সবুজ মনের রসদ
Ichchhamoti Logo

"তোমার সঙ্গে একটা আলোচনা আছে। "
"হ্যাঁ বলো, আমি শুনছি।"
" শুনছি বলছ, কিন্তু মন দিয়ে নিজের মোবাইল স্ক্রল করে যাচ্ছ! সত্যি শুনছ কি?"
" আহ! বলোই না। আই ক্যান মাল্টিটাস্ক! "
" আচ্ছা বেশ। বলি তাহলে। তুমি তো জানো, আমি প্রতি সংখ্যায় নিজের চিঠির সঙ্গে একটা করে ছবিও দিই। মাঝেমধ্যে একের বেশিও দিই। আশ্বিন বা অক্টোবর বা শরৎকালে আমার চিঠির সঙ্গে একটা বিশেষ ছবি যায়। সেটাকে আমরা আগে বলতাম পুজোস্পেশ্যাল বা শারদীয়া পোস্টার। সেই ছবিটা আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করি। তারপর সেটাকে আঁকেন আমাদের এক প্রিয় শিল্পী। আর সেটাকে ঘিরেই আমি চিঠিটা লিখি। তা ভেবে বলো তো, এইবছর আশ্বিন- অক্টোবরের সংখ্যায় কেমন ছবি চাও তুমি? আর আমিই বা কী নিয়ে লিখি?"
" তুমি কি সত্যিই আমার কথা শুনবে? না কি সব শুনবে, তারপরে বলবে, না, এই আইডিয়া বাতিল! আমি বড়ো, আমার কথাই শেষ কথা!"
"তোমার মতামত তো আমি এর আগেও নিয়েছি। আর এখন, গত কয়েক মাসে চারিপাশে যা ঘটিয়ে চলেছ — তোমাদের জেনারেশনকে হেলেফেলা করার উপায় কি আর তোমরা রেখেছ? এখন আমাদের বুড়োদের কথা থাক। তুমি, তোমার বন্ধুরা, কী ভাবছ, কী ভাবতে পারো, সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি।"
" তাহলে বলি শোনো। আমি আর আমার বন্ধুরা, অনেক কিছু নিয়ে ভাবি। যেমন ধরো, পরিবেশ নিয়ে; মানুষের মধ্যে বিনা কারণে ধর্মের বিভাজন নিয়ে; পৃথিবীর নানা প্রান্তে চলতে থাকা যুদ্ধ নিয়ে; গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে। সারা পৃথিবী জুড়ে কত রকমের বিপদ তৈরি করে রেখেছ তোমরা বড়োরা। তোমরা বড়োরা এটা কতটা মানো আমি জানি না। আমরা কিন্তু জানি আর বুঝি।"
"হুম।"
"এইসব কারণগুলো মিলিয়েই আমার মাথায় অনেকগুলো ভাবনা ঘুরছে। সেগুলো প্রতিটাই আলাদা, কিন্তু আবার আলাদা নয়। বলতে পারি, কিন্তু তুমি শুনে হাসবে না তো?"
"প্রমিস করছি, হাসব না। মন দিয়ে শুনব।"
"নেপালে কয়েকদিন আগেই কী হল দেখলে তো?"
"হুঁ। দেখলাম তো।"
"জানো, পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, গ্লোবার ওয়ার্মিং-এর কারণে আগামী কিছু বছরের মধ্যেই সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা শহরগুলি, যেমন মুম্বই বা কলকাতা, জলের তলায় চলে যেতে পারে?"
"হ্যাঁ, সেটাও পড়েছি।"
"সেরকম কিছু যদি হয়? তখন কী হবে?"
"কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়? মানব সমাজ এই বিপদের মোকাবিলা কীভাবে করবে?"
" আমরা কি 'নোয়াজ আর্ক'-এর মত একটা বিরাট নৌকায় সব প্রজাতির প্রাণীদের আর সব রকমের মানুষদের নিয়ে চড়ে বসব? আর জলে ভাসতে থাকব?"
"শুধু নোয়াজ আর্ক কেন? ভারতীয় পুরাণেও তো রাজা মনুর গল্প আছে -এমনই এক নৌকায় করে সব প্রাণী ও বীজ রক্ষা করার। আর শুধু বাইবেলে বা আমাদের পুরাণেই না, পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাচীন সভ্যতায় এমন একই ধরনের কাহিনি রয়েছে। এই কাহিনিগুলি একত্রে 'Flood Myth' নামে পরিচিত। কিন্তু শারদীয়া আমেজের মধ্যে তোমার হঠাৎ এই কাহিনিটা মনে পড়ল কেন?"
"চোখের সামনে ওইরকম ভয়াবহ সব ভিডিও দেখলাম, তারপরেও এইসব মিথিকাল ফ্লাডের কথা মনে পড়বে না ? "
"তা ঠিক। আমিও খুবই ভয় পেয়েছি।"
" আমি দুর্গাপুজোর মিথগুলো নিয়ে একটু সার্চ করলাম। জেনেছি যে, শাস্ত্রমতে মা দুর্গা এবার ঘোড়ায় (বা হাতিতে) চেপে বাপের বাড়ি আসবেন। আর নৌকায় ফিরে যাবেন। মা নৌকায় ফিরে গেলে নাকি পৃথিবীতে শস্যের ফলন ভালো হয়। কিন্তু একই সঙ্গে বন্যা হওয়ারও চান্স থাকে। তাই ভাবলাম এমন একটা ছবি আঁকা হোক, যেখানে একটা নৌকাতে জাতি-ধর্ম বিচার না করে সবাই আশ্রয় পাবে; সঙ্গে পশুপাখিরাও আশ্রয় পাবে। আর সেই নৌকাটা দেখতে আসলে পৃথিবীর মত। ভেবে দেখো, এই পৃথিবীটাতো আসলে একটা নৌকাই, তাই না? মহাকাশকে যদি তুমি সমুদ্র ভাবো, তাহলে সেই মহাসমুদ্রে পৃথিবী নামের নৌকাতে আমরা সবাই চেপে ভেসে বেড়াচ্ছি।"
"হ্যাঁ, এইভাবে তো ভাবাই যায়।"
"আর শোনো, আমাদের এই পৃথিবী-নৌকাতে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে আমাদের নিজেদের যত লোককথা, মিথোলজি, আমাদের হেরিটেজ; সেই সবকিছুকে ভুলে গেলে চলবে না , কারণ এই সব সহজ সরল কাহিনির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস— এই পুরো ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য থাকবে একটা চালচিত্র, যেমন থাকে দুর্গাঠাকুরের পেছনে।"
"বেশ, বেশ। আর সামনে সপরিবারে দুর্গা?"
" ইয়েস অ্যান্ড নো।"
"মানে?"
" আমাদের চালচিত্রের সামনে থাকবে অনেক মানুষ। গরিব-ধনী, ফর্সা-কালো, রোগা-মোটা, বিভিন্ন ধর্মের সব রকমের মানুষ। কারণ আমাদের মনে রাখা উচিত কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার থেকে ওই দুটো লাইন -
হিন্দু না ওরা মুসলিম?— ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!
সত্যি যদি সমুদ্রের জলের নিচে কলকাতা শহর চলে যায়, সেই জল কি বেছে বেছে কারোর ঘরবাড়ি ডোবাবে আর কারোরটা ছেড়ে দেবে? নেপালে হিমবাহটা কি ধর্ম দেখে সিলেক্টিভলি মানুষের ক্ষতি করেছে?"
" কী কান্ড! তুমি তো দেখছি সত্যিই খুব বড়ো হয়ে গেছ! তুমি আমাকে এইভাবে তোমার ভাবনা বোঝাবে আমি ভাবিইনি। কিন্তু সত্যিই আমাদের ছবিতে ত্রিশূল হাতে দুর্গাঠাকুর থাকবেন না? মহিষাসুর থাকবে না?"
"তোমরা বড়োরা একে অন্যের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া, সাজ পোষাক, পুজো করার পদ্ধতি — সব কিছু নিয়ে ঝগড়া করো, এমনকি মারামারি-কাটাকাটিও করো। একজন দেবীকে পাঁচদিন ধরে কতকিছু দিয়ে পুজো করো, এদিকে সত্যিকারের মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ দাও না, নিরাপত্তা দিতে পারো না। তোমরা খুবই বোর করো আমাদের। বাট এনিওয়ে, তুমি এটাও শিখিয়েছ যে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ঠাকুর রয়েছেন। আমার আইডিয়াতে, এই ছবিতে যত মানুষ, তাদের মধ্যেই রয়েছেন দুর্গা অ্যান্ড ফ্যামিলি। আলাদা করে চেনার দরকার কী? সবাইকে ইকোয়ালি ট্রিট করো, ভালোবাসো, সেটা করলেই তো আসল পুজো হবে। 'জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।' "
"আবার স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি! তুমি আজকাল এতরকমের পড়াশোনা করছ নাকি?"
"চিল্‌! আমি এ আই -এর হেল্প নিচ্ছি এইসব জানার জন্য। দেখো, আইডিয়া দিলাম। এইবার তোমার লেখার পালা।"
"বেশ। তোমার আইডিয়াটা আমার পছন্দ হয়েছে। এমন ছবিই আঁকব আমরা। সঙ্গে কী লিখব সেটা ভাবি। তুমি আপাতত এদিকে এসো। ওই দেখো, সামনের বাগানে কেমন শিউলি গাছটা আলো করে শিউলি ফুল ফুটে আছে। ভোরে ওই ফুলগুলোই টুপটাপ ঝরে পড়বে। শিউলির মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছ তো?"
"ইয়েস।"
"বিকেলে বরং আমরা একটু বেড়াতে যাব। ক্রমশ বাড়তে থাকা শহরের সারি সারি বাক্সবাড়ির মাঝে এখনও ফাঁকা থেকে যাওয়া পোড়ো জমিতে অল্প হাওয়ায় মাথা দোলায় কাশফুলের ঝাড়। তুমি আর আমি তাদের সঙ্গে দেখা করে আসব। যখন আমরা ফিরব, চারদিকে জ্বলে উঠবে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ আলোর মালা; আশ্বিন মাস শেষ; কার্তিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। তাই মাথায় অল্প হিম পড়বে। শিরশিরে হিমের সঙ্গে মিশে ছাতিম ফুলের ঘন সুবাস আমাদের সঙ্গ দেবে। ঝুপঝুপ করে হঠাৎ বৃষ্টি না পড়লেই ভালো হয়। আমরা এদিক ওদিক দু-চারটে মন্ডপে যাব; মা-দুর্গার সঙ্গে দেখা করব। তারপর পথের ধারের ঠেলা নিয়ে দাঁড়ানো ফেরিওয়ালার থেকে প্লাস্টিক প্যাকেটে ভরা পাঁপড়ভাজা, বাদামভাজা, ভুট্টার খই কিনে খেতে খেতে ফিরে আসব। আজ তো ষষ্ঠী। আজ একটু ঘুরতে না বেরোলে হয়?"

২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
১৬ অক্টোবর ২০২৬

আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথগ্রহণ করছি এবং তার সকল নাগরিক যাতে : সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা,মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার স্বাধীনতা; সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি-সম্ভ্রম ও জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুনিশ্চিত করে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে; আমাদের গণপরিষদে, আজ,১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর, এতদ্দ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ করছি, বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা