ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

দণ্ডকারণ্যের কথা।উড়িষ্যার মালকানগিরি নামক জাগায় পরিবার নিয়ে তখন বাস করি।গ্রামের নাম পদমগিরি।সেখানে আমি আর আমার স্ত্রী শিক্ষকতা করতাম। সে ছিল অজ পাড়াগাঁ।গাঁ থেকে বড় রাস্তা ছিল পাঁচ কিলো মিটার দূরে।মেঠো রাস্তায় সাইকেল ছাড়া কখনো সখনো দু একটা বাইক চোখে পড়ত।গরুর গাড়ির যাতায়াত ছিল সবচে বেশী।রাত হলে মনে হতো জন মানবহীন কোন দ্বীপে বাস করছি।কেরোসিনের ল্যাম্প,বড় জোর হ্যারিকেন রাতের আলোর সম্বল ছিল। গ্রামের সব ঘর ছিল মাটির তৈরি।কেবল মাত্র স্কুল ঘর ছিল পাকা, সেটা সরকারের দেন।গ্রামবাসীরা দু এক ঘর ছাড়া দিন আনা,দিন খাওয়ার মত অবস্থায় ছিল। আমি আর স্ত্রী দু জনেই মাত্র শিক্ষক ও শিক্ষিকা।ছিলাম স্কুলের অফিস ঘরে।আমাদের দুই মেয়ে।দু জনই ছোট।বড় জন ক্লাস টুতে,ছোটজন আড়াই বছরের শিশু। অনেক সমস্যার মধ্যেও যেটা বেশী করে অনুভব করছিলাম সেটা হল দুধ--দুধ জোটানো মুস্কিলের ব্যাপার হয়ে উঠে ছিল। আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থাকলেও দুধের খুব অভাব ছিল!এর ওর কাছ থেকে জোটাতে হচ্ছিল।কিন্তু বড় অনিয়মিত ভাবে। বাচ্চাদের নিয়ম মত ও প্রয়োজন মত দুধ খাওয়ানো অসম্ভব প্রায় হোয়ে উঠে ছিল।

একদিন গ্রামের এক বয়স্কা জন এসে স্ত্রীকে বললেন,‘দিদিমণি, বাবুকে বলেন না,একটা গরু কিনতে--দুধ দেওয়া একটা গরু কিনলে আপনাদের দুধের চিন্তা আর থাকবো না।’

আমার স্ত্রী কথাটা আমায় পাড়লেন।একদিন,দুদিন শোনার পর ব্যাপারটা আমিও ভেবে দেখলাম।মন্দ নয়,যদি আমরা একটা গরু পুষি?তবে দুধ দোয়া আর চড়ানোর কি হবে?

সেই বয়স্কা জনের সামনে প্রশ্নগুলি রাখা হলে তিনিই জানালেন, ‘গ্রামে গরু চরাবার ছেলের অভাব হবে না,অভাবী গ্রামে গরু দোয়াবার লোকেরও অভাব নাই !’ কথাগুলি যুক্তিযুক্ত মনে হল।

সামনের রবিবার গরুর হাট ছিল।যেতে হবে পাঁচ কিলোমিটার সাইকেলে।সঙ্গে গরুর ব্যাপারে ভালো জানে এবং গরুকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসার জন্যে বিজ্ঞ,অভিজ্ঞ লোক নিয়ে হাজির হলাম গরুর হাটে।হাটে কত রকমের গরু--সাদা,কালো,খয়েরি কিম্বা সাদায় কালোয় মিশানো,খয়েরি সাদায় মেশানো,সব রঙের--আর আকার আকৃতি প্রকৃতিতে নানা জাতের গরু সব।

সাথের লোকটা একটা কালোয় সাদায় মেশানো,মাঝারি সাইজের নাদুস নুদুস গরু পছন্দ করল।আমার খারাপ লাগলো না,কিন্তু প্রকৃতি--মানে স্বভাব ওর ভালো ছিল না।ওটার পিঠে যেই হাত রাখলাম,ওটা আমার সামনে সিং উঁচিয়ে ধরল!আর পিছনের পা দুটো ছাঁটাতে থাকলো।ওটাকে দুষ্ট স্বভাবের মনে হল।ওর পাশের গরুটা খয়েরি রঙের ছিল,মোটা মুটি বড়সড় দেখলাম।ওটা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার গা শুঁকছিল।ওর দিকে নজর পড়ল, সাথীকে বললাম,‘আচ্ছা এ গরুটি কেমন হবে?’ সাথী বলল,‘বয়স সামান্য বেশী,দুধ খুব একটা দেবে না।’

বললাম,‘কিন্তু শান্তশিষ্ট আছে।’

সাথী বলল,‘কিন্তু বাচ্চা দেবে দেরীতে।এটার চে আমার পছন্দের সাদা কালো গরুটা বাচ্চা দেবে তাড়াতাড়ি।’

সাদাকালো গরু ভালো লাগছিল না--কথায় বলে দুষ্ট গরুর চে শূন্য গোয়াল ভালো।বললাম,‘আমার এই খয়েরি রঙের গরুটা ভালো লাগছে।’

--‘কিন্তু দুধ দিতে চার পাঁচ মাস দেরী হবে মাস্টামশাই !’সাথী বলে উঠলো।

আমার পছন্দের গরুটা আমার দিকে সামান্য এগিয়ে এলো। দেখলাম ওর কপালে চাঁদের মত সাদা গোল করা আছে।ওর চাঁদ কপালে হাত বুলিয়ে দিলাম।ওটাও আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। জীবনে ওই দিনই গরুর চোখের দিকে ভালো করে তাকালাম।বড় বড় সুন্দর দুটি চোখ হয় গরুর ! সাদার মধ্যে কালো চক্ষু মনির এমন মানানসই সৌন্দর্য ত আগে কখনো লক্ষ্য করিনি ! ভাবলাম, আহা মায়াময় চোখদুটি ! মনে হল কোন মানুষের যদি এমন চোখ থাকে নিঃসন্দেহে চোখের ভাষায় তাকে সরল,স্বচ্ছ ও উদার মনে হবে।সে চোখে যেন স্নেহ,প্রেম,ভালোবাসা মিলে মিশে একাকার হোয়ে আছে!কেন জানি না,সেই মুহূর্তে মা’র কথা খুব মনে হচ্ছিল!

--‘মাস্টামশাই ! এই গাভীকে মনে হচ্ছে আপনার খুব পছন্দ!’ আমার সঙ্গের সাথী বলে উঠলো।

--‘হ্যাঁ,দেখুন না দাম দর করে!’আমি বললাম।

শেষে চারশো পঁচাত্তর টাকায় সে গরু কিনে ঘরে ফিরলাম।গরু দিব্বি বিনা প্রতিবাদে হেঁটে হেঁটে আমাদের ঘরে এলো।পথে আসতে আসতেই ওর একটা নাম ঠিক করে ফেললাম,লক্ষ্মী।শান্ত শিষ্ট গরুর নাম লক্ষ্মী রাখা যেতেই পারে !

গ্রামে ফিরতে মাস্টারের গরু দেখতে গ্রামের অনেকেই এলো। একেক জন এক এক রকমের মন্তব্য করল।

কেউ বলল,‘মাস্টারমশাই,এ গরু বাচ্চা দেবার পর পা ছাঁটবে খুব, দুধ দুয়াতে বেশ অসুবিধা হবে !’

কেউ বলল,‘দেখতে খারাপ না,তবে দুধ এক কিলোর বেশী পাবেন না।’

গ্রামের এক মাতব্বর গোছের লোক বলল,‘আমার তো মনে হয় বাঁজা গরু,না হলে চেহারা এমন চকচকে সুন্দর হয়?’

কেবল আমাদের যে দুধ দিত বয়স্কা মাসি বলেছিল,‘না বাবা! ভালো গরু কিনেছ তুমি।’

আমার দেওয়া লক্ষ্মী নাম ঘরের সবার ভালো লাগলো বলে সবাই ওকে লক্ষ্মী বলেই ডাকত।রোজই সময় পেলে আদর করতাম ওটাকে।ও শান্তশিষ্ট হয়ে মাথা তুলে তাকিয়ে থাকত আমার দিকে। কত অতল গভীর সে তাকানো,মনে হত,বড় মায়াময়,ত্যাগের সে চাহনি!

গরু চরাবার ছেলে ঠিক করলাম।বাচ্চা দেবার পর দুধ দুয়িয়ে দেবার জন্যে আগে থেকে লোক ঠিক করে রাখলাম।

দিন যায়,দিন আসে।লক্ষ্মী বাচ্চা দেবে এটা ক্রমশ:ওর শরীরে স্পষ্ট হতে লাগলো।ঠিক চার মাস আঠার দিনের দিন লক্ষ্মীর সাদা ফুট ফুটে এক বাচ্চা হল।বাচ্চা দেখে আনন্দে আমার বাচ্চারা,আমরা আহ্লাদে আটখানা হোয়ে গেলাম!

দুধ দোয়ানো শুরু হল।প্রথম দিন দু লিটার দুধ হল।বাচ্চা দেবার পর তিন দিন পর্যন্ত নাকি দুধ জাল দিতে নেই।কি করা যাবে, এদিক ওদিক বিলিয়ে সামান্য দুধ আমরাও খেলাম।

সাত দিনের মাথায় দু কিলো দুধ চার কিলোয় গিয়ে দাঁড়ালো।দুধ দেওয়া মাসি এসে সব শুনে খুব আনন্দ পেল।বলল,‘আমি কই ছিলাম না!খুব ভালো গরু আনছ তুমি!’

রোজ সকালে দুধ দোয়ানো হয়ে গেলে গাই বাছুর চরাতে নিয়ে যেত রাখাল ছেলে।

বিকেলে দুধ দোয়ানো হতো না।সারা দিনের দুধ খেয়ে বাছুরের চেহারা বেশ নাদুস নুদুস হোয়ে উঠলো।ঘরের সবাই পছন্দ করে ওর নাম রাখলাম,চন্দা।চন্দা লাফায় ঝাঁপায়--কেউ ওকে ধরতে গেলে ছুটে পালিয়ে যায় ওর মা লক্ষ্মীর কাছে।আমার ছোট মেয়ে দুটোর তো আনন্দের শেষ নেই।অনেক সময় ধরে তারা দূরে দাঁড়িয়ে বাছুরের খেলা দেখে যায়।

একদিনের কথা--চন্দা আমার খুঁড়োতে খুঁড়োতে এলো।রাখাল ছেলেটি বলতে পারলো না কি ভাবে ও ব্যথা পেয়েছে।দেখলাম, পায়ের খুড়ের ওপর দিকে অনেকটা কেটে গেছে।সঙ্গে সঙ্গে আঘাতের জাগা ধুয়ে মলম লাগিয়ে জাগাটা বেঁধে দিলাম।পর দিন থেকে ওকে ঘরে রাখার ব্যবস্থা হল।তিন দিন পর বাঁধন খুলে দেখি ঘা আরও বেড়ে গেছে!বেশ কিছু দিন ধরে ঘায়ে ওষুধ পট্টি করতে লাগলাম।কিন্তু কেন জানি না ঘা বেড়েই যেতে লাগলো।সারার লক্ষণ দূরে থাক--ক্রমশ: ঘা বড় হতে থাকলো।কিছুতেই কোন ওষুধ কাজে লাগছিল না।একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি চন্দা আমার মরে গেছে!দু মেয়ে কেঁদে ভাসাল।স্ত্রীর চোখে জল দেখলাম। আমার চোখ ঝাপসা হোয়ে এসেছিল।লক্ষ্মী তার মরা বাচ্চাকে বারবার শুঁকে যাচ্ছিল।

এর পর আরও একটা বছর কেটে গেলো।জানি না কেন লক্ষ্মী মত শান্ত গরু পেয়ে আমাদের আর একটা গরু কেনার ইচ্ছা হল।আর এক দিন হাটে গিয়ে সাদা একটা গরু কিনে আনলাম।এ গরু দেখেও গ্রামের লোকেরা বিভিন্ন মন্তব্য করল।এ গরুর নাম রাখলাম,গৌরী।দেখেছি গৌরী,লক্ষ্মী থেকে কিছুটা চঞ্চল বটে,তবু আমার যেন কেন ভালো লাগলো।গৌরীকেও আদর করতাম। শুরুতে একবার দুবার ও সারা শরীর নাড়িয়ে ছাঁটিয়ে উঠত--পড়ে শান্ত হোয়ে যেত।ওর চোখ দুটোও দেখেছি--লক্ষ্মী ও গৌরীর চোখ প্রায় এক মতন--ধীর স্থির--চঞ্চলতার লক্ষণ তাতে ধরা পড়ে না। চোখের গভীরতা হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। মনের সমস্ত দ্বেষ বিদ্বেষকে যেন ভুলিয়ে দিয়ে যায়! প্রকৃত ভালবাসা সবাই বোঝে।হোক না কেন সে পশু।আমার লক্ষ্মী,গৌরী আমার ভালোবাসা বেশ বুঝতে পারত।আমার আদরের ছোঁয়া ওরা মন ভরে গ্রহণ করত।ওরা জানত ওদের আমরা কি নামে ডাকি—লক্ষ্মী,ডাকলে ও মুখ তুলে তাকাত। গৌরী,ডাকলে ও কান খাড়া করে নিজের নাম শুনে তাকিয়ে দেখত কে তাকে ডাকছে!

এমনি এক দিনের কথা।সন্ধ্যে পার হোয়ে গেছে।স্ত্রী বললেন,‘তুমি ঘরে নেই,দেখো তো লক্ষ্মী,গৌরী এখনো বাড়ি ফেরে নি!’

আশ্চর্য হলাম,‘বললাম,কেন গরু চরানোর ছেলেটা ফেরেনি?’

--‘না,এখনো ফেরে নি’,স্ত্রী নিরাশ হোয়ে বললেন।

আরও আধ ঘণ্টা কেটে গেলো।গরু ফিরল না!‘দেখি’বলে ঘরের বাইরে বেরলাম।এমনি সময় রাখল ছেলে হন্তদন্ত হোয়ে এসে বলল,‘তোমাগ গরু খুঁজে পাচ্ছি না গো ! ওরা কোন দিকে জঙ্গলে চইলে গেছে—’

--‘বলিস কি?’ব্যস্ত হোয়ে বললাম,‘চল দেখি’,বলে,সঙ্গে টর্চ নিয়ে জঙ্গলের দিকে বেরিয়ে গেলাম।

রাখালেরা জঙ্গলের অনেক ভিতরে গরু চরাতে ঢুকে যায়--রাতে ওই ঘন জঙ্গলে ঢোকা ঠিক নিরাপদ নয়।এ জঙ্গলে সময়ে অসময়ে বাঘ ভাল্লুকের আনা গোনা আছে!তবু হাঁটতে হাঁটতে আধ কিলোমিটার জঙ্গল পার হলাম।লক্ষ্মী,গৌরীর দেখা নেই।আর এগোনো যায় না,কি করি,কি করি,ভাবছিলাম।রাখল ছেলেটি,‘লক্ষ্মী,গৌরী,আয়, আয়’,বলে ডাক ছাড়তে লাগলো।

ক্রমশ: জঙ্গলে নীরবতা ছেয়ে যেতে লাগলো।আশপাশের গ্রামের সামান্য চীৎকার চেঁচামেচিও কানে আসছিল না।তার বদলে ঝিঁঝির ডাক,আর জোনাকির আলো চমকে চমকে উঠছিল।আমি এত সময় চুপচাপ ছিলাম।খুব খারাপ লাগছিল,মনে একটা বিষণ্ণ ভাব জমে উঠছিল।তারপর কি মনে হল আমি গলা ছেড়ে চীৎকার করে উঠলাম,‘লক্ষ্মী,গৌরী..লক্ষ্মী,গৌরী বলে...’এক বার,দু বার,তিন বার,এবার গভীর জঙ্গল থেকে আমার লক্ষ্মী,গৌরী চীৎকার করে উঠলো,‘হাম্বা,হাম্বা’,বলে।আবার গলা চড়ালাম,তার প্রত্যুতর এলো, ‘হাম্বা,হাম্বা !’একটু পরেই দেখলাম,আমাদের দিকেই ছুটে আসছে ওরা!কাছে এসে ওরা হাঁপাচ্ছিল।জঙ্গলে ওরা হারিয়ে গিয়েছিল, ওদের হাবভাবেও কেমন একটা ভয় ভয় ভাব লেগে ছিল।জঙ্গলের চাঁদের আবছা আলোর ভিতরে আমি ওদের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করলাম।লক্ষ্মী,গৌরের চোখের দিকে চোখ পড়ল,ওদের শান্ত চোখ তখন অন্ধকারে আবছা ডুবে ছিল,তবে চোখের কোল ঘেঁষে চিক চিক করছিল ওগুলি কি ! স্থিরতার অভ্যন্তরে অস্থিরতার প্রকাশ--ওদের চোখে সূক্ষ্ম জল বিন্দু ভরে আছে !

এমনি ভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল।দেখতে দেখতে চার পাঁচ বছর কেটে গেলো।ইতিমধ্যে লক্ষ্মীর বেশ কটি বাচ্চা হয়েছে--কিন্তু কোন বাচ্চাই বাঁচাতে পারিনি।কিছুটা বড় হবার পর কোন না কোন কারণে ওরা মারা যেত।এ যেন কোন অভিশাপেরই নামান্তর ছিল! গৌরীর তিনটে বাচ্চা,একটা ছোট আর দুটো বেশ বড়।আমার একে বারে গোয়াল ভরা গরু,যাকে বলে আর কি !

একদিন আমাদের স্থানান্তরণের আদেশ এসে গেলো।বহু দূরে আমাদের চলে যেতে হবে! ট্রেনে,বাসে করে দূরের এক শহরে।গরু বাছুর নিয়ে এত দূর পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না।আর শহর এলাকায় গরু বাছুর পালা ছিল এক ঝকমারি ব্যাপার।অগত্যা আগে ভাগে বাছুরগুলি সব বিক্রি করে দিলাম।ওদের জন্যে আড়ালে আবডালে আমি ও আমার স্ত্রী স্তব্ধ হোয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলাম।করার কিছুই ছিল না।মেয়েদের চোখগুলি জলে ভারী হিয়ে থাকত ! যখন চোখে জল আসে তখন নাকি সত্য মানুষকে ছুঁয়ে যায় !

অফিসে গেলাম রিলিভ অর্ডার হাতে নিতে।আর তিন দিন পরেই রওনা দিতে হবে বদলির জাগায়।আজ লক্ষ্মী ও গৌরীকে ওদের নতুন মালিক এসে নিয়ে যাবে।ওদের বিক্রি করে অনেক পয়সা পেয়েছি।নতুন মালিককে বলেছিলাম বাকি পয়সা দিয়ে দু দিন পরে ওদের নিয়ে যেতে।

আজ সেই দু দিন পর।রিলিভ অর্ডার হাতে নিয়ে সন্ধ্যের আগে আগে সাইকেলে ফিরছিলাম ঘরে।যখন ঘরে পৌঁছবো পৌঁছবো তখন দেখলাম,ঘরের পাশে বেশ কিছু লোকের জটলা ! তাড়াতাড়ি জটলার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম।দেখি স্ত্রী,মেয়েরা কাঁদছে।স্ত্রী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠলো,‘তোমার লক্ষ্মী—’

--‘কি হয়েছে !’ তাড়াতাড়ি জটলার মাঝখানে গিয়ে দেখি লক্ষ্মী মাটিতে পড়ে আছে।ওর দেহ স্থির হোয়ে আছে।আমি ওর মুখের কাছটায় গিয়ে বসলাম।আমার দিকে তাকিয়ে ওর চোখের পাতা দুবার কেঁপে উঠলো।আর তারপর সব কিছু স্তব্ধ হোয়ে গেলো। মেয়েরা চীৎকার করে উঠলো,স্ত্রীর অস্ফুট চীৎকার কানে এলো। আমি তখন স্থির নির্নিমেষ।কদিন যাবত লক্ষ্মীর শরীর ভালো যাচ্ছিল না।ও চরতে যেতে চাইছিল না।পরশু ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিয়ে গেলো।কি ধরনের রোগ,ডাক্তার বলতে পারলেন না।গত কাল ও চরতে না গিয়ে গোয়ালে বসে ধীরে ধীরে জাবর কাটছিল।আজ ও নেই ! ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।ওর চোখ তখনও খোলা ছিল।সে চোখের চাহনি কোন সুদূর লোকের দিকে পড়ে ছিল।না,আমি কাঁদি নি--শুধু অনুভব করছিলাম,চোখের দু ধার বেয়ে উষ্ণ কিছু গরম জলের ধারা গাল বেয়ে এসে বুক স্পর্শ করছিল!


