের ইতিহাসে এই ছবি প্রথম 'সেরা ছবি' সহ মোট১১টা পুরষ্কার পায়, যা পরে 'টাইটানিক' এবং ' লর্ড অফ দ্য রিংস' ছবি ছাড়া আর কেউই ছুঁতে পারেনি।

রথের দৌড়


বেনহুর ছবিটি , তার গল্পের দৌড়ের বাজির মত, নিজেই যেন এক বাজির খেলা। প্রথমে জনপ্রিয় অভিনেতা বার্ট ল্যাঙ্কাস্টার কে নাম ভূমিকায় অভিনয় করতে বলা হয়। তিনি রাজি হলেন না। তখন পল নিউম্যান এর দরজায় কড়া নাড়া হয়। তিনিও সাড়া দেন নি। অবশেষে চার্লটন হেস্টন রাজি হয়ে যান। পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন বিখ্যাত পরিচালক উইলিয়াম ওয়াইলার। তাঁর ছবি করার বৈশিষ্ট হচ্ছে লম্বা লম্বা শট। অথচ, বেনহুরের সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্য -রথের দৌড়, তিনি পরিচালনাই করেননি। ওই দৃশ্য পরিচালনা করেন অ্যাণ্ড্রিউ মারটন নামে একজন অখ্যাত নির্দেশক। আর আরো অবাক কথা, যে এই সিকোয়েন্স মোটেই হলিউডে তৈরি নয়। রোমের বিখ্যাট চিনেচিত্তা স্টুডিওতে তৈরি। এই পুরো সিকোয়েন্স চিত্রায়িত করতে সবশুদ্ধ সময় লেগেছিল তিন মাস। সেট এর মাপ ই ছিল ৭৩হাজার বর্গ মিটার। ১৮টা রথ বানানো হয়েছিল। ১৫,০০০ এক্সট্রা নিয়োগ করা হয়। বেনহুর রূপী চার্লটন হেস্টন কে একমাস সময় দেওয়া হয় রথ চালানো শেখার জন্য। মেসালা রূপী স্টিফেন বয়েড অবশ্য তার অর্ধেক সময় নেন শিখতে।

 

বাজি
বেনহুর ছবির বিখ্যাত রথের দৌড়এর দৃশ্য
 
রথের দৌড়
 
রথের দৌড়

রথের দৌড়

 

এইবারে বুঝলে তো, গত সংখ্যায় কেন বলেছিলাম, কারখানায় যেমন ভাবে কোন পন্য বানানো হয়, ঠিক তেমনভাবেই হলিউডের প্রথম যুগে ছবি বানানো হত। 'বেনহুর' যদি না দেখে থাকো, তাহলে  অবশ্যই দেখে নাও। ক্লাসিক বা ধ্রূপদী হলিউড সিনেমার এক অসামান্য নিদর্শন এই ছবিটা।

 

 

 

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক, চলচ্চিত্র বিদ্যা বিভাগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

 

ছবিঃ
উইকিপিডিয়া

সারেগামা হোম ভিডিও

undefined

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা