খেলাঘরখেলাঘর

ওয়াহাবি-ফারাজি আন্দোলন

এই যে ছোট্ট বন্ধু, কেমন আছ তুমি? গরমে হাঁস-ফাঁস তো?বৃষ্টির জন্য হা-পিত্যেস করে বসে থাকতে থাকতে আবার ঘুরে গ্রীষ্মকাল ফিরে এল যেন। বৃষ্টি হল যা দু চার ফোঁটা, তাতে শুধু রাত্তির টুকুই ভাল করে ঘুমনো গেল। সকাল হলেই আবার সেই একই রকম ব্যাপার—চটচটে অস্বস্তি। তবে হ্যাঁ, এইতুকুই যা রক্ষা, যে গরমের ছুটিটা বেশ লম্বা হয়ে গেল। আমার বেশ মনে পড়ে, জানো, মামারবাড়িতে ছোটোবেলায় প্রতিবছর গরমকালে যখন থাকতে যেতাম, বাবা-মা এর শাসনের কোনো বাঁধন ছিল না। গ্রামের চাষীদের ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে খেলা করতাম। এখন না হয় গরমের দুপুরে রোদ্দুর-এর তেজে বাইরে বেরনোর কথাআ ভাবলেই ভয় লাগে, আর তখন খেলার নেশায় সে সব অনুভূতি-ই ছিল না।কত্ত নতুন নতুন অভিযান! নতুন নতুন শেখা!কলাপাতা-কে পানের মত করে মুড়ে তার মধ্যে কাঁচা আম থেঁতো করে নুন, চিনি আর লঙ্কাপোড়া দিয়ে মেখে তার রস ওই কলাপাতার খিলির গোড়া দিয়ে টেনে টেনে খেয়েছ কোনোদিন? পৃথিবীর কোনো রেঁস্তোরা বা আচারের দোকানে এ জিনিস পাবে না! পাকা আম কে ‘বেলো’ করে খেয়েছ কোনোদিন? বঁটি-ছুরি ছাড়াই একটা আমের ভিতরের শাঁস খোসা না ছাড়িয়েই হাপিস; পড়ে থাকবে শুধু খোসা আর আঁটি।– খেয়েছ কোনদিন?মহাত্মা গান্ধির খুব প্রিয় খাবারের মধ্যে একটা ছিল এই বেলো করা আম।মহাত্মা গান্ধির কথাটা বললাম কেন জান? না হলে তোমার বাড়ির বড়রা আবার ভাববেন কি সব বদ গেঁয়ো শিক্ষা দিচ্ছি তোমাকে!যাই হোক তবু আমার ছেলেবেলার আনন্দ-টা শুনেও তো তুমি কিছুটা আনন্দ পাবে, আর আমার তাতেই বেশি আনন্দ।তবে ওই সব বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম, যা কোনো স্কুলে শেখা যায় না। একদম মাটির শিক্ষা, হাতে নাতে শিক্ষা, ধৈর্যের শিক্ষা, অনেক কিছু ছাড়াই খুশিতে বাঁচার শিক্ষা, একজোট হয়ে কাজের শিক্ষা, সব রকম মানুষ-কে সম্মানের শিক্ষা – যা সিলেবাসের বাইরে।শেখার মূল মন্ত্রটা তোমার কানে কানে বলে দিই আজ – তোমার সঙ্গে যিনিই থাকুন না কেন, যদি তাঁর কাছ থেকে শেখার কিছু থাকে, তাহলে তাঁর বয়েস আর শ্রেনী বিচার না করে বরং তাঁর জানা আর তোমার অজানাকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দিও। ব্যাস। দেখবে, কাম খতম।
আধুনিকতার মায়াজালে এক আশির্বাদ দুর্ভিক্ষ সে ভাবে না হওয়া।তবে পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা তথা পুরো উত্তর ভারতে প্রতি দশকে গড়ে একবার করে বড় রকমের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। কারণ – বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের আগ্রাসী অপশাসন, বাণিজ্যের নামে দুর্ণীতি ও জুলুমবাজি, মুঘল আমলের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণশ খাজনা আদায়, বাংলার কৃষিব্যবস্থাকে নষ্ট করে দেয়।তার মধ্যে আবার গোদের অপর বিষফোঁড়া, লর্ড কর্নওয়ালিশের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’।
আচ্ছা তুমিই বল এরকম অবস্থায় কোন গরীব সাধারন মানুষটা আর স্বাভাবিক থাকতে পারে।কৃষ্কদের মনে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সেই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটল ওয়াহাবি বিদ্রোহের মাধ্যমে। ফরাজী তার অনুসারী হয়।
বৃটিশ শক্তি তখন প্রায় সারা ভারতেই প্রসারিত। শেষ ভরসা টিপু সুলতান পরাজিত হয়ে বীরের মত ইংরেজদের হাতে নিহত হয়েছেন।মারাঠা শক্তি তখনো জ্বলছে তুষের আগুনের মত।দাবানল হওয়ার শক্তি তার আর নেই।শুধু রণজিত সিংহ তখনও পাঞ্জাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ঠিক সেই সময়ে হোলকারের এক প্রাক্তন সেনাপতি সৈয়দ আহমেদ বারলেচী-র (১৭৮৬-১৮৩১) আবির্ভাব হয়।। তিনি ভারতের সকল মুসলিমদের ওয়াহাবি আন্দোলনের ডাক দেন। ওয়াহাবি শব্দের মানে জান? এর অর্থ হল ‘নবজাগরণ’। তাঁর আহ্বান ছিল ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠা করা। এটা ত’ সত্যি কথা যে ওয়াহাবি আন্দোলনে ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা ছিল। তবে নিঃস্ব রিক্ত কৃষকদের মধ্যে এবং বেশ ভালভাবেই জনসাধারনের মধ্যে এই আন্দোলন বিপুল সাড়া জাগায়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলায় যে জমিদার শ্রেনির উদ্ভব হয় তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল হিন্দু। আর বাংলার অধিকাংশ কৃষকই ছিল মুসলমান।সাম্প্রদায়িকতার ছাপ স্পষ্ট হলেও যেহেতু ইংরেজদের অন্যায় অত্যাচারের বিরূদ্ধে এই ওয়াহাবি আন্দোলন সংগঠিত হয়, তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।কেন জান? দুর্ভিক্ষ আর ক্ষুধা জাত-ধর্ম বিছার করে আসে না। কৃষক সমাজে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি ছিল। বৃটিশদের সৃষ্ট ‘মারী মন্বন্তরে’ যে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাতে স্বাভাবিক ভাবেই মুসলিমদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। ওয়াহাবির ডাক তাই তখন মুসলিমদের খুবই বেশি করে উদবুদ্ধ করেছিল।সাপ্রদায়িক আন্দোলন হওয়া সত্বেও হিন্দু-মুসলিম বিভেদ ও বিবাদ এর মধ্য এক্কেবারেই ছিল না।বরং সবাই একজোটে রুখে দাঁড়িয়ে ছিল সব জমিদার, জোতদার ও তাদের পরম পৃষ্ঠপোষক বৃটিশদের বিরূদ্ধে।
বাংলায় ওয়াহাবিদের নেতা ছিলেন মৌলবী শরিয়তুল্লাহ। সৈয়দ আহমেদ বাংলায় এসে ওয়াহাবির আদর্শ প্রচার করেন। মক্কায় বহুদিন থাকার পর দেশে ফিরে তিনি ধর্ম-সংস্কারের উদ্দেশ্যে কৃষক জনসাধারণের মধ্যে তাঁর আদর্শ প্রচার করেন।তাঁর সংস্কার ছিল পরশাসন ও শোষণ বিরোধী।পরশাসনের ছাতার নিচে থাকা সমস্ত সমর্থক, জোতদার, জমিদার, সামন্ত, গোমশ্তা, তহশিলদারেরা শ্বাভাবিকভাবেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
শরিয়তুল্লাহ এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী গোপন সংগঠন ‘ফরাজী’ সম্প্রদায় গঠন করেন।বাংলায় ফরাজীরাই হল ওয়াহাবি আন্দোলনে্র সংগঠক ও প্রচারক। ফরাজীরাই হল তার সদস্য ও যোদ্ধা। তাদের মূল শ্ত্রু হল ইংরেজ এবং তাদের শাসন ব্যবস্থার সমর্থক শ্রেনী।কিন্তু দুঃখের কথা কি জান, এই আন্দোলন ভালোভাবে সংগঠিত হওার আগেই শরিয়তুল্লার মৃত্যু হয়। তাঁর যোগ্য পুত্র দুদু মিঞা বাংলায় ওয়াহাবি-ফরাজী বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পুর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই আন্দোলনে ব্যাপকভাবে যোগ দেয়।
শ্বেতাঙ্গ নীলকরেরাও কম ছিল না অত্যাচারের দিক থেকে। বাংলার শিক্ষিত শ্রেনী নীল্কর সাহেব্দের অত্যাচারে প্রতিবাদ শুরু করারা আগেই দুদুমিঞা-নেতৃত্বে ওয়াহাবিরা নীলকুঠির ওপর অত্যাচার চালায়। সাহিত্য যে সমকালীন সমাজের ঐতিহাসিক দর্পন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল, দীনবন্ধু মিত্রের কালজয়ী নাটক ‘নীলদর্পন’। হরিশচন্দ্র  মুখার্জীর তত্বাবধানে প্রকাশিত হিন্দু পত্রিকায় নীলকরদের বিরূদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তোলা হয়। অনেক ব্রিটিশ সাহেবও কিন্তু ছিলেন যাঁরা এই দেশকে ভালবাসতেন। রেভারেন্ড জেমস লং এর কথা এই প্রসঙ্গে তমাদের না বললেই নয়।‘নীলদর্পণ’ ইংরেজি-তে অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত আর তা হরিশচন্দ্র তা তাঁর পত্রিকার প্রকাশ করেন জেমস লং এর সহায়তায়। ফলে লং সাহেবের এক মাসের জেল ও এক হাজার টাকা জরিমানা হয়। কালিপ্রসন্ন সিংহ মহাশয় তক্ষুনি সেই টাকা আদালতে জমা দেন।
ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবী সুস্পষ্টভাবে ঘোষণার অনেক আগেই ওয়াহাবিরা কৃষকদের একভাবে সংগঠিত কর ব্রিটিশ শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।বাংলার বহু জায়গায় তারা মুক্তাঞ্চল গড়তে পেরেছিল। কিন্তু দুদুমিঞা ছাড়া এই আন্দোলনে দ্বিতীয় আর কোনো নেতা না থাকায় তার গতি ও তেজ বেশীদিন স্থায়ী হতে পারে নি।সুসংগঠিত বিরোধীদের প্রতিআক্রমনে তাদের প্রতিরোধ আন্দোলন হারিয়ে যায়। তবে সিপাহী বিদ্রোহের সম্য পর্যন্ত ওয়াহাবিদের আন্দোলন ও ইংরেজ শাসন নির্মূল করার সংগঠিত চেষ্টা বেশ সক্রিয় ছিল।
ওরে বাবা!!! অনেকটা লিখে ফেললাম যে!!! তুমি আবার যেন রাগ কোরো না বাপু!আর এটা তো গল্প, পড়া তো আর নয়! তাই না!

আর্য চ্যাটার্জি
কলকাতা