চারটে বল করার পর প্রমাদ গুনল মানব। মাত্র সাত রানই হয়েছে। অর্থাৎ বাকি দু'বলে আরও এগারো রান দিতে হবে। মাহেশ্বরীর সাথে সেইরকমই চুক্তি হয়েছে। ষাট লাখ টাকার চুক্তি। অবশ্য সে একা নয়, রাভিন্দরও সঙ্গে ছিল। রাভিন্দর ও তার দু'ওভারে গলাতে হবে অন্তত ত্রিশ রান। তাহলেই ঐ টাকা তারা দু'জনে ভাগ করে নিতে পারবে। কিন্তু হতচ্ছাড়া রাভিন্দর তার নির্দিষ্ট ওভারে দিয়েছে মাত্র বারো রান। তাই বাকি আঠেরো রানের দায়টা এখন মানবের।

মানব তার দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী বোলার। যে কোনও ধরণের পিচে, যে কোন পরিস্থিতিতে মানবের হাতে আছে সেই প্রতিভার ছোঁয়া, যা দিয়ে সে তার ছুঁড়ে দেওয়া বলটায় করতে পারে প্রাণসঞ্চার। অলৌকিকভাবে নিষ্প্রাণ বলটা তখন ব্যাটসম্যানের কাছে পৌঁছয় একটা দুর্বোধ্য প্রশ্নচিহ্নের আকারে। বেশীর ভাগ সময়েই সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবার আগেই ব্যাটসম্যানকে ধরতে হয় শিবিরে ফেরার রাস্তা। বিপক্ষের জমাট পার্টনারশিপ ভাঙ্গতেই হোক, অবাধ রানের গতি থামাতেই হোক অথবা রুখে ওঠা কোন ব্যাটের বিষদাঁত নষ্ট করতেই হোক, দলের অধিনায়কের একমাত্র ভরসা মানব।

মানবের সামনে ছিল অপার সম্ভাবনা। কিন্তু ক্রিকেট খেলতে গিয়ে কখন যে সে আর এক খেলায় মেতে উঠেছিল, নিজেও ঠাহর করতে পারে নি। রুপোর ঝলকানি ছিল চাড্ডা, মাহেশ্বরীদের হাতে। সে আলোর তীব্রতা ঢেকে দিয়েছিল নিজের ভবিষ্যৎ, দলের স্বার্থ আর ঐ লাল গোলাকার বস্তুটার সাথে তার আবাল্য সখ্যতা... রাভিন্দর এক ফাঁকে সবার চোখ বাঁচিয়ে তার কাছে মাপ চেয়ে গেছে। সেই সঙ্গে যে ইঙ্গিতটা করেছে তার মানে হয়, অব সব কুছ তেরে হাথ মে। তু কর শকতা হ্যায় ইয়ার।

রাভিন্দরকে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি উপহার দিয়েও মানব ভেবে নিয়েছিল, করতে তাকে হবেই। কাজটা সহজ করে দিল দলের ক্যাপ্টেন, সে যখন তাকে অন্য টীমের মারকুটে ব্যাটসম্যান বিপিনের বিরুদ্ধে বল করতে ডাকল। বিপিন মানবের খুবই পরিচিত। একসময়ে অনেক কোচিং ক্যাম্প একসাথে করেছে, একই ষ্টেট টীমে খেলেছে। এখন আলাদা ফ্র্যাঞ্চাইজিতে হওয়ায় তারা মুখোমুখি। ম্যাচজেতানো ব্যাটসম্যান বিপিন, মেরে খেলায় প্রসিদ্ধি আছে তার।

ওভারের শুরুতে মাহেশ্বরীকে সংকেত করতে ভোলে নি মানব, এই সেই ওভার। বাঁ পকেট থেকে সবুজ রুমাল বার করে মুখ মুছে ডান পকেটে ঢুকিয়েছিল সে। তখন সে জানবে কি করে ওভারের প্রথম বলটা বিপিন সোজা ব্যাটে খেলে একটা রান নিয়ে নেবে?

অন্যদিকের ব্যাটসম্যানটি একদম নতুন, একেবারে ঢ্যাঁড়স মার্কা। তাড়ু, টেকনিকের বালাই নেই। ভয় হল, আউট না হয়ে যায়। এর পরেই শেষ ব্যাটসম্যান, সে হয়তো একটা বলও টিকবে না। খুব সাবধানে একটা আলগা বল দিল মানব। ব্যাটসম্যান চোখ বুজে চালাল। কি করে যে বলটা উইকেটকীপারের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বাউন্ডারীর বাইরে পড়ল, মানব তা জানে না। জানবার দরকারটাই বা কি, বোলিং মার্কে ফিরে যেতে যেতে খুশী মনে ভাবল মানব। ত্রিশ লাখ টাকার ধূসর স্বপ্নটা এবার যেন একটু পরিস্কার দেখতে পেল সে।

সে স্বপ্ন কিন্তু মিলিয়ে গেল তার পরের দু'বলে। তৃতীয় বলটা অফস্টাম্পে রেখেছিল মানব। নাগাড়ে লুজ বল দিলে পাবলিক সন্দেহ করতে পারে। গাধাটা বিট হয়ে মিস করল। 'বোলিং বোলিং' বল ধরে উইকেটকীপার উচ্ছ্বাস জানালো চেঁচিয়ে। 'ওয়েল বোলড মানব' পয়েন্ট থেকে ক্যাপ্টেনও উৎসাহ দিলেন। মানব কিন্তু মোটেই উৎসাহিত হল না। বোলিঙের নিকুচি করেছে, ভাবতে ভাবতে মরীয়া হয়ে পরের বলটা অফস্টাম্পের এক হাত বাইরে ফুল্টস করলো। স্কোয়ার কাটটা ছোকরা মন্দ করে নি, টাইমিংটা একটু বেশীরকম ভাল ছিল। নক্ষত্রগতিতে পয়েন্টে যাওয়ায় কোন রান হোলো না। ক্যাপ্টেন স্বয়ং ধরে ফেলে ফের হাততালি দিলেন। চার বল হয়ে গেল, রান হয়েছে মাত্র সাত!

দু'বলে এগারো রান ইজ টু মাচ টু আস্ক। একটা নো-বল করা ছাড়া আর উপায় নেই, মানব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। মাহেশ্বরী অবশ্য সাবধান করেছিল। 'নো-বল করবে কিন্তু তোমার রিস্কে' জানিয়েছিল সে, 'মোক্ষম সময়ে নো-বল বেশ সন্দেহজনক হয়ে দাঁড়ায়।'

না, আর চান্স নিতে পারে না মানব। কিন্তু আজ ভাগ্যও কি তার সাথে নেই? সতীর্থদের সহানুভুতি আদায়ের জন্যেই নো-বলটা করেই পিচের ওপর গড়িয়ে পড়ল সে, যেন হোঁচট খেয়েছে। তারপর ঝেড়েঝুড়ে উঠে দেখে আম্পায়ার কোন সিগনাল দিচ্ছে না! তার মানে? পা কি তার ক্রীজের ভেতরেই ছিল? তা কি করে হয়, সে তো বেশ মেপেজুখেই টার্গেট করেছিল? কিন্তু আম্পায়ার কোন সংকেত দেয় নি, সুতরাং নো-বল হয় নি।

শুধু আশার কথা, সেই বলে একটা রান হয়ে বিপিন ক্রীজে ফিরে এসেছিল। কিন্তু আশাই বা কোথায়? ত্রিশ লক্ষ টাকার সমীকরণটা মানবের মাথায় ভীষণ জটিল হয়ে দাঁড়াল। এক বলে দশ রান! সে তো বিপিনের বাবারও ক্ষমতা নেই। সুতরাং আরও একটি নো-বল! একটু বেশী রিস্ক নেওয়া হয়ে যাবে না কি? কোন উপায় নেই। যা হয় হবে ভেবে নো-বল করবার রান-আপে প্রচন্ড ভুল করে ফেলল মানব। শেষ পা'টা ফেলেই বলটা হাত থেকে বেরিয়ে যাবার মুহূর্তে সে আবিস্কার করল পা তার পপিং ক্রীজের প্রায় এক ফুট ভেতরে। এবার আর হোঁচটের অভিনয় করতে হল না। তার স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে সত্যিই সে পিচের ওপর ভেঙ্গে পড়ল।

আর তখনই বলের ওপর ব্যাটের একটা মিষ্টি আওয়াজে দৃষ্টিটা ফিরিয়ে দেখল, বলটা উড়ে যাচ্ছে স্কোয়্যার লেগ বাউন্ডারীর ওপর দিয়ে, আর... আর... তার নীচে দেবদূতের মতো স্কোয়্যার লেগ আম্পায়ার ডান হাতটা মাটির সমান্তরালে তুলে জানাচ্ছেন, বলটা ছিল নো-বল! ফুট-ফল্টে নয়, কিন্তু নো-বল হয়েছে বলটা ব্যাটসম্যানের কোমরের ওপরে থাকায়। আতঙ্কে বলটা ছাড়বার সময়ে আপনা থেকেই গ্রিপ আলগা হয়ে সেটা যে কোন নেহাত আনাড়ী ব্যাটসম্যানেরও লোভনীয় সঠিক উচ্চতায় ধীরগতির লংহপে পরিণত হয়েছিল। বিপিনের মতো ব্যাটসম্যানের জন্য এর চেয়ে বেশী আমন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল না।

'নেভার মাইন্ড মানব, গো ফর হিম', ক্যাপ্টেন তার পিঠ চাপড়িয়ে উৎসাহ দিয়ে গেলেন। মানবের চোখের সামনে রাশি রাশি শিউলি ঝরছে। কিছু শেষ হয় নি। কেউ কিছু বুঝতে পারে নি। এখনও তার একটা বল বাকি। সামনে বিপিন। মাত্র চারটে রানের দূরত্ব! অতল গহ্বর থেকে ভেসে উঠতে উঠতে মানবের মনে হল, ইচ্ছে করলে ত্রিশ লক্ষ টাকা সে এখনই যেন ছুঁয়ে দেখতে পারে।

একটা হাফ ভলি, আর ভুল করবে না মানব। বোলিং মার্কে ফিরে যেতে যেতে ভাবতে লাগলো, বিপিন তুই আমার পুরনো বন্ধু। জানি তুই আমাকে হতাশ করবি না। দেখিস, আমি প্র্যাক্টিসেও কখনো এতো সফট বল তোকে করি নি। একটা বাউন্ডারী শুধু আজ আমি তোর কাছে ভিক্ষে চাইছি!

যেমনটি ভেবেছিল মানব, বলটা ঠিক তেমনই ছিল। স্ট্রেট ব্যাটে লং অফের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিতে বিপিনের কোন সমস্যা হবার কথা ছিল না। কিন্তু এটা কি করলো বিপিন? স্লো মোশনে কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া ছবির মতো পুরো ঘটনাটা আবার মানবের সামনে যেন রিপ্লে হয়ে গেল। বলটা মাঝমাঠ পার হতেই বিপিন স্টান্স বদল করে সপাটে রিভার্স সুইপ করলো। মানব যখন পয়েন্ট বাউন্ডারীর আকাশে বলটাকে আপ্রাণ খুঁজে নিতে চাইছে, সহ-খেলোয়াড়রা এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। বিপিনের ব্যাট থেকে বন্দুকের বুলেটের মতো বলটা গিয়ে তার মিডল স্টাম্পকে শুইয়ে দিয়েছে।

* * *

আধো অন্ধকারে মানব ক্লাবহাউসের গেটের পাশে দাঁড়িয়েছিল। মাথাটা তার একেবারে শূন্য। মাহেশ্বরীর মুখটা মনে পড়তেই মেরুদন্ডের মধ্যে একটা শীতল স্রোত অনুভব হচ্ছে। বড় কড়া ধাতের ব্যবসাদার, খুব সহজে মানব ছাড়া পাবে না।

বিপিন হাসি হাসি মুখে ক্লাবহাউস থেকে বেরিয়ে আসছে। পাশ দিয়ে যাবার সময়ে মানবকে দেখে বললে, 'ওয়েল ডান মানব।'

বিপিনের দল হেরে গিয়েছিল। তা সত্বেও সে স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে মানবকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। কেন? দলের হারে সে কি দুঃখিত নয়? মানবের মনটা পাথর হয়ে গেছিল, দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলল, 'উস তরিকে সে আউট হোনা জরুরি থা?'

বিপিন চকিতে একবার এদিকওদিক দেখে নিল। মুখে তার অনেকগুলো এক্সপ্রেশন খেলে গেল। তারপর হাত বাড়িয়ে মানবের কাছে এগিয়ে এল। পরম সৌহার্দে তার গলাটা জড়িয়ে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, 'হাঁ ইয়ার, বহত জরুরি থা। কেয়া করে? আখরি গেন্দ হি তো বচা থা...'

'কেয়া বকওয়াস হ্যায় বিপিন, তু অউর ইতনা ইরেস্পন্সিবিলিটি? তু টীম সে নিকালা যা শকতা...।'

'যা শকতা নহী ইয়ার, নিকালা যায়গা। আই নো। লেকিন কেয়া ফর্ক পড়তা? কল বম্বে যা রহা হুঁ। পুরে সীজন কা এক সাথ মিল যায়গা, চালিশ লাখ কা সওয়াল...' কাঠ হয়ে মানব শুনে যেতে লাগলো বিপিন চাপা গলায় বলে চলেছে, 'তু ভি আ যা না ইয়ার, ইয়ে খেল মে কেয়া রাকখা হ্যায়? অসলি খেল মে আ, ম্যায় সেনগুপ্তাসাবকো বতা দেঙ্গে। সামিল হো যা, তেরা ভী তকদীর বন যায়গা ইয়ার...'

মানবের চোখের সামনে তখন আর শিউলি নয়, সর্ষেফুলের মেলা।


সূর্যনাথ ভট্টাচার্য
কলকাতা

পাখিদের সমাজে আজ সোরগোল পড়ে গিয়েছে , সকাল থেকেই চিত্কার চেঁচামেচি আর ব্যস্ততা । আমগাছের ওই মগডালে আজ সভা বসেছে। মানুষগুলো সারাজীবন ধরে পাখিদের জ্বালিয়ে মারছে, হয় খাঁচায় বন্দী করছে, নয়তো উদরস্থ করছে-- আরো কত কি!!! তাই সভাপতি ময়না এক প্রতিযোগীতার আয়োজন করেছে। মানুষকে বিরক্ত বা ক্ষতিগ্রস্থ করার অভিজ্ঞতা লিখে জমা দিতে হবে, আর তার মধ্য থেকে বাছাই করা হবে তিনটে অভিজ্ঞতার কথা । এই সভায় সেই তিনজন লেখক/ লেখিকা তাদের সেই লেখা দর্শক পাখিদের সামনে পাঠ করবে আর দর্শকদের ভোটের বিচারে পুরস্কৃত হবে শ্রেষ্ঠ লেখক বা লেখিকা ।

