
কিন্তু ছোট ইডার কাছে, ছাত্রটি এই যে ফুল নিয়ে গল্পগুলি বলেছিল, সেগুলি খুব মজাদার লাগল, আর সে সেগুলি নিয়ে অনেক অনেক ভাবল। ফুলগুলি সত্যিই মাথা ঝুঁকিয়ে ছিল, কারণ ওরা সারারাত নেচেছে, আর খুব ক্লান্ত ছিল, আর হয়ত ওদের একটু শরীর খারাপও ছিল। তারপরে সে ফুলগুলিকে নিয়ে সেই ঘরে গেল যেখানে একটা ছোট্ট সুন্দর টেবিলে অনেক খেলার জিনিষ রাখা ছিল, আর টেবিলের ড্রয়ারটা নানারকমের সুন্দর জিনিষে ভর্তি ছিল। তার পুতুল সোফি নিজের ছোট্ট বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল। ইডা তাকে বলল, "সোফি, এবার তোমাকে ঘুম থেকে উঠতে হবে, আজ রাতের জন্য তুমি কষ্ট করে ড্রয়ারে থাক, ফুলগুলি খুব ক্লান্ত, আর তোমার বিছানায় আজকে ফুলগুলি শোবে, তাহলে হয়ত ওরা ভাল হয়ে যাবে।" এই বলে সে পুতুলটাকে তুলে নিল। সোফির মুখ দেখে মনে হচ্ছিল খুব রেগে গেছে, কিন্তু সে কিনা বিছানা ছাড়তে হচ্ছে বলে খুব রেগে গেছিল, তাই সে কোন কথা বলল না। ইডা ফুলগুলিকে পুতুলের বিছানায় শুইয়ে দিল, তাদের গায়ের ওপরে কাঁথা টেনে দিল। তারপরে সে তাদেরকে বলল লক্ষ্মী হয়ে শুয়ে থাকতে। তারপরে সে তাদের জন্য খেলার কেতলিতে চা বানিয়ে খেতে দিল, যাতে তারা একটু ভাল বোধ করে , আর পরের দিন ভাল হয়ে উঠতে পারে। তারপরে সে ছোট্ট বিছানাটার চারপাশ দিয়ে ভাল করে পর্দা টেনে দিল, যাতে তাদের চোখে রোদ না লাগে। সেই ছাত্র তাকে যা বলেছিল, সেইসব নিয়ে সারা সন্ধ্যা ধরে সে ভাবতেই থাকল। আর ঘুমোতে যাওয়ার আগে, সে আর থাকতে না পেরে, জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে বাগানের দিকে উঁকি দিল, যেখানে তার মায়ের হাতে করা সুন্দর ফুলগুলি ফুটে ছিল - হায়াসিন্থ , টিউলিপ, আরো কত কি! তারপরে সে চুপিচুপু তাদেরকে বলল, "আমি জানি তোমরা আজ রাতে একটা বল নাচের আসরে যাবে।" কিন্তু ফুলগুলি এমন ভাবে স্থির রইল, যেন তারা কিছুই বোঝেনি, একটা পাতাও নড়ল না। কিন্তু ইডা একদম নিশ্চিত হয়ে গেল যে সে সব কিছু বুঝে গেছে। বিছানায় শুয়েও সে অনেকক্ষণ জেগে রইল, আর ভাবতে লাগল, রাজার প্রাসাদে সব ফুলগুলি যখন নাচবে, তখন দেখতে না জানি কতই ভাল লাগবে! "আমার ফুলগুলো কি সত্যি সত্যিই ওখানে গেছিল..." ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। রাতের বেলা ইডার ঘুম ভেঙে গেল। সে স্বপ্নের মধ্যে তার ফুলগুলিকে, সেই ছাত্রকে আর সেই গোমড়ামুখো উকিলবাবুকে দেখছিল। তার শোবার ঘর নিঃস্তব্ধ, তার বাবা আর মা অঘোরে ঘুমাচ্ছেন, শুধুমাত্র রাতবাতিটা টিমটিম করে জ্বলছে। " আমার ফুলগুলো কি এখনো সোফির বিছানায় ঘুমিয়ে আছে," ভাবল ইডা, "জানতে পারলে বেশ হয়।" সে বিছানার থেকে মাথাটা একটু তুলল, আর পাশে যে ঘরে তার খেলনা আর ফুলগুলি ছিল, সেই দরজার দিকে তাকাল। দরজাটা আধা খোলা ছিল, আর তার মনে হল, সেই ঘরে কে যেন খুব আস্তে, মিষ্টি সুরে পিয়ানো বাজাচ্ছে। এমন বাজনা সে আগে কোনদিন শোনেনি। "এখন সব ফুলগুলো নিশ্চয় ওখানে নাচ করছে, "ভাবল সে, " ওহ, আমার কি দেখতে ইচ্ছা করছে! " কিন্তু সে বিছানা থেকে নড়ল না, বাবা-মায়ের যদি ঘুম ভেঙে যায়! " আহা, ওরা যদি এই ঘরে আসত," সে ভাবল। কিন্তু কেউই এলনা, আর ওদিকে বাজনাটা এত সুন্দর ভাবে চলতেই থাকল যে সে আর ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারল না। সে নিজের ছোট্ট বিছানা ছেড়ে উঠে, পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে উঁকি দিল। ওহ! কি দারুণ এক দৃশ্য সেখানে দেখা গেল! সেই ঘরে কোন রাত বাতি জ্বলছিল না, কিন্তু ঘরের মধ্যে যথেষ্ট আলো ছিল, কারণ জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে মেঝেতে পড়ে প্রায় দিনের মতই ঝকঝক করছিল। সমস্থ হায়াসিন্থ আর টিউলিপেরা লম্বা সারি দিয়ে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল , জানালায় বা ফুলদানিগুলিতে একটা ফুলও ছিলনা। ফুলগুলি তাদের লম্বা লম্বা সবুজ পাতা দিয়ে একে অপরকে ধরে, মেঝেতে ঘুরে ঘুরে নাচ করছিল। পিয়ানোয় বসে বাজাচ্ছিল একটা বড় হলুদ রঙা লিলি। ইডার মনে হল এই ফুলটাকে সে গ্রীষ্মকালে দেখেছে, কারণ তার মনে পড়ল, সেই ছাত্রটা বলেছিল হলুদ লিলিটাকে দেখতে তার পিয়ানো দিদিমণি মিস লীনার মত। তখন সবাই তার কথা শুনে হেসেছিল, কিন্তু, এখন ইডার মনে হল, সেন সেই লম্বা, হলুদ ফুলটাকে দেখতে সত্যিই মিস লীনার মত ! তাঁর মতনই ফুলটা মাথা এদিক ওদিক ঝুঁকিয়ে বাজাচ্ছিল , আর বাজনার তালে তালে মাথা দোলাচ্ছিল। তারপরে সে দেখতে পেল একটা উজ্জ্বল বেগুনী রঙা ক্রোকাস এক লাফে গিয়ে উঠল তার খেলার টেবিলের ওপরে, আর গিয়ে পুতুলের বিছানার চারপাশ থেকে পর্দা সরিয়ে দিল; সেখানে শুয়ে ছিল সেই অসুস্থ ফুলগুলি, কিন্তু তারা এক লাফে উঠে বসল, আর অন্যদের দিকে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে জানান দিল যে তারাও নাচ করতে চায়। পুরনো কাপড়ের পুতুলটা, যার কিনা মুখ ভাঙা, সে উঠে ফুলগুলিকে লম্বা কুর্নিশ জানাল। তাদের দেখে মনেই হচ্ছিল না যে তারা অসুস্থ, বরং তারা আনন্দে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু তারা কেউই ছোট্ট ইডাকে খেয়ালই করল না।
তারপরে মনে হল টেবিলের ওপর থেকে কি যেন একটা লাফ দিয়ে পড়ল। ইডা দেখল, মেলায় কেনা রংচঙে লম্বা লাঠিটা ফুলেদের মাঝখানে লাফিয়ে পড়ে এমন হাবভাব দেখাচ্ছে যেন সে তাদেরই একজন। লাঠিটার মাথায় সেই উকিলবাবুর মত চওড়া টুপি পড়া একটা ছোট্ট মোমের পুতুল বসে ছিল। লাঠিটা ফুলেদের মাঝখানে পা ঠুকে ঠুকে নাচতে শুরু করল; ফুলেরা তার সাথে তাল মেলাতে পারল না, তাদের পা অত শক্ত নয় কিনা! হটাত করে লাঠীড় মাথায় বসে থাকা মোমের পুতুলটা যেন বড় আর লম্বা হতে থাকল, আর সে ঘুরে বসে ফুলগুলির দিকে তাকিয়ে বলল, " এইসব কথা তোমরা কি করে একটা শিশুর মাথায় ঢোকাতে পার? যত্ত সব আজগুবি ব্যাপার!" তখন পুতুলটাকে সেই উকিলবাবুর মতই রাগী রাগী দেখতে লাগছিল। কিন্তু কাগজের পুতুলগুলি তার রোগা রোগা পায়ে পিটুনি দিতেই, সে আবার ছোট হয়ে গিয়ে আগেকার মত পুঁচকে মোমের পুতুল হয়ে গেল। সেই দেখে ইডার এত মজা লাগল, যে সে না হেসে আর পারল না। লাঠিটা নেচেই চলল, আর তাই উকিলবাবুও নাচতে বাধ্য হলেন। তিনি নিজেকে বড় আর লম্বাই বানান, বা পুঁচকেই থাকুন, নাচতে তাঁকে হবেই। শেষ পর্যন্ত সব ফুলেরা গিয়ে অনেক কষ্টে রঙিন লাঠিকে নাচ থামাতে বাধ্য করল, বিশেষ করে সেই অসুস্থ ফুলগুলি।
