সূচীপত্র -গ্রীষ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

১৮৫১ সালে, সুকুয়ামিশ জনজাতির নেতা সিয়াটেল এই ভাষণ দিয়েছিলেন এক চুক্তি প্রস্তাবের উত্তরে। সেই চুক্তি প্রস্তাব অনুসারে, আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের বলা হয়েছিল দুই মিলিয়ন একর জমি ১৫০,০০০ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করতে হবে। এই ভাষণ কে বলা হয়ে পরিবেশ সম্পর্কে সবথেকে সুন্দর এবং চিন্তাশীল

-----------------------------------------------------------------------------
চিফ সিয়াটেল

তোমরা কিভাবে আকাশ কে , মাটির উষ্ণতাকে কিনতে বা বেচতে পার? এই ধারণা আমাদের অচেনা।
বাতাসের সজীবতা আর স্রোতের ঝলক আমাদের সম্পত্তি নয়, তাহলে তোমরা সেগুলিকে কিভাবে কিনতে পার?

এই পৃথিবীর প্রতিটা অংশ আমার লোকেদের কাছে পবিত্র। পাইনের প্রতিটা ঝকঝকে সূঁচ, প্রতিটি বালুকাবেলা, গভীর জঙ্গলের প্রতিটা কুয়াশা, প্রতিটা খোলা জমি আর গুনগুন করতে থাকা পোকারা আমার লোকেদের স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতায় পবিত্র। গাছের মধ্যে দিয়ে যে রস বয়ে চলে তার মধ্যে আছে লাল মানুষের স্মৃতি।

সাদা মানুষের মৃতেরা যখন তারাদের সাথে পথ চলতে শুরু করে, তারা তাদের জন্মভূমির কথা ভুলে যায়। আমাদের মৃতেরা এই সুন্দর পৃথিবীকে কখনো ভোলেনা, কারণ এ হল লাল মানুষের মা। আমরা এই পৃথিবীর অংশ আর এ আমাদের অংশ। সুগন্ধী ফুলেরা আমাদের বোন; হরিণ, ঘোড়া, বিরাট ঈগল , এরা আমাদের ভাই।

পাথুরে খাঁজ, রসে ভরা ঘাসজমি, ঘোড়ার গায়ের ওম, আর মানুষ- সবাই এক পরিবারের অংশ।

তাই, যখন ওয়াশিংটন থেকে মহামান্য অধিপতি জানাচ্ছেন যে তিনি আমাদের জমি কিনে নিতে চান, তিনি আমাদের থেকে খুব বেশি চাইছেন। মহামান্য অধিপতি জানাচ্ছেন যে তিনি আমাদের জন্য একটা জায়গা বেছে রাখবেন যেখানে আমরা নিজেদের মত আরামে থাকতে পারব। তিনি হবেন আমাদের পিতা আর আমরা হব তাঁর সন্তান।

তাই আপনার পাঠানো আমাদের ভূমি কেনার প্রস্তাব আমরা বিবেচনা করে দেখব। কিন্তু সেটা সজহ হবে না। কারণ এই ভূমি আমাদের কাছে পবিত্র। নদী-নালাতে বয়ে চলা এই ঝিলমিলে জল শুধুমাত্র জল নয়,এ হল আমাদের পূর্বপুরুষের রক্ত। আমরা যদি তোমাদের ভূমি বিক্রি করি, মনে রাখবে যে এটা পবিত্র, আর তোমরা তোমাদের সন্তানদের অবশ্যই শেখাবে যে এটা পবিত্র , আর জানাবে যে ঝিলের পরিষ্কার জলে পড়া প্রতিটা ছায়াময় প্রতিফলন আমার জনজাতির জীবনের ঘটনা এবং স্মৃতির কথা বলে। জলের কুলুকুলু শব্দ আমার পিতামহের স্বর।

নদীগুলি আমাদের ভাই; তারা আমাদের তৃষ্ণা মেটায়। নদীগুলি আমাদের ক্যানো বহন করে, আর আমাদের সন্তানদের খাদ্য দেয়।আমরা যদি তোমাদের কাছে আমাদের ভূমি বিক্রি করি, তাহলে মনে রাখতে হবে, আর তোমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে , যে নদীগুলি আমাদের ভাই আর তোমাদেরও, আর এখন থেকে তোমরা নদীগুলিকে সেইরকমই ভালবাসবে যেভাবে নিজের ভাইকে ভালবাস।

আমরা জানি সাদা মানুষ আমাদের নিয়ম কানুন বোঝে না। ভূমির একটা অংশ তার কাছে আরেকটা অংশের মতই, কারণ সে একজন অচেনা মানুষ যে রাতের অন্ধকারে, তার যা প্রয়োজন সব কিছু নেওয়ার জন্য ভূমির কাছে আসে। পৃথিবী তার ভাই নয়, বরং তার শত্রু, আর যখন সে স্তাকে জয় করে ফেলে, সে তখন এগিয়ে চলে। সে তার পিতার সমাধি পেছনে ফেলে চলে যায়, তার কথা ভাবে না। তার পিতার সমাধি আর তার সন্তানদের জন্মগত অধিকার সব ভুলে যায়। সে তার মা, ধরিত্রিকে, আর তার ভাই, আকাশকে , মনে করে এমন জিনিষ যা কেনা যায়, নষ্ট করা যায়, ভেড়ার মত বা চকমকে পুঁতির মত বিক্রি করা যায়।তার ক্ষিদে ধরিত্রিকে নিঃশেষ করে ফেলে রেখে যাবে শুধু এক মরুভূমি।

আমি জানি না। আমাদের ভাবনা চিন্তা তোমাদের থেকে আলাদা। তোমাদের নগরগুলিকে দেখলে লাল মানুষের চোখে কষ্ট হয়। সাদা মানুষের নগরে কোন শান্ত জায়গা নেই। কোন হায়গা নেই যেখানে বসন্তের পাতা জেগে ওঠার শব্দ , অথবা পোকাদের পাখনার ফরফর আওয়াজ শোনা যায়। সেখানে শব্দের ঝনঝনানি যেন কানগুলিকে অপমান করে। আর জীবনে কি রইল, যদি মানুষ একলা পাখির কান্না , অথবা রাতে পুকুরের ধারে ব্যাঙেদের তর্কবিতর্ক শুনতে না পায়? আমি একজন লাল মানুষ আর বুঝিনা। আমারা দুপুরের বৃষ্টিতে ধোয়া, পাইনের গন্ধে মাতোয়ারা, বাতাসের নরম শব্দ শুনতে পছন্দ করি।

লাল মানুষের কাছে বাতাস খুব দামী, কারণ সব জিনিষ একই শ্বাস ভাগ করে নেয়। সাদা মানুষ যে বাতাসে শ্বাস নেয় তার খেয়াল রাখে না। অনেকদিন ধরে মরতে থাকা মানুষের মত সে দুর্গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।কিন্তু আমরা যদি আমাদের ভূমি তোমাদের বিক্রি করি, তোমরা তাহলে সেটাকে আলাদা এবং পবিত্র রাখবে এমন একটা জায়গা হিসাবে, যেখানে এমন কি সাদা মানুষও ঘাসজমির ফুলের গন্ধে ভরা মিষ্টি বাতাসের আশ্বাদ নিতে যেতে পারে।

তোমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে যে তাদের পায়ের নিচের মাটি হল আমাদের পিতামহদের দেহাবশেষ। যাতে তারা ভূমিকে সম্মান জানায়, তাই তোমাদের সন্তানদের বল যে ধরিত্রি আমাদের ভাইদের জীবনে ধনী। তোমাদের সন্তানদের শেখাও যে আমরা আমরা আমাদের সন্তানদের শিখিয়েছি যে পৃথিবী আমাদের মা। পৃথিবীর যা হবে, তার ছেলেদেরও তাই হবে। মানুষ যদি মাটিতে থুতু ফেলে, তাহলে তারা নিজেদের ওপরেই থুতু ফেলবে।

ছবি

আমরা এটা জানিঃ পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি নয়; মানুষের ওপর পৃথিবীর অধিকার আছে। সব কিছু যুক্ত আছে। আমরা হয়ত শেষমেষ ভাই হতে পার। আমরা দেখব কি হয়। একটা জিনিষ আমরা জানি, যা সাদা মানুষ হয়ত একদিন আবিষ্কার করবেঃ আমাদের ঈশ্বর একই ঈশ্বর।

তোমরা হয়ত এখন ভাববে যে তাঁর ওপরেও তোমাদের অধিকার আছে, ঠিক যেমনভাবে তোমরা আমাদের ভূমি অধিকার করতে চাও; কিন্তু তোমরা পারবে না। তিনি হলে মানুষের দেবতা, আর লাল আর সাদা মানুষদের জন্য তাঁর দয়া সমান।এই পৃথিবী তাঁর কাছে দামি; আর পৃথিবীর ক্ষতি করা নামে তার সৃষ্টিকর্তার অবমাননা করা। সাদারাও একদিন নিঃশেষিত হবে। হয়ত অন্য সমস্ত জনজাতির থেকে আগেই হবে। নিজের বিছানাকে নোংরা কর, আর একদিন তুমি নিজের তৈরি করা নোংরার মধ্যেই দম বন্ধ হয়ে মরবে।

কিন্তু এই শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যেও তোমরা ঈশ্বরের শক্তির দ্বারা প্রজ্বলিত হয়ে উজ্জ্বলভাবে ঝকঝক করবে; ঈশ্বর তোমাদের এই দেশে এনেছিলেন এবং কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তোমাদের এই দেশ এবং লাল মানুষদের ওপর আধিপত্য দিয়েছেন।

সেই ভবিতব্য আমাদের কাছে একটা রহস্য, কারণ আমরা বুঝি না, যখন সমস্ত মহিষ কাটা পড়বে, বুনো ঘোড়ারা পোষ মেনে যাবে, বনভূমির গোপন কোনাগুলি বহু মানুষের গন্ধে ভরে যাবে, আর পুষ্ট পাহাড়গুলিকে ঢেকে দেবে কথা বলা তারেরা।

ঝোপঝাড়গুলি কোথায় ? নেই। ঈগল কোথায়? নেই।

বেঁচে থাকার শেষ আর টিঁকে থাকার লড়াই-এর শুরু।আগেই হবে।

অনুবাদঃ
মহাশ্বেতা রায়
পাটুলি, কলকাতা

লেখক পরিচিতি

মহাশ্বেতা রায়

মহাশ্বেতা রায় চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ওয়েব ডিজাইন, ফরমায়েশি লেখালিখি এবং অনুবাদ করা পেশা । একদা রূপনারায়ণপুর, এই মূহুর্তে কলকাতার বাসিন্দা মহাশ্বেতা ইচ্ছামতী ওয়েব পত্রিকার সম্পাদনা এবং বিভিন্ন বিভাগে লেখালিখি ছাড়াও এই ওয়েবসাইটের দেখভাল এবং অলংকরণের কাজ করেন। মূলতঃ ইচ্ছামতীর পাতায় ছোটদের জন্য লিখলেও, মাঝেমধ্যে বড়দের জন্যেও লেখার চেষ্টা করেন।