ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

সৃজন ও তার ময়না টিয়া
সৃজনের বাড়িতে ছিলো দুটো পাখী।ময়না ও টিয়া।দুটো খাঁচায় ওরা থাকত। ওদের মধ্যে ছিলো ভীষণ ভাব।সময় সুযোগ পেলেই ওরা নিজেদের মধ্যে খুব কথা বলত।হ্যাঁ,মানুষের মতই ওরা বেশ কিছু কথা বলতে পারত।সৃজন ওদের ছোট বেলা থেকেই কথা বলার শিক্ষা দিত।তাই ওরা মানুষের ভাষা যেমন অনেকটাই বুঝতে পারত তেমনি বলতেও পারত।এমনি ভাবে সৃজনও ওদের বন্ধু বনে গিয়েছিল।

ময়না একদিন বললো,টিয়া আমরা খুব ভাল আছি,দেখ তুই যা খাস আমিও তা খাই।তোকে যখন বন্ধু সৃজন স্নান করায়,আমাকেও করায়।আমাদের তো মজাই মজা,তাই না?
টিয়া বললো,তা বলেছিস ঠিক।আমরা তিন বন্ধু আছি তা না হলে,শুধু এক জন হলে কত খারাপ লাগত বল ?
--কেন?খারাপ কেন?ময়না জেনে শুনেও প্রশ্ন করল।
--ওই দেখ না,আকাশটা দেখ না কি সুন্দর!আর দেখ,আমাদের জাত ভাইরা কেমন উড়ে বেড়াচ্ছে স্বচ্ছন্দে!তোর আমারও তো ইচ্ছে করে বল,ওই আকাশটায় উড়ে বেড়িয়ে আসতে--ঘুরে বেড়িয়ে আসতে?টিয়া তার মনের কথা বলে চলল,এমনি সময় ঘরের বাইরে নীল আকাশে এক ঝাঁক পাখীর দল টি-টি,টি-টি শব্দ করে উড়ে গেলো।টিয়া তা চুপ করে কান পেতে  শুনলো। ময়নাকে আবার সে বলে উঠলো,ওই দেখ,আমার জাত ভাইরা আমায় ডেকে ডেকে চলে যাচ্ছে!রোজ ওরা এমনি ডেকে যায় কিন্তু আমি যেতে পারি না,আমি তো বন্দী !
ময়নার টিয়ার কথা সত্যি মনে হলো,ও সান্ত্বনা দিয়ে টিয়াকে বললো,তুই সত্যি বলেছিস টিয়া,আমরা বন্দী বটে!তবু একটা সময় আসে আমাদের ভালো লাগে--আমরা যখন খাই--আমরা যখন স্নান করি--আর আমাদের বন্ধু সৃজন আমাদের সঙ্গে যখন কথা বলে--শিশ দিয়ে কথা বলতে ওই তো আমাদের শিখিয়েছে!ও কিন্তু আমাদের খুব ভালবাসে রে !মাঝে মাঝে মনে হয় যদি সত্যি আমরা উড়ে যাই তা হলে সৃজন খুব দুঃখ পাবে।ওর জন্যে আমাদের মনও কাঁদবে রে !
টিয়া বললো,আমার মন কাঁদবে না।আমার কাছে ওই নীলাকাশ,সঙ্গী সাথীদের নিয়ে উড়ে যাওয়া--অনেক,অনেক ভালো লাগবে।
সৃজন পাখীদের কথা আড়াল থেকে শুন ছিলো।পাখীরা ওকে ভালোবাসে না।ও এত ভালোবাসে ওদের,আর,ওরা?চলে যেতে চায় ওকে ছেড়ে?
সৃজনের মনে আছে এক বছর আগের কথা--এক পাখীওয়ালা তাদের বাড়ি এসেছিল।অনেক পাখী ছিলো,এক এক খাঁচায় এক একটা করে পাখী ছিলো। কেবল একটা খাঁচায় দুটো ছোট্ট ছোট্ট পাখীর বাচ্চা রাখা ছিলো। পাখীওয়ালা বলেছিল,ওরা নাকি ডিম ফুটে ক দিন আগেই বেরিয়েছে। ছোট ছোট লোম নিয়ে ওরা চুপ করে জড়সড় হয়ে বসে ছিলো--তখনও পালক গজায় নি ওদের গায়ে!সৃজন বাবা,মার কাছে বায়না ধরেছিল ওই দুটো পাখীই তাকে কিনে দিতে হবে বলে!
দুটো পাখীর একটা ছিলো টিয়া,অন্যটি ময়না।অনেক দাম--কিন্তু পাখী দুটো ছোট ছিলো বলে কম দামে দিয়ে গিয়ে ছিল পাখীওয়ালা। বাবা,মা, বললেন,এবার ঠেলা সামলাও,ভালো করে ওরা খেতেই শেখে নি! তোমাকেই ও পাখীদের বারবার খাওয়াতে হবে।
কষ্ট করে ছিলো সৃজন।পাখীদের ঠোঁট ফাঁক করিয়ে ছাতু,আটার গোলা, ভেজানো চানা-মটরের টুকরো করে খাইয়েছে।এমনি ভাবেই টিয়া,ময়না বড় হয়েছে।খাওয়া পড়া শেখানোর সব করেছে সৃজন।মা,বাবা মাঝে মধ্যে একটু আধটু সাহায্য করেছেন ঠিকই,সে সঙ্গে পড়ালেখার অনেক খোঁটাও দিয়েছেন,বলেছেন,সৃজন তোমার পড়ালেখা কিন্তু গোল্লায় গেলো!সারাক্ষন তুমি পাখীদের নিয়ে বসে থাকো!কিন্তু পাখীদের জন্যে এত কিছু করার পরও ওকে ছেড়ে ওরা উড়ে যেতে চায়!ওদের কথা শুনে ওর মন খুব খারাপ হয়ে গেলো--মনে মনে বেশ রাগ হলো,ঘরে ঢুকে পাখীদের কাছে গিয়ে বললো, টিয়া ,ময়না,তোরা কি আমায় ছেড়ে চলে যেতে চাস?আমার জন্যে তোদের এতটুকু ভালবাসা নেই !
ময়না বললো,আমি তোমায় ভালোবাসি,তবু মাঝে মাঝে মনটা উড়ু উড়ু হয়--মনে হয় ওই খোলা আকাশটা ঘুরে আসি--মনে হয়,পাখা ছড়িয়ে একটু আকাশের নীল রঙ আর রোদ্দুর মেখে নিই !
টিয়া বললো,একটু না,অনেক,অনেক ঘুরব,আকাশের আমার আত্মীয় পাখীদের ঝাঁকের সাথে ঘুরব.নীল আকাশটা পেরোব,সাদা মেঘে চড়ে খেলে বেড়াব--কি মজা ! কি মজা !
--ঠিক আছে,ঠিক আছে,ভীষণ রাগ হলো সৃজনের,মনে মনে বললো,পাজি! খুব খারাপ!!তোদের কাছে এই ভালবাসার মূল্য?দুটো খাঁচার দ্বারই ও খুলে দিয়ে বললো,তোরা কেউ আমার বন্ধু না,যা,চলে যা তোরা,আমার কাছে  আর কখনো আসবি না !
খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে এলো টিয়া,ময়না--সৃজনের কাঁদো কাঁদো মুখের দিকে ওরা তাকিয়েও যেন তাকালো না!ওরা শুধু রোদমাখা আকাশের দিকে তাকালো।আর ফর ফর উড়তে গিয়ে দুবার পড়ে গিয়ে তারপর উড়ে গেলো আকাশে!
সৃজন স্কুলে গেলো না--সারা দিন মন মরা হয়ে পাখীদের কথাই ভাবতে লাগলো।ও কাঁদছিল,আকাশের মাঝে ও ওর টিয়া,ময়নাকে খুঁজতে খুঁজতে  কাঁদছিল।
দিনের আলো নিভে আসতে লাগলো।সব পাখীরা তখন ফিরছে নিজের নিজের বাসায়।পলকহীন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল সৃজন--ওর টিয়া, ময়না হারিয়ে গেছে--আর ফিরবে না ওরা--!
তখন সন্ধ্যে হয় হয়--এমনি সময় সৃজন শুনতে পেল ময়না তাকে ডেকে বলছে,সৃজন বন্ধু! আমি ফিরে এসেছি,বন্ধু!ছুটে গেলো সৃজন বাইরে, দেখল, সত্যি ওদের দরজার ওপরে বসে ময়না মিটিমিটি হাসছে। কিন্তু টিয়া?সে তো এলো না!রাত নামল,অন্ধকারে সৃজন ও ময়না বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।কিছু পরে বাইরে থেকে টিয়ার কান্না শোনা গেলো,ও সৃজন বন্ধু আমায়  বাঁচাও। তাড়াতাড়ি সৃজন বাইরে বেরিয়ে এলো,দেখতে পেল, ধুলোয় লুটিয়ে আছে টিয়া! ওর একটা ডানা ভেঙে গেছে--ও উড়তে পরছিলো না।সমস্ত গা ওর ধুলোয় মাখা! সৃজন কেঁদে উঠলো, বললো, তোমার কি হয়েছে বন্ধু,টিয়ে !
টিয়ে কেঁদে বললো,আমার স্বজনেরা আমায় নিলো না বন্ধু,আমায় ওরা মেরেছে,আর তা ছাড়া,আমি ভালো উড়তে জানি না।আমি আর বাঁচবো না বন্ধু! সুজন কেঁদে উঠলো,ওকে কোলে নিলো,বললো,না,তুমি বাঁচবে,তোমায় আমি মরতে দেবো না!
টিয়ে বললো,সৃজন বন্ধু,আমি বুঝতে পেরেছি,এ খাঁচাই আমার ঘর,এখান থেকেই আমি বাইরের নীল আকাশ দেখে আনন্দ পাবো !
খাঁচা থেকে ময়না বলে উঠলো,ঠিক বলেছ বন্ধু!সৃজন বন্ধুকে দেখো--আমাদের থেকে চেহারায় কত বড়--তবু ঘরের মতই একটা খাঁচাতে ও আমাদের মতই বাস করে !
                                                                              
                                        

তাপসকিরণ রায়
জবলপুর, মধ্যপ্রদেশ                                      

   


   

চিলাপাতার জঙ্গলে

মাদারিহাট পর্যটন লজের সামনে কালচে সবুজ জঙ্গলের ঠিক ওপরটা দিয়ে সিঁদুরের গোল টিপের মতো সূর্য পাটে যেতে বসেছে। পশ্চিম আকাশে রং ময়ূরনীল ছিল একটু আগেও, এখন অচেনা একটা জাফরানি বর্ণ এসে মিশেছে আকাশে। বিচ্ছুরিত রজন হলুদকে সরিয়ে দিয়ে উঁকি দিচ্ছে মিষ্টি একটা ম্যাজেন্টা। আমি আর ইমন চা খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। ইমন বলল, বুঝলি রাহুল, ডুয়ার্সের প্রকৃতি যে আমাদের এমন করে দেবে সেটা আমি ভাবতেই পারিনি।

আমি বললাম, যা বলেছিস। পরের বার আরও বেশিদিন হাতে নিয়ে আসব এখানে।

ইমন আর আমি ক্লাসমেট। একবার স্কুল থেকে অযোধ্যা পাহাড়ে এক্সকারশানে গিয়েছিলাম আমরা। তখনই ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়েছিল। স্কুল থেকে বেরিয়ে আমরা একই কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। তখন আমরা দুজন ঘুরে বেড়িয়েছি প্রচুর। একটা আ্যড এজেন্সিতে দুজন চাকরি পেয়েছি একই সঙ্গে। তারপর বাউন্ডুলেপনা আরও যেন বেড়েছে আমাদের। পাহাড় আর সমুদ্রে আমরা গিয়েছি বেশ কয়েকবার। তবে ডুয়ার্সের সবুজ অরণ্যে ঢুঁ মারা আমাদের এই প্রথম।

ইমন বই পড়তে ভালোবাসে। বেড়াতে এলও এক-আধটা বই ওর ট্রাভেলব্যাগ থাকে। এবার ইমন ব্যাগের ভেতর একটা মহাভারত বয়ে এনেছে। ট্রেনে করে আসার সময় সুযোগ পেলেই গাব্দাগোব্দা সাইজের সেই বই পড়ে সময় কাটিয়েছে ইমন। আমি বিরক্ত হয়ে বলেছি, মহাভারত তো আমাদের সকলেরই পড়া। এর কাহিনি মোটামুটি প্রায় সব লোকেরই মুখস্ত।     কতবার পড়বি এক বই।

মহাভারতকে বলা হয় পঞ্চম বেদ জানিস তো, পৃথিবীর যাবতীয় ভাষায় রচিত মহাকাব্যের মধ্যে মহাভারত শুধু বৃহত্তমই নয়, নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম। ইমন হেসে বলেছে, মহাভারত কখনও পুরানো হয় না রে রাহুল। যতবার পড়ি, নতুন লাগে।

মাদারিহাটের কাছেই খয়েরবাড়ি প্রকৃতি উদ্যান। কাল বিকেলে গিয়েছিলাম সেখানে। হাতির পিঠে চেপে জলদাপাড়ার জঙ্গল চষেছি আজ সকালে। হলং, মালঙ্গী, চিরখাওয়া, বুড়িবসরা, সিসামারা আর ভালুক নদী বয়ে গিয়েছে বনের ভেতর দিয়ে। নদীর জলে কচুরিপানা খেতে আসা হাতির ছোট একটা পাল দেখতে পেয়ছি। এছাড়াও একটা গন্ডার, প্রচুর চেনা-অচেনা পাখি, কয়েকটা ময়ূর আর বাঁদর দেখতে পেয়ছি জঙ্গল সাফারি করার সময়।

আমাদের পর্যটন লজের ম্যানেজারের নাম নিত্য নিয়োগী। কাঁচাপাকা চুল, তামাটে গায়ের রং ঈষৎ প্রৌঢ় ভদ্রলোক লনে দঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের বারান্দায় দেখতে পেয়ে উঁচু গলায় বললেন, আপনারা তো কাল ফিরছেন ?

আমি চায়ে আরাম করে শেষ চুমুকটা দিয়ে গলা তুলে বললাম, কাল সকালে আলিপুরদুয়ার থেকে ট্রেন। কিন্তু আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দেবার জন্য একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে হয় যে !

নিত্যবাবু বললেন, ভাববেন না। পদম প্রধান নামে একজন চেনা ড্রাইভার আছে। খবর পাঠিয়েছি, সে এসে পড়বে এখনই।

আমরা ধন্যবাদ জানালাম। নিত্যবাবু হেসে বললেন, এরপর এলে একটু সময় হাতে নিয়ে আসবেন। নলরাজার গড় জায়গটা তো এবার আপনাদের দেখা হল না। পরের বার ওটা মিস করবেন না।

আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম, নলরাজার গড় ? সেটা আবার কোথায় ?

নিত্যবাবু বারান্দায় উঠে এসেছেন। একটা চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, কোচ রাজবংশের আদিপুরুষ বিশ্বসিংহের তৃ্তীয় পুত্র ছিলেন চিলা রায়। তিনি নাকি চিলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তেন শত্রুর ওপর। চিলাপাতার জঙ্গল নামটা তাঁর নাম থেকেই এসেছে। সেই চিলা রায় এই জঙ্গলে একটি দুর্গ স্থাপন করান। সেই দুর্গই হল নলরাজার গড়।

আমাদের কথার মধ্যেই ইঞ্জিনের শব্দ পাওয়া গেল। কাঁচা রাস্তাটা দিয়ে শুকনো শালপাতা উড়িয়ে একটা জিপ ঢুকে পড়ল লজের কম্পাউন্ডের ভেতরে। নিত্যবাবু বললেন, ওই যে, পদম চলে এসেছে গাড়ি নিয়ে। ওর সঙ্গে কাল সকালে স্টেশনে যাবার ব্যাপারে কথা বলে নিন।

পদম ঘাড় নাড়ল। ইমন কবজির দিকে একবার চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল, চিলাপাতার জঙ্গলে এখন নলরাজার গড়ে গিয়ে কি ঘুরে আসা যাবে একবার ?

পদম বলল, এখন বেরোলে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে স্যার।

নিত্যবাবু হাঁ হাঁ করে উঠলেন, এখন আর চিলাপাতার জঙ্গলে যাবেন না। এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তু যেমন আছে, তেমনি রয়েছে চোরাশিকারিদের দল। একটু বাদেই অন্ধকার নেমে আসবে। রাতের জঙ্গল কিন্তু ভীষণ ভয়ংকর। একটু গলা খাঁকড়ে ভদ্রলোক বললেন, তাছাড়া অন্য ভয়ও আছে সেখানে।

ইমন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, অন্য ভয় আছে মানে ?

নিত্যবাবু ইতস্তত করে বললেন, ঘটনাটা খুলেই বলি। গত সপ্তাহে দক্ষিণ ভারতীয় এক সাংবাদিক এই লজে এসেছিলেন। একটা ইংরেজি কাগজে ট্রাভেলিং নিয়ে লেখালেখি করেন উনি। আলিপুরদুয়ার থেকে গাড়ি ভাড়া করে এসে বিকেলের দিকে নলরাজার গড় দেখতে ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন। অনেক রাতে যখন ফিরলেন তখন চোখমুখ বদলে গেছে, ভয়ে রীতিমত কাঁপছেন ভদ্রলোক। তিনি একা নন,  ড্রাইভার ছোকরার অবস্থাও একিরকম। জঙ্গলের মধ্যে নাকি একটা জলজমিতে একজোড়া বিশাল সাইজের মানুষের পায়ের ছাপ দেখেছেন তাঁরা।

ইমন কৌতূহলী স্বরে বলল, বিশাল সাইজ মানে ?

নিত্যবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, যত বড় পায়ের মাপের কথা ভদ্রলোক বললেন তাতে ওই পায়ের মালিককে জুতো পরাতে হলে জুতো কোম্পানিকে কুড়ি নম্বর সাইজ জুতো তৈ্রি করতে হবে ! এ তো রীতিমত ভৌতিক ব্যাপার মশাই ! সে কারণেই বলছিলাম আপনারা রাতের বেলা চিলাপাতার জঙ্গলে যাবেন না।

ইমন তাঁকে আশ্বস্ত করার ঢঙে বলল, জঙ্গলে যারা চোরা শিকার করে গাছ কাটে তারাই সম্ভবত এই কাজ করছে। সাধারণ মানুষ যাতে জঙ্গলে গভীরে না ঢোকে সেজন্য তাদের ভয় পাওয়াবার জন্য তারা নকল পায়ের ছাপ তৈ্রি করে ভয় দেখাছে।


চিলাপাতার জঙ্গলে

নিত্যবাবু এই যুক্তি মানতে রাজি নন। আমাদের যেতে বারণ করেছিলেন বারবার। সে আপত্তিতে কান না দিয়ে বেরিয়ে পড়েছি আমরা। বেশ কিছুটা গিয়ে অরণ্যের গভীরে বনদপ্তরের চেক পোস্টে আটকে গেল আমাদের জিপ। পথের ওপর লোহার চেন দিয়ে বাঁধা শাল গাছের গুড়ি। আনেক খোঁজাখুঁজি করলাম, কিন্তু বিট অফিসারের দেখা পাওয়া গেল না।

হেমন্তের সন্ধে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, জঙ্গলে ছায়া গাঢ় হছে। আমি একটা হাফহাতা সোয়টার পরেছি, তবুও বেশ শীত শীত করছে এখন। আমাদের পাশ দিয়ে ছলাত্ ছল শব্দ করে বয়ে যাছে একটি নদী। তার পাড়ে বনদপ্তরের একটা সবুজরঙা কাঠের বেঞ্চ। সেখানে বসে পদম বলল, এটা হল চিলাপাতার জঙ্গল। নদীর ওপারে ওই যে বন দেখছেন, ওটা জলদাপাড়া। শিলতোর্সা নদী আলাদা করেছে দুটো জঙ্গলকে।

আমি বললাম, গাড়ি যাওয়ার পথ তো বন্ধ। নলরাজার গড় এখান থেকে কতদুর ? হেঁটে যাওয়া যাবে না সেখানে ?

পদম বলল, আনেকটা হবে স্যার।

ইমন বলল, হাঁটতে হলে হাঁটব। এত কাছে এসেও ফিরে যাব নাকি ?

ভাগ্যিস বুদ্ধি করে ওডোমস নিয়ে এসেছিলাম। মশার কামড় থেকে বাঁচার সেই মহৌষধ গায়ে লাগিয়ে জঙ্গল দিয়ে এগোচ্ছি। দূর থেকে একটা  অদ্ভূত শব্দ আওয়াজ এল একবার। একসঙ্গে আনেক ঘোড়া ডাকলে যেমন শব্দ হয় ঠিক তেমন। এক জায়গায় জঙ্গল একটু দোমড়ানো মনে হল। পদম দাঁড়িয়ে পড়ে চিন্তিত স্বরে বলল, দাগটা বেশিক্ষণ আগে তৈরি হয়নি। মনে হচ্ছে কোনও গন্ডার গিয়েছে এই পথ দিয়ে এক-দু'ঘন্টা আগে।

ইমন আমার পিঠে হাত রেখে বলল, জলদাপাড়ায় যে শান্তশিষ্ট গন্ডারটা দেখেছিলি সে মানুষের মুখ দেখে দেখে অভ্যস্ত। কচুরিপানা খেতে আসা হাতিরাও একরকম তাই। চিলাপাতার চারপেয়ে বাসিন্দারা কিন্তু ততটা নিরীহ নয়। কাজেই বি আ্যলার্ট রাহুল।

আমি ঢোঁক গিললাম। এমন নিশ্ছিদ্র জঙ্গল আগে দেখিনি কখনও। দিনের বেলাতেই আলো ঢোকে না ভালো করে। এই সন্ধেবেলা তো সে প্রশ্নই নেই। আমার হাতে একটা টর্চ। সেই টর্চ জ্বেলে জঙ্গল ভেঙে ভেঙে হোঁচট খেতে খেতে এগোচ্ছি। খানিকটা হাঁটার পর অবশেষে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পড়েছি। পদম আঙুল তুলে বলল, ওই যে, ওটাই নলরাজার গড়।

সন্ধে ঢলে রাত নামছে ধীরে ধীরে। একফালি চাঁদ তার ফিনফিনে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে নলরাজার গড়ের ওপর। পুরনো আমলের স্থাপত্য, যার প্রায় কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই, ধ্বংস হয়ে গিয়েছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। শুধু কিছু পুরানো ইঁটের দেওয়াল রয়ে গিয়েছে এখও। যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠেছে আগাছা।

ইমন বলল, এই গড় থেকে কোচ সেনাবাহিনির সফল কামরূপ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চিলা রায়। সষ্কোশ থেকে কোচ রাজ্যের পরিধি বড়িয়েছিলেন সুদুর কামরূপ পর্যন্ত, আজ যাকে অসম রাজ্য বলে আমরা জানি। এখানে এসে আমার তো রীতিমত গায়ে কাঁটা দিচ্ছে রে রাহুল।

 আমি উঁচু গলায় বললাম, ইমন, ওটা কি ?

খানিকটা দূরে ঝুঁঝকো মতো একটা গাছে ছেয়ে আছে জোনাকি। গোটা গাছটা ঢাকা পড়ে আছে হাজার হাজার হিরের টুকরোয়। আলোগুলো একবার জ্বলছে, একবার নিভছে। আরো গাছ আছে এ তল্লাটে, কিন্তু সে গাছগুলোতে জোনাকির বংশ পর্যন্ত নেই।

ইমন বলল, চল তো, কাছে গিয়ে ব্যাপারটা দেখি একবার।

হাজার হাজার জোনাকি জ্বলছে গাছটাকে ঘিরে। কাছাকাছি আসতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে এল। ঠিক যেন তুবড়ি পোড়ার মত গন্ধ। আসংখ্য তুবড়ি যেন জ্বলছে কোথাও।

ইমন নাক কুঁচকে বলল, এ তো সালফারের গন্ধ। এখানে সালফার এল কোথা থেকে ?

তখনি কেমন শোঁ শোঁ একটা শব্দ আসতে লাগল দূর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে জোনাকিগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে গাছটাকে ছেড়ে উড়ে যেতে লাগল নলরাজার গড়ের দিকে।

পদম ফিসফিস করে বলল, ফিরে চলুন স্যার। কেমন গড়বড় লাগছে সব।

তিনজন ছুটছি। হুমড়ি খেয়ে পড়লাম একবার। মুখের কাছটা ছড়ে গেল একটু। হাতের টর্চ ছিটকে গেল জঙ্গলের মধ্যে। টর্চ খুঁজে সময় নষ্ট না করে আবার দৌড়তে শুরু করেছি। জঙ্গল দিয়ে খানিকটা পথ আসার পর একটু উঁচু ফাঁকা জমি এসেছে। কী ভেবে পেছন ফিরে তাকিয়েছি। আমার গায়ের সমস্ত রোম দাঁড়িয়ে গেল দৃশ্যটা দেখে। জিভ সহসা অসাড়, কাউকে ডাকব সে ক্ষমতাও বুঝি আমরা লোপ পেয়ে গিয়েছে। ইমন আর পদম গুটিগুটি এসে দাঁড়িয়েছে আমার পাশে। আমরা তিনজনই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি নলরাজার গড়ের দিকে।

আজস্র জোনাকি ঝাঁকে ঝাঁকে নলরজার গড়ের ঠিক মাঝখানটায় এসে কিছু একটা কেন্দ্র করে। হেমন্তের মিহি কুয়াশা একটা আবছা আড়াল তৈরি করেছে আমাদের চোখের সামনে। বুকের মধ্যে ধামসা মাদলের শব্দ হচ্ছে, চোখের পলক পড়ছে না আমাদের। রণ-পা চড়ে মানুষ যেমন হয়,  অল্পক্ষনের মধ্যেই ঠিক তেমনি বিরাট আদল তৈরি করে ফেলল জোনাকিগুলো।

এবার একটু স্পষ্ট হয়েছে সেই অতিমানবীয় অবয়ব। কালীপুজোর সময় আনেক পুজোমন্ডপে কুড়ি-পঁচিশ হাত উঁচু প্রতিমা দেখতে পাওয়া যায়। ঠিক তেমনি উচ্চতার এক মূর্তি সেখানে দাঁড়িয়ে। সারা গা দিয়ে যেন আলো বেরোছে তার। জ্বলজ্বল করছে দুটো স্থির চোখ। দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো সেই মূর্তিটির পরনে যুদ্ধের বেশ, মাথায় শিরস্ত্রাণ, একহাতে উদ্যত বিশাল এক ধনুক, অন্যহাতে অদ্ভুতদর্শন এক তির।

ঠিক তখনই আবার তুবড়ি-তুবড়ি গন্ধটা কোত্থকে এসে ঝাপটা মারল নাকে। আচমকা সমস্বরে একশো ঘোড়ার ডাকের সেই পিলে চমকে দেওয়া শব্দটা কাঁপিয়ে দিল সমস্ত জঙ্গল। মেরুদাঁড়া দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল যেন। আমরা একপা দু'পা করে পিছোতে পিছোতে দৌড়তে শুরু করছি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে।

ক্ষীণ চাঁদের আলোতে পথটুকু ঝাপসা দেখাছে। ঘাম জবজবে অবস্থা, এই শীতও ঘামছি কুলকুল করে। মনে হছে ফুসফুস বুঝি ফেটে পড়বে এখনই। বুড়িতোর্সার তীরে চেকপোস্টের কাছে আমাদের জিপটা দাঁড়িয়ে ছিল। সেইটুকু পর্যন্ত পৌঁছতে কতবার যে এক-একজন আছাড় খেয়ে পড়লাম তার ঠিক নেই।

হেডলাইট আর ফগলাইটের জোরালো আলো ফেলে ঘন জঙ্গল চিরে পাগলের মতো গাড়ি ড্রাইভ করে পদম আমাদের নিয়ে এল লজে। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই নেমে পড়েছি আমি আর ইমন। পদম বিস্ফারিত চোখ নিয়ে তখনও বসে আছে ড্রাইভিং সিটে। গাড়ি থেকে নামার কথা যেন মনেই নেই তার।

নিত্যবাবু আমাদের দেরি দেখে লজের বাইরে পায়চারি করছিলেন। আমাদের তিনজনকে বিপর্যস্ত দশায় দেখে লবিতে এনে বসালেন। তিন গ্লাস জল এল তাঁর নির্দেশে। চোঁচোঁ করে গ্লাসের পুরো জল খেয়ে নিলাম তিনজন। ইমনের মুখে সব শুনলেন নিত্যবাবু। বড়বড় চোখ করে বললেন, সেই অতিকায় পায়ের ছাপের মালিককেই কি তবে দেখলন আপনারা ? এ তো ভৌতিক কান্ড মশাই !

আমি স্বগতোক্তি করার মতো করে বললাম, ভুত-প্রেত তো কখনও দেখিনি কিন্তু যেসব গল্প যেমন শুনছি এ তো তেমন মনে হল না। অতিকায় চেহারা অবধি ঠিক আছে, কিন্ত ভূতের গা দিয়ে কি জ্যোতি বেরোয় ?

পদম বলল, ভূত কি যুদ্ধের পোশাক পরে থাকে কখনও ? তাদের হাতে কি তিরধনুক থাকে ?

আমি ইমনের পিঠে একটা আলতো চাপড় মেরে বললাম, তোর মহাভারতের পাতা থেকে কোনও চরিত্র উঠে আসে নি তো ?

ইমন হাসল না মোটেই।  বিস্ফোরিত চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। বলল, হ্যাঁরে রাহুল, আমরা অশ্বত্থামাকে দেখিনি তো?

আমি আকাশ থেকে পড়লাম,  অশ্বত্থামা ? মানে ?

ইমন আদ্ভুত স্বরে বলল, মহাভারতে দশজন চিরজীবীর উল্লেখ আছে জানিস তো। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষে দু'পক্ষ মিলিয়ে মাত্র দশজন বীর বাঁচেছিলেন। পান্ডবপক্ষের সাতজন হলেন যুধিষ্ঠির, ভীম, আর্জুন, নকুল, সহদেব, সাত্যকি, শ্রীকৃষ্ণ। কৌরবপক্ষের মাত্র তিনজন। অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য আর কৃতবর্মা।

নিত্যবাবু হাঁ করে শুনছেন ইমনের কথা। আমি ভ্রু কুঁচকে ইমনের দিকে তকিয়ে বললাম, তাতে কী প্রমাণ হল ?

ইমন উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, দ্রোণ আর কৃপীর পুত্র হলেন  অশ্বত্থামা। জন্মেই ঘোড়ার মতো ডেকেছিলেন বলে  অশ্বত্থামা নাম তাঁর। বাবার কাছেই তিনি অস্ত্রশিক্ষালাভ করেন, তাঁর কাছ থেকেই ব্রহ্মশির অস্ত্র পান। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত অবস্থায় দ্রৌপদীর পাঁচ ছেলে,  ধৃষ্টদ্যুম, শিখন্ডীকে বধ করেন আশ্বত্থামা। এমনকী তাঁর অস্ত্রে উত্তরার গর্ভস্থ অভিমন্যুর সন্তান মারা যায়। তাঁর মাথায় একটা মণি ছিল। সবসময় সেটা জ্বলজ্বল করত। সন্তানশোক, ক্রোধে উন্মাদ হয়ে দ্রৌপদী বলেছিলেন আশ্বত্থামার মাথার মণি  আমার চাই।

আমরা তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। তিনজন একসঙ্গে বললাম, তারপর ?

ইমন বলল, যুদ্ধশেষে অশ্বত্থামার মাথার মণি ভীম খুলে দ্রৌপদীর হাতে দিয়ে দেন। মণি হারিয়ে চিরজীবী অশ্বত্থামা বনে চলে যান। কে বলতে পারে, যুগ যুগ ধরে সেই হারানো মণির খোঁজে আজও হয়তো বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, এ তোর কষ্টকল্পনা। দিনরাত মহাভারত পড়ছিস, তাই এসব গাঁজাখুড়ি ভেবে দুই প্লাস দুই বাইশ করছিস।

ইমন স্মিতমুখে বলল, অমি একটা সম্ভাবনার কথা বলালম। আমি ভুল হতে পারি। তবে খেয়াল করে দেখিস যখন আলোর জ্যোতি বেরোতে থাকা মূর্তিটা আমরা জঙ্গলের মধ্যে দেখলাম তখন যেন একশো-হাজার ঘোড়া চিঁহি চিঁহি করে ডেকে জঙ্গল ফাটিয়ে ফেলছিল। চিলপাতার জঙ্গলে এত ঘোড়া আসবে কোত্থেকে বল তো !

সময় গড়িয়ে যাছে সময়ের মতো। আমার স্থানুর মতো বসে রয়েছি পর্যটন লজের লবিতে। খিদে-তেষ্টা ভুলে গিয়েছি সবাই। আজ নিজের চোখে যা দেখেছি সে ঘটনার কথা কেউ বিশ্বাস করবে কখনও ? অসম্ভব। হেসে উড়িয়ে দেবে সকলে। কিন্তু ইমনের অনুমান সত্যি হোক বা না হোক, একটা ব্যাপার নিশ্চিত, এই আশ্চর্য অভিজ্ঞতার স্বাদ আমরা বয়ে বেড়াব সারাজীবন ধরে।                                                        

পাপাঙ্গুল

পাপাঙ্গুলকে তোমরা অনেকেই চেনো। সেই পাপাঙ্গুল... "নিল মাথাতে সবুজ রঙের চুল"...এই গল্পটা সেই পাপাঙ্গুলের...যখন সে তার ছাঁকনি চড়ে সাগরপারি দিল। তারপর, অনেকদিন অনেক রাত গেছে কেটে, সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে ...পাপাঙ্গুলের নৌকো যখন অনেক ঝর অনেক ঢেউ পেরিয়ে এসে পৌঁছল এক মাঝ সমুদ্রে, সমুদ্রের ঢেউ ততক্ষণ অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। ছাঁকনিতে বাঁধা সবজেটে রুমালটা খুব আলতো করে, মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিচ্ছিল খুব কাছে, খুব কাছেই আছে পাপাঙ্গুলের দেশ। নিজের দেশ...

পাপাঙ্গুল তার ছাঁকনির ধারে বসে ভাবছিল সে নানান কথা – কেমন করে ঘর ছেড়েছিল...
“সে এক ঝমঝমে বৃষ্টির রাত, তিনদিন তিনরাত টানা বৃষ্টিতে যখন চারিদিক জলে থৈ-থৈ করছে, একটানা বৃষ্টির জলে ভেসে যে গেছে তার সব কিছুই, কোথাও কিছুই নেই। পাপাঙ্গুল তখন সেই বৃষ্টির রাতেই বেরিয়ে পরেছিল তার ছাঁকনিটাকে সম্বল করে, হুঁকোয় তার সবজে রুমালটা বেঁধে – তাকে পাল করে। তারপর ভাসতে ভাসতে কত যে কাল পেরিয়ে গেল, কত দেশ, কত মানুষ।”

এসব ভাবতে ভাবতে হটাৎ পাপাঙ্গুলের চোখ চলে গেল জলে – সেখানে একটা ছোট্ট গোল্ডফিশ। তার নৌকার খুব কাছে দিয়ে যাচ্ছে, একা একা। মুখটা তার ভারী ভারী, চোখ দুটো ছলছল। পাপাঙ্গুলের মনটা কেমন করে উঠল...সেও কি তার মত দেশছাড়া, সঙ্গীছাড়া কেউ? একা একা পথ ভুলে কিম্বা অভিমানে ঘর ছেরেছে? পাপাঙ্গুল একটু ঝুঁকে আস্তে করে ডাকল – “এই যে শুনছ...”
কোনও সাড়া নেই। গোল্ডফিশ আনমনা হয়ে সাঁতরেই চলছে একা একা। কোথায় যে যাচ্ছে তার কোনও ঠিকঠিকানাও নেই। চোখের কোনে তার এক চিলতে জল। ঠোতদুটো তার অভিমানে ফোলা। পাপাঙ্গুল আবার ডাকল – “এই শোনো, তুমি কোথায় যাচ্ছ?”

ঘোর কাটলে গোল্ডফিশের, এক চোখে পাপাঙ্গুলকে দেখে বলল – “আমায় কিছু বলছ তুমি?”

পাপাঙ্গুল মুখটা জলের দিকে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল – “নাম কি তোমার, কোথায় চললে তুমি?”

“জানিনা”।
“তুমি আমার ছাকনিতে এসো, একটুখানি জিরিয়ে নাও। অনেকক্ষণ থেকে সাঁতার কাটছ মনে হচ্ছে।” – পাপাঙ্গুল খুব নরম করে গোল্ডফিশকে বলল।
“কেন? আমি কেন তোমার ছাকনিতে চরবো?” – খুব গভীর দুঃখ যে হয়েছে, সেটা তার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

পাপাঙ্গুল বলল – “না মানে আমি ত তোমার বন্ধু হতে পারি, অনেকটা পথ আমিও একা একা চলেছি, যদি একটা বন্ধু পেতাম, মনের মত দুটো কথাও বলা যেত। সেই কতকাল দেশ ছেড়েছি, তালুক-তুলুক মালুক-মুলুক সব ভুলে আমারও কি ছাই একা একা আর ভাল লাগে বল? তাই ভাবলাম যদি তুমি আমার নাও-এ এসে একটু আমার সাথে গপ্পো কর...”

কি জানি কি ভেবে গোল্ডফিশের মন একটুখানি নরম হল। সে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে পাপাঙ্গুলের ছাঁকনিতে চড়ে বসল।

“তোমার নাম কি?”

“অনি...অনিফিশ”

“তোমার বাড়ী কোথায়?” অনিফিশ কোনও উত্তর দিলনা। পাপাঙ্গুল বুঝল একে ঘাঁটিয়ে কাজ নেই, তার থেকে এর সাথে বন্ধুত্ব করা যেতে পারে। বলল – “আমার নাম পাপাঙ্গুল। অনিফিশ, তুমি আমার বন্ধু হবে?”
পাপাঙ্গুল নাম শুনে বোধহয় অনিফিশের খুব ভাল আর মজাও লেগেছে। সে ফিক করে একটু হেসে বলল – “পাপাঙ্গুল...!!??”

“হ্যাঁ, আমার নাম পাপাঙ্গুল।

আমি ছাঁকনি চড়ে, নৌকো করে,

দূর দেশেতে ঘুরে, ফিরছি আবার ঘরে।”

 

পাপাঙ্গুলের ছড়া শুনে অনিফিশ খুব মজা পেয়ে গেল। সে বলল – “হুম, আমি বন্ধু হতে রাজি।”
তারপর শুরু হল অনিফিশ আর পাপাঙ্গুলের গল্প।
অনিফিশ বলল – “আমি ছিলাম সমুদ্দের মাঝে একটা ছোট্ট পাহাড়ের নিচে, একটা গর্তে। সেখানে আমরা অনেকে মিলে থাকতাম, আমার মা-বাবা ভাইবোন, বন্ধুরা সবাই মিলে। বেশ আনন্দেই কাটত আমাদের দিন, সব্বাই মিলে, সাঁতার কেটে এদিক-ওদিক ঘুরে বেরাতাম। সূর্যের প্রথম আলো যখন সেই জলের নিচে পৌঁছত...সেই সোনালি জলের মধ্যে আমরা দৌড়োদৌড়ী করে খেলা করতাম। ছোট্ট ছোট্ট সবুজ গাছের মধ্যে সমুদ্রের নিচে যে সে কত কি আছে...তোমায় কি বলব পাপাঙ্গুল, সে ভারী আজব দুনিয়া। কত সুন্দর সব নানা রঙের মাছ সেখানে, কত সুন্দর সেখানে নানান গাছ, তাতে নানা রঙের ফুল। তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না। তুমি ফাইটোপ্লাঙ্কটন দেখেছ পাপাঙ্গুল?”
পাপাঙ্গুল তো সেসব কিছু দেখেনি, মাথা নাড়িয়ে বলল “না”। অনিফিশ বলে – “সে ভারী সুন্দর জিনিষ পাপাঙ্গুল, সমুদ্রের ফুল, খুব সুন্দর, সুমদ্রের জলে ভেসে থাকে। আমরা বন্ধুরা মিলে সেই ফাইটোপ্লাঙ্কটনের বাগানে মাঝে মাঝে পিকনিক করতাম। কিন্তু জানো পাপাঙ্গুল, আমার মনটা শুধু আমায় বলত এখানের থেকে আরো দূরে যাব, আরো অনেক দূরে, এই সমুদ্রকে আবিষ্কার করতে। তারপর একদিন আমাদের সেই সুখের দেশে হানা দিল এক বিশাল হাঙর। সেদিন ছিল একটা খুব ঝলমলে দিন। আমরা বন্ধুরা মিলে প্ল্যান করেছিলাম একটু দূরে সবাই বেরাতে যাব। তাই সবাই মিলে গান গাইতে গাইতে এক ঝাকে আমরা চলে ছিলাম। হটাৎ করে দেখি সেই আলোর আকাশে একটা কালো মেঘের ছায়া, যেন অন্ধকার নেমে এল। আমাদের মধ্যে কে যেন বলে উঠল – পালাও পালাও পালাও...।” মাথা ঘুরিয়ে পিছন ফিরে আর দেখা হলনা পাপাঙ্গুল। যে যেদিকে পারল ছুটে গেল, কিছু বন্ধু পারলনা। হাঙর তাদের খেয়ে ফেলল। আমি দলছুট হয়ে খুব জোরে সাঁতার কেটে একটানা যখন প্রাণে বাঁচলাম দেখলাম এক অজানা দেশ। কেউ কোথাও নেই। একা আমি এখানে, কাউকে চিনি না। আমিতো পথ হারিয়েছি পাপাঙ্গুল। একা খুব একা।”

 

এই কথা বলতে বলতে পাপাঙ্গুল দেখে অনিফিশের সেই সুন্দর চোখের থেকে টুপটুপ করে দু-এক ফোঁটা জল পরছে পাপাঙ্গুলের হাতে। পাপাঙ্গুল অনিফিশের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল – “ছিঃ! অমন করে কাঁদতে আছে? আমি না তোমার বন্ধু হলাম আজ?”

“পাপাঙ্গুল আমার যে কেউ নেই, কোথাও কেউ নেই। আমি খুব একা হয়ে গেছি।”

“আমি তো আছি” এই বলে পাপাঙ্গুল অনিফিশের পাশে এসে চুপটি করে বসল। এদিকে গল্প করতে করতে কখন যে দিন গড়িয়ে বিকেল পেরিয়ে পশ্চিম সাগরে সূয্যিমামা অস্ত গেছে কেউ খেয়াল করেনি। আকাশে আজ খুব সুন্দর চাঁদ উঠেছে। পাপাঙ্গুল সেদিকে তাকিয়ে বলল – “অনিফিশ দেখ...কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে। এর মানে সব মেঘ কেটে গেছে আমরা এবার আবার সব ফিরে পাব।”
পাপাঙ্গুলের কথা শুনে অনিফিশের মনটা খুশীতে ভরে উঠল। সে তার ছোট্ট ছোট্ট পাখনা নেড়ে বলল - “আমরা আবার নতুন করে সব বন্ধু করে নেব, এই সমুদ্রে জা কিছু আছে সব আবার নতুন করে চিনে নেব।”

পাপাঙ্গুলের সবুজ চুল তখন হাওয়ায় ফুর ফুর করে উড়ছে। অনিফিশ আর পাপাঙ্গুলের মনে খুব আনন্দ আজ...অনেকদিন পর। বন্ধু পেয়ে বেজায় খুশী দুইয়ে। তারা তাদের চারিদিকে চেয়ে গেয়ে উঠল -

“আহা আলংগুশ, আজকে আমাদের মেজাজ খুশ, আহা আলংগুশ!!!”


অনন্যা দত্ত
রামপুরহাট, বীরভূম

মান্তুর জাদুছক্কা

মানতু এক বছর বারো-তেরোর ছেলে। ছোটবেলায়ই সে মা-বাবাকে হারিয়েছে, কাকা-কাকীমার কাছে মানুষ। কাকার দিলটা ছিলো দরাজ, কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য ছিলো সীমিত। তার মধ্যেই তিনি মানতুর যতটা সম্ভব দেখভাল করতেন। নিজের ছেলেমেয়েদের সাথে স্কুলে পাঠিয়ে তাকে লেখাপড়া শেখাতেন।
মানতু খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করতো। তবে তার ঝোঁক ছিলো আঁকাজোকা আর গানবাজনার দিকে। সে স্বপ্ন দেখতো, বড় হয়ে একদিন নামী চিত্রশিল্পী বা গায়ক হবে।
সেদিন রাতে সে একটি গল্পের বই শেষ করে সবে বিছানায় শুতে গিয়েছে। কোনো কারণে ঘুম আসতে চাইছে না, এমন সময় কানে এলো পাশের ঘরে কাকা-কাকীমার কথোপকথন। তাঁরা গলা নামিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বিষয়ে আলোচনা করছেন। সব কথা শোনা যায় না, তবু তার থেকেই বুদ্ধিমান মানতু বুঝে নিলো যে তাঁর এই আশ্রয়দাতা দু’জন গভীর আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে রয়েছেন। কিছুতেই তাঁরা আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য করে উঠতে পারছেন না। তবু এই উদার হৃদয় মানুষ দু’টি সেকথা মানতুর কাছে ঘুণাক্ষরে প্রকাশ করেননি। সে ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবেই এখন এ বিষয়ে আলোচনা করছেন।
“আমি যদি কিছু রোজগার করে ওঁদের সমস্যার একটু সুরাহা করতে পারতাম!” এই কথা ভাবতে ভাবতে মানতু একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো। কতক্ষণ পর কে জানে, কার ডাকে হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেলো। এক মহিলা মিষ্টিস্বরে ফিসফিসিয়ে বলছেন, “মানতু, তোমার দুঃখ আমার বুকে বেজেছে। আমি তোমায় সাহায্য করতে চাই।”
মানতু ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলো না। বললো, “আপনি কোথায়? আপনাকে যে দেখতে পাচ্ছি না।”
“আমাদের দেখা যায় না মানতু, শুধু শোনা যায়।” মহিলা আবার বললেন।
অতি কষ্টে উত্তেজনা দমন করে মানতু বললো, “আপনি কি কোনো দেবী, আমায় বর দেবেন?”
“ঠিক তা নয়। আসলে আমি এক ভিনগ্রহের অধিবাসী। আমি তোমায় একটা যাদু ছক্কা দিয়ে যাচ্ছি, যার সাহায্য নিয়ে তুমি তোমার মনের ইচ্ছে পূরণ করতে পারবে।”
“এটা কি তবে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো কোনো জিনিস?” মানতু কিন্তু-কিন্তু করে বলে।
“অনেকটা, তবে একটু তফাত আছে।” মহিলা বলেন, “ইচ্ছেপূরণের জন্য তোমাকে দুটো শর্ত মানতে হবে।”
 “কী সেই শর্ত?”
“প্রথমতঃ, তুমি কারো অনিষ্ট চাইবে না।”
“আমি কখনো কারো অনিষ্ট চাই না।”
“জানি, আমরা মন পড়তে পারি।” না দেখা স্বরে এবার একটু হাসির ছোঁয়া, “তোমার মনটা ভালো দেখেই আমরা এই ছক্কা তোমায় দিচ্ছি। তবে ক্ষমতা হাতে পেলে মানুষ বদলে যায়, তাই সাবধান করে দিচ্ছি – তুমি যদি এই ছক্কার কাছে কারো অনিষ্ট চাও তো তোমার নিজেরই অনিষ্ট হবে।”
“আমি যদি তেমন কিছু চাই তবে সেটাই আমার উচিত শাস্তি হবে। এবার বলুন, দ্বিতীয় শর্তটা?”
না দেখা কণ্ঠস্বরে এবার দৃঢ়তার ছোঁয়া, “আমরা অলস, অপদার্থদের সাহায্য করি না। ইচ্ছেপূরণের জন্য তোমাকে আন্তরিকভাবে পরিশ্রম করতে হবে, তবেই এই যাদু ছক্কা তোমায় উদ্দেশ্য পূরণে সাহায্য করবে। চলবে?”
“সে আর বলতে!” মানতু বিনা দ্বিধায় বললো, “পরিশ্রমে আমি কখনো পিছপা নই। শুধু আমি চাই তার ফলে যেন আমার আর আমার প্রিয়জনেদের উপকার হয়।”
“সেই জন্যেই এই যাদু ছক্কা। তুমি এটা হাতে ধরে মনে মনে আন্তরিকভাবে কিছু চাইবে, আর সাথে সাথে কোমর বেঁধে লক্ষ্যপূরণের জন্য কাজে নেমে পড়বে। তাহলেই তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে।”
“তাই হবে। কিন্তু – কোন কারণে যদি আমি ছক্কার কাছে যা চাইলাম তার জন্যে কোনো চেষ্টা না করি?”
“তবুও তোমার সেই মনস্কামনা পূর্ণ হবে।” কণ্ঠস্বরে এবার যেন একটু বিষণ্ণতার ছাপ, “কিন্তু সেই শেষবার। তারপর এই যাদু ছক্কা আবার আমাদের কাছে ফিরে আসবে।”

হঠাৎ যেন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলো আর মানতু ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলো। ওঃ, তাহলে স্বপ্ন!
কিন্তু তার শিয়রের কাছে ওটা কী জ্বলজ্বল করছে? মানতু আলো জ্বাললো, সাথে সাথে চোখে পড়লো সেখানে একটা লুডোর ছক্কার মতো জিনিস। তার ওপরে অবশ্য ছক্কার মতো এক-দুই ইত্যাদি ফোঁটার বদলে আছে কিছু অদ্ভুত চিহ্ন। আলো জ্বালাবার পর এখন জিনিসটিকে নিস্প্রভ দেখাচ্ছে। মানতু সেটাকে হাতে নিয়ে আলো নিভিয়ে দিতেই জ্বলজ্বলে ভাবটা আবার ফিরে এলো। অনিশ্চিত মন নিয়ে মানতু বালিশে মাথা দিলো, একটু পর ঘুমিয়েও পড়লো।


মান্তুর জাদু ছক্কা
ভোর হয়েছে। রাতের মায়াবী পর্দা সরে গেছে। মানতু চোখ খুলে দেখলো, সেই ছক্কাটা হাতের কাছেই রয়েছে। সে খোলামনে ব্যাপারটা ভাবার চেষ্টা করলো। কাল রাতে যা শুনেছে তা কি স্বপ্ন, না সত্যি? এ জিনিসটির কি সত্যিই কোনো যাদু ক্ষমতা আছে, নাকি কোনো আজেবাজে জিনিস কেউ ফেলে রেখে গেছে?
“কিন্তু আমি ব্যাপারটা সত্যি বলে বিশ্বাস করলেই বা ক্ষতি কী?” মানতু শেষ অবধি সিদ্ধান্তে এলো, “উদ্দেশ্য পূরণের জন্য পরিশ্রম করলে তো খারাপ কিছু হতে পারে না। আর এই মুহূর্তে কিছু টাকা রোজগার করে কাকা-কাকীমাকে সাহায্য করার চেয়ে বড় উদ্দেশ্য আমার আর কী হতে পারে?”
এই কথা ভেবে ছক্কাটাকে হাতে ধরে সে একটু অন্যমনস্কভাবে পথ চলছে। এমন সময় দেখলো একটা ঘোড়া টগবগিয়ে ছুটতে ছুটতে এগিয়ে আসছে। ভালো করে তাকিয়ে বুঝলো, ঘোড়াটি ক্ষেপে গিয়ে বেপরোয়া লাফঝাঁপ করছে আর পিঠে তার সওয়ার পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হবার ভয়ে সিঁটিয়ে কোনমতে লাগাম ধরে ঝুলে আছে।
কোনো ভাবনাচিন্তা না করেই মানতু সেই ছুটন্ত ঝড়ের সামনে লাফিয়ে পড়লো। তাকে দেখে জন্তুটার গতি যেন এক মুহূর্তের দ্বিধায় জড়িয়ে গেলো। সেটুকু সুযোগকে কাজে লাগিয়েই আরোহী আপ্রাণ চেষ্টার পর ঘোড়াটিকে আবার আয়ত্তে নিয়ে এলো। মানতু ওর পিঠে আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিলে লাগলো। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেলো জন্তুটা।
“বাহাদুর ছেলে!” ঘোড়ার সওয়ার মানতুর পিঠ চাপড়ে বললেন, “নিজের জীবন বিপন্ন করে তুমি আমাকে গুরুতর দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করেছো। এবার বলো, আমি তোমার জন্যে কী করতে পারি?”
কিছুক্ষণ দ্বিধা-সঙ্কোচের পর মানতু অবশেষে বলতে পারলো যে তার কিছু অর্থ উপার্জন করা খুব দরকার আর তার জন্য সে কিছু খুচরো কাজ খুঁজছে।
“কিন্তু তোমার তো এখনো কাজ করার মতো বয়েস হয়নি।” আরোহী বললেন, “তবে আমি তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি আর এ ব্যাপারে তুমি ঠিক লোকের কাছেই সাহায্য চেয়েছো। আমি একটা যাত্রাদলের মালিক। আমরা কয়েক দিন আগে যাত্রার পালা করবার জন্যে এই শহরে এসেছি আর অন্ততঃ মাসখানেক এখানেই থাকবো। এই ঘোড়াটাও কিছুক্ষণের জন্য যাত্রায় নামবে, তাই ওকে তালিম দেওয়া দরকার। সেই জন্যে আজ সহিসকে ছুটি দিয়ে আমি ওকে নিয়ে পড়েছিলাম। ঘোড়াটা শিক্ষিত, কিন্তু কী যেন দেখে ক্ষেপে উঠেছিলো। বড় বিপদ হতো, যদি তুমি এসে না পড়তে।
“তা, আমি খুচরো ফাই-ফরমাস খাটার জন্য একজন বিশ্বাসী ছেলে খুঁজছিলাম। তুমি চাইলে এখন থেকে সে কাজ তুমিই করবে। স্টেশনের কাছের ময়দানে আমাদের তাঁবু পড়েছে। আজ বিকেলে তাহলে সেখানে গিয়ে আমার সাথে দেখা ক’রো।”
যাত্রার মালিক ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে গেলেন আর মানতু উৎসাহে ফুটতে লাগলো। ছক্কাটি পাওয়ার পর সবে কয়েক ঘণ্টা কেটেছে, এর মধ্যেই তার প্রথম ইচ্ছেটা সফল হতে চলেছে!

সেদিন সন্ধ্যেয় মানতু যাত্রার মালিক দত্তবাবুর সাথে যাত্রার তাঁবুতে গিয়ে দেখা করলো। অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাকা শেষ অবধি তাকে কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। দেখা গেলো মালিক হিসেবে দত্তবাবু খুবই দয়ালু। তিনি মানতুকে হালকা কাজই দিতেন। তবে তাকে খুব বিশ্বাস করতেন দেখে প্রায়ই টাকা লেনদেনের মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তার হাতে ছাড়তে দ্বিধা করতেন না।
মানতুর অবশ্য সবচেয়ে ভালো লাগতো রাঘবের কাজে সাহায্য করতে। রাঘব যাত্রার দৃশ্যপট আঁকতো। মানতু তার ফাই-ফরমাস খাটতো আর সুযোগ পেলেই বসে বসে তার আঁকা লক্ষ করতো। দুঃখের বিষয়, রাঘব মানতুর প্রতি মোটেই সদয় ছিলো না। ছুতোয়-নাতায় সে মানতুকে হেনস্থা করতো। তার দুর্ব্যবহার অবশ্য মানতু গায়ে মাখতো না। সে দৃশ্যপটগুলির দিকে তাকিয়ে ভাবতো, কবে সে-ও অমন আঁকতে পারবে।
একদিন দুপুরে রাঘব খেতে গেছে আর মানতুকে বসিয়ে রেখে গেছে তার আদ্ধেক আঁকা একটা ছবির সামনে। দেখতে দেখতে মানতু ভাবছে, “আহা রে, আমি যদি এমন করে ছবি আঁকার সুযোগ পেতাম তো দেখিয়ে দিতাম আমিও কেমন পারি।” ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার গা কেমন শিরশির করে উঠলো। ঝট করে তাকিয়ে দেখে, নিজের অজান্তেই সে যাদু ছক্কাটা কখন হাতের মুঠোয় তুলে নিয়েছে।
হঠাৎ মনে হলো কে যেন তাকে বলছে – সুযোগ কেউ দেয় না মানতু, সুযোগ তৈরি করে নিতে হয়। চমকে এদিক-ওদিক তাকায় মানতু – কই, কেউ তো নেই! এবার সে ভালো করে দৃশ্যপটের দিকে মন দেয়। একটা পাহাড়, তার ওপরে আকাশে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ। আর পাহাড়ের গা বেয়ে সামনে এসে পড়েছে এক বহতা নদী। চমৎকার!
তবে নদীর জলে যেন ঠিক স্রোতের উদ্দামতা নেই। কী মনে হয়, রং-তুলি হাতে তুলে নেয় মানতু। তারপর ধীরে ধীরে নদীর বুকে আলতো তুলির টানে প্রাণসঞ্চারের চেষ্টা করতে থাকে। কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানে না, হঠাৎ এক ক্রুদ্ধ গর্জনে তার সম্বিত ফেরে। ঝট করে পেছন ফিরে দেখে, রাঘব দাঁড়িয়ে। রাগে তার চোখমুখ টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।
“হতচ্ছাড়া ছোঁড়া, আমার ছবিটার বারোটা বাজিয়ে দিলি! তোকে আজ দেখাচ্ছি!” বলে রাঘব ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে যায়। একটু পরই সে মালিক দত্তবাবুকে টানতে টানতে সেখানে নিয়ে আসে। অবাক দত্তবাবু ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছেন, এমন সময় হুড়মুড় করে সেখানে ঢোকে কয়েকজন পুলিশ কনেস্টবল আর একজন ইনস্পেক্টর। তাদের দেখে রাঘব দৌড়ে পালাতে যায়, কিন্তু তার আগেই কনেস্টবলদের শক্ত বাহুবন্ধনে সে ধরা পড়ে গেছে।
জানা গেলো, লোকটা একজন কুখ্যাত অপরাধী আর এখানে এসে গা ঢাকা দিয়ে ঘাপটি মেরে বসে ছিলো। সুযোগ পেলেই মালিককে ফাঁক করে সে আবার লম্বা দিতো। সময়মতো খবর পেয়ে পুলিশ এসে পড়ায় বেঁচে গেলেন দত্তবাবু।
“তবুও তো আমার বারোটা বাজলো!” কপাল চাপড়ে বললেন দত্তবাবু, “এই ছবিটা এখন শেষ করবে কে? আজ সন্ধ্যের পালার জন্যে যে এটা আমার চাই।” তারপর তিনি ছবিটার দিকে ফিরে তাকালেন আর দেখতে দেখতে তার মুখে ফুটে উঠলো অবাক বিস্ময়ের ছাপ।
“ওই নদীর জলের ভেতরকার কারুকার্যটা কে করেছে?” তিনি নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
“আজ্ঞে, আমি”, কুণ্ঠিত মানতু উত্তর দিলো।
“অসাধারণ!” দত্তবাবু প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন আর পরমুহূর্তেই বিস্মিত মানতুকে বুকে টেনে নিলেন। বলা বাহুল্য, মানতুই এরপর ছবিটা শেষ করলো আর সেটা সবার উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও অর্জন করলো।
এভাবে মানতুর আর একটি মনোবাসনাও পূর্ণ হলো – তার গোপন শিল্পীপ্রতিভা স্বীকৃতি পেলো। মানতুর কাকার সম্মতি নিয়ে দত্তবাবু তাকে যাত্রাদলের প্রধান চিত্রশিল্পী হিসেবে নিয়োগ করলেন। অবশ্য মালিকের সদয় সহযোগিতায় সে লেখাপড়াও চালিয়ে যেতে লাগলো।


মান্তুর জাদু ছক্কা
ছবি আঁকা ছাড়া যা মানতুর মন টানতো তা হচ্ছে গান। যাত্রা চলার সময় যখন পেছনে প্লে-ব্যাকে গান চালানো হতো, তার সাথে সাথে মানতু গুনগুনিয়ে গলা মেলাতো। বলাই বাহুল্য তার গলা নয়, রেকর্ডের গানই সাউণ্ড চ্যানেলে শোনা যেতো। “ইস, আমিও যদি প্লে-ব্যাক গায়ক হতে পারতাম!” সে প্রায়ই ভাবতো।
কিন্তু একদিন একটা ‘গোলমাল’ হয়ে গেলো। যাত্রাদলের এক টেকনিশিয়ান মানতুর এই গুনগুনিয়ে গান গাওয়ার অভ্যেস লক্ষ করে তার সাথে এক নিষ্ঠুর তামাসার পরিকল্পনা করলো। একদিন সে সবার অলক্ষ্যে সাউণ্ড চ্যানেলে সিডি প্লেয়ারের বদলে গ্রীনরুমের মাইক্রোফোন জুড়ে দিলো। ফলে অভিনেতা যখন ‘লিপ’ দিচ্ছিলো, কয়েক সেকেণ্ড চারদিক নিঃশব্দ। কিন্তু তারপরই মাইকে বেজে উঠলো এক কচি, কিন্তু সতেজ ও মিষ্টি কণ্ঠস্বর – মানতুর অজান্তে তার খালি গলার গান!
যে তামাসা করতে চেয়েছিলো, তার উদ্দেশ্য ছিলো মানতু এভাবে সবার সামনে অপদস্থ হবে। কিন্তু কিছুক্ষণ অবাক হয়ে থাকার পর দর্শকরা যখন বুঝতে পারলো কোনো কিশোর শিল্পী ‘লাইভ’ গাইছে, সহর্ষ করতালিতে তারা এই নবীন প্রতিভাকে স্বাগত জানালো। গ্রীনরুমে তখনও ভ্যাবাচাকা ভাব কাটেনি। যখন আসল ব্যাপারটা ধরা পড়লো, ততক্ষণে মানতু স্টেজ মাত করে দিয়েছে।
হিংসুটে টেকনিশিয়ানটির কপালে জুটলো বিস্তর বকাঝকা। মালিক তাকে সতর্ক করে দিলেন যে আবার অমন করলে তাকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হবে। এবার যাত্রাদলের সঙ্গীত পরিচালক মানতুর কাছে এসে নরম স্বরে বললেন, “তুমি চমৎকার ছবি আঁকো। কিন্তু তোমার গানের গলা, এক কথায়, অতুলনীয়! প্রথম সারির গায়ক হবার সমস্ত লক্ষণই তোমার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু উঁচুতে উঠতে হলে আগামী দিনগুলিতে তোমাকে এ ব্যাপারে অনেক মেহনত করতে হবে।”
“আমি জানি, স্যার!” হাতে ধরা যাদু ছক্কাটির দিকে তাকিয়ে মানতু যেন স্বগতোক্তি করার মতোই ফিসফিসিয়ে বললো।

শুধু বলা নয়, কাজেও সে করে দেখালো মেহনত কাকে বলে। তার গান শেখার হাতেখড়ি হলো সঙ্গীত পরিচালকের স্নেহের ছায়ায়। পরে মালিকের নির্দেশে ও সাহায্যে সে একজন নামকরা সঙ্গীত গুরুর কাছে শেখার সুযোগ পেলো। গুরুটি ছিলেন খুবই কঠোর, আবার মানতুকে তিনি খুব ভালোও বাসতেন। তাঁর ছত্রছায়ায় মানতু দ্রুত উন্নতি করতে লাগলো, তার নাম আশেপাশে ছড়িয়ে পড়লো।
তারপর একদিন এক চলচ্চিত্র প্রযোজক মানতুর প্রতিভার সন্ধান পেয়ে অনেক টাকার বিনিময়ে তাকে তাঁর সিনেমায় প্লে-ব্যাকে গাইবার জন্য চুক্তিবদ্ধ করলেন। এইভাবে যাদু ছক্কার কাছে চাওয়া তার আর একটি ইচ্ছেও পূর্ণ হলো। নিজের এতদিনের শহর ছেড়ে সে চললো ভারতীয় সিনেমার যাদুনগরী মুম্বইয়ে। প্রযোজকের লোকই তার প্লেনের টিকিট ও অন্যান্য ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত করে দিলেন।
মানতু তাঁর পিতৃতুল্য মালিক দত্তবাবু, যাত্রার সঙ্গীত পরিচালক ও গুরুজীর কাছ থেকে বিদায় নিলো। এঁদের সাহায্য ও প্রাণঢালা ভালোবাসা ছাড়া সে কিছুতেই এত বড় হতে পারতো না। তারপর সে সজল চোখে বিদায় নিলো এতদিনের অভিভাবক কাকা-কাকিমার কাছ থেকে। আসার সময় মানতু বলে এলো যে এবার থেকে তাঁদের আর টানাটানি করে চলতে হবে না, সে নিয়মিত মুম্বই থেকে টাকা পাঠাবে।


মান্তুর জাদু ছক্কা
শেষ অবধি মানতুর স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত এলো। এই প্রথম সে প্লেনে চড়ছে। জানালার পাশের সিটে বসে সে বাইরের সমস্ত দৃশ্য দু’চোখ ভ’রে দেখতে লাগলো। প্লেন রানওয়ের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলার পর সাঁ করে আকাশে উঠে পড়লো। নীচের দ্রুত বিলীয়মান ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে হঠাৎ মানতুর বুকটা ধক করে উঠলো।
নীচের দৃশ্যাবলীর মধ্যে কোথাও এক আগুনের রেখা ফুটে উঠেছে। এত বড় সে আগুন যে এত উঁচু থেকেও মানতুর অনভিজ্ঞ চোখে তা ধরা পড়ে গেছে। আটকে পড়া অসহায় মানুষ, যাদের এখান থেকে প্রায় পিঁপড়ের মতো দেখাচ্ছে, তারা বৃথাই এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে মরছে। মানতুর যেন মনে হলো সেই মানুষের ভীড়ে কিছু নারী ও শিশুও আছে।
কয়েকটি অনিশ্চিত মুহূর্ত, তারপর মানতু তার কর্তব্য স্থির করে ফেললো। সে যাদু ছক্কাটিকে শক্ত করে হাতে ধরে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলো, “হে উপকারী বন্ধু, এবার সেই সময় এসেছে। নীচের অসহায় মানুষের দুর্দশা আমি আর দেখতে পারছি না। কিন্তু তাদের সাহায্য করার জন্য যে মেহনত দেবো, তার কোনো উপায়ই আমার এখন নেই। তাই আমি ঐ ভয়াবহ আগুন নেভানোর জন্য তোমার যাদুশক্তির সহায়তা প্রার্থনা করছি। এর ফল যে কী হবে, তা আমি ভালো করেই জানি।”
মানতু যখন এই কথা বলছিলো, সে খেয়াল করেনি কখন আকাশে বিরাট একখণ্ড কালো মেঘ জমা হয়েছে। তার কথা শেষ হতে না হতেই সেই মেঘ প্রবল বর্ষণের রূপ নিয়ে ঝ’রে পড়লো মাটির বুকে। দেখতে না দেখতে সেই ভয়াবহ আগুন শান্ত হলো, মানুষ পেলো স্বস্তি।
কিন্তু প্লেনটা সেই মুহূর্তে ঝোড়ো বাতাসের পাল্লায় পড়ে এক বিরাট ঝাঁকুনি খেলো। ভেতরের সবকিছু যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য বেসামাল। তারপর যখন আবার সব ঠিক হয়ে গিয়েছে, মানতু দেখলো যাদু ছক্কাটি তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে কোথায় চলে গেছে। মানতু বুঝতে পারলো, সেটা চিরদিনের মতোই হারিয়ে গেছে!
“তবে তার জন্যে দুঃখ নেই।” সে নিজের মনে বলে, “হে অদেখা বন্ধু, সঙ্কটের মুহূর্তে আমাকে মদত দেওয়ার ও শক্তি জোগাবার জন্যে তোমাদের অজস্র ধন্যবাদ। তোমাদের সহায়তা আর পাবো না। কিন্তু এতদিনে আমি নিজের মেহনতে ও হিম্মতে পৃথিবীর বুকে উঠে দাঁড়াবার মতো শক্তি অর্জন করেছি।”

 

 

অনিরুদ্ধ সেন
থানে, মহারাষ্ট্র

অ্যালজেব্রা

পিসির বাড়ি বেড়াতে এসে একদিনের মধ্যেই বেশ বুঝলাম যে এই জায়গাটা অদ্ভূত। এমনটা যেন আগে কোথাও দেখেনি। প্রথমেই যেটা চোখে লাগল তা হচ্ছে এখানে মিষ্টির দোকানের নাম ‘সরকার জ্ঞানভান্ডার’। প্রথমে মনে হল বোধহয় শখ করে দিয়ে থাকবে। তারপরে দেখি আরেকটা দোকানের নাম ‘জ্ঞানের মজারু সন্দেশ’, তারপর আরেকটায় ‘জ্ঞানগম্যি মিষ্টান্ন ভান্ডার’। দেখছি আর ভাবছি এ আবার কেমন ধারা মিষ্টির দোকান। ভুল দেখছি না তো? তারপর দেখি না – দিব্যি থরে থরে সাজানো রয়েছে রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলিপি।
পটাশকে জিজ্ঞেস করতে সে অম্লান বদনে বললে, ‘বাহ রে, তাই তো নাম হওয়া উচিত। নইলে বুদ্ধি বাড়বে কেমন করে?’
পটাশের সাথে আলাপ হয়েছে সকালেই। এ বাড়িতে আমার বয়সী বলতে দুজন – পটাশ আর ফটাশ। যমজ ভাই। আমার চেয়ে এক ক্লাস নিচুতে পড়লে কি হবে, কোন অংশে তারা কম যায় না। আমি পটাশের উত্তর শুনে ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললাম, ‘মিষ্টির দোকানের নামের সাথে বুদ্ধির কি সম্পর্ক?’
উত্তরে কিছু না বললে পটাশ এমন করে তাকাল যেন এই কথাটা বলা কি সাংঘাতিক অন্যায় হয়েছে, একথার কোন উত্তরই হয় না।
শুধু এটুকু হলেও না হয় কথা ছিল। পটাশকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাদের ইস্কুলেও গরমের ছুটি পড়েছে বুঝি?’
‘না না, এখন তো গরমের ইস্কুল।’
‘গরমের ইস্কুলটা আবার কি?’
‘কেন? গরমটা বাদ যাবে কেন?’  
‘তার মানে সারা মাস ধরে ছুটির কাজ করো, আবার ছাতাপড়া রোদ্দুর মাথায় নিয়ে ইস্কুলেও যাও?’
‘না না, তা কেন? গরমের ইস্কুল তো বেশ মজার-’
‘সে কেমন?’
‘অতশত এক্ষুনি বলা যাবে না। তবে তোমার যদি ইচ্ছে করে, ওবেলা যেও না হয় আমাদের সঙ্গে -’
তাহলেই বোঝ কি গোলমেলে ব্যাপার। এই দুপুর গরমে যেতে হবে কিনা ইস্কুল? এদিকে আমাকে প্রায় একরকম জোর করেই পাঠানো হয়েছে পিসির বাড়ি। কেন? সে আরেক বৃত্তান্ত। অঙ্কে আমি বরাবরই কাঁচা। ক্লাস সিক্সের ফাইনাল পরীক্ষায় মেরে কেটে পেয়েছি উনচল্লিশ। তার পর থেকে কপালে দুঃস্বপ্নের মত এল বীজগণিত। ইস্কুলের প্রথম পরীক্ষা দিয়ে বুঝলাম এবারে উনচল্লিশ কেন, নয় ও পাবো না।

সব শুনে টুনে বাবা আর দেরী করতে চাইলেন না। আমাকে পাঠিয়ে দিলেন পিসির বাড়ি। আমার পিশেমশাই আবার বেশ নামকরা অঙ্কের মাস্টারমশাই। গ্রামে থাকলে কি হবে, মহা বড় বড় অঙ্ক উনি নাকি একেবারে মুখে মুখে করে দিতে পারেন তা সে হিসেবের খাতা হোক, কি বর্গমূল হোক বা ভগ্নাংশই হোক। শুনেছি ওনার নাকি ক্যালকুলেটর লাগে না। যে কোন সংখ্যার নামতা এমনিই বলে যেতে পারেন। কি করে পারেন কে জানে, তবে আমার রেজাল্টের এই অবস্থা শুনে উনি নিজেই নাকি বলেছেন যে আমি যেন গরমের ছুটিটা পিসির বাড়ি গিয়ে কাটিয়ে আসি, উনি তাহলে আমাকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে পারবেন আর কি! বাবা মা শুনে খুব খুশি। এর চেয়ে ভালো যেন কিছুই হতে পারে না। তাই যেমন কথা তেমন কাজ। গরমের ছুটি পড়তে না পড়তেই আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল এখানে।  

আমাদের ইস্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই গোবিন্দ স্যারের কথা ভেবে আমি একটু ভয় ভয়েই ছিলাম। প্রত্যেক মাস্টারের ছাত্রদের ভয় দেখানোর কিছু না কিছু ভয়ঙ্কর শাস্তির উপায় থাকে। চড় চাপড়, স্কেলের বাড়ী, বেঞ্চের ওপর দাঁড়ানো বা কানমলা এইসব তো এখন পুরনোই হয়ে গেছে বলতে গেলে। আর সত্যি কথা কি, ঐসব কোনদিনই আমার ওপর তেমন কাজ করেনি। বরাবর কানমলা খাওয়ার পর দেখি অঙ্কটা আমার আরো গুলিয়ে যায়। অঙ্ক করাতে বসলে তো পিসেমশাই পিশেমশাই থাকবেন না, অঙ্ক স্যার হয়ে না জানি কি রূপ ধরবেন এই ভয়েই আমি অস্থির। ওদিকে পিসির বাড়ি সবাই জেনে যাবে, বা হয়তো জেনেই গেছে, যে আমি অঙ্ক পারি না, এই সব ভেবেই আমার হাত পা যেন পেটের ভেতর সেঁধিয়ে আসছিল।

অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, এখানে আসার পর থেকে কেউ আমাকে পড়তে বসতেই বলেনি।  ভোর ভোর ছোটকাকুর সাথে এখানে এসেছি আর আমাকে পৌঁছে দিয়ে কাকু একটু বাদেই ফিরে গেছে। সবার আগে পিসিমা একটু মাথায় হাতটাত বুলিয়ে বাইরের ঘরে পাঠালেন। পিসেমশাই তখন বাইরের ঘরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একখানা বইয়ের পাতা উলটোচ্ছিলেন। আমি কিছু বলার আগে উনি নিজেই আমায় বললেন, ‘এই সবে এলে এখন একটু ঘোরাঘুরি করো, পটাশ আর ফটাশ আমার দাদার ছেলে। তোমারই বয়সী হবে। তোমরা বরং আগে আলাপ টালাপ করে নাও। খেলাধুলো করো। তুমি আসবে বলে তোমার পিসিমা অনেক রান্নাটান্না করেছেন। সেসব খাওদাওয়া করো-’

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘আর অঙ্ক?’
‘ওহ অঙ্ক, কেন অঙ্কে বুঝি তোমার ভীষন ভয়’
থতমত খেয়ে বললুম, ‘হ্যাঁ, মানে না, তবে ঐ একটু’
পিসেমশাই হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘সে হবে এখন। দিকশূন্যপুরে থাকতে আর তোমায় আর অঙ্কে ভয় পেতে হবে না’।

পিসেমশাইয়ের কথা শুনে আমার মনটা একটু চনমনিয়ে উঠেই আবার থমকে গেল। আমাকে বাড়িতে কোনদিন পড়া শেষ না করে খেলতে দেওয়া হয় না। এখানে যে দেখি উলটো নিয়ম। কে জানে কি আছে আমার কপালে।


অ্যালজেব্রা


পটাশ আর ফটাশ যে যমজ সে কথা কি আগেই বলেছি? দেখতে সহজ সাধাসিধে হলে কি হবে ভেতর ভেতর তারা যে কি পরিমান বিচ্ছু তার ধারনা পেলাম একটু পরেই। তাদের দুপুরের ইস্কুলের সাথে পড়াশুনোর কোন সম্পর্ক নেই, আদতে তা  হচ্ছে গিয়ে রাজ্যের ডানপিটেমো করার অবাধ জায়গা আর সে শুধু তাদের দুজনেরই নয়, তাদের মত আরো একপাল ছেলেপুলের আড়ত। এই ইস্কুল বসে ইস্কুল বাড়িতেই, আর সেখানে কচিকাঁচাদের অভিজ্ঞরা বদমায়েসির নানা প্যাঁচ পয়জার শেখায়। ইস্কুলের চারদিকে পাঁচিল থাকলে কি হবে, সব্বাই পিছনের দিকে একটা ছোট্ট ফাঁক দিয়ে এসে ঢুকে পড়ে। কয়েকটা ক্লাসরুম খালি থাকে, কেউ সেখানে বোর্ডে চক দিয়ে খেলার মাঠের ছক বোঝায়, কেউ অন্য কোন রকমের ফন্দী বাতলায়।

পটাশ বা ফটাশ দুজনেই এই ইস্কুলের হর্তা কর্ত্তা আর কি। একজন ঢিল ছুঁড়ে টিপ করা শেখাচ্ছে, তো একজন গাছে চড়া। একজন গুলতি বানানো শেখায় তো আরেকজন তীর-ধনুক।
সত্যি কথা বলতে কি এক পলকেই আমার ভালো লেগে গেল দুপুরের ইস্কুল। কিন্তু সেই সঙ্গে একটু ভয়ও করল। বাড়িতে থাকতে কাউকে না বলে খেলতে যাইনি কক্ষনো, তাও সপ্তাহে তিনবার। বাকী সময়টুকু এই ঐ ক্লাস করতে কেটে যায়। এখানে এসে খেলে বেড়াচ্ছি এইসব খবর যদি বাড়িতে পৌঁছয় তবে কি হবে?

একটা সময় আমি পটাশকে আলাদা করে  ধরে বললাম, ‘হ্যাঁ পটাশ, রে তোদের বাড়িতে বকবে না জানলে?’

সে একগাল হেসে বললে, ‘আরে আমি তো ফটাশ, এই দেখো মাঝের চুল গুলো খাড়া হয়ে রয়েছে!’ দুজন কে দেখতে তো হুবহু একরকম। খালি নাকি দুজনের চুল দুরকম। ফটাশের মাথার মাঝে খানিকটা চুল টিনটিনের মত উঁচু হয়ে থাকে। সত্যি থাকে না টিনটিনের গপ্প পড়ে এইরকম বানিয়েছে কিনা কে জানে, এই দুপুর রোদ্দুরে কারো চুল দেখে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই।

আমি বললাম, ‘আচ্ছা ফটাশ, তুইই বল বাড়িতে যদি জানে যে তোরা দুপুর বেলা ইস্কুল এসে এত হল্লা করছিস জানলে তোদের বাড়িতে বকবে না?

-‘সে কি বকবে কেন?’

-‘বাহ রে, বাড়ির ছেলেরা দুপুরবেলা এরকম হইচই কান্ড বাঁধাচ্ছে জানলে বকবে না? আর ইস্কুল থেকে যদি কমপ্লেন করে দেয়?’

-‘তুমিও যেমন! আমাদের তো বাড়ি থেকেই এইখানে পাঠায়। আর এসব তো আমাদের বাবা-কাকা তাদের বন্ধুরাও এককালে খুব করেছে। এখন আমরা করছি। বলি, ছেলের হইচই করবে না তো কি বুড়োরা করবে?’

উত্তর শুনে আমি তো থ। মনে মনে বললাম – তাও ঠিক। আমাকে তো বাড়িতে তেমন খেলতে দেওয়া হয় না। এক ঐ ইস্কুলের টিফিন, নইলে ইস্কুল বাস আসার আগে কিছুক্ষন। কতগুলো বিকেল অঙ্কের বই খুলে গালে হাত দিয়ে বসে কেটে গেছে। আজকে আর সেসব কিচ্ছু মনে রইল না। কিছুক্ষনের মধ্যে আমিও ওদের একজন হয়ে খেলায় মেতে উঠলাম। ঘামে জামা ভিজে চপচপ করছে, অথচ সেদিকে খেয়াল নেই।
বিকেল হতে না হতে বুঝলাম, আমার হাতে বেশ টিপ – তা সে গুলতি নিয়ে মাটির গুলিতেই হোক, কি ঢিল ছুঁড়েই হোক। একটা খেলা হচ্ছিল টিপ প্র্যাকটিসের। খেলা অনেক নিয়ম, অনেক কায়দা। প্রথমে সব্বাই কাছ থেকে ছুঁড়ে টিপ করবে। সেখানে যারা ঠিক ঠিক লাগাতে পারবে, তারা পরের রাউন্ডে আবার আরেকটু দূর থেকে টিপ করবে। এই খেলা আমি আগে কক্ষনো খেলিনি। তিন নম্বর রাউন্ডে ত্রিশ পা দূর থেকে যখন গাছ থেকে ঝোলা লেবু, টিনের ফলা আর কাচের বোতল সবকটাই লাগিয়ে দিলাম গুলতি ছুঁড়ে তখন দেখি চারপাশে হইচই পড়ে গেছে। কেউ বললে, ‘শাবাশ!’, কেউ বললে, ‘কেয়াবাত’, ‘কেউ বললে, এতদিন কোথায় ছিলে ওস্তাদ!’

সব্বাই এক এক করে এসে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে গেল। সব দেখে শুনে  আর নিজেকে বাইরের কেউ মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আমিও ওদেরই একজন। বাবা মাকে ছেড়ে, নিজের বাড়ী ছেড়ে অন্য কোথাও আছি সে কথা মনেই নেই।

খানিক বাদেই দুভাই মিলে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে চললে ফুটবল মাঠের দিকে। আমি বললাম, ‘এখন আবার কি?’

-‘আরে, আজকে ফুটবল ম্যাচ আছে যে!’

-‘তাই নাকি, এরপরে আবার ফুটবল খেলবি তোরা?’
-‘আরে শুধু আমরা কেন, তুমিও খেলবে। এও তো টিপ করে বল লাথানো ছাড়া তো আর কিছু নয়’

আমি ফুটবল আগে তেমন খেলিনি। আমাদের পাড়ায় একটাই ফুটবল মাঠ ছিল, সেখানেও এখন বাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ফুটবল বাবার সঙ্গে বসে দেখেছি অনেক, কিন্তু মা বার বার বলে ফুটবল খেলতে নামলে নাকি পা ছড়ে যাবে, হাঁটু ঘুরে যাবে, গোড়ালি মচকে যাবে। কিন্তু আজকে যখন মাঠ ছেড়ে হই হই করতে বেরোচ্ছিলাম, ততক্ষনে জেনে গেছি আমার বাঁ পায়ে দারুন শট আছে। বলতে গেলে আমার গোলেই কিন্তু পটাশরা এই ম্যাচটা ৩-০ য় জিতল। ওদের ডিফেন্ডার মারকুটে মিনেশ যখন আমার মালাইচাকি লক্ষ্য করে একটা লাথি চালিয়েছিল, তখন দেখলাম কেমন নিজের অজান্তেই হালকা লাফে সেটা কাটিয়ে গেছি আর শুধু তাই ই নয়, আমার বাঁ পায়ের ছোঁয়ায় বলটা তখন ওদের গোলে লুটোপুটি খাচ্ছে।


অ্যালজেব্রা


পিসিমা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘আহা রে, মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে বুঝি?’

আসলে আমি তখন সবে সবে দুধের গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে সাবাড় করছি। অন্যান্য সময় বাড়ি ফিরে দুধের গ্লাস তেমনই থেকে যায়। মা বলাবলি করতেই থাকে। আজকে খেলে ধুলো মেখে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। বাড়ির কথা বা মার কথা একটুও মনে নেই। কিন্তু পিসির কথায় একটু লজ্জা পেয়ে ঘাড় নাড়লাম। এখানে আমি পড়াশুনো করতে এসেছি, খেলে বেড়াতে নয়। বীজগণিত যদি শিখতে না পারি তাহলে মহা মুশকিল। দুধ, টোস্ট আর মিষ্টি খেতে খেতে আবার মনে পড়ল, এখানে মিষ্টির দোকানে অদ্ভূত নামের কথা। তাই ভাবলাম পটাশ আর ফটাশ দুটো যা ফাজিল ওদের কাছ থেকে হয়তো কোনদিনই সত্যিটা জানতে পারব না, বরং পিসিকেই জিজ্ঞেস করি।

‘আচ্ছা, তোমাদের এখানে মিষ্টির দোকানে নাম এরকম কেন?’
‘সে এক গল্প। এখানে মানুষের বিশ্বাস যে মিষ্টি খেলে নাকি বুদ্ধি বাড়ে-’
‘তাই নাকি? সত্যি বাড়ে?’
‘সত্যি মিথ্যে তো জানি না। তবে শুনেছি এই গ্রামের এক মহা পন্ডিত ছিলেন। তিনি মিষ্টি খেতে বড় ভালোবাসতেন। একটা দোকান থেকে মিষ্টি কিনে রোজ বাড়ি ফিরতেন রাত্রিবেলা। তখনকার দিনে এত পড়াশুনো জানা লোক আর এই গ্রামে ছিলেন না। তাই সেই মিষ্টি দোকানের নাম রাখে জ্ঞানভান্ডার। আর আজকাল এইটেই হুজুগ হয়ে গেছে। তবে এসব তো আমার শোনা গল্প। তোমার পিশেমশাই বরং ভালো করে গুছিয়ে বলতে পারবেন এই নিয়ে-’

আমি মনে মনে ভাবছিলাম একটা সময় তো পড়তে বসতে হবেই। এবার বোধহয় পিসেমশাই ডাকবেন। ডাকলেন বটে, তবে সেটা দেখতে যে আমি খেলাধুলো করে বাড়ি ফেরেছি কিনা দেখার জন্য। তারপর খাবার টেবিলে এসে আমার পাশেই  পড়লেন। আমি একটু ঢোক গিলে বললাম, ‘অঙ্ক বইটা কি আনব পিসেমশাই?’

উনি একটু চমকে বললেন, ‘বই আনবে কেন? তা আনো’

আমি একছুটে গিয়ে ব্যাগ থেকে অঙ্ক বইটা নিয়ে এসে হাজির হলাম। এই সেই বই যা নিয়ে আমার দুঃস্বপ্নের শেষ নেই। কানগুলো কিরকম চনমন করে উঠল, স্কেলের বাড়ির কথা মনে পড়ে হাতের চেটোদুটোও একটু টনটন করে উঠল। শেষমেষ বইখানা পিসেমশাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বললাম, ‘এই যে-’
উনি নরম গলায় বললেন, ‘তা কোন জায়গাটা ঠিক বুঝতে পারছো না?’
-‘এই যে বীজগণিতটা বিশেষ করে’  
-‘আচ্ছা, তুমি বরং এক কাজ কর। আজকে নিজে নিজে অঙ্কগুলো একবার দেখো। আমায় জিজ্ঞেস করার দরকার নেই, আমার মনে হয় তুমি নিজেই পারবে। কোথাও যদি আটকে যাও, তাহলে ফুটবল মাঠের কথা মনে করে দেখো। অঙ্কটা যেন বিপক্ষ দলের গোল। তোমাকে ওদের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বলটায় কেবল আলতো করে পা ছুঁইয়ে দিলেই ব্যাস। তারপর যদি একেবারেই হচ্ছে না, তাহলে কালকে তোমায় নিয়ে বসব, কেমন?’
আমিও ভালো ছেলের মত ঘাড় নেড়ে বললাম। পিসেমশাই বলেন কি? তবে অঙ্ক বইটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে বুকটা ভয়ে ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল সেই ভাবটা কোথাও মিলিয়ে গেল। আজকে বিকেলেই দুটো গোল নিজে করেছি আরেকটা হয়েছে আমার বাড়ানো পাসেই। ওফফ কি দুর্দান্তই ছিল ম্যাচটা। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি অঙ্ক বই খুলে প্রথম অঙ্কটা পড়লাম, খাতা টেনে নিয়ে দু লাইন লিখে অঙ্কটা করেও ফেললাম। বীজগণিতের সব ছোট্ট ছোট্ট অঙ্ক। এক দু লাইনেই নেমে যাচ্ছে। এক সময়ে দেখি সবকটা অঙ্কই হয়ে গেছে। এবার কি করব কি করব ভাবছি, অমনি পটাশ আর ফটাশ লাফাতে লাফাতে এসে হাজির। ব্যস আর কি, পড়া মাথায় উঠল।

পরদিন সকালে পিসেমশাইয়ের কাছে অঙ্ক বই নিয়ে আবার হাজির হলাম। পিসেমশাই তখন নিজে নিজে দাবা খেলছেন, মানে সাদা আর কালো দুপক্ষের হয়ে নিজেই চাল দিচ্ছেন। আমি অঙ্কের বইটা এগিয়ে দিলাম। বললাম, ‘অঙ্কগুলো হয়ে গেছে’

 ‘বাহ বাহ, এ তো খুব আনন্দের কথা। আর হবে নাইই বা কেন? অঙ্ক তো হওয়ার জন্যেই’
-‘তাহলে এবার কি করব?’
-‘কি করবে? আচ্ছা, আরেকবার বইটা খুলে পরের প্রশ্নমালার অঙ্কগুলো দেখো তো ঠিক বুঝতে পারছো কিনা-’

আমি বই খুলে বীজগণিতের নতুন প্রশ্নমালার একটা অঙ্ক দেখতেই চোখের সামনে ছবির মত অঙ্কটা ভেসে উঠল। আমি ভ্যাব্যাচাকা খেয়ে পিসেমশাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি দাবার বোর্ড থেকে চোখ না তুলেই বললেন, ‘কি হল? কিছু বলবে?’  

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম না। ভয়ে ভয়ে পরের অঙ্কটার দিকে তাকালাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে সেই অঙ্কটাও কেমন যেন নিজেই নিজেকে করে ফেললে। তারপর আরেকটা। তারপর আরও একটা। এরকম করে এক এক করে দেখি অনেক গুলো অঙ্কই নিজে নিজে হয়ে গেল। চোখ তুলে তাকাতে দেখি পিসেমশাই হাসছেন, ‘কি মনে পড়ছে না বুঝি? বেশ বেশ। পরে হবে এখন’
আমি তখন ভাবতে শুরু করেছি – ব্যাপারটা কি হল? এই কদিন আগেও অঙ্ক বইটা খুললে জ্বর আসছিল। আজকে সবকটা অঙ্ক কি মুখে মুখেই হয়ে গেল? পিসেমশাই কি ম্যাজিক জানেন নাকি? আচ্ছা, তোমরাই বল, এরকম হয়?


অ্যালজেব্রা


ঢং ঢং করে ঘন্টা বেজে গেল। তার মানে আজকে ক্লাস শেষ। হইহই করে উঠল সব্বাই।
‘কি করে হল?’ ‘
‘তার মানে কি দিকশূন্যপুরের মিষ্টি খেলে কি সত্যিই বুদ্ধি বাড়ে?’
‘দিকশূন্যপুরটা ঠিক কোনদিকে?’
‘তারপর কি হল?’
কারো প্রশ্নের আর শেষ নেই।

আজকের দিনটা ওদের বছরের প্রথম ক্লাস আর আমি ওদের অঙ্কের মাস্টারমশাই। ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘না মিষ্টি খেলে বুদ্ধি বাড়ে এমন প্রমান বিজ্ঞানীর এখনও অবধি পেয়েছেন বলে তো জানি না’
একজন বলে উঠল, ‘তবে যে অঙ্ক গুলো মুখে মুখে করে দিলেন?’
আমি হেসে উঠলাম, ‘আরে দূর, সে কি মিষ্টি খেয়ে নাকি? আমার মনে জড় হয়ে ছিল ভয়। অঙ্ক নিয়ে অনেকের অনেক ভয় থাকে। বিভিন্ন রকমের ভয় অঙ্ক বুঝতে না পারার ভয়, পরীক্ষার হলে গিয়ে অঙ্ক করে না আসতে পারার ভয়, অঙ্ক ভুল করলে মারের ভয় – এইসব গিয়ে জড় হয় অঙ্ক বইয়ের পাতায়। আসলে অঙ্কটাকে ভয় করার কিছু নেই। ভয়টা দূর করাই আসল। অঙ্ক তো এমনিই হয়ে যাবে। ব্যাপারটা আমার বাড়ির কেউ ধরতে পারেন নি, ধরতে পারেন নি আমাদের ইস্কুলের গোবিন্দ স্যারও। বুঝেছিলেন আমার পিশেমশাই।’

প্রথম দিনটা আমি বই টই কিছুই আনি না। খালি চক দিয়ে বোর্ডের ওপর লিখি - অ্যালজেব্রা। তারপর অঙ্কএর বই না খুলে বীজগণিত পড়ানো শুরু করার আগে, প্রত্যেক বছর আমি এই গল্পটা আমার সব ছাত্রদের একবার করে বলি। অনেক বছর ধরে বলে আসছি, তবু গল্পটা পুরনো হয় না।



অভ্র পাল
কলকাতা

undefined

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা