অনুষ্ঠানের দিন আনন্দবাজার পত্রিকার কলকাতার কড়চা বিভাগে প্রকাশিত তথ্য

anandabazar

অনুষ্ঠান বিষয়ে এই সময় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ,১৫-৮-২০১৩

eisamay

সেমিনারের ছবির অ্যালবাম ফ্লিকারের এই লিঙ্কে দেখা যাবে

১২ই আগস্ট সন্ধ্যাবেলা জীবনানন্দ সভাঘরে হয়ে গেল আমাদের সেমিনার ওয়েবম্যাগঃ ইন্টারনেটে বাংলা সাহিত্য চর্চার মাধ্যমঃ বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। নিচে এই সেমিনারের বিষয়ে সংক্ষিপত বিবরণ দিলামঃ

এই সেমিনারে যোগ দিয়েছিলেন এই ওয়েবসাইটগুলিঃ

দিয়ালা -জার্নি নাইন্টিজ -অন্য নিষাদ -পরবাস -আদরের নৌকা -আসমানিয়া -কালিমাটি -প্যাপিরাস -ইচ্ছামতী -আমাদের ছুটি -ও কলকাতা -কফিহাউজের আড্ডা -শব্দবাজী -জয়ঢাক -কৌরব -ঈশানের পুঞ্জমেঘ -বাক -গুরুচন্ডালী -সৃষ্টি

এদের মধ্যে প্রেজেন্টেশন একদম প্রথম দিকে পাঠিয়েও কোন কারণে শেষ মূহুর্তে পরবাসের প্রতিনিধি সেমিনারে যোগ দিতে পারেন নি।

এছাড়াও বিশেষ বক্তা ছিলেন শ্রী তন্ময় বীর এবং শ্রী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য । শ্রী তন্ময় বীরের আলোচনার বিষয় ছিল -ওয়েব ম্যাগাজিনঃ বর্তমান এবং সম্ভাবনা। শ্রী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের আলোচনার বিষয় ছিল ছোটদের জন্য ওয়েবজিন- বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ।

ওয়েব ম্যাগের জগতে গত কয়েক বছর ধরে কাজ করতে করতে কতগুলি সমস্যা অনুভব করেছিলাম আমরা। সেই সমস্যাগুলির সদুত্তর খোঁজাই ছিল এই সেমিনারে মূল উদ্দেশ্য। আরো যাঁরা এই দুনিয়ায় কাজ করছেন, তাঁদের সাথে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চেয়েছি আমরা। যে সমস্যাগুলি আমরা দেখছিলাম সেগুলি মোটামুটি এইরকমঃ

পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে প্রকাশিত বাংলা ওয়েব ম্যাগাজিন এবং ব্লগজিনের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু আমরা সবাই কাজ করছি একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। নিজেদের মধ্যে পরিচিতি কম। বেশিরভাগই নিজেদের পেশাকে সামলে পাশাপাশি ওয়েব ম্যাগাজিনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নিয়মিত বা অনিয়মিত সংখ্যা বেরোচ্ছে, ফেসবুকে প্রচুর শেয়ার হচ্ছে, লাইক পড়ছে। কিন্তু তারপরে? সেই ওয়েব ম্যাগাজিন কি সত্যিই পৌঁছাতে পারছে সাধারণ পাঠকের কাছে? নাকি সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে শুধুমাত্র চেনা-পরিচিতদের গন্ডির মধ্যে?

এইখান থেকেই আসে দ্বিতীয় প্রশ্নটি। ম্যাগাজিন তৈরি করছি কাদের জন্য? যদি মুদ্রিত পত্রিকা হয়, তাহলে না হয় হিসাব রাখতে পারি কটা কপি বিক্রি হল সেটা নিয়ে। কিন্তু যদি পুরোটাই ওয়েব ভিত্তিক হয়, তাহলে সাহায্য নিয়ে হয় গুগল অ্যানালিটিক্‌স্‌ এর। কিন্তু এই তথ্য কি সবসময়ে আমাদের সত্যি ছবিটা দেখায়? আমার পত্রিকার এতজন দর্শক এটা তো জানলাম, কিন্তু সেই দর্শকেরা কি সময় নিয়ে পত্রিকা প্রথম থেকে শেষ অবধি পড়ছেন? নাকি দ্রুত ব্রাউজ করে নিজের পরিচিত জনের লেখা দেখেই চলে যাচ্ছেন অন্য কোন ওয়েব সাইটে। যাঁরা যাঁরা আমার ওয়েবসাইট দেখছেন, তাঁরা কি আদৌ আমার পত্রিকার লক্ষ্য? ইচ্ছামতী বা জয়ঢাক কি সত্যিই ছোটরা পড়ছে, নাকি বড়রাই পড়ছে? অথবা অনন্যারা নামে যে ওয়েবসাইট লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের বার্তা কি সত্যিই পৌঁছাচ্ছে সেই সমস্ত মহিলাদের কাছে, যাঁদের জন্য তাদের এই প্রচেষ্টা?

এইখান থেকেই মনে হয়েছিল, শুধু নানারকমের সোজা অথবা কঠিণ, সরল বা পরীক্ষামূলক লেখা লিখেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায়না। পাঠক তৈরি করাটাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পাঠকেরা যদি যথেষ্ট ভাবে প্রযুক্তির সাথে পরিচিত না হন, অথবা প্রযুক্তি সম্পর্কে তাঁদের দ্বিধা-দ্বন্দ থাকে, তাহলে সেই সমস্যাগুলির সমাধা করার জন্য আমাদেরই হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এবং এটা যেকোন ওয়েব ম্যাগের লেখক এবং সম্পাদক, উভয়েরই দায়িত্ব।

এইখান থেকেই আসে সম্পাদকের দায়িত্ব সম্পর্কে আরো কিছু ভাবনা। নিজের পত্রিকার আয়তন বাড়ানোর জন্য অথবা শুধুমাত্র প্রচারের সুবিধার্থে সমস্ত লেখাই কি প্রকাশ করব? নাকি চেষ্টা করব শুধুমাত্র ভাল লেখাই প্রকাশ করতে?

সব শেষ প্রশ্ন, লেখক এবং সম্পাদক হিসাবে, আমরা যে ভাষা নিয়ে কাজ করছি , সেই ভাষার প্রতি কি আমরা যথেষ্ট দায়বদ্ধ? নাকি বাঙালিয়ানার মূল শর্ত গুলির মধ্যে একটি, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে রুচিশীল এবং তার বিস্তারে সক্রিয়ভাবে জড়িত, এই পালকটা টুপিতে লাগিয়ে নিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ? আর যে পাঠকেরা ওয়েবে এসে আমাদের লেখা পরে বক্তব্য রেখে যান, তাঁদের দায়বদ্ধতাও কি সেখানেই শেষ? নাকি ওয়েব সাহিত্যের বিস্তারের জন্য তাঁদেরও সক্রিয় ভূমিকা দরকার?

এই সমস্ত সমস্যা নিয়ে অন্যান্যরা কি ভাবেছেন সেই বিষয়ে আলাপ আলোচনার কথা মাথায় রেখেই এই সেমিনারের আয়োজন।

সেমিনারে প্রায় সব ওয়েব ম্যাগাজিনই নিজেদের কাজের পরিধি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু কেউই সেইভাবে, নিজেদের প্রেজেন্টেশনেএই সমস্যাগুলির উল্লেখ করেন নি। এই মূহুর্তে মনে পড়ছে , পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষায় একমাত্র সম্পূর্ণ ভ্রমণ পত্রিকার প্রতিনিধি রত্নদীপ দাশগুপ্তের কথা। তাঁদের সংক্ষিপ্ত প্রেজেন্টেশন এর শেষে তিনি একটি মূল্যবান মন্তব্য করেন - গুগলে সার্চ করতে হলে বাংলা দিয়ে খুঁজেই সার্চ করুন নিজেদের নাম, ন্য ওয়েবসাইটের নাম। আরো বেশি করে অভ্যস্ত হন বাংলা ফন্ট ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে।

শ্রী তন্ময় বীরের আলোচনার বিষয় ছিল ওয়েব ম্যাগাজিনঃ বর্তমান এবং সম্ভাবনা। দীর্ঘ এই বক্তব্যের সারাংশ অনুযায়ী, ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। তিনি আমাদের প্রায় ১০০টির কাছাকাছি বাঙলাভাষায় প্রকাশিত ওয়েবসাইটের হদিশ দিয়েছেন, যেগুলি বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যা সত্বেও, তাঁর বেছে নেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইন্টারনেটে বাংলা ভাষায় কনটেন্ট এর ভাগ নগণ্য। ইউনিসেফ বলছে, পৃথিবীত ৬৭০০ ভাষা অবলুপ্তির পথে। সেটা কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু সেটাকে একটু বিলম্বিত করা যেতে পারে , যদি সেই ভাষা ব্যবহারকারী মানুষেরা আরো সক্রিয় হন।

প্রায় এক উলটো ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরলেন শ্রী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য তাঁর প্রেজেন্টেশনে। ঝকঝকে পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি আমাদের জানালেন, গত কয়েকবছরে ইন্টারনেট পরিষেবার হার যেভাবে বেড়েছে, ঠিক সেই অনুপাতেই বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা। তার সাথে আরো দেখা যাচ্ছে যে প্রথাগত ডেস্কটপ কম্পিউটার এর বদলে মোবাইল ডিভাইস দিয়ে ইন্টারনেট দেখেছেন অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ। এবং সেইখান থেকেই তিনি তুলে ধরেছেন এক আপাত উপেক্ষিত তথ্য ঃ পরিকাঠামোর উন্নতির সাথে সাথে ছোটদের জন্য ওয়েব ম্যাগাজিনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এই অবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছোটদের জন্য কন্টেন্ট এর যোগান দেওয়া। ছোটবেলা থেকেই যদি তাদের প্রিয় মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বড় হলে স্বাভাবিকভাবেই সেই ভাষার প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা জন্মাবে। আর এইভাবেই তৈরি হবে বাংলা ভাষায় আগামি দিনের পাঠক। আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। ডিজিটাল তথ্য ভিত্তিক ভিজিটর সংখ্যা দিয়ে নিজের পত্রিকার পরিচিতি ও বিস্তৃতির হিসাব সব সময়ে সঠিক হয়না। ইন্টারনেটে স্বচ্ছন্দ একজন পাঠক একটা ভাল সাহিত্যসৃষ্টিকে পৌঁছে দিতে পারেন আরো বহু মানুষের কাছে। চাই শুধু সঠিক সংযোগ। আর চাই সদিচ্ছা।

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের দেওয়া এই তথ্যের ভিত্তিতে , তন্ময় বীরের প্রেজেন্টেশন থেকে উঠে আসা ইউনিসেফের হুঁশিয়ারিকে কি চ্যালেঞ্জ জানাব আমরা, বাংলা ভাষায় লেখক-পাঠক-সম্পাদকেরা?

এই সেমিনারের আরেকটি অংশ ছিল মাসকাবারি ওয়েবসাইটের উদবোধন । তার সাথে ছিল সৃষ্টিসুখ CMS এর সম্পর্কে উপস্থিত দর্শকদের জানানো।

প্রথমে আসি সৃষ্টিসুখ CMS এর কথায়। এই Content Management System তৈরি করেছেন রোহণ কুদ্দুস। তিনি জানিয়েছেন, এর সাথে তাঁর আরেকটি উদ্যোগ, সৃষ্টিসুখ প্রকাশনার কোন সম্পর্কে নেই। এই CMS এর মূল উদ্দেশ্য হল ওয়েব ম্যাগাজিন তৈরির প্রক্রিয়াটিকে সহজতর করে দেওয়া। যাঁরা ওয়েব ম্যাগাজিন বানাতে উৎসাহী, তাঁরা সবাই অবশ্যই তথ্য প্রযুক্তির সব দিক বিষয়ে জানেন না বা স্বচ্ছন্দ নন। এই কারণে অনেকেই ব্লগস্পট বা ওয়ার্ডপ্রেসকে বেছে নেন ।কিন্তু এই ফ্রি ব্লগিং প্ল্যাটফর্মগুলিকে সবসময়ে পছন্দমত সাজিয়ে নেওয়া যায়না। এই সমস্যার সমাধান করবে সৃষ্টিসুখ CMS. এই মূহূর্তে বেশ কিছু বাংলা ওয়েব ম্যাগ ব্যবহার করে এই CMS. নতুন কোন ওয়েবসাইট এই সুবিধা গ্রহণ করতে চাইলে আরো বিশদে জানার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন রোহণ কুদ্দুস এর সাথে।

সব শেষে আসছে মাসকাবারি ওয়েবসাইটের কথা। এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য হল, আন্তর্জালে উপস্থিত সমস্ত বাংলা ওয়েব ম্যাগাজিন কে একটা সাধারণ প্ল্যাটফর্ম দেওয়া। এখানে ইচ্ছুক সমস্ত ওয়েবম্যাগের সম্পাদকদের একটি করে নিজস্ব অ্যাকাউন্ট দেওয়া হবে। এই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সম্পাদকেরা নিজেদের ওয়েবম্যাগ সংক্রান্ত নতুন সমস্ত তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন, এবং সেই তথ্য সবাই দেখতে পারবে। এর ফলে সুবিধা কি? সুবিধা হল এই যে, যিনি পাঠক, তাঁকে আর বিভিন্ন ওয়েব সাইট ঘুরে ঘুরে খোঁজ নিতে হবে না নতুন লেখা বা সংখ্যা প্রকাশিত হল কিনা। মাসকাবারির প্রথম পাতায় দেখা যাবে সমস্ত ওয়েবসাইটের সাম্প্রতিক আপডেট। এছাড়াও এই ওয়েবসাইটে সম্পাদকেরা নিয়মিত বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগাজিনের কোন বিশেষ সংখ্যা, বা সমগ্র ওয়েবম্যাগটিকে নিয়েই আলোচনা করবেন। আরো থাকবে অন্যান্য মাধ্যম নিয়ে আলাপ আলোচনার নিয়মিত বিভাগ।

এই সেমিনারের পরবর্তীতে গত চব্বিশ ঘন্টায় ফেসবুকের ইভেন্ট পেজে হয়েছে গতকাল উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের অনেকরকমের আলোচনা। সেই আলোচনাতেও দেখছি বারবার কয়েকটি কথা ঘুরে ফিরে আসছেঃ

১) বাড়ানো হোক ওয়েবে বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্য রসদের ভান্ডার। প্রতিটা ওয়েবম্যাগ এই কাজে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসুক।
২) ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার প্রচার এবং ডিজিটাল দুনিয়ায় বাংলা ভাষাকে স্বমহিমায় এবং সগর্বে টিঁকিয়ে রাখার জন্য শুরু করতে হবে যথাসম্ভব প্রয়াস।
৩)বৃদ্ধি করতে হবে ডিজিটাল দুনিয়ায় বাংলাভাষী পাঠকের সংখ্যা।

চলতে থাকুক আমাদের এই আলোচনা। আসুক বৈচিত্রপূর্ণ প্রস্তাব। তৈরি হোক নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার মাধুর্য এবং ক্ষমতাকে আবার করে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য নতুন নীতি। হাতে হাত মেলাই সবাই।

(শেষ আপডেট হয়েছে ১৩ই আগস্ট, ২০১৩)