সবুজ মনের রসদ
Ichchhamoti Logo

আজ ২০২৬ সালের ১৪ অগাস্ট। ১৪৩৩ বাংলা সনের শ্রাবণ মাসের ২৮ তারিখ। প্রায় দুই বছর পর তোমাকে চিঠি লিখতে বসলাম। দুই বছরে জমেছে কত কথা। গপ্পো শুরু করলে শেষ করতে দিন কেটে যাবে। কোথা থেকে শুরু করি?

প্রথমেই বরং বলি ইচ্ছামতী আর আমি এতদিন কোথায় ছিলাম, কী করছিলাম। — কোত্থাও যাইনি। এখানেই ছিলাম, আর এক কথায় বলতে গেলে, একটু ছুটি নিয়েছিলাম। অনেকদিন টানা পড়াশোনা কিংবা অনেক কাজ করার পর যেমন মনে হয়, এবার একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক, একটু আলসেমি করা যাক, এবার একটু নিজের ইচ্ছেমত গল্পের বই পড়া যাক বা গেম খেলা যাক — চাঁদের বুড়ির ঠিক তেমনটাই মনে হয়েছিল। ইচ্ছামতীও দিল তালে তাল। বলল, চলো, আমিও ছুটি নিই। তাই দুজনে মিলে কিছুদিনের জন্য কীবোর্ড-মাউজ-রং-তুলি-কাগজ-পেন্সিল- রাংতা-জরি-পালক-নোলক-সুতো-চরকা সব গুছিয়ে তুলে রেখেছিলাম।

কিন্তু ছুটি নিয়ে কি সত্যিই ছুটি পেলাম? বেশিদিন ছুটি নিলেই কি আর ছুটির মজা বেশি হয়? একেবারেই না। তাই একটা সময়ে এসে, বন্ধুদের সঙ্গে গপ্পোগাছা না করতে পেরে ইচ্ছামতী আর চাঁদের বুড়ি, দুজনেরই গা ম্যাজম্যাজ, পেট গুরগুর, মাথা টিপটিপ, মন আনচান করতে লাগল। আর শেষমেষ, আবারও নতুন নতুন গল্প - কবিতা - নাটক পড়ার জন্য, দেশদুনিয়ার নানা খবর আর এই পৃথিবীর হালহকিকত জানার জন্য দুজনে মিলে বের করে আনলাম গুছিয়ে তুলে রাখা চরকা-সুতো-নোলক-পালক-জরি-রাংতা-পেন্সিল-কাগজ-তুলি-রং-মাউজ-কীবোর্ড; হাঁক পেড়ে ডাক দিলাম বহুদিন ধরে ইচ্ছামতীর সাথে থাকা, পাশে থাকা বন্ধুদের — থাকবে তো সাথে? দেবে তো নতুন লেখা? আঁকবে তো নতুন ছবি?

দশদিক থেকে হইহই করে উত্তর এল — একদম। অবশ্যই।

অতএব…ইচ্ছামতীও দাঁত মেজে, চুল আঁচড়ে, নতুন সাজুগুজু করার জন্য তৈরি হল। আর চাঁদের বুড়িও নিজের কাজ শুরু করল।

*****

গত কিছুদিনে এই দেশজুড়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটল, বা এখনও ঘটে চলেছে, এবং বোঝা যাচ্ছে, ঘটে চলবে, যে ইচ্ছামতী আর চাঁদের বুড়ি , দুজনেই একই সঙ্গে খুব উত্তেজিত আর আনন্দিত। গত কয়েক মাসে, ভারতের আকাশে বাতাসে এক অন্যরকম আলো দেখা যাচ্ছে, যেমনটা বহুদিন দেখা যায়নি; এক অন্যধারার বাতাস বইছে, যেমনটা বহুদিন বয়নি।

এখন যারা স্কুল বা কলেজের ছাত্রছাত্রী, তাদের নতুন ঘরানার পরিচিতি ‘জেন- আলফা’ বা ‘জেন -জি’ ; এইসব শৌখিন নাম সরিয়ে রাখলে, এইসব ছেলেমেয়েরা — যেমন তুমি বা তোমার বন্ধুরা — এই দেশের ভবিষ্যৎ। এমন একটা সময়ে তোমরা বড়ো হয়ে উঠছ, যেখানে প্রত্যেকের হাতে রয়েছে ডেটা কানেকশন ভরা স্মার্টফোন। এই ফোনের মারফত পড়াশোনা, দেশবিদেশের খবর রাখা, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, এবং একই সঙ্গে মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করা — সবেতেই তোমরা সহজেই পারদর্শী। নানারকমের সোশ্যাল মিডিয়া আর মেসেজিং সার্ভিস তোমাদের হাতের মুঠোয়। নিজেদের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, দুনিয়ার নানা রকমের ভালো এবং খারাপ অভিজ্ঞতা হচ্ছে তোমাদের। আবার একই সঙ্গে তোমরা পড়াশোনা বা বড়ো হয়ে ওঠার নানা ক্ষেত্রে এমন সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছ, যেসব সমস্যা এর আগের প্রজন্মের মানুষদের জন্য তৈরিই হয়নি। অনেক সময়ে সেইসব সমস্যার সমাধানও তোমরা নিজেরাই করে ফেলছ।

সব মিলিয়ে, কাগজে কলমে নাবালক হলেও, বুদ্ধিতে, ভাবনাচিন্তায় বা অভিজ্ঞতায় তোমরা সাবালকদের থেকে কিছু কম নও। তোমরা অনেক বেশি সচেতন, ওয়াকিবহাল এবং সাহসী মানুষ এবং নাগরিক।

স্কুলে পড়ে যারা কিংবা স্কুল ছাড়বে যারা, এমন সব ছেলেমেয়েদের জন্য, গত কয়েক মাসের মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরটি হল, ২০২৬ সালে সিবিএসই-র দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ‘অন-স্ক্রিন মার্কিং’ (OSM) মূল্যায়ন ব্যবস্থায় খুব বড়ো কিছু ভুল ধরা পড়া। আর এই ভুলগুলি ধরে তিন ছাত্র নিসর্গ অধিকারী, সার্থক সিদ্ধান্ত এবং বেদান্ত শ্রীবাস্তব। তারা হাতেকলমে প্রমাণ করে , সারা দেশের সামনে দেখিয়ে দেয়, এই মূল্যায়ন ব্যবস্থার কোথায় কোথায় ভুল আছে। তাদের এই সাহসিকতার সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয় সিবিএসই। তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে নেয় এবং তাদের অনলাইন মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে উন্নত করবে কথা দেয়।

এর পরে পরেই, জুন-জুলাই মাস ধরে , মূলত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং আরও নানা দুর্নীতির প্রতিবাদে গত জুন ও জুলাই মাস জুড়ে, দিল্লির যন্তর-মন্তর চত্ত্বরে চলে এক ছাত্র সমাবেশ। এমন সমাবেশ এই দেশ বহুদিন দেখেনি। যদিও এই সমাবেশে যোগ দেওয়া বেশিরভাগ প্রতিবাদীরাই স্কুল কলেজের গন্ডী পেরিয়ে গেছেন অনেকদিন, কিন্তু আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, কতশত ছেলেমেয়েরা, যারা বয়সের হিসাবে নাবালক, স্কুলের ছাত্রছাত্রী — তারা এসে জুটেছে এই প্রতিবাদ জমায়েতে। কেউ কেউ এসেছে বাবামায়ের হাত ধরে; কেউ জানাল, বাড়িতে বাবা-মা-ই বলেছেন, যাও গিয়ে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করো; কেউ বলছে বাড়িতে জানলে বকবে, তাই না জানিয়েই এসেছি। কেউ কেউ একেবারে অন্য শহর থেকে চলে এসেছে। এই ছেলেমেয়েদের সবার চাহিদা এক জায়গায় এসে মিশে গেছে — পরীক্ষাব্যবস্থা স্বচ্ছ, সহজ-সরল করতে হবে; তাদের পরিশ্রমের সঠিক দাম দিতে হবে; আর সব থেকে জরুরী কথা — ধর্মের নামে, জাতের নামে, খাবার বা পোষাকের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে, বন্ধুদের মধ্যে, প্রতিবেশীদের মধ্যে বিভেদের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।


মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলায় আধা তৈরি হয়ে পড়ে থাকা ড্যামের ওপর লাফ দিয়ে স্কুলে যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। এই পথে না গেলে স্কুলে পৌঁছাতে তাদের আরও আট কিলোমিটার বেশি হাঁটতে হয়।


ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুলের পরিস্থিতি উন্নত করার আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীরা

যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ সমাবেশের প্রথম দফা বন্ধ হতে না হতেই, আমরা দেখলাম, এই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন বয়সী ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের নানারকমের সমস্যার কথা নির্ভয়ে বড়োদের সামনে তুলে ধরছে। কেউ প্রশ্ন তুলছে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়া নিয়ে, তো অন্যদের দাবী স্কুলে যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষক চাই; আবার অন্যরা স্কুলে পরিষ্কার জল, বা স্কুলের যাওয়ার ভাঙাচোরা রাস্তার মেরামতির দাবী নিয়ে প্রশাসনের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিত্যদিন খবরের পোর্টালগুলি জুড়ে স্কুল ড্রেস পরা ছাত্রছাত্রীদের মুখ ভেসে উঠছে। তারা নিজেরাই মোবাইল ফোনের সাহায্যে ভিডিও তৈরি করে তাদের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে সবার সামনে। মাত্র কয়েকদিন আগে ভাইরাল হওয়া বিহারের দুটি ছোটো ছেলের ভিডিও বার্তা সবার নজর কেড়েছে। তারা বলেছে, যদি ৫/- দামের বিস্কুটের প্যাকেটে সেই বিস্কুট নির্মাতা এবং বিস্কুটের উপাদান বিষয়ে সব লেখা থাকে, তাহলে কোটি টাকা দিয়ে তৈরি রাস্তায় কেন লেখা থাকবে না সেই রাস্তা নির্মাতাদের নাম বা কী দিয়ে তৈরি হল তার হিসাব? বিস্কুট খেয়ে ক্রেতার ক্ষতি হলে বিস্কুট কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। তাহলে নতুন তৈরি রাস্তা কয়েকদিনের মধ্যে ভেঙে গেলে কেন কেউ দোষী হয়ে শাস্তি পাবে না?

এই সময়ের মা-বাবা-বয়স্ক-আত্মীস্বজন-প্রতিবেশী-শিক্ষক-অধ্যাপক-সহ সমাজের মান্যগন্য যাঁরা — তাঁদের সবার কাছে এ এক অভিনব দৃশ্য, এক আলোভরা সময়। প্রতিদিনের জীবনধারণের লড়াইতে ব্যস্ত থাকতে থাকতে তাঁরা হয়ত পথে নামার সময়, সুযোগ বা সাহস পান নি। ন্যায্য জেনেও প্রশ্ন না করে চুপ করে থেকেছেন। আজকের জেন-জি আর জেন-আলফা তাঁদের হাত ধরে দেখিয়ে দিতে পারল যে সাহস থাকলে, শুধুমাত্র নিজের সুযোগসুবিধার কথা না ভেবে, সবাই মিলে একজোট হয়ে ভালোর দিকে, আলোর দিকে এক পা এক পা করে এগোনো সম্ভব।

এদিকে, এই সমস্ত কিছু দেখে, আর মাত্র এক মাস পরে যে আঠারো বছর পূর্ণ করবে, সেই ইচ্ছামতী কী ভাবছে? অবশ্যই ইচ্ছামতী এই সব নির্ভীক বন্ধুদের সঙ্গে থাকতে চায়। তাদের সবার মনের কথা, কথা, তাদের নিত্যনতুন ভাবনাচিন্তা, কাজকর্ম বিষয়ে নানা খবরাখবর সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়। আর ইচ্ছামতী যখন চাইছে, তখন চাঁদের বুড়ি যে তার সঙ্গে থাকবেই, সে তো সবাই জানে!

*****

আগামীকাল কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের একশো বছরের জন্মদিন। ১৯২৬ সালের ১৫ই অগাস্ট এই বিদ্রোহী কিশোর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৩ মে, ১৯৪৭। পুরো একুশ বছরও বয়স হয়নি তখন। তিনি এই দেশকে স্বাধীন হতে দেখে যেতে পারেন নি। কিন্তু স্বাধীনতার ঠিক আগের বছরগুলিতে, যখন একই সঙ্গে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বাংলায় চলছে ভয়ানক মন্বন্তর, জাতের নামে, ধর্মের নামে মানুষে মানুষে চলছে হানাহানি-কাটাকাটি — সেই অস্থির সময়ে, দেশের মানুষের জন্য নিরন্তর কাজ করার পাশাপাশি তিনি লিখেছিলে চলেছিলেন একের পর এক কবিতা। যখন তিনি লিখছিলেন, তখন তিনি নিতান্তই এক কিশোর, এক সদ্য তরুণ — আজকের দিনে হলে তাঁকেও ধরে নেওয়া হত একজন জেন-জি বা জেন-আলফা। কিন্তু সেই সব কবিতা, আজকের দিনেও মূল্য হারায়নি, বরং যেন মনে হয় এই সময়ের কথা ভেবেই লেখা। । তেমনই দুটি কবিতা রইল এইমাসের সম্ভারে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা কবিতাদুটি ফিরে পড়ে দেখার মাধ্যমেই তাঁকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই।

একই সঙ্গে আগামীকাল, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ভারত পালন করবে তার ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতা দিবসে, নিয়ম করে পতাকা তোলা, গান-বাজনা করা, মিষ্টি খাওয়া, রক্তদান শিবিরে যোগ দেওয়া, পদযাত্রা হাঁটা সবকিছুর পাশাপাশি, আমরা যেন ভুলে না যাই, এই দেশের সংবিধান, এই দেশের সমস্ত মানুষকে দিয়েছে কিছু মৌলিক অধিকার। আমরা যেন অন্য কারোর মৌলিক অধিকার কেড়ে না নিই। আর অন্য কাউকে আমাদের মৌলিক অধিকার কাড়তে না দিই।

চিঠি লেখার শুরুতে বলেছিলাম, অনেক গপ্পো জমে আছে। দেখো, কত্তোবড়ো একখানা চিঠি লিখে ফেললাম। তবুও জমা রয়ে গেল আরও কত কথা। সে সব নিয়ে ফিরে আসব শিগ্‌গির। আজ এইটুকু থাক।

ভালো থেকো। তোমার জন্য রইল আঁজলাভরা বৃষ্টির জল, বেগুনী-গোলাপি দোপাটি ফুল আর মেঘলা দুপুরে লুকিয়ে খাওয়া গত বছরের কুলের আচারের টক-মিষ্টি স্বাদ।

১৪ অগাস্ট ২০২৬
২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথগ্রহণ করছি এবং তার সকল নাগরিক যাতে : সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা,মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার স্বাধীনতা; সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি-সম্ভ্রম ও জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুনিশ্চিত করে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে; আমাদের গণপরিষদে, আজ,১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর, এতদ্দ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ করছি, বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা