
“যখন যেমন মনে করি
তাই হতে পাই যদি
আমি তবে একখানি হই
ইচ্ছামতী নদী।”
শিশু ভোলানাথের রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ষাটের কোঠায়। ছোটদের জন্য লিখছেন একের পর এক আশ্চর্য কবিতা। বয়স ছুতো। স্মৃতি, ভাষা আর কল্পনার ছু মন্তর তখনও ছুঁয়ে দেখছে শৈশবের রোদেলা উঠোন।
ইচ্ছামতী ছোটদের ম্যাগাজিন। তাই বলে বড়রা কি নেই? কে বলে নেই? বড় হওয়া আসলে ক্যালেন্ডারের ট্রিক। বাবা সুবলচন্দ্র ও তাঁর অবাধ্য ছেলে সুশীলচন্দ্রের মতো। ইচ্ছাপূরণ হলেই চিচিং ফাঁক।
আমাদের বড় হওয়ার দিনগুলোতে যখন ক্রমে গিলি গিলি গে, ছু মন্তর, চিচিং ফাঁককে সরিয়ে জায়গা করে নিচ্ছিল আব্রা কা ডাব্রা; নন্টে ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট সদ্য সদ্য বাংলা অ্যানিমেশনের হাত ধরে উঁকি মারছিল টিভির পর্দায়, সহস্রাব্দের সেই শুরুর দশকে হারমাইওনি গ্রেঞ্জারও শেখাচ্ছিল উইনগার্ডিয়াম লেভিওসা-র সঠিক উচ্চারণ — লেভি-ও-সা। কালকের শিশু আজ তিরিশের কোঠায়। অতীতের দপ্তরে সময়ের ধুলো। জেন জি, জেন আলফা, জেন বিটা আজকের অপ্রতিরোধ্য আগামী।
আমি যখন ইচ্ছামতীতে লিখতে শুরু করেছিলাম তখন সদ্য স্কুল শেষ করে কলেজে পা দিয়েছি। মাঝে গিয়েছে মহামারী, এসেছে এ আই, গ্লোবাল ওয়ার্ল্ড অর্ডারটাই গিয়েছে বদলে। চাঁদের বুড়ির আন্তরিকতা আর বকুনিতে শিখেছি অনেক। সময়ের হাওয়াগাড়ি চেপে ইচ্ছামতীও এ বছর পা দিয়েছে আঠারোয়।
***
ইচ্ছামতী প্রাপ্তবয়স্ক। প্রাপ্তি কী?
পুরোনো লেখার ক্যাটালগ ঘাঁটলে দেখা যায় অসামান্য সব মনি মানিক্য। সময়সিন্দুকে রাখা একযুগের শৈশবের হালখাতা। পাঠক প্রচুর। লেখক, শুভানুধ্যায়ীদের সংখ্যাও কম নয়।
বাড়ির হাজারো কাজে ব্যস্ত বড়োরা অনেক সময়ই নতুন সময়ের ফেরিওয়ালার ডাক শুনতে পায় না। বড়দের একটা বড় সমস্যা — সেখানে লেখক, সম্পাদক প্রমুখ সবাই-ই শিশুসাহিত্যের আয়নায় নিজেদের শৈশবকে দেখতে চায়। বোঝে না যে, নতুন সময়, নতুন সময়ের মন নতুনের চোখ দিয়ে দেখা অন্যরকম। নতুন প্রজন্ম কী কী পড়ছে, কী কী দেখছে, কী কী তাদের কাছে জনপ্রিয় — এই সবের খোঁজ রাখাও যে কোনো ছোটদের পত্রিকার জন্য প্রয়োজনীয়। জরুরি আরো বেশি বেশি করে আগামী প্রজন্মের কন্ঠস্বরকে তুলে ধরা। যে ব্যস্ততার উল্লেখ করলাম, তাতে এখন বড়দের চেয়ে ছোটদের পাল্লাও কম ভারী নয়। টাইম পত্রিকা প্যান্ডেমিকের সময় থেকেই আরম্ভ করে পারসন অফ দ্য ইয়ারের ছোটদের সংস্করণ — কিড অফ দ্য ইয়ার। বিশ্বে কাজের ছাপ ফেলতে এখন আর ছোটদের বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার খুব একটা দরকার পড়ছে না, তার অনেক আগেই তারা নজর কাড়ছে সকলের।
কিন্তু ব্যস্ততার সাথে জরুরি শৈশবকেও উপভোগ করা। হাজারো চাপের মধ্যে যেন খোলা থাকে একটু খেলার মাঠ। রাতের আকাশ। বলাই- এর মতো গাছেদের সাথে বন্ধুত্ব। জানলা খুলে যে গাছটা দেখতে পাও, তার নাম জানো? নাম না জানা মানে ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া। হিটলারের কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদি বন্দীদের নাম মুছে তাঁদের হাতে একটা সংখ্যা উল্কি এঁকে দেওয়া হত। ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হত তাঁদের ডাকনাম। পরিচিতি শুধু একটা সংখ্যামাত্র।
বাংলায় বিভূতিভূষণের লেখায় কতশত ছোট বড় জংলা গাছের নাম। কিন্তু তার অনেক অনেক নামই ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। অক্সফোর্ড পকেট ডিকশনারি গুরুত্বের দিক দিয়ে কম শব্দ সংখ্যা আঁটতে গিয়ে বাদ দিচ্ছে কম ব্যবহার হওয়া অনেক শব্দ। ফলে বাদ চলে যাচ্ছে গাছের নাম, সেই জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে ইন্টারনেটে ব্যবহার হওয়া নতুন নতুন শব্দ। বিভূতিভূষণের প্রজন্ম গাছের নাম ধরে ধরে গাছ চিনত। সেইসব গাছের ডাকনাম থাকত। আমরা যেমন ভালোবাসার মানুষকে ডাকনামে ডাকি। রবীন্দ্রনাথ কতসব গাছের, ফুলের ডাকনাম দিয়েছিলেন — অমলতাস, নীলমণিলতা, বাগানবিলাস, হিমঝুরি, অলকানন্দা, বনপুলক, মুক্তোঝুরি, অগ্নিশিখা, মধুমঞ্জরী আরো কত কী! এখন আমরা আর গাছেদের নাম ধরে চিনি না। গাছেদের ডাকনাম নেই। তার বদলে প্রযুক্তির হরেকরকম শব্দ আমাদের ঠোঁটস্থ।
***
ইচ্ছামতী একটা নদী। তার একপারে বাংলা ও বাঙালির সমৃদ্ধ জনপদ। জংলা গাছের আদুরে ডাকনাম। অন্যপারে বিশ্বসাহিত্যের-বিশ্বসিনেমার রামধনু, আগামীর আবাসন, প্রযুক্তির নগরী।
অনেকের বিশ্বাস জলের স্মৃতিধর। অতীত সভ্যতাকে লালন করেছে নদী। কিন্তু নদীর জলের বয়স কত? নদী কি পুরোনো হয়? প্রতিদিনই তো তাতে নতুন স্রোত বয়। সেই উজান বেয়ে ভেসে চলুক সবুজ মনের ডিঙি, আর হাতে আঁজলা ভরা থাকুক থৈ থৈ জল। ওয়াটার মেমরি।

