সবুজ মনের রসদ
Ichchhamoti Logo

প্রিয়,

চাঁদের বুড়ি,

শরতের মেঘের মতো এক পশলা চিঠি যখন আমার উত্তরপাড়ার চিলেকোঠায় এসে পৌঁছালো তখন আমার মনে পড়লো ইচ্ছামতী নদীকে। মনে পড়লো তার ওপরে পাল তোলা নৌকাটাকে। আর সেই আলো ঝলমল সকালটা যেখানে মেঘের ভেলায় গোটা বিশ্বের মাঝে হামা দিতে শিখেছিল আমাদের ইচ্ছামতী ওয়েব ম্যাগাজিন। আজ তার বয়েস আঠারো। স্পর্ধায়, সাহসিকতায় এই বয়েস তো মাথা নোয়াবার নয়। আর কি আশ্চর্য সমাপতন এই বছরেই আমাদের কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ। যিনি লিখেছিলেন ‘এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’।

তোমার কি মনে আছে চাঁদের বুড়ি আমরা যখন সেই ছোট্ট ইচ্ছামতীকে নিয়ে বয়ে চলতে শুরু করলাম নিজস্ব এক ছন্দে তখনও তো আমরা নিজেদের স্বাধীন চিন্তার পরিসর থেকে সরে আসিনি। আজও যখন দেখি দেশের বিপদে খুব সংকটকালে এই দেশের তরুণরা শিরদাঁড়া সোজা করে উঠে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁদের মতবাদ, প্রতিবাদ ব্যক্ত করছেন তখন কেন যেন কবেকার এক হারিয়ে যাওয়া কবি তার সদ্য কৈশোরের ভাবুক মুখ নিয়ে গালে হাত দিয়ে আমাদের সামনে চুপটি করে বসে থাকেন। তখন একটা কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ শুধু তারমধ্যেই আটকে থাকে না। সেটা তার শব্দের, তার অর্থের, যাপনের ডালপালা নিয়ে প্রসারিত হয়ে যায় মানব সভ্যতার দিকে। তার কল্যাণের পথে। যে পথে আমরা হেঁটে এসেছি কত বহুবছর ধরে।

এখন যখন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে ফিরে তাকাই তখন মনে হয় এই যে আমরা সারাক্ষণ বলে থাকি আসলে ছোটরা ছোটই। তাদের পৃথিবী অন্যরকম। কাজেই তাদের পৃথিবী সাজাতে গিয়ে বড়োরা এবং আমার মতো বুড়োরা ভুলেই যাই তাদের কোনোদিন একটা ছোট্টবেলা ছিল। সেই ছোট্টবেলায় দূরে কাদের ছাদের ওপরে ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দিত বেগনী রঙের শাড়ি। তিনটে শালিক কুটোপাটি করে ঝগড়া করতো। ভক্তরামের নৌকা শক্ত কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরী হতো। একটা দাঁড় কাক বেজায় গম্ভীর হয়ে স্লেটে বসে বসে অঙ্ক কষতো। আর পদিপিসির বর্মিবাক্সের গল্প শুনতে বসতো ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ। এইসব কিছু ভুলে গিয়ে আমরা গম্ভীর হয়ে যাই। সিলেবাস সাজাতে গিয়ে কি কান্ডটাই না করি। আর সেইসব