খেলাঘরখেলাঘর

স্বাধীনতার গল্

আমরা যে আসলে কি চাই, তাই জানি না।গরমকালে গরম পড়ল, বৃষ্টি চাইলাম। বৃষ্টি এমন শুরু হল যে তিন দিন ধরে থামেই না।আমার ত বেশ মজাই হল। জল-কাদা ডিঙ্গিয়ে বাইরে বেরতে মাঝে মাঝে মন্দ লাগে না।তোমার মত যখন ছোটো ছিলাম, তখনকার কত স্মৃতি এসে ভিড় করে। তোমারও নিশ্চয়ই ও ক’দিন আর ইস্কুলে যাওয়া হয় নি!সারাদিন-রাত ধরে ব্যাঙেদের ডাক শুনতে খারাপ লাগে না বল? আমাদের পাশের বাড়িতে আবার একটা সাপ বেরিয়েছিল, জান! কি সুন্দর দেখতে! কতকরে বললাম সব্বাইকে যে বনদপ্তরে খবর দিলে ওরা নিশ্চয়ই ওটার একটা ব্যবস্থা করে দেবে, ওটাকে মারার দরকার নেই। কিন্তু কেউ আমার কথাই শুনল না, মেরে পুড়িয়ে দিল।

সিরাজ
নবাব সিরাজদ্দৌলা

প্রায় এরকম ভাবেই বাঙ্গলার নবাবীকে ইংরেজরা গ্রাস করেছিল তাদের পরিকল্পনা চরিতার্থ করার জন্য। ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণের নৃশংস প্রতিশোধ ছিল পলাশীর যুদ্ধ। নবাব সিরাজকে কোনো ক্ষমা-ঘেন্না না দেখিয়ে খুব নৃশংস ভাবে হত্যা করল ইংরেজরা। ইংরেজদের মোহে অন্ধ মীরজাফর ক্লাইভ আর তার অনুচরদের সাহায্য করল মুর্শিদাবাদের নবাবের কোষাগার ভেঙ্গে বিপুল ধনরত্ন অবাধে লুন্ঠন করতে।সারা দেশের মানুষ সেদিন ইংরেজদের নৃশংসতা আর তান্ডব দেখে বুঝতেই পারল যে দেশের ভবিষ্যত সুবিধের নয়। একশোখানা নৌকা লেগেছিল সেই ধন-সম্পদ কলকাতায় আনতে। ক্লাইভ আর কোম্পানীর কর্তারা রাতারাতি সেই লুটের সম্পদ ভাগাভাগি করে দেশের নতুন নবাব হয়ে গেলেন। ছিল আ আইনের কন শাসন বা ন্যায়-নীতির বালাই। মীরজাফর নবাব হলেন বটে কিন্ত হয়ে রইলেন কোম্পানীর হাতের পুতুল।

বাংলার সিংহাসনে মীরজাফরকে বসিয়েও বৃ্টিশ বণিকদের ক্ষমতা অ বিত্তলাভের বাসনা কমল না। মীরজাফরের বিরূদ্ধে অপদার্থতার অভিযোগ এনে ১৭৬০ সালে তাঁকে গদিচ্যুত করল কোম্পানী। দেশের নবাব কে হবে তার নির্ধারকও হয়ে উঠল বৃটিশ বণিকরা। বুঝতেই পারছ, শাসনদন্ড আসলে তাহলে কার হাতে। মীরজাফরের জামাই মীরকাশেম বেশ ভালো লোক ছিলেন। কোম্পানীর গভর্নর হেনরী ভ্যান্সীটার্ট আর তাঁর কাউন্সিল তাঁকেই বাংলার নবাব হিসেবে বসান। তবে বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ তিনটি অঞ্চল বর্ধমান, মেদিনীপুর, আর চট্টগ্রামের রাজস্ব আদায়ের অধিকার তিনি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বৃটিশ বণিকরা যেন অজগরের মত নিঃশব্দে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকল আমদের দেশকে।

মীরকাশিম কিন্তু বৃটিশ বণিকদের স্বেচ্ছাচারীতা বরদাস্ত করেন নি। কোম্পানীর হাতের পুতুল হয়ে থাকার বাসনাও তাঁর ছিল না। মোগ্ল সম্রাটের দেওয়া দস্তকের অপব্যবহার তার বেয়াইণি প্রয়োগ, ব্যবসার দালালি-এ সবকিছু আমাদের দেশীয় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা উতপাদন, আমদানী ও রপ্তানী কে বেশ জোর ধাক্কা দিয়েছিল। নতুন পাওয়া সম্পদ ও ক্ষ্মতার আবেশে ইংরেজ বণিকেরা ধরা কে সরা জ্ঞান করছিলেন।মীর কাশিম দেশীয় ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য তাদের সব শুল্ক মকুব করে দেন।কিন্তু বাংলার বণিকদের আর পণ্য উতপাদকদের ভাতে মারার জন্য বৃটিশ বণিকদের দুর্নীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে মীরকাশিম নিজের বিপদ ডেকে আনলেন। ইংরেজ্ রা সোজা তাঁর বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মীরকাশিম, সুজাউদ্দৌলা ও দিল্লীর মোগল বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের যৌথ বাহিনী ইংরেজদের হাতে পরাজিত হয়।ইংরেজদের ক্ষমতা বিস্তারের পথে যতটুকু বাধাও বা ছিল, তা আর রইল না। শাহ আলম বন্দী হলেন।মীরকাশেম রোহীলখন্ডে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। বন্দী শাহ আলমকে দিয়ে জোর করে ইংরেজরা ফরমাণ লিখিয়া নিল যে বাংলার দেওয়ানীর সব দায়িত্ব তাদেরই।১৭৫৭ সালে যে পরাধীনতার সূত্রপাত ১৭৬৫  যে গভর্ণর হলেন লর্ড ক্লাইভ।দেওয়ানী লাভের ফলে
সারা বাংলার সব রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পেল ইংরেজরা।

দেশে যে গভীর অন্ধকার নামল তার বিরূদ্ধে প্রথম গর্জে উঠেছিলেন বাংলার নবাব মীরকাশিম।চেয়েছিলেন আসন্ন পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে। বাংলা তথা ভারতের মাটিতে যেমন বৃটিশ শাসন সত্যি, থিক সেরকম ভাবেই সত্যি হল যে বাংলার মাটি থেকেই ধ্বনিত হয়েছিল প্রথম প্রতিবাদ। তাই ইতিহাস যেমন মনে রেখেছে, তুমি ও মীরকাশিমের কথা মনে রেখ।

আর্য চ্যাটার্জি
কলকাতা

ছবিঃ
ক্যালকাটাওয়েব