খেলাঘরখেলাঘর

পায়ের তলায় সর্ষে


পৃথিবীর ম্যাপটাকে যদি দূর থেকে ছোট করে দেখি, মনে হয় যেন কেউ সেটাকে হাতরুটির মত করে বেলে দিয়েছে। দেখেই বেড়াতে ইচ্ছা করছে। আমেরিকান কোম্পানির ম্যাপ বলেই বোধ  হয়, এত ছোট করে ম্যাপটা ধরে থাকা সত্বেও স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ফটোখানি ঠিক দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মহাকাশ থেকে দেখা যায় কেবলমাত্র চীনের প্রাচীর। এখানে অবিশ্যি গোল পৃথিবীকে বেলে চ্যাপ্টা করে ফেলায় সুমেরু আর কুমেরু হাস্যকর রকমের বড় হয়ে গেছে। অবশ্য তুমি যদি অঙ্কে দড় হও, তাহলে বলবে ওরকমই হবার কথা - যা দেখছি ঠিকই দেখছি - এ জগতে সবই মায়া!!

ম্যাপ


কিন্তু যদি ম্যাপটাকে কাছে আনতে আনতে একেবারে কলকাতা থেকে শুরু করি, রুটিখানা দেখতে ততটাও খারাপ লাগবে না। ওপর থেকে বেশ ধূসর -হলদে, ম্যাটকা মতন রঙ হয়েছে গঙ্গা নদীর, আমি আপাততঃ বেলঘড়িয়া থেকে সোনারপুর দিব্যি দেখতে পাচ্ছি। নদীর চারিদিকে এত সবুজ যে ভাবাই যাচ্ছেনা যে একদম নিচে নেমে এলে কি বিষম কেলো দেখতে পাওয়া যাবে !
আমার মূল ইচ্ছেটা হল গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরার। ইতিহাস বইতে যে রাস্তাটার কথা লেখা ছিল, এটাই সেটা। যদি আমার সঙ্গে আসতে চাও তবে তোমাকে তুলে নেব আনোয়ার শাহ রোড থেকে। সাউথ সিটির সামনে । এই সাউথ সিটি হয়ে ইস্তক এই রাস্তায় এমন ঝামেলা বেধেছে, যে চলা ফেরাই দুষ্কর। অথচ দেখ, এই যে আমরা ঢাকুরিয়া লেক থেকে মোড় নেব, সেখানে থিকথিকে বাড়িঘরদোরের মধ্যে একটা কেমন সুন্দর জলে ভর্তি জায়গা। পেছনে স্টেডিয়াম, ক্রিকেট মাঠ কত কি...আর এইটাকে নাকি লোকে বুজিয়ে দেবে ভাবছিল! বেশি ভাবলে এই হয়!
যাই হোক, আসল কথা হল জি টি রোড আমরা মেট্রো লাইন ধরেই যেতে পারতাম। ময়দান অবধি মেট্রোয় গিয়ে তারপর গাড়ি। 'সেইল' কোম্পানির অফিসের সামনে থেকে বাঁদিকে যাব- স্ট্র্যান্ড রোড ধরে হাওড়া। ভাল করে দেখলে কিনা জানিনা, ডানদিকে পড়ল ইস্টবেঙ্গল আর এরিয়ানের মাঠ, তারপর  বাঁদিকে মোহনবাগান। তারপর ডাইনে মহামেডানের মাঠ পেরিয়েই দেখ কেমন আউট্রাম ঘাটের দিকে একটা কান্নিক নিয়েছি।

হাওড়া ব্রীজ
হাওড়া ব্রীজ

ভর গরমে হাওড়া ব্রিজ পেরোতে গিয়ে সুড়সুড় করে বাতাস দিচ্ছে। আমরা ইচ্ছে করলে নৌকায় বসেও দক্ষিণেশ্বরের দিকটা একবার চট করে হয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু থাক, গুলমোহরের মাঠটা ডানদিকে রেখে জিটি রোড ধরে ফেলি। এখান থেকে আড়াআড়ি গেলে বেনারস রোড। এই বয়সে কাশী যেতে চাইলে যাও, আর না হলে সোজা দেখ। এই রাস্তার ওপর সাপুড়েরা আগে হাল হামেশা খেলা দেখাত। এখন তো সে সব আইন করে বন্ধ হয়ে গেছে। বললে বিশ্বাস করবে না, লিলুয়া এখান থেকে মাত্র আট কিলোমিটার, আর আমরা কিনা দূরপাল্লার ট্রেন হলেই হাওড়া ঢোকার মুখে লিলুয়া পেড়িয়ে হালুয়া তে আটকে থাকি।  এপথে অবিশ্যি বেলুড় মঠ ও পড়বে, সেখানে দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিলে আশ্চর্য আরাম হবে।

বেলুড় মঠ
বেলুড় মঠ

এখানে ডানদিকে নদীতে গুটগুট করে নৌকা যাচ্ছে, আর তীরে যত লোহালক্কড়, খোলা-বন্ধ পাটের কারখানা। এরপর দেখবে কেমন ঝিমুনি আসছে- ছোট ছোট টাউন, মাঝেমাঝে গাছপালা। ধুলো উড়ছে, বিকেল হয়ে আসছে, দোকানের সাইনবোর্ডের ঠিকানায় লেখা - রিষড়া, কোন্নগর, শ্রীরামপুর।  এসব বললেই এক্ষুণি কেউ আমাকে ক্যাঁক্‌ করে চেপে ধরে বলবে - এগুলি ছোট টাউন!! অ্যাঁ? সে যাই হোক গে - দুই নম্বর জাতীয় সড়ক হয়ে প্রায়ই আরো জোরে এপথেই লোকে যায়, কিন্তু তারা কি আর বৈদ্যবাটি, ভদ্রেশ্বর, ব্যান্ডেল - এইসব দেখতে পায়? দিনের শেষে তো সেই একটা পান্ডবর্জিত জায়গা থেকে অবশ্য জাতীয় সড়ক ধরতেই হবে, যার সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন হল আদিসপ্তগ্রাম !
একবার হাইওয়েতে পড়লে আর রোখে কে ! যত সব শহুরে জটিল পথের ঘোরপ্যাঁচ ছেড়ে আমরা হুহু করে বেড়িয়ে যাব। পশ্চিমবঙ্গ শেষ হল বলে। জায়গাটাকে যতটা পান্ডব বর্জিত লাগছিল, ততটাও না। তোমার পাচ্ছিল ঘুম, হুট করে ডেকে নিয়ে এলাম বলে সঙ্গে একটা গল্পের বই অবধি নেই, ঘুম পেতে বাধ্য! আমরা আছি পান্ডুয়ার কাছে, এখানে চৌদ্দশো শতাব্দীর একটা মিনার আছে, প্রায় বারো তলা উঁচু।

কার্জন গেট
কার্জন গেট, বর্ধমান

তবে সেখানে না গিয়ে দুধারে ধানক্ষেত দেখতে দেখতে আমরা বর্ধমান পৌঁছে যাব , আর বর্ধমান পৌঁছানো মানেই হল দুর্গাপুর পৌঁছে যাওয়া। শান্তিনিকেতনও যে খুব দূরে, তা নয়। এখানে দুইদিন থাকলে রমনাবাগান ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে লেঙ্গুর আর চিত্রপৃষ্ঠ হরিণ দেখে আসা যেত। আর যেতে পারতাম মাইথন ড্যাম, তোপচাঁচি ঝিল, পরেশনাথ পাহাড় আর তিলাইয়া ড্যাম। পরিবেশবিদরা ঠিক ভুল যাই বলুন, এই মানুষের তৈরি ড্যাম আর ব্যারেজগুলি দেখতে যে কি সুন্দর, বলে বোঝানো দুষ্কর।
তিলাইয়া পেরোলেই বিহার। চারদিকে লাল ধুলো, রুক্ষ, আর তার মধ্যে দিয়ে শোণ নদী বয়ে গেছে। শোণ নদীর ওপর ডেহরিতে একটা বিখ্যাত ব্রিজ গেছে- ইংরেজ আমল থেকে তার নাম হয়েছে 'ডেহরি অন শোণ', ঠিক যেন শেক্স্‌পিয়রের শহর 'স্ট্র্যাটফোর্ড আপন অ্যাভন' বা কিংবা 'নিউকাস্‌ল অন টাইন ' এর মত। শোণ নদী পেরোলে পৌঁছাব সাসারাম বলে একটা শহরে। এখানে নামতেই হবে। সবুজ পান্নার মত জলে দাঁড়িয়ে আছে শের শাহ সুরীর কবর। জলের মাঝে বললাম ঠিকই, কিন্তু আদতে এটা একটা চৌকো পুকুরের ঠিক মাঝখান অবধি তৈরি করা একটা রাস্তা।

সাসারাম
শের শাহ সুরীর কবর

এপথে বিহার এটুকুই - কারণ, একটু চালালেই উত্তর প্রদেশ চলে আসে। কিন্তু এত অল্পে তো চোখ ভরে না। তাই তদ্দুর যাওয়ার আগে, ভাবুয়া জেলায় যাব তেলহর কুন্ড। এ জায়গায় আগে ছিল মগধ রাজ্য। ইদানীং বিজ্ঞানীরা এই কুন্ডের আশেপাশে খোঁড়াখুঁড়ি আর খোঁজাখুঁজি করে পাথরে খোদাই করা প্রাচীণ সব ছবি বের করেছেন - আর সে সব ছবির সাথে স্পেনের আলতামিরা গুহার ছবির আশ্চর্য মিল!
উত্তর প্রদেশে অবশ্য এখন এ পথে ক্ষেত আর বিশাল বিশাল কারখানা। এত সুন্দর করে ক্ষেতিবাড়ি হয়েছে যে আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে যেন নকশী কাঁথায় নকশা তোলা হয়েছে। মাঝে মাঝে ছোটখাট জনবসতি - ছোট মানে প্রায় শ' দুই পাকা বাড়ি- তত ছোটও নয়। ট্রেনে করে এলে চণ্ডাউলি নামে একটা স্টেশনে এখানে হল্ট দেয়, তারপর মোগলসরাই হয়ে কাশী চলে যায়। কাশীতে এত ক্যাঁচোর ম্যাচোড় আর গন্ডগোল, যে লোকে হালহামেশা ছবি তুলতে ছোটে - তারপর সে সব ছবি বড় বড় আসরে প্রাইজ পায়! কিন্তু আমি কস্মিনকালে গিয়ে উঠেতে পারলাম না, ফেলুদার সিনেমা বাদ দিলে ; আজকেও, কাশীটা বাদ দেওয়াই ভাল। কলকাতা থেকে খুব একটা দূরে তো আসিইনি এখনও। আর গিয়েও বা কি হবে - বেনারস এখন হদ্দ নোংরা হয়েছে,পশু আর মানুষের গুয়ে ভরতি। ফটো থেকে ত আর গন্ধ বেরোয় না রে বাবা!
কাশী থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত রাস্তায় গঙ্গানদী একদম কপিবুক ছকে ভূগোল বইতে দেখানো অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের ছবিটার মতো অ্যাঁকাব্যাঁকা। আর এইযে এলাহাবাদ, তার মধ্যে দিয়ে যে দ্রাঘিমা রেখা গেছে, তার সময়ই আমাদের ভারতের সময়। কলকাতার আসল সময়টা সত্যি করে দেখলে, ঢাকার সময়।

এলাহাবাদ
অল সেইন্টস্‌ ক্যাথেড্রাল, এলাহাবাদ

এত কথা ভাবতে ভাবতে আমরা টুক করে রাজস্থানে ঢুকেছি। এবারে শুরু হবে বালি, হাভেলি আর মন্দির -মসজিদের সমারোহ। ফতেপুরের পর যতক্ষণে জাহানাবাদ, এটাওয়া জংশন, এইসব পেরোবো, গঙ্গার চেয়ে যমুনা নদী অনেক কাছে চলে আসবে। তখন নাক বরাবর গেলেই আগ্রা! আর আগ্রা মানেই হচ্ছে ঘন লস্যি, তাজমহল আর নোংরা গিটগিটে যমুনা নদীর মশা।

তাজমহল
তাজমহল, আগ্রা

তা বলে দমলে চলবে না, এরকম মোগলাই জায়গায় কি রোজ আসি? আরো বড় কথা হল, মোগলাই রাজত্ব থাকলেই রাজপুতরা আসেপাশে ঠিক ঘুরঘুর করবে। তাই জন্যেই তো এখান থেকে রাস্তা গেছে সোজা জয়পুর। ওই তো, নীল রঙের সালোয়ার কামিজ পরে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, বাজার বসেছে, তরমুজ বিক্কিরি হচ্ছে, তার মধ্যে আবার গরু ছাগলের মত একপাল উট হেঁটে হেঁটে আসছে; এই ধুলোবালির মধ্যে বড় শহর কেবল উদয়পুর, বাকি খাঁ খাঁ; প্লেন ল্যান্ড করার সময়ে বোঝা যায় কেমন বড়।

উদয়পুর
উদয়পুর

মুশকিল হচ্ছে ঐ 'খাঁ খাঁ' নিয়ে। রাস্তা না জানলে মহা গেরো। তবে ভুল হবার যো নেই। একটা মাত্র মেন রোড একগাদা ঢিপিঢাপার মধ্যে দিয়ে সোজা গেছে আজমেড় শরীফ। আজমেড়েই হল বাবা চিস্তির দরগা, সেখানে চাদর চড়াবো আর কাওয়ালি শুনব। এখানে মসজিদের উঠোনে যা কাওয়ালি গাওয়া হয় , সে শত খরচা করলেও স্টেজে শোনা যায়না। পাকিস্তানে সাঁই জহুর বলে এক দুর্ধর্ষ কাওয়াল আছেন, তিনি বছর তিনেক আগে গানের জন্য একটা বিরাট প্রাইজ পেলেন বিলেতে -ওয়ারর্ল্ড মিউসিক অ্যাওয়ার্ডস্‌-এ। অথচ তখন ওনার একটিও সিডি, ক্যাসেট, রেকর্ডিং কিচ্ছু ছিল না, কেবল দরগায় দরগায় গাইতেন। সে গান এমন গান, যে লোকমুখে চারিদিকে নাম ছড়িয়ে গেল। বড় বড় চাঁইরা সাঁইকে পরখ করতে এসে চক্ষুস্থির হয়ে গেলেন। ওনার "আল্লা হু" শুনলে বুঝবে গানের মত গান কি করে গাইতে হয়। তবে যা বলছিলাম- আজমেড়ের দর্গায় খুব সাবধান! পকেটমার থিকথিক করছে! এই যে পীর বাবা একটা সাদা চামর দুলিয়ে আমাদের হাওয়া দিচ্ছেন, তিনি পর্যন্ত বিড়বিড় করছেন - 'পকেট সামহালকে, পকেট সামহালকে...!"

আজমের শরীফ
আজমের শরীফ

আজমের এর পাশেই হল পুষ্কর। তার মধ্যে নাকি দুর্যোধন ভীমের ভয়ে লুকিয়ে ছিল।যত্ত সব বাজে কথা! আগে এখানে পচা পাতামাতা অসহ্য নোংরা করে রাখত, এখন পরিষ্কার করে বাঁধিয়ে দেওয়াতে ভাল লাগছে। পুষ্করে অনেক কম পরিচিত দেব-দেবীর মন্দির আছে - ব্রহ্মা, সাবিত্রী এসব...মরুভূমির মধ্যেকার জায়গা বলে বোধ হয় বেশি পাল্টায়নি। কিন্তু তা বলি কি করে? এত পুজো-আচ্চার মধ্যেই তো  টিনের চালে দেখি 'পিঙ্ক ফ্লয়েড কাফে' - ভেতরে চা আর ভেজিটেবল্‌ কাট্‌লেট - ফ্রি ওয়াই-ফাই অবধি পেয়ে যেতে পারি।

পুষ্কর
পুষ্কর

তবে পুষ্করের ওপারে শুধুই মরুভূমি। এখান দিয়ে গেলে চাক্ষুষ বোঝা যায় আকাশে ধীরে ধীরে পাখি কমে যাচ্ছে, এক কোণায় হয়ত বা একটা ছোট্ট মাজার হলদে পাথরের গা ঘেঁষে পড়ে আছে। একেই বলে থর মরুভূমি। একটা লোক নেই, একেকটা বাড়ির মধ্যে বহু মাইল দুরত্ব, চলতে চলতে চোখে ধোঁয়া লাগে, ততক্ষণ, যতক্ষণ না একটা স্টেশন আসে। এলা রঙ করা স্টেশন, ঝকমক করছে, কোনও যাত্রী নেই, একপাশে লোহার বেড়া। এইখানেই ভারতবর্ষের শেষ। ওপাড়ে উমেরকোট দুর্গ।

 

এই লেখকের অন্যান্য রচনা