
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো ভাবতেও পারবো না, কিন্তু একসময় মানুষের পরিচয় তার নাম বা স্বপ্ন দিয়ে হতো না। হতো তার গায়ে খোদাই করা একটি নম্বর দিয়ে।
১৯৪২ সালের কথা। নাৎসি বাহিনীর তৈরি ভয়ংকর 'অশউইৎজ' কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হাজার হাজার মানুষের সাথে বন্দি করা হয়েছিল লালে সোকোলভ নামে এক তরুণকে। সেখানে পৌঁছানোর পর তার চুল কামিয়ে দেওয়া হয়, কেড়ে নেওয়া হয় সব শখ-আহ্লাদ, আর হাতে বিষাক্ত কালিতে লিখে দেওয়া হয় নম্বর—৩২৪০৭। লালে অনেকগুলো ভাষা জানতেন, তাই নাৎসি রক্ষীরা তাকে ক্যাম্পের 'ট্যাটুশিল্পী' বানিয়ে দেয়। প্রতিদিন লাইন ধরে আসা নতুন বন্দিদের হাতে বিষাক্ত সূঁচ দিয়ে নম্বর খোদাই করা ছিল তার কাজ। লালে এই কাজটা একদম পছন্দ করতেন না, কারণ তিনি মানুষের নাম মুছে দিয়ে তাদের স্রেফ একটা সংখ্যায় বদলে দিচ্ছিলেন। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য তার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না।
ঐ বছরেরই জুলাই মাসে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরীর হাত ধরলেন লালে, তার হাতে নম্বর খোদাই করার জন্য। মেয়েটির নাম ছিল গিটা ফুরম্যান, আর তার হাতে লেখা নম্বরটি ছিল ৩৪৯০২। গিটার চোখের দিকে তাকাতেই লালের মন এক নিমেষে বদলে গেল। চারপাশে মৃত্যু আর ভয়ের সেই নরকে তাদের মধ্যে গড়ে উঠল এক গভীর ভালোবাসা।
কিন্তু অশউইৎজের মতো জায়গায় ভালোবাসার কথা ভাবাও ছিল চরম বিপদের কাজ। চারপাশে উঁচু উঁচু কারেন্টের তারের বেড়া, পাহারায় হিংস্র কুকুর আর বন্দুক হাতে নির্দয় রক্ষীরা। সামান্য ভুলেই নির্ঘাত মৃত্যু! তবুও লালে পিছিয়ে যাননি। লালে তার কাজের সূত্রে কিছুটা যাতায়াত করতে পারতেন। তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে রাখা খাবার আর টুকরো কাগজে চিঠি লিখে পাঠাতেন গিটার কাছে। সেই চিরকুটগুলো ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি বা গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তাই তারা একে অপরকে গোপন সংকেতে মনের কথা জানাতেন। লালে মৃত বন্দিদের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে নাৎসি রক্ষীদের ঘুষ দিতেন। সেই বিনিময়ে জোগাড় করতেন চকোলেট, একটু ভালো খাবার কিংবা ওষুধ। একবার তো গিটা ভয়ংকর রোগ 'টাইফাস'-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন, লালে জীবন বাজি রেখে ওষুধ এনে তাকে সুস্থ করে তোলেন।
একবার এই সব জিনিস পাচার করার অপরাধে লালে ধরা পড়ে যান। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাম্পের সবচেয়ে ভয়ংকর অত্যাচার কক্ষে। রক্তভেজা শরীরে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেও তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি। তিনি জানতেন, একটা ভুল কথা গিটার জীবন কেড়ে নিতে পারে। শুধু গিটাকে দেওয়া কথা রাখার শক্তিতেই তিনি সেই নরক থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরে এসেছিলেন।
যুদ্ধের শেষ দিকে নাৎসিরা যখন হেরে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন সব বন্দিদের আলাদা করে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়। লালে আর গিটার যোগাযোগ পুরো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হলো, কিন্তু লালে দমে যাননি। তিনি জানতেন না গিটা বেঁচে আছেন কি না, তাও স্লোভাকিয়ার এক রেলস্টেশনে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে লাগলেন। হাজার হাজার কঙ্কালসার মানুষের ভিড়ে তিনি শুধু সেই পরিচিত চোখ দুটিকে খুঁজতেন। একদিন অলৌকিকভাবে এক ঘোড়ার গাড়ির ওপর তিনি গিটাকে দেখতে পেলেন! দীর্ঘ তিন বছর পর দুটি বন্দি নম্বরের সেই পুনর্মিলন ছিল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর এক মুহূর্ত।

বাস্তব জীবনে গিটা ফুরম্যান ও লালে সোকোলভ
পরবর্তীকালে লালে ও গিটা বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান এবং দীর্ঘ ৫৮ বছর সুখে সংসার করেন। লালে কোনো অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু তার পাঠানো প্রতিটি রুটির টুকরো আর গোপন চিঠি ছিল নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক বিরাট প্রতিবাদ। নাৎসিরা চেয়েছিল মানুষকে শুধুই একটা সংখ্যা বানিয়ে দিতে, কিন্তু ভালোবাসা আর দয়ার শক্তিতে লালে আর গিটা প্রমাণ করেছিলেন—মানুষের আসল পরিচয় কখনো কোনো নম্বর হতে পারে না।
ফটোগ্রাফ: সিবিসি

