
বাঁকা ঝিলের বাঁকে, পাড়ের ওপর নুইয়ে পড়া আধশুকনো বাবলার ডালে বসে ঝিমোতে ঝিমোতে বুড়ো দাঁড়কাকটা ভেবে চলেছে কত শত হাজারো ভাবনা। মনে পড়ছে তার ছোট্টবেলায় এই ঝিলের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এটা ছিল একটি জোয়ার-ভাঁটা খেলা চঞ্চল নোনা নদী। নাম 'শেলেমারী'। এখন আর এই নামে কেউ চেনেই না। বাঁধা পড়ে কবে সে হারিয়ে গেছে!
এপার-ওপার যোগাযোগ করতে, এমনকি নগর কলকাতাকে ছুঁতে মানুষগুলো লম্বা-চওড়া কংক্রিটের বাঁধ দিয়ে বাঁধল 'শেলেমারীকে'। এদিকে 'গোবদীয়া নদীর' পেট থেকে বেরিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে এসে তীব্র খরস্রোত 'সপ্তমুখীর' উত্তরের এক শাখায় মিশেছিল। দিন-দুবেলা কালচে-সবুজ বা মাঝেমধ্যে লালাভ গিরে শাকের চর ছাপিয়ে গরান, গেঁওয়া, হেঁতাল, বানি বা শ্যাওড়া জঙ্গলের পেট চিরে বইয়ে দিত নোনা কাদাজলের ঘন স্রোত। আর ভাঁটার শেষে নরম থকথকে কাদামাখা পলিতে জেগে থাকা শ্বাসমূলের ওপর দিয়ে 'ড্যাকরা' মাছের আঁকাবাঁকা বিচরণ যেন এক নকশিকাঁথার মাঠ! আর একটু উঁচু শুকনো কাদার চরে লাল কাঁকড়ার দল গর্তের সামনে সজাগ পাহারায় বিঘ্ন ঘটাত উড়ে যাওয়া গাংচিল নয়তো সাদা বক। নিমেষে দৌড়ে গিয়ে গর্তে ঢুকে মুহূর্তের নিরাপদ আশ্রয়ে ওরা নিশ্চিন্ত। ওদিকে পাংশুটে 'কাদাখোঁচা' পাখিটা লেজ দুলিয়ে ছন্দে ছন্দে এগিয়ে চলে নরম কাদায় পা ডুবিয়ে। নয়তো আষাঢ়ের ভরা কটালে সবুজ ধানের বিয়ন বোঝাই 'পাউখা' বেয়ে সৃষ্টিধর দাস গলা ছেড়ে গান ধরে—
"গুরু না ভজিনু সন্ধ্যা-সকালে
মন প্রাণ দিয়ারে…"
মুখভার আকাশে রাশি রাশি কালো মেঘেদের আনাগোনার মাঝে ঘনঘোর বৃষ্টির মধ্যে স্লুইসগেটের মুখে কানাই বাঙ্গাল জাল ফেলে 'তাউরী মাছ' ধরতে ব্যস্ত। তার কোমরে বাঁধা বাঁশের 'খ্যাঁচায়' মাছগুলো লাফিয়ে-দাপিয়ে মুক্তির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে ঘন বাবলার ঝোপে ছোট্ট কাকের বাচ্চাটা ভিজে একসার অবস্থা। গুটিসুটি মেরে বসে সে লোলুপ দৃষ্টিতে মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাপিত্যেশ করে।
এখন সে পরিণত বুড়ো দাঁড়কাক। গলার স্বর ভাঙা। অবিন্যস্ত চেহারা। গায়ে ছেঁড়া-ছেঁড়া কালো পালক কোনো প্রকারে ঝুলে রয়েছে। তার প্রবীণ চোখে ধরা পড়ে বর্ষায় উল্টো দিকের ভরা ঝিলের মিঠে জল ক্রমশ চরের বাদাবন ও ঘন সবুজ দূর্বাঘাসের মাথা ছাপিয়ে বাঁধের দিকে এগিয়ে আসছে। তক্ষুনি ঝিলের জলে জেগে থাকা লোটকলমির ডাল থেকে রঙিন মাছরাঙাটা দোলা দিয়ে তড়িৎ গতিতে উড়ে গেল বাঁধার বাজারের দিকে। আর এদিকে ঝিলের ধারের ঝোপে ঝিঁঝিঁর ডাক ও কোটরব্যাঙেদের 'কোরর-কোরর' ডাক ছাপিয়ে বাঁধার পাকা রাস্তায় যাত্রীবোঝাই বাসটা কানফাটানো তীক্ষ্ণ বাঁশি বাজিয়ে 'ঘ্যাড়র-ঘ্যাড়র' শব্দ করে ছুটে গেল শহর অভিমুখে। সঙ্গে একরাশ কালো ধোঁয়া উগরে দিল। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ল বাজারের হরেক রকম দোকানদানি, কোলাহল, মানুষজন, আর সঙ্গে পোড়া ডিজেলের তীব্র গন্ধ। দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়!
দিন-দুবেলা লোকজনের আনাগোনা, হিসেব-নিকেশ, লাভ-লোকসানের অঙ্ক চলে মানুষে মানুষে। জিনিসপত্র আদান-প্রদান, দরদাম—কত কী যে ক্যাচর-ম্যাচর চলতে থাকে রাতদিন, তার ইয়ত্তা নেই। ছিল দুটো চালাঘর। এখন কত শত ইট-ইমারত গজিয়েছে, আরো গজাচ্ছে, কে তার হিসেব রাখে! বাজার ক্রমশ বিস্তার লাভ করতে করতে ঝিলের চরটাকেও গিলে ফেলছে! হয়তো একদিন অবশিষ্ট চর ও জলাজমি কংক্রিটের মোড়কে মুড়ে ফেলবে লোভী মানুষগুলো! হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চাউনিতে বসে থাকে বুড়ো দাঁড়কাকটা।
হঠাৎ কাকটা দেখতে পায় নিচে বাবলাতলায় উত্তরপাড়ার খোকন হাফহাতা সাদা গেঞ্জি ও কালো হাফপ্যান্ট পরে ডান হাতের তর্জনীর ওপর সাদা ফুটবলটা বাঁই বাঁই করে ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে এসে বসে পড়ে ঝিলের পাড়ে। পেছনে বন্ধুরাও একে একে খোকনকে অনুসরণ করতে থাকে। তারপর, পরের ফুটবল প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মশগুল হয়ে যায়। সঙ্গে চলে হৈচৈ, হুল্লোড়, দাপাদাপি, খুনসুটি। ওরা এলেই এখানের নিঝুম-নিস্তব্ধ পরিবেশটা যেন প্রাণ ফিরে পায়। চিৎকার-চেঁচামেচিতে বেশ চনমনে হয়ে ওঠে চারিদিক। মনটা আনন্দে ভরে যায়। কাকটার মনে মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, তাহলে এখনো এরা মোবাইল নামক খেলনাটা ছেড়ে ফুটবলটাকেই বেশি ভালোবাসে নিশ্চয়ই! সে উৎফুল্ল হয়ে বাহবা দিতে খোকন ও তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে চ্যাঁচায়— "শোন তোমরা, সত্যি বলছি, তোমরা খুব ভালো ছেলে। তোমাদের তুলনা হয় না। এখনও যে তোমরা ফুটবল খেল, ভাবাই যায় না! ভেরি গুড! ভেরি গুড!" আর সেই বাহবা খোকনদের কানে এসে পৌঁছল কর্কশ স্বরে— 'কা-আ-কা-আ-কা-আ…!' মাথার ওপর বুড়ো কাকের ভাঙা স্বরে ওরা ভীষণ বিরক্ত বোধ করে। খোকন একটা মাটির ঢিল তুলে সপাটে ছুঁড়ে মারল ওর দিকে। ঢিলটা তীরের বেগে কাকটার কানের পাশ দিয়ে শোঁ করে ছুটে গিয়ে পাশের ডালের পাতায় 'ঝ্যাড়র' শব্দে ছিঁড়ে, উড়িয়ে ছিটকে পড়ল মাঠের জল-কাদায়। আর একটু হলেই বেচারা কাকটা কুপোকাত হতো!
এর জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। এইজন্য বলে না যে— অযথা প্রশংসা করতে নেই। কোথায় সে বাহবা দিল, তার পরিবর্তে ঢিল খেতে হলো! অগত্যা হতাশায় ও অভিমানে গজগজ করতে সে ডাল থেকে ওদের দিকে ঘাড় নামিয়ে বড় বড় চোখ করে অভিযোগ করে— "হেই! এটা কী হলো? তোমাদের ভালো বলে উৎসাহ দিলাম, আর উল্টে আমায় মারতে আসছ?!" কিন্তু তা আবারও 'কা-আ-কা-আ-কা-আ…' শব্দে ভেসে এলো খোকনদের কানে। এবার ওরা সবাই একে একে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করে। বাধ্য হয়ে কাকটা ডানা মেলল উত্তরের আকাশে। রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে— "ধুর ধুর, অনেক হয়েছে। আর কক্ষনো মানুষের সুনাম করব না। কক্ষনো না...কা...কা...কা...।"
ঝিরঝিরে কাদামাখা ঘাস-জলে চিৎকার-চেঁচামেচি, হৈ-হৈ করে খোকন ও বন্ধুরা খেলায় মেতে উঠেছে। খেলতে খেলতে কাদামাখা বলের সঙ্গে পিচ্ছিল কাদায় 'সর-র-র' করে পিছলে যাওয়া, অমনি পাশের বন্ধু এসে ঝাঁপিয়ে বলটা নিজের আয়ত্তে আনতে গিয়ে সেও বেসামাল হয়ে বলসুদ্ধু চিৎপটাং! এই সুযোগে অন্যজন দৌড়ে এসে 'ধপাস' করে কষিয়ে মারল লাথি। তারপর কাদামাখামাখি হয়ে একে অন্যের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, টেনেহিঁচড়ে, দৌড়ে কোনপ্রকারে বলটা আঁকড়ে অন্যজন ছিনিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল গোলপোস্টের দিকে। অমনি গোলরক্ষক দৌড়ে এসে বলটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল মাঠের মধ্যিখানে। উল্টো দিকের স্ট্রাইকার ওটাকে বুকে আটকায়। তারপর বল নিজের আয়ত্তে এনে পায়ে পায়ে গোলপোস্টের দিকে এগোতে থাকে। এদিকে পেছন থেকে আরেকজন পা দিয়ে বলে যেই না মারল খোঁচা, অমনি দুজনে পায়ে জড়াজড়ি হয়ে আছড়ে পড়ে। এদিকে বলটা কিছুটা ছিটকে গিয়ে আটকে গেল নরম কাদায়। এই সুযোগ! খালি মাঠে বল পেয়ে খোকন দৌড়ে এসে কষিয়ে মারল এক লাথি। তীরবেগে বল শুকনো বাঁশের গোলপোস্টে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল দূরে ঝিলের জলে। এবার আর এক খেলা জমবে! সবাই ঝাঁপ দিয়ে দাপাদাপি করে, জল ছিটিয়ে, সাঁতরে বলটা উদ্ধার করবে। তারপর শুরু হবে আর একপ্রস্থ লাফালাফি, ডাঙা থেকে ডিগবাজি খেয়ে জলে ঝাঁপ দেওয়ার প্রতিযোগিতা। কিন্তু তার আগেই ওরা দেখতে পায় দূরে বাঁধের ওপার থেকে একটা কমলা রঙের মাটি কাটার ড্রেজার বিকট গর্জন করতে করতে ওদের দিকে তেড়ে আসছে!
মাঠের নরম কাদাজল দাপিয়ে যন্ত্রদানবটা সবকিছু দলে, পিষে ফুঁৎকারে এগিয়ে আসছে। পেছনে বিরাট লম্বা আঁচড়ের দাগ তৈরি হলো নরম কাদামাটিতে। মুহূর্তে খেলার মাঠটা নির্মমভাবে তছনছ, বিধ্বস্ত, এলোমেলো হয়ে গেল। ঘাস, আগাছা সব মুহূর্তে কুচিকুচি হয়ে কাদামাখা মণ্ডে পরিণত হলো। খেলা বন্ধ করে খোকনরা হতভম্ব হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল ওটার গতিবিধির দিকে। সবজে ঘাস ও সোঁদা মাটির আদি সুবাস ছাপিয়ে পোড়া পেট্রোলের বিদঘুটে ঘ্রাণে ভরে যাচ্ছে চারিদিক। অবশেষে দানবটা বুড়ো বাবলাতলায় এসে থামে। শেষে দু’বার ভীষণ হুঙ্কার ছেড়ে, কালো ধোঁয়া উড়িয়ে তবেই ক্ষান্ত দেয়। এদিকে পেছনে পেছনে পঞ্চায়েত প্রধান শম্ভু দাস ও তার সাগরেদরা দ্রুত এগিয়ে আসছে বাবলাতলায়। ভীষণ উৎকণ্ঠা ও বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে মাঠের ছেলেগুলো তখনো ঘোরের মধ্যে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে! তারপর একসময় রহস্য উদ্ধারের আশায় ওরা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ড্রেজার মেশিনটার দিকে।
একরাশ কৌতূহল নিয়ে ছেলেগুলো মেশিনটার চারদিকে ঘিরে দাঁড়ায়। সবার মনে মনে একই জিজ্ঞাসা— কী হবে এখানে! খোকন সাহস করে এগিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে শম্ভু দাসকে জিজ্ঞেস করে—"এখানে কী হবে গো? ড্রেজার দিয়ে কী করবে গো?" শম্ভু দাস পাঞ্জাবির পকেট থেকে খাতা-পেন বের করতে করতে অবজ্ঞার ভঙ্গিতে খোকনের দিকে একবার ফিরে দেখে নিজের হিসেব-নিকেশে ব্যস্ত হয়ে যায়। কোনো উত্তর না পেয়ে খোকন বোকার মতো ড্রেজারটাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। চোখ আটকে যায় ওটার লম্বা শুঁড়ের মাথায়। বিরাট বড় তিনকোনা লোহার ফাঁপা হাঁ, নিচের দিকে বড় বড় খাঁজকাটা দাঁত। যেন একরাশ খিদে নিয়ে গিলতে উদ্যত। এবার সে বুক দুরুদুরু ও ভীষণ উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে গিয়ে পঞ্চায়েত সদস্য পশুপতি সামন্তের হাতে আলতো নাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করে— "এখানে কী হবে গো?'"অমনি প শুপতি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উত্তর দেয়— 'দেখতেই তো পাচ্ছিস! ড্রেজার মেশিন এসেছে। মাটি কাটা হবে, আবার কী।' এবার খোকনের সংশয় হয়, সে আবারও জিজ্ঞেস করে— 'এখানে মাটি ভরাট হবে?!' খোকনের মনে খটকা লাগে। জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে থাকে পশুপতির দিকে। বড় বড় চোখ করে এবার পশুপতি মুখ বেঁকিয়ে ব্যঙ্গহাসি হেসে উত্তর দেয়— 'হুঁ-হুঁ, এবার তো রোজ বাজার বসবে এখানে! তাই মাটি ভরাট করা হবে। এখানে এখন তো আর খেলা যাবে না— খোকনসোনা! বুঝলে? অন্য কোথাও যাও…' খোকন তখন অসহায়ভাবে বন্ধুদের দিকে ফিরে তাকায়। সবার মুখ বিমর্ষ। এই অঞ্চলে একটাই খেলার মাঠ ছিল, তাও এই লোকগুলো কেড়ে নিল!
ড্রেজারের সামনের দরজা খুলে কালো কুদমোমতো লোকটা ভেতরে ঢুকে ইঞ্জিন চালু করল। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে, 'ভরর-ভরর' বিদঘুটে শব্দ করে দানবটা লাফিয়ে, দাপিয়ে এগিয়ে গিয়ে বাবলা গাছের গোড়ায় লম্বা শুঁড়ের মাথাটা ঢুকিয়ে প্রবল ঝাঁকুনি দিতেই গাছটা নড়েচড়ে উঠল। তারপর বিশাল ঝাঁকুনি দিয়ে গাছটাকে মাটি থেকে নিমেষে উপড়ে বাঁধের ওপারে জলাজমির ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। মুহূর্তে গাছটা ধরাশায়ী!
উত্তরের আকাশ থেকে বুড়ো কাকটা উড়ে এসে দেখে ওদের বাসাসুদ্ধু বাবলা গাছটা ধূলিসাৎ। অমনি সে বুকফাটা আর্তনাদ করে— 'কে কোথায় আছ গো, উড়ে এস গো...হায়, হায় রে, আমাদের কী সব সর্বনাশ করে দিলে গো...শয়তান মানুষগুলো। আমাদের ঘরবাড়ি সব ধ্বংস করে...ক-কা-কা…।' সমানে সে চ্যাঁচাতে থাকে আর শূন্য আকাশে চক্কর দিতে থাকে। মুহূর্তে প্রতিবেশী, স্বজন সবাই যে যেখানে ছিল একে একে উড়ে এসে ওর সঙ্গে যোগ দিল। একসঙ্গে সবাই গগনভেদী চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে থাকে। মাথার ওপর রাশি রাশি কাকের তারস্বরে চেঁচানো যেন কোনো এক অশনিসংকেত। মনটা ভীষণ, ভীষণ খারাপ হয়ে যায় খোকনের।
সেদিন বেতারে বারে বারে ঘোষণা করে সতর্ক করে দিচ্ছিল একটা ভয়ঙ্কর ঝড় ধেয়ে আসছে বঙ্গোপসাগর থেকে। পঞ্চায়েত থেকেও মাইকে ঘোষণা করে দিয়েছিল— সবাই যেন নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। আকাশে মেঘের ঘনঘটায় ছেয়ে যাচ্ছে চারদিক। ঝোড়ো হাওয়ায় নিকষ কালো মেঘগুলো ধেয়ে এসে দলাপাকিয়ে একের পর এক ঠাসাঠাসি করে আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত নেমে এসে সার দিয়ে ফুঁসছে— যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ! ধরাতল যেন ভয়ে থরথর কম্পমান! তারপর বিকেল থেকে শুরু হলো ঝড়ের তাণ্ডবনৃত্য। তাথৈ রবে ভীষণ দাপাদাপি। গাছের মাথাগুলো মাটি পর্যন্ত নুইয়ে দিচ্ছিল। ঘরবাড়ি, গাছগাছালি সবকিছু তছনছ করতে শুরু করে। মাঠে-ঘাটে যা পাচ্ছে তাই নিমেষে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আছড়ে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে অঝোর ধারায় বৃষ্টির ঝাপটা। হয়েই চলেছে, হয়েই চলেছে। নদী-নালা, পুকুর, খাল-বিল সব জলে টুপটুপ হয়ে ভেসে যাচ্ছে। সে এক ভয়ঙ্কর রূপ প্রকৃতির। ঝড়টার নাম অদ্ভুত— আম্ফান!
খোকন বাড়ির সবার সঙ্গে খাবার-দাবার, জামাকাপড় পোটলা করে দৌড়ে আশ্রয় নিয়েছিল উঁচু মতো পাকা বাড়ি স্কুলঘরে। আর বাড়ির গরু, ছাগলগুলোকে গোয়াল থেকে ছেড়ে দিয়েছিল, যেদিকে খুশি চলে যাক। খোকন স্কুলঘরে ঢুকেই অবাক! দেখেছিল ঘরগুলোতে একে একে গ্রামের সব মানুষজনে ভরে যাচ্ছে। ওর অনেক বন্ধু আগেই এখানে ঠাঁই নিয়েছে। ওরা ভয়ে গুটিসুটি দিয়ে এককোণে বসে রয়েছে। সবাই নীরবে তাকিয়ে খোকনের দিকে। কেউ কোনো কথা বলতে পারছে না। সবার মুখে তখন আতঙ্কের ছাপ।
সারারাত ঝড়ের দাপটে আর বৃষ্টির ধারায় সবাই প্রায় অসহায়ের মতো জেগে কাটিয়ে দিয়েছিল। একটা হারিকেন যদিওবা টিমটিম করে জ্বলছিল, হাওয়ার দাপটে কখন সে নিভে অন্ধকারের বন্যা বইয়ে দিয়েছে! মাঝেমধ্যে প্রয়োজনে টর্চের রুপোলি আলো জ্বেলে সজাগ থাকছে নিজেরা। অমনি মানুষগুলোর ভৌতিক অবয়ব ফুটে ওঠে তাৎক্ষণিক। ভয়ে, আতঙ্কে সবাই সিঁটিয়ে গিয়েছে সেই নিকষ কালো অন্ধকারে। ঝড়ের ঝাপটায় মনে হয় যেন একসময় স্কুলবাড়িটাও তুলে নিয়ে যাবে। দরজা-জানলা সব থরথর করে কাঁপছিল। আর বাতাসের তীক্ষ্ণ শোঁ-শোঁ শিস শব্দে বুক কেঁপে ওঠে। যেন এক বিশাল ভয়ঙ্কর দানব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চারিদিক। সবকিছু উলটপালট, ভেঙেচুরে একাকার করে দিচ্ছে লহমায়। বাইরে সমানে বৃষ্টির ঝমঝম, তীব্র হাওয়ার দাপাদাপি, ডাল ভাঙার ‘কড়াৎ’ আওয়াজ, বসতবাড়ির চালের টালি বা অ্যাসবেস্টস উড়ে এসে আছড়ে পড়ে খানখান ‘খনাৎ’ আওয়াজে বুকটাও ছ্যাঁৎ করে ওঠে বারে বারে! ভয়ে হাত-পা সিঁধিয়ে যাবার জোগাড়। দুরুদুরু বুকে খোকন কখন যেন চোখ বন্ধ করে দু’কানে হাত চাপা দিয়ে মেঝেতে কুঁকড়ে শুয়ে পড়েছিল।

আধোঘুমের মধ্যে খোকন শুনতে পাচ্ছে মানুষজনের গুঞ্জন, বুড়ো মানুষের 'খকর, খকর' কাশি, বাচ্চার কান্না, অমনি মায়ের আধো আদুরে ভাষায় সান্ত্বনা, অসংখ্য পায়ের চলাফেরার ‘খসখস’ আওয়াজ। বাইরে তখনও ঝড়ের দাপট রয়েছে, তবে কিছুটা দুর্বল। চলছে এলোমেলো হাওয়ার ঝাপটা আর সঙ্গে ঝমঝম বৃষ্টি। সে ধীরে ধীরে চোখ খোলে। ঘোর দুর্যোগের মধ্যেও ভোরের রুপোলি আভা ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে! খোলা দরজায় উঁকি দিয়ে তা স্কুলঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার থিতিয়ে যাচ্ছে তখন। ফুটে উঠছে ভেতরের ঠাসাঠাসি মানুষজন, হাঁড়ি-কুড়ি, বোঁচকা-বুঁচকি, বাক্স-প্যাঁটরার সব অবয়ব। হঠাৎ একটা মোরগের চাপা স্বর 'কঁকর–ক' ভেসে এল খুব কাছ থেকে। খোকনের মনে লাগে বিস্ময়! সেই ডাকের উৎস খুঁজতে সে উদগ্রীব। আধো-অন্ধকার ঘরের মধ্যে ছোট্ট প্রাণীটির অস্তিত্ব সহজে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। সব জায়গায় মানুষজন শুয়ে-বসে ঠাসাঠাসি। তক্ষুনি আবার সেই ডাক! এবার সে উঠে বসে। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখতে থাকে। অনেক অনুসন্ধানের পর দেখা যায় ঘরের কোণে ওল্টানো বাঁশের ঝাঁকার ভেতরে, পরিবার-পরিজনদের নিয়ে সেই উৎকণ্ঠার মধ্যেও মোরগটা ঠিক তার দায়িত্ব পালন করে চলেছে! তার পাশেই জানালার গরাদ থেকে ঝোলানো দড়িতে বাঁধা নধর ছাগল, সঙ্গে দুটি খুব ছোট্ট ছানা। হয়ত কালই জন্মেছে। কাঁপা কাঁপা পায়ে দরজার দিকে এগোতেই ওদের মা মৃদু দুর্বল স্বরে দুবার 'ম্যা-হ্যা-হ্যা, ম্যা-হ্যা-হ্যা' করে যেতে বারণ করে।
চোখ ডলতে ডলতে খোকন স্কুলের বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। এখানেও মানুষে মানুষে ছয়লাপ, চারদিকে শুয়ে-বসে রয়েছে। একটু এগোতেই, ভালো করে চেয়ে দেখে চারিদিকে শুধু জল আর জল। স্কুলবারান্দার কোল থেকে যত দূর চোখ যায় শুধু জল আর জল! চারিদিকে সবকিছু ডুবে টুপটুপ করছে। ওদিকে বাঁধার কংক্রিটের বাঁধটা কোথায় হারিয়ে গেছে! বাজারহাট, দোকানদানি এখন জলে ডুবসাঁতার দিচ্ছে। ঝিলের চরের গাছগাছালি জলের তলায় তলিয়ে গিয়েও বিধ্বস্ত মাথাগুলোর নিস্তার নেই হাওয়ার প্রলয় নাচনে। ছেঁড়া পাতা, মচকানো কাঁচা ডালপালাগুলো বারে বারে জলে চুবিয়ে আবার শূন্যে উড়িয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করছে। খরস্রোত জলের তোড়ে ঘরবাড়ি, গাছগাছালি, খড়কুটো, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির মরা দেহ সব ভেসে যাচ্ছে। শেলেমারী আবার তার আগের রূপ ফিরে পেয়েছে।
হাঁটতে গিয়ে ডান পায়ের পেছনে হাঁটুর নিচে চিড়বিড় টান অনুভব করে খোকন। ফিরে দেখে শুকনো ফ্যাকাশে নরম কাদা লেপটে আছে। আর তাতেই টান ধরেছে চামড়ায়। ভালো করে চেয়ে দেখে তার দু’পায়ে ছোট-বড় অসংখ্য কাদার আস্তরণ লেগে আছে। কাল রাতে প্রাণপণে দৌড়ে কোনোপ্রকারে স্কুলঘরে মাথা গুঁজে আপাতত রেহাই পেয়েছিল ওরা। হাত-পা ধুতে ভুলেই গিয়েছিল। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। তক্ষুনি সে জলের দিকে এগিয়ে যায়। হাঁটুজলে নেমে গিয়ে দাঁড়িয়ে পা ধোয়ার চেষ্টা করে। পায়ের নিচে নরম কাদা আর কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব জলের। বেশ আরাম লাগে পায়ে। এবার সে নিচু হয়ে হাত দিয়ে রগড়ে কাদা পরিষ্কার করতে থাকে। তারপর পা দিয়ে জল ছিটোতে থাকে এদিক-ওদিক, যাতে করে পায়ের কাদাগুলো ধুয়ে যায় খুব সহজে। বারে বারে করতে থাকে। হঠাৎ পায়ে কী যেন একটা নরম বস্তু লাগল! সে থমকে দাঁড়ায়। ঝুঁকে পড়ে দেখতে থাকে জিনিসটা কী! দেখা মিলল ঘোলাটে কাদাজলে কালো মতো বস্তু ডোবা অবস্থায় ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। ভয়ে আঁতকে লাফিয়ে উঠে আসে জল থেকে। মনে মনে শঙ্কা জাগে, কোনো বিষধর জলজ প্রাণী নয়তো! তার বুক কেঁপে যায়। কী করা যায় এখন! মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে সে। দেখতেই হবে ওটা কী?!
হাতের কাছে কিছু পাচ্ছে না যা দিয়ে ওটা তুলে দেখা যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে স্কুলবারান্দার একপাশে জড়ো করা কাঠের বেঞ্চগুলোর মধ্যে টেবিলে প্রধান শিক্ষকের হাতের সেই ছড়িটা চোখে পড়ে। অমনি সে ওটা টেনে নিয়ে এগিয়ে গেল দ্রুত। তারপর খুঁচিয়ে তুলতেই সে দেখতে পায় সেই বুড়ো কাকটার নিষ্প্ৰাণ দেহ! মাথাটা ঝুলতে থাকে ছড়ি থেকে কিছুটা নিচে। তার নিথর কালো স্থির চোখ দুটো তখন শুধু চেয়ে আছে খোকনের দিকে— অসহায়ভাবে।
ছবি: গুগ্ল্ জেমিনাই

