সূচীপত্র- শীত সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

পুরাণকথা

(জাতকের গল্প অবলম্বনে)

সে অ--নেক কাল আগের কথা। আমাদের দেশে কাশী নামে যে রাজ্যটা আছে, যাকে আমরা বেনারস বা বারাণসী বললেই চিনতে পারি, তার পাশে ছিল এক ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলে যে হাতি পরিবারগুলি থাকত, তাদের মধ্যে একটি পরিবারে একদিন খুশীর হাওয়া বয়ে গেল। কেন জানো? তাদের মধ্যে জন্ম হল এক ফুটফুটে শিশুর। শিশুটি এত সুন্দর দেখতে ছিল যে সারা জঙ্গল ভেঙ্গে হাতিরা সব তাকে দেখতে এল। এত সুন্দর বাচ্চা তো তারা কখনোই দেখেনি। তাই তারা ভীষণ খুশী হয়ে শিশুটাকে আদর করে, নেচে, আকাশে শুঁড় তুলে ডাক ছেড়ে সারা জঙ্গলে মাতামাতি শুরু করে দিল। কত গাছের ডাল ভেঙ্গে গেল, কত লতা তাদের মোটা মোটা পায়ের তলায় পিষে গেল, তার ইয়ত্তা নেই। তাদের হুঁশই নেই যে এর ফলে জঙ্গলের অন্য বাসিন্দাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। হাতিদের বিকট হুংকারে তারা ভয় পেয়ে যে কোথায় লুকাবে ভেবেই পায় না। ধড়মড় করে উঠে তারা সব ছিটকে পড়ে দৌড়াতে লাগল। কারো পা ভাঙল আছাড় খেয়ে, কারো গা-হাত ছড়ে গেল গাছের গায়ে ধাক্কা লেগে।
ছোট্ট ছানাটা পিট্‌পিট্‌ করে এ সবই লক্ষ্য করছিল। তাকে ঘিরে এত হৈচৈ তার ভালোই লাগছিল। কিন্তু অন্য সকলের যে সে জন্য বড়ই অসুবিধা ঘটছে, সেটাও তার ভাল লাগছিল না। তার মনে হল, “একি, আমার জন্য সকলের এত কষ্ট হচ্ছে! আমার জন্য আমার দাদু, কাকা, জ্যাঠা, মেসোরা এত স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে যে তারা বুঝতেই পারছে না যে এতে যারা হাতি নয়, তাদের কত কষ্ট হচ্ছে। না না এতো ভাল নয়!” তার মনটা খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু সে ছোট বলে চুপ করে রইল।
এক সময় এই উৎসব, এই মাতামাতি শেষ হল। হাতিরা যে যার মত ঘরে ফিরে গেল। সময় বয়ে যায়। হাতিকুলের মধ্যে আমাদের ছোট্ট হাতিটি চাঁদের মত বেড়ে উঠতে লাগল। সে খুবই শান্ত স্বভাবের এবং শান্তিপ্রিয় ছিল। তার বন্ধুরা যে অকারণে অন্যদের উপরে অত্যাচার করে, সেটা তার ভাল লাগত না। অন্য হাতিছানারা খেলতে খেলতে হঠাৎ শুঁড় তুলে কোনো একটা গাছের ডাল ভেঙ্গে দিত। গাছের ডালে ঝুলে থাকা একটা বাঁদরছানাকে হয়তো শুঁড়ে জড়িয়ে শুন্যে তুলে ভয় দেখিয়ে দিত। শুঁড়ের ভিতর জল ভরে সোঁ করে ছুঁড়ে দিল পাখিদের দিকে, আর তারা ভয় পেয়ে পড়ি কি মরি করে উড়ে পালাত। রাতের বেলা শস্যক্ষেতে ঢুকে ফসল নষ্ট করত। গরীব চাষীর মাথায় হাত। বন্ধুদের এমন দুষ্টামি আর অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়াকে সে একদম পছন্দ করত না। তাই সে প্রায়ই একলা সময় কাটাত; কারো সঙ্গেই প্রায় মিশত না। এভাবেই সে ধীরে ধীরে এক সময় বড় হয়ে গেল। এখন সে আর হাতিছানা নয়, বড়সড় একটি হাতি।
একদিন ঘুরতে ঘুরতে সে একটা গাছের তলায় বসে খানিক বিশ্রাম করছে, তার কানে এল কোনো একজনের কান্নার শব্দ। উপরদিকে তাকিয়ে সে দেখল একটা বানরছানা একা একা বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হাতি আস্তে তার কাছে গিয়ে খুব আদর আর মমতামাখা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “ছোট্ট বন্ধু আমার, কাঁদছ কেন?” ফুঁপিয়ে উঠে বাঁদরছানা বলল, “কি করি বলোতো হাতিদাদা, আমি জন্ম থেকেই খুব অসুস্থ আর দুর্বল। বন্ধুরা যখন ডাল থেকে ডালে লাফালাফি করার প্রতিযোগিতায় মাতে, আমি ওদের সাথে পাল্লা দিয়ে পারি না তাই ওরা আমাকে ফেলে রেখে চলে গেছে। আমার এত ভয় করছে। হিংস্র জন্তুরা যদি আমায় খেয়ে ফেলে?”
বাঁদরছানাকে দেখে হাতির খুব মায়া হল। সে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “কেঁদো না, কেঁদো না, আমি এক্ষুণি জঙ্গলে গিয়ে তোমার বন্ধুদের খুঁজে নিয়ে আসছি। তুমি ভয় পেয়োনা, আর অন্য কোথাও চলে যেয়ো না।”
এই বলে হাতি চলল বানরছানার বন্ধুদের খোঁজে। এ বন ও বন ঘুরে শেষ পর্যন্ত তাদের সে খুঁজে পেল। তাদের কাছে গিয়ে সে বলল, “বন্ধুরা, তোমরা এখানে এত ফুর্তি করছ, আর তোমাদের বন্ধু ওখানে একা বসে কাঁদছে, ওকে এভাবে একা ফেলে আসাটা কি ঠিক হল, বল? বন্ধু কথাটার অর্থ হল একে অন্যকে সাহায্য করা; কেউ দুঃখ পাবে আর তুমি আনন্দ করবে – কি মনে হয়, এটা কি বন্ধুর মত কাজ?”
বাঁদরছানাগুলি বুঝল তারা একটা ভুল করেছে। কাজটা ভাল হয়নি। তারা হাতির কাছে সবাই মিলে নিজেদের দোষ স্বীকার করল । তারপর হুপ্‌হাপ্‌ করে দৌড়াল অসুস্থ বন্ধুকে দেখার জন্য। হাতিও তাদের সঙ্গে সঙ্গে গেল। অসুস্থ বানরছানা তখন একটা গাছের ডালে বসে ধুঁকছিল। পথের দিকে চেয়ে হঠাৎ সে আর তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাদের চিরশত্রু হাতির সঙ্গে তার বন্ধুরা! এই হাতিটাকে যদিও সে তার কষ্টের কথা বলছিল, কিন্তু সে তো ভয়ে। হাতিটা যে আবার তার বন্ধুদের এনে হাজির করবে, তাতো সে স্বপ্নেও ভাবেনি। বন্ধুদের দেখে আনন্দে তার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। হাতির কানে আর শুঁড়ে হাত বুলিয়ে বাঁদরছানা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগল। “হাতিদাদা, তুমি মহান, তুমি অসাধারণ। তুমি যদি আমার বন্ধুদের ফিরিয়ে না আনতে, তবে আমি হয়তো মরেই যেতাম।” অন্য বাঁদররাও হাতিকে ধন্যবাদ দিল তাদের দোষ ধরিয়ে দেবার জন্য। সত্যিই তো বন্ধুর সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করা উচিত, সে ব্যাপারে হাতিই তো তাদের চোখ খুলে দিল।
এবার তারা বন্ধুরা মিলে ঠিক করল হাতির মত মরমী আর মহৎ একজনকেই তাদের রাজা করা উচিৎ। তারা সমস্বরে জয়ধ্বনি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এই হাতিই আমাদের রাজা। রাজা দীর্ঘজীবি হোন!” গোলমাল শুনে বনের অন্যান্য পশুরা সেখানে জড় হল ব্যাপারটা কি জানার জন্য। এই পশুরা তো হাতিকে ছোটবেলা থেকে দেখছে; তারা হাতির স্বভাব জানতই। তাই বানরদের কথায় তারাও সম্মতি জানাল। সবাই বলল, এটা খুব ভাল নির্বাচন। সকলেই নতুন রাজার নামে জয়ধ্বনি দিল। এভাবেই বনের সব জন্তু ও পাখিদের শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালবাসার মধ্য দিয়ে আমাদের হাতিমহাশয় বনের সর্বসম্মত নতুন রাজা নির্বাচিত হল। নাম হল, গজরাজ।

 

শুক্তি দত্ত
বৈষ্ণবঘাটা, কলকাতা

লেখক পরিচিতি

শুক্তি দত্ত

শুক্তি দত্ত ভালবেসে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। রূপকথা, প্রাচীন সাহিত্য, দেশবিদেশের লোকসাহিত্য, গল্পকথা পড়তে ভালবাসেন। সেগুলো নিয়ে আলোচনা বা শিশুদের সেই গল্প শোনাতেও ভালবাসেন। প্রধানতঃ শিশুমনস্তত্ত্ব ও তাদের শিক্ষাসংক্রান্ত কাজে দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন। সেটা শুধু পড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি শিশু সাহিত্য, লোকসাহিত্য প্রভৃতিকে তাদের মূল্যবোধ বিকাশে কাজে লাগাতে চান।