সভাপতি ময়নার সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে শুরু হল সভা। প্রথম লেখিকা একটি টিয়া । উপস্থিত দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে টিয়া শুরু করল তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা - সেদিন ধানক্ষেতের পাশে খেজুর গাছটায় বসে একটা পাঁকা খেজুরে যেই না কামড় দিতে গিয়েছি , দেখি কয়েকটা পাজী ছেলে আমার দিকে কি একটা তাঁক করে রেখেছে , ভয় পেয়ে ছুটে পালাই- কিন্তু ছোঁড়াগুলোও ছাড়বার পাত্র নয় , তারাও দৌড়ায় আমার পেছনে, বেশ কয়েকটা পাথর আমার গায়ে লাগতে লাগতে নিচে পড়ে গেল। আমি হাপাতে হাপাতে একটা বট গাছের ডালে সবেমাত্র একটু বসেছি, ওমা ছোঁড়া গুলো ওখানেও চলে এসেছে!! হঠাত দেখি বট গাছের ডালে একটা সাপের বাচ্চা, আমি তাড়াতাড়ি সেটা মুখে নিয়ে নিচে ছুঁড়ে মারি, আর সেটা মাটিতে পড়তেই ছেলেগুলো মা রে বাবা রে বলে এর ওর ঘাড়ে পড়তে পড়তে ছুটে পালালো ....... হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। টিয়ার বক্তব্য শেষ ।

পরবর্তী প্রতিযোগী এক কাক- " সেদিন সকালে পেয়ারা গাছের ডালে দোল খাচ্ছি হঠাত দেখি চকচকে টাক ওয়ালা একটা লোক দাঁতন করছে ঠিক ওই গাছটারই নিচে, লোকটা মহা শয়্তান, আমার ই বন্ধুকে ঢিল মেরেছিল তার আগের দিন, বন্ধুটার একটা পাখনা প্রায় অকেজো হয়ে পরেছে । ব্যাটাকে দেখে ব্রহ্মতালু জ্বলে গেল, দিলাম একটা গলা পঁচা পেয়ারা মাথায় ফেলে, ব্যাস লোকটা এবার আমাকে দেখতে পেয়ে যেই না ঢিল তুলেছে অমনি ক্ষিপ্রগতিতে উড়ে এসে লোকটার টাকের বাকি কগাছা চুল ছিঁড়ে নিয়ে উড়ে পালালাম খানিক দূরের এক সজনে গাছের ডালে । লোকটা মাটিতে আছড়ে পড়ে কি কান্না !! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ .… কাক বক্তব্য শেষ করল ।

শেষ প্রতিযোগী এক শালিক । শালিক তার বক্তব্য শুরু করল : " সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। প্রচণ্ড জলের তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাবার যোগাড় - একটা বাড়ির পেছনের বাগানে একটা মাটির ভাড়ে খনিকটা জল দেখে উড়ে গেলাম তেষ্টা মেটাতে কিন্তু ঠিক তখনই বাড়ির পেছনের দরজা খুলে এক মহিলা বেরিয়ে এসে ' আ মরণ, এক শালিক! যাঃ যাঃ ' বলে একটা ঢিল ছুঁড়ে আমাকে মারল , ঢিলটা আর একটু হলেই আমার ডানায় লাগত আর আমি পঙ্গু হয়ে যেতাম ! খুব রাগ হল, বাসায় ফিরে বন্ধুদের বলাতে ওরাও বলল যে এক শালিক দেখাটা নাকি মানুষরা পছন্দ করে না, ওদের দিন খারাপ যায়। সে যাইহোক আমি পরদিন আমার বন্ধুদের নিয়ে সেই বাগানে আবার গেলাম। দেখি সেই মহিলাটি একটা খুব সুন্দর শাড়ি বাগানে টানানো একটা দড়িতে শুকো দিচ্ছে - যেই না ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছে আমি আর বন্ধুরা মিলে সেই শাড়িটাকে ঠোট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে ছিঁড়ে দিলাম। হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ…..

এরপর দর্শকদের বিচারে শ্রেষ্ঠ লেখকের সম্মান পেল কাক । কারণ একমাত্র সেই মানুষকে শারিরীক যন্ত্রণা দিতে পেরেছে, তার চোখে জল আনতে পেরেছে। প্রবল হর্ষধ্বনির মধ্যে কাকের গলায় জয়মাল্য পড়িয়ে দিল ময়না, আর পুরষ্কার স্বরুপ দিল পাতায় করে শুকনো পোঁকামাকড় আর কিছু ধান - তার শ্রেষ্ঠত্বের পুরষ্কার । পাখিদের সভা শেষ।


এখন আমি শহুরে হয়ে গেছি। থাকি শাহরের একটি অভিজাত এলাকায়। দোতলা বাড়র নিচিতলায় ঝুল বারান্দায় একটা কালচে রংয়ের ঝোলানো খাঁচায় আমার বাসা। এখান থেকে দিব্যি দুবেলা মানুষজন, ঘর-বাড়ি, কুকুর-বেড়াল, কাক-শালিক আরো কত কি যে দেখা যায়! এক্ষুনি হয়তো মাথায় ঝাঁকা করে কলা বেচা ফেরিওয়ালাটা অদ্ভুৎ ডাক দেবে - "ক-লা-চা-ই, ক-লা---" পরক্ষনে হয়তো লম্বা ঢ্যাঙ্গা লুঙ্গি পরা হাফ হাতা লালচে গেঞ্জি পরা দর্জি কাঁধে তুলো পেঁজার যন্ত্রটার দড়িতে টান দিয়ে "ঘ্যাঁ-ও-ও, ঘ্যাঁ-ও-ও" শব্দ তুলে চলে যাবে পাশের গলিতে। এদিকে রাস্তার উল্টো দিকে "গোপাল ভান্ডার" এ দোকানদার খদ্দের সামলাছে একইভাবে। দোকানের মাথায় ঠান্ডা পানিয়র বিশাল বিজ্ঞাপনের ব্যানার। বিশাল আকৃতির একটি পানিয়র বোতল, গায়ে বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা চুঁইয়ে পড়ছে। আপনা থেকেই তৃষ্ণা পাবেই। তাকে ছাড়িয়ে একটু দুরে বিশাল ছাতিম গাছের ছাওয়ায় দুটো রিক্সা পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বিশ্রাম করছে।

তক্ষুনি স্কুল ফেরত ইচ্ছামতী দু'দিকে বিনুনী দুলিয়ে নীলচে স্কুল ফ্রক উড়িয়ে মায়ের হাত ছেড়ে আমার খাঁচার নিচে এসে লাফাতে লাফাতে চ্যাঁচায় " এই টিঁয়া - টিঁয়া - তুই ঘুমোচ্ছিস - টিঁয়া?!" ওর লাফানো দেখে আমায় খেলায় পেয়ে বসে। আমিও ডানা ঝাপটে চ্যাঁচাতে থাকি - "মঁতি - মঁতি!" ইচ্ছামতী বড্ড বড় নাম, তাই ছোট করে আদর করে বলি - "মঁতি"। ও এবার মাষ্টারি করতে শুরু করে, কোমরে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বিজ্ঞের মতো জিজ্ঞেস করে - "বল প্যারট"। আমি গলার স্বর গম্ভির করে বলি-"প্যাঁর-র-ট"। ও অনুশাসন করে বলে - "মানে বল ?" আমি আবারও বলি-"প্যাঁর-র-ট"। ও অনুযোগের সুরে বলে - "এর মধ্যেই ভুলে গেলি ? কাল যে তোকে শেখালাম!" আমি মজা করে ঘাড় বেঁকিয়ে গায়ের পালকগুলো ফুলিয়ে আবার বললাম - "প্যাঁর-র-ট"। ওতো হেসে কুটোপাটি!

মা পেছন থেকে ইচ্ছামতীকে টেনে ঘরে নিয়ে যায়। ও কিছুতেই যেতে চাইছেনা। আর একটু আমার সঙ্গে খেলতে চায়। মা ওকে বকুনি দিতে দিতে ঘরে টেনে নিয়ে যায়। বলে - " চলো, চলো জামা কাপড় ছেড়ে চান করে ঘুমোবে। বিকেলে টিচার আসবে। হোম টাস্ক --- ওঃ বড্ড অবাধ্য!" ও হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে কাঁদতে মার সঙ্গে ঘরে যায়। আমার ভালো লাগে না। এখন শুধু শুধু বসে থাকা ছাড়া কোন কিছু করার নেই।

ঝিমুনি ধরা দুপুরের রোদটা শহরের এই গলিটাকে আরো বেশি করে তন্দ্রাছন্ন করে তুলছে। রাস্তা প্রায় ফাঁকা, মাঝে মধ্যে দু'একটা গাড়ি বা বাইকের আওয়জে তন্দ্রায় ছেদ পড়ছে বইকি ! এদিকে চারদিকে তখন উঁচু নিচু বাক্সঘর থেকে ভেসে আসছে টিভি সিরিয়ালের দাপাদাপি ও দামামা। আমার ঝিমুনি আসে। চোখ বন্ধ করে ঘাড় গুঁজে বসে রইলাম।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই বন-বাদাড়ে ভরা নোনা নদীর চর। চরের বাঁক ছাড়িয়ে নদীটা এঁকে বেঁকে মিশেছে দু'র দিকচক্রাবালে। দিন দুবেলা জোয়ার ভাটা খেলা করে যায় এই চরের জঙ্গলে। আর চরের এপারে মোটা নদী বাঁধ পেরিয়ে মাঠ ভরা সোনালী আদিগন্ত ধানের ক্ষেত। মাঝে মধ্যে সবুজ আলবাঁধগুলো সোনালী ক্যানভাসে আঁকিবুকি কেটে মায়াবী রুপরেখা তৈরী করেছে। আরো দূরে গাছ-গাছালির দিগন্ত রেখায় দু'একটা পাংশুটে খড়ের ঘর বা কালচে লাল রঙের টালির ছাউনি মাটির ঘর। পেছন থেকে হয়তোবা কোন তাল-নারকেল তেড়ে ফুড়ে উঠে গেছে শুধু নীল দীগন্তে ভেসে থাকা কোন মেঘের ডানা ছুঁতে।

চরের জঙ্গলে একটা বুড়ো নধর বানী গাছের কোটরে আমাদের বাসা। আমরা তিন ভাইবোনে একসঙ্গে গায়ে গায়ে, গাদা-গাদি হয়ে বসে থাকি। আমরা একে অপরে ধাক্কা-ধাক্কি করে কোটর থেকে মুখ বের করে বাইরের জগতটা দেখে নেই। একজনের দেখা হয়ে গেলে তাকে সরিয়ে অন্যজন। বেশ লাগে নদীর চর, ধানক্ষেত, আকাশ-মেঘ আর অপেক্ষা করি মা কখন ফিরবে ! নয়তো সময় কাটাতে পাশের ঝোপের বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে ক্যাচর ম্যাচর করে গল্প জমাই। গল্পের কোন ঠিক ঠকানা নেই। মায়ের কাছে শোনা কোন রাক্ষস-খোক্ষসের বা কোন রুপকথার গল্প নয়তো ধাঁধাঁ অথবা মজার চুটকি।

তক্ষুনি মা মুখে করে খাবার নিয়ে উড়ে এসে গর্তের মুখে ধরে। আমরা মহানন্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের মুখ থেকে খাবারের টুকরোগুলো ছিঁড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলি এক নিমেষে। মা এবার শাষন করে বলে - " তোমরা বড্ড দুষ্টু হয়েছ, কতবার না বলেছি গর্ত থেকে বের হবে না ... এখনো ভালো করে উড়তে শিখলে না। কাল থেকে আমার সঙ্গে ওড়া প্র্যাক্টিস করবে। শত্রুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবে কি করে ?!

বিকেলে হঠাৎ গাছটায় প্রবল ঝাঁকুনি সঙ্গে ঠক-ঠক করে বিকট শব্দ, যেন সমস্ত পৃথিবীটা দুলে উঠছে - একবার নয় দুবার নয় বার বার ! মূখ বাড়িয়ে গর্ত থেকে মুখ বাড়িয়ে যেইনা দেখবার চেষ্টা করেছি, দেখি কি কালো মতো একটা লোক গাছটায় চড়ে বসে আছে, হাতে জাল ! সর্ব্বনাশ - এটাতো শিকারী ! আমরা তিনজন কোটরের একেবারে ভিতরে ডুকে বসে রইলাম। বুক দুরু দুরু, ভয়ে কাঁপছি। কান্না পাচ্ছে ভিষন কিন্তু মাকে ডাকতে পারছ না। এমন সময় কোটরের মুখ বন্ধ হয়ে গেল, এখন শুধু অন্ধকার।

দম বন্ধ হয়ে আসছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, ভিষন কষ্ট, পারছিনা... নিজেদের বাঁচাতে কপাল ঠুকে কোটরের মুখ থেকে বেরোবার জন্য শত চেষ্টা করছি অমনি দুটো কালো হাত এসে আমাদের জালে জড়িয়ে ফেলল। আমরা প্রাণপনে চ্যাঁচিয়ে প্রতিবাদ করছি কিন্তু লাভ কোন লাভ হচ্ছে না। আত্মরক্ষার জন্য আমাদের লাল ঠোঁট দিয়ে লোকটার কালো হাতে আচ্ছা করে কামড় বসাই। হাত দুটো ক্ষনিকের জন্য সরে গেলেও পরক্ষনে আবার পেছন থেকে ডানাদুটো জাপটে ধরে একটা খাঁচার মধ্যে চালান করে দিল। আমারা তখন সমানে কঁদে কাঁদে অনুরোধ করছি - " ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও, আমদের ভিষণ লাগছে, কি অপরাধে আমাদের ধরে বাঁধে নিয়ে যাচ্ছ ?"

মা তক্ষুনি আকাশ চিরে চিৎকার করে উড়ে এসে গাছের উপরে চক্কর দিচ্ছে। মা প্রতিবাদ করছে - "এই বদমানুষটা, আমার বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দে, ছেড়ে দে, কি ক্ষতি করেছে ওইটুকুনি কচি বাচ্চগুলো ? ভালো হবে না কিন্তু... ছেড়ে দে বলছি..." মায়ের সঙ্গে আমরাও সমানে চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করছি, অমনি আমাদের পাশের প্রতিবেশিরাও জঙ্গলের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে চক্কর দিতে দিতে তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। মুহুর্তে জঙ্গলে যেন আলোড়ন উঠল। মাকে আমরা কাঁদতে কাঁদতে বলছি - "আমাদের বাঁচাও মা, আমাদের বাঁচাও..." মা তীব্র গতিতে সোজা উড়ে এসে লোকটার মাথায় একটা টক্কর দিল, লোকটা হাত দিয়ে 'হুস-হুস' করে মাকে তাড়াতে থাকল। তারপর খাঁচার মুখটা ভালো করে বন্ধ করে বাঁকের পেছনে খাঁচাটা ঝুলিয় দিল। এবার মা হাঁউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করছে - "হেই মানুষ, ওদের ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। তোমরা শক্তিধর, বুদ্ধিমান, আমরা ক্ষুদ্র-ক্ষীণ, তাই বলে আমাদের এভাবে ধরে বাঁধে বিনা দোষে খাঁচার জেলে পচিয়ে মারবে ! কেন - কেন ?"

পাষন্ড লোকটা তখন নির্বিকার নির্লিপ্তভাবে আমাদের বাঁকে ঝুলিয়ে সোনালী ক্ষেতের মাঝের সবুজ আলবাঁধ ধরে এগিয়ে চলে। আমরা ডানা ঝাপটে ঝাপটে ক্লান্ত হয়ে ফ্যাঁস-ফ্যাঁসে গলায় অনুরোধ করে যাচ্ছি - "ছেড়ে দাও - ছেড়ে দাওনাগো আমাদের..." মা তখনো আকাশে চক্কর দিতে দিতে আকাশ ফাটা চিৎকার মিনতি করছে - "দয়া করো - দয়া করো তুমি, আমার সোনার ধন বাচ্চাগুলকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও..."

তারপর সন্ধ্যে নেমে এসেছিল সেই সনালী ক্ষেতে। মা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আর কোনোদিন মায়ের ডাক শুনতে পাই না। মায়ের অনুষনও এখন শুনতে পাই না। মায়ের মুখের খাবার স্বাদ আর পাই না। এখন আমি একা একা খেতে শিখে গেছি। আমি একা একাই কথা বলি। আমারতো আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে। মায়ের জন্য আমার ভিষন কষ্ট হয় - ভিষন। কান্না পায়। কোঁকিয়ে কেঁদে উঠি। ডানা ঝাপটে খাঁচার মধ্যে চিৎকার করে কাঁদতে থাকি - " মা-মা-মা, মা-মা-মা"

দুফুরের অলস ঘুম জড়ানো চোখে ইচ্ছামতীর মা দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। দরজার আওয়াজে আমিও সম্বিৎ ফিরে পাই। উনি দরজায় দাঁড়িয়ে হাই তুলতে তুলতে আমাকে জিজ্ঞেস করেন - " কি হয়ছে ? ডাকছিস কেন ? ক্ষিদে পায়েছে ? আচ্ছা দাঁড়া দিচ্ছি" বলেই ঘরে ফিরে যায়। আমি ডানা ঝাপটে ভিষন চিৎকার করি - " আমাকে ছেড়ে দাও, মুক্তি দাও, এক্ষুনি এক আকাশ পাড়ি দিয়ে আমি আমার মায়ের কাছে চলে যাই।"

আমার কান্নার বাঁধ মানছে না, সব শক্তি সঞ্চয় করে তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদছি - "মা-মা-মা..."


মহাভারতে ধর্ম বকের ক্যুইজের উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, যার কোনো ঋণ নেই সেই প্রকৃত সুখী। দ্বাপর যুগের সে সব ফিলজফি এই ঘোর কলিতে স্বাভাবিক ভাবেই অচল। বরং ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ আজকের ফ্যাশান! ক্রেডিট কার্ড বা লোনদাতাদের রমরমা থেকেই তা মালুম হয় বেশ। অবশ্য কিছু খলিফা মানুষ আছেন যাঁরা ধার করারও ধার ধারেন না। দিব্যি খোশমেজাজে পরস্মৈপদী জীবনযাপন করেন। আজকের গল্প এমনই এক বিরলপ্রতিভা ভদ্রলোককে নিয়ে।

দূরদৃষ্টিতে কিছুদিন ধরেই কেমন গোলমাল ঠেকছিল। কাল সন্ধেয় শেষমেষ গেলাম পাড়ার গোবিন্দদার চশমার দোকানে একটা চোখের ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তারবাবুর আসতে লেট। খদ্দেরের তেমন ভিড় নেই। তাই গোবিন্দদা একথায়-সেকথায় তাঁর এক বিশেষ খদ্দেরের গপ্পো পাড়লেন। পাশের পাড়ার জনৈক বয়স্ক,এককালীন উচ্চপদস্থ সরকারী চাকুরে এবং বর্তমানে মোটা পেনশনজীবী এই ভদ্রলোক গত বছর গোবিন্দদার দোকান থেকে বেশ সৌখীন, ভালো দামের চশমা তৈরি করান। কিন্তু তারপর দাম মেটাবার আর নাম করেন না! খাতির দেখিয়ে ডেলিভারী দেবার সময় "পরে আপনার সময়মত দেবেন" বলেই নিজের জালে মোক্ষম ফেঁসেছেন গোবিন্দদা। শেষে একদিন সকাল সকাল রাস্তায় ধরলেন তাঁকে। নাকে সেই চশমা উঁচিয়েই বাজারের থলে হাতে চলেছেন তিনি। টাকার কথা পাড়তেই খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি, "এটা একটা চশমা হয়েছে ? কিচ্ছু ঠিকমত দেখতে পাচ্ছি না। আরো কটা দিন ট্রায়াল দিয়ে দেখি। আরে, তোমার ঐ কটা টাকা মেরে দিয়ে আমি পালাচ্ছি নাকি, য়্যাঁঃ ?" গোবিন্দদা অধোবদন - হকের টাকা চাইতে গিয়ে। আর ভদ্রলোক বীরদর্পে চললেন মাছের বাজারে। বলা বাহুল্য তাঁর হাঁটাচলায় দৃষ্টিবিভ্রমের কোনো লক্ষণ নেই।

আরো মাসতিনেক কাটল। ভদ্রলোক দিব্যি বিনিপয়সার চশমা পরে দেশদুনিয়া ঘুরে বেড়ান, অবশ্য গোবিন্দদার দোকানের রাস্তাটা বাদে। শেষে আর থাকতে না পেরে একদিন গোবিন্দদা ভদ্রলোকের ছেলেকে রাস্তায় পেয়ে সব কথা বললেন। ছেলে বাপের চালচলন বিলক্ষণ চেনে। সে বলল, "সামনের হপ্তায় মাস পয়লার দিন বাবা পেনশন তুলবে। ঐ দিন রাত দশটা নাগাদ একবার আমাদের বাড়ি এসো। এসে জাস্ট কলিং বেল টা টিপবে। তারপর যা করার আমি করব।"

যেমন কথা তেমন কাজ। নির্দিষ্ট দিনে বেল টেপার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে দরজা খুলেই ভিতরের ঘরের দিকে হাঁক দিল, "বাবা, একবার শুনে যাও।" বাবা ভদ্রলোকটি মনে হয় নিদ্রার আয়োজন করছিলেন। স্যাণ্ডো গেঞ্জী আর লুঙ্গি পরে হাওয়াই চটি ফটফটিয়ে এলেন তিনি বাইরের ঘরে। ছেলে বলল,"ইনি কি বলছেন - তুমি নাকি ওঁর দোকানে পাওনা বাকি রেখেছ?" শুনেই ভদ্রলোক লাফিয়ে চলে এলেন গোবিন্দদার সামনে। খালি চোখে ঠিক চিনতে পারলেন কিনা বোঝা গেল না। তার পরেই সবাইকে হতচকিত করে দিয়ে পা থেকে হাওয়াই চটিজোড়া খুলে এক টানে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, "এটা একটা হাওয়াই চটি ? আবার বাড়ি বয়ে দাম চাইতে এসেছে!!"



ছবিঃদীপায়ন সরকার

undefined

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা