সবুজ মনের রসদ
Ichchhamoti Logo

১৯৭৬এ চাকরির সূত্রে বঙ্গচ্যূত হওয়ার পর মন ভরাতে ছোটদের জন্য কিছু লেখালিখি শুরু করেছিলাম, যার কয়েকটি কলকাতার বিভিন্ন মাসিকপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর ১৯৮৯ নাগাদ এই চেষ্টায় ভাটা পড়ল কাজের ও সংসারের চাপে। রিটায়ার করার পর আবার এই অভ্যাস পুনর্জাগরিত হল ২০১১য়, ছোটদের ওয়েব ম্যাগাজিন 'ইচ্ছামতী'র হাত ধরে।

আমার এক সাহিত্যিক বন্ধুর মারফতই 'ইচ্ছামতী'র সন্ধান পেয়েছিলাম। আমাদের ধারণা হয়েছিল, মহাশ্বেতা নামে এক জাঁদরেল মহিলা পত্রিকাটি পরিচালনা করেন। ভয়ে ভয়ে একটা কবিতা পাঠালাম, উৎরেও গেল। সেই সূত্রে লিঙ্কে ক্লিক করে দেখলাম 'ইচ্ছামতী' ওয়েবম্যাগকে, অবাক হলাম। তার অজস্র বিভাগ, যার মধ্যে রয়েছে ছোটদের নিজেদের লেখা ও আঁকা। আর রয়েছে সম্পাদক 'চাঁদের বুড়ি'র ছোটদের প্রতি মনছোঁয়া প্রতিবেদন। তবে যা আমাকে বিস্মিত করত তা হচ্ছে পত্রিকাটির ব্যাপক বর্ণাঢ্য অলঙ্করণ। ভাবতাম, একজন মানুষের পক্ষে এত করা সম্ভব নয়, নিশ্চয়ই এর পেছনে একটা বড় টিম আছে।

এরপর আমি কবিতা ছাড়া গল্পও 'ইচ্ছামতী'তে পাঠাতে শুরু করলাম। তখন ইচ্ছামতী ছিল ত্রৈমাসিক, আমি প্রায় প্রত্যেক সংখ্যায়ই কিছু না কিছু লেখা পাঠাতাম। এই সূত্রে মহাশ্বেতার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে লাগল। একদিন বইমেলায় এক অনুষ্ঠানে দেখাও হয়ে গেল। জানলাম, ফোটোতে তাকে ভার-ভারিক্কি দেখালেও আদতে সে আমার হাঁটুর বয়সি এক একরত্তি মেয়ে, যাকে আপনি-আজ্ঞে করা যায় না। আরো জানলাম, 'ইচ্ছামতী'র নিবিড় ও ব্যাপক অলঙ্করণ মূলত এই প্রফেশনাল ওয়েবপেজ ডিজাইনারের একক প্রচেষ্টার ফসল।

আমি তখন মুম্বই উপকণ্ঠ থানের অধিবাসী। মুম্বইয়ে কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, যাঁরা স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু বাচ্চাদের বাংলা শেখাবার চেষ্টা করছেন। এমন একজনের চেষ্টার ফসল কিছু ছাত্রছাত্রীর লেখা 'ইচ্ছামতী'র ছোটদের বিভাগে পাঠালাম। তারপর চেনাজানা কিছু স্কুলছাত্রের আঁকা। 'ইচ্ছামতী' সেসব সাদরে গ্রহণ করল। ছোটরা ও তাদের মা-বাবারাও খুব খুশি, ওয়েব ম্যাগাজিনে তাদের কীর্তি চেনাজানাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া খুব সহজ বলে।
তবে ঐ ছোটরা পরবর্তী কালে হয়তো ক্রমবর্ধমান পড়াশোনার চাপের জন্য এই যোগাযোগ ধরে রাখতে পারেনি। তা, বহির্বঙ্গে বসে তারা যতটুকু করেছে, তাই বা কম কী! আর এদিকে, 'ইচ্ছামতী'র পাতায় নতুন নতুন কচিকাঁচার আগমনও অব্যাহত রয়েছে।

এরপর কালক্রমে 'ইচ্ছামতী'র কিছু পরিবর্তন ঘটল – সে ত্রৈমাসিক থেকে অবিচ্ছিন্ন বা continuous updateএর ম্যাগাজিনের রূপ নিল। আমার লেখালিখি তবুও অব্যাহত রইল। বরং মহাশ্বেতার অনুরোধে কিছু সরল বিজ্ঞান বিষয়ক লেখাও 'ইচ্ছামতী'তে পাঠাতে লাগলাম। বিজ্ঞানের প্রবন্ধের সঙ্গে অপরিহার্য ছবি ও ডায়াগ্রাম। কিন্তু রিটায়ার করার পর আলস্যবশত কম্পিউটারে ছবি আঁকা ভুলে গেছি। তাই মহাশ্বেতাকে কিছু স্কেচের স্ক্যান, কিছু আইডিয়া পাঠাতাম আর এই নিপুণ আর্টিস্ট কাম ওয়েব ডিজাইনার তা নিখুঁতভাবে রূপায়িত করে প্রবন্ধের নতুন মাত্রা দিত। কিন্তু লেখার পর ওর নাম না থাকায় একদিন আমি বললাম, এরপর অলঙ্করণে তোমার নাম না দেখলে আর লেখা পাঠাব না। ও অগত্যা রাজি হয়ে গেল।

তারপর একদিন দেখলাম 'ইচ্ছামতী' ঘুমিয়ে পড়ল, তার আপডেট প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। খারাপ সম্ভাবনাই মাথায় এসেছিল। কিন্তু সম্প্রতি আবার দেখে খুশি হলাম যে 'ইচ্ছামতী' শীতঘুম ভেঙে চাঁদের বুড়ির হাত ধরে জেগে উঠেছে। খুশ খবর শুনলাম, তার আঠেরো বছর পূর্ণ হল। এই আঠেরোর প্রথম তিন ও শেষ দুই বাদে বাকি সময়ে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ থেকেছে। প্রথম তিনের সংখ্যাগুলোর সিডি অবশ্য মহাশ্বেতার সৌজন্যে আমার হস্তগত হয়েছে।

সবশেষে, সম্পাদকের অনুরোধে কিছু পরামর্শ। সাধারণভাবে, 'ইচ্ছামতী'র আঙ্গিক বা অন্তর্বস্তুর মান নিয়ে, ঐ 'কোনো কথা হবে না!' কিন্তু ভবিষ্যতে এগোতে গিয়ে একটি মৌলিক বিষয় ভাবতে হবে – এখনকার শিশু ও কিশোররা কী ভাবে? তারা একটি ওয়েবম্যাগের কাছ থেকে কী চায়? এই জানাটার প্রক্রিয়া অবিরাম চালু না রাখলে সেই চাহিদাকে পরিণত মনস্কদের চিন্তায় জারিত করে তাদের উপযুক্ত মানসিক খাদ্য পরিবেশনের কাজটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বললাম বটে, এই চিন্তাকে কীভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় তা আমারও জানা নেই।

দ্বিতীয়ত, অনেক ম্যাগাজিন ও ওয়েব ম্যাগাজিনের অভিজ্ঞতা দেখে আমার ধারণা, এই ধরণের সৎ প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে হলে একটা টিম লাগে। একজন ব্যক্তি, তিনি যত কুশলী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞই হোন না কেন, কখনো ব্যক্তিগত কারণে থমকে যেতে পারেন। তখন সামাল দেবার কেউ না থাকলে প্রচেষ্টাটাই থমকে যায়।
আমার নিজস্ব ধারণা – 'ইচ্ছামতী'কে ত্রৈমাসিক থেকে অবিচ্ছিন্ন আপডেটের পত্রিকায় রূপান্তরিত করাটা না করলেও চলত। ঐ ধরণের সাহসী প্রচেষ্টাকে বাস্তবায়িত করতে আরো লোকবল লাগে।

সর্বশেষে, ওয়েবম্যাগটি অপেশাদার, তবু চালাতে সামান্য হলেও কিছু অর্থ লাগে। সেটুকুর জন্য ইচ্ছুক দাতা নিশ্চয়ই 'ইচ্ছামতী'র অনুরাগী মহলে পাওয়া যাবে। এমন কোনো চেষ্টা আগে হয়েছে কিনা, আমি ঠিক জানি না।

ইচ্ছামতী এবং তার স্রষ্টা ও প্রতিপালক মহাশ্বেতাকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করলাম।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনীয়ার ও মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী অনিরুদ্ধ সেন কলকাতা-মুম্বইয়ের বিভিন্ন সাময়িকপত্র ও ওয়েব ম্যাগাজিনের নিয়মিত লেখক। তাঁর লেখা ও অনুবাদ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, এবং সংকলিত বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথগ্রহণ করছি এবং তার সকল নাগরিক যাতে : সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা,মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার স্বাধীনতা; সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি-সম্ভ্রম ও জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুনিশ্চিত করে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে; আমাদের গণপরিষদে, আজ,১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর, এতদ্দ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ করছি, বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা