
লোকে বলে যুদ্ধ অ্যাডাল্টদের ব্যাপার, বাচ্চাদের সেখানে কোনও জায়গা নেই। স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার হলো, বড় বড় যুদ্ধে সবচেয়ে সাফার করে সেই বাচ্চারাই। আমরা ভাইরাল নিউজ, রিল, মিম দেখে খানিকটা জানি, খানিকটা ইমাজিন করে নিই, তারপর ইমোশনাল ড্যামেজ নিয়ে স্ক্রোল করে যাই।
এবারে সামনে একটা ডকু মুভি যদি আসে, আর সেই ডকু মুভি দেখে যদি সেন্সর বোর্ডের ব্রেনরট হয়ে যায় তাহলে একটু ইমোশনাল ড্যামেজ অ্যাফর্ড করা যেতেই পারে, তাই না? তিউনিসিয়ান ডিরেক্টর কাওথার বেন হানিয়া একটা এমনই ডকু ফিকশন মুভি বানিয়েছেন — The Voice of Hind Rajab।
কী এমন আছে এই মুভিতে? প্লট একটা দিনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, গাজা সিটি। ছয় বছরের হিন্দ রাজাব একটা গাড়িতে আটকে, চারপাশে তার ফ্যামিলির লাশ, ইজরায়েলের ট্যাঙ্ক তার গাড়ি আটকে বসে আছে। গুলি চলছে। গাড়িতে সবাই গুলি খেয়ে মরে গিয়েছে, একা হিন্দ বেঁচে। সে রেড ক্রেসেন্টকে কল করে কাঁদতে কাঁদতে বলে — “মা কে ডাকো, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাক।” সাড়ে তিন ঘণ্টা কল চলে। তারপর? স্পয়লার দেবো না, তবে প্লট কিন্তু রিয়েল লাইফ স্টোরি। হান্ড্রেড পার্সেন্ট ট্রুথ। এই মুভিতে হিন্দ রাজাবের কল রেকর্ডিং বেজে যায়। ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, গাজা সিটিতে ছয় বছরের হিন্দ রাজাব যে কলগুলো তার গাড়ির ভেতর থেকে করেছিল সেইগুলো।
রেকর্ডেড, ভেরিফায়েড, রিয়েল। আর তাই এত হরিফিক।
তাই জন্যই কি এত কন্ট্রোভার্সি?
সিনেমার কন্ট্রোভার্সি নিয়ে ভাসাভাসি পরে, আগে ক্রাফট ব্রেকডাউন। বেন হানিয়ার সিগনেচার স্টাইল ডকু-ফিকশন হাইব্রিড, উনি এর আগেও (Four Daughters-এ) রিয়েল সাবজেক্ট আর অ্যাক্টরদের মিক্স করে বানিয়েছেন। এই সিনেমায় হিন্দের আসল ভয়েস নোট আর কল রেকর্ডিং যেমন আছে হুবহু, তেমনি রেড ক্রেসেন্টের কন্ট্রোল রুমের ভেতরের সিনগুলো অ্যাক্টররা প্লে করেছে — ইউসুফ, আহমেদ, বাকি স্টাফ, যারা রিয়েল টাইমে হিন্দকে বাঁচানোর জন্য সাড়ে তিন ঘণ্টা ফাইট করে যাচ্ছে ফোনে ফোনে, রুট অ্যাপ্রুভাল চাইছে, প্রতিটা মিনিট কাউন্ট করছে। ক্যামেরা প্রায় পুরোটাই ওই একটা কন্ট্রোল রুমে বন্দি — রিয়েল-টাইম, একদম ঘড়ির কাঁটার সাথে সাথে চলা প্রেশার-কুকার সেটআপ, কোনো রিলিফ নেই। হিন্দকে কখনো স্ক্রিনে কেউ দেখবে না, শুধু শুনবে। আর ওই “না দেখানো”টাই সবচেয়ে ভারী পাঞ্চ। রিয়ালিটি চেক।
আর সেটাই সিনেমার আসল হরর।
মুভির রিসেপশন কেমন? ভেনিসে বিশ মিনিট স্ট্যান্ডিং ওভেশন, সিলভার লায়ন গ্র্যান্ড জুরি প্রাইজ, অস্কারে বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিচার নমিনেশন, এমনকি ইজরায়েলেও রিলিজড। মানে গ্লোবালি এটা “মাস্ট ওয়াচ, নট মাস্ট ব্যান” ক্যাটাগরির মুভি, ক্রিটিক্যালি সিরিয়াস। কিন্তু ইন্ডিয়াতে আসতেই সেন্সর বোর্ড পুরো ঘোস্ট মোডে চলে গেল। কোনো অফিশিয়াল রিজেকশন লেটার নেই (যেটা ল’ অনুযায়ী কম্পালসারি), শুধু শোনা গেল সিনেমাটা নাকি “সেনসিটিভ”, রিলিজ হলে ইন্ডিয়া-ইজরায়েল রিলেশন “ভেঙে” যাবে। একটা ডকু-ড্রামা এত পাওয়ারফুল যে ডিপ্লোম্যাটিক টাই ক্র্যাক করে দেবে? প্রচুর হল্লাগুল্লার পর সেন্সর বোর্ড ব্যাকফুটে গিয়ে ‘A’ সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়, আনকাট।
একটা বাচ্চার কান্না শুনে সিস্টেমের প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে, শুনলেই স্ট্রেঞ্জ লাগে। হিন্দ রাজাব মায়ের কাছে যেতে চাইছে, বলছে ভয় করছে। একা একটা ছয় বছরের বাচ্চা লাশভর্তি গাড়িতে বসে কাঁদছে। এতে কি সিক্রেট মিলিটারি কোড আছে নাকি? আসলে হিন্দ রাজাব যে ফোন করে মায়ের কাছে যেতে চাইছিল সেটা আমাদের ভিউয়ার থেকে উইটনেস বানিয়ে দেয়, ওতেই কি আসল মুশকিল?
যাক গে, আমার ভার্ডিক্ট ৫/৫ ইমোশনাল ড্যামেজ। হিন্দ রাজাবের কান্না আমার মাথার মধ্যে খোদাই হয়ে গিয়েছে, চেষ্টা করলেও ডিলিট করতে পারব না।
সব মুভি এন্টারটেইনমেন্ট নয়, কিছু মুভি বানানো হয় শুধু উইটনেস রাখার জন্য। সব ভয়েস নোট ডিলিট হয় না। যেমন, The Voice of Hind Rajab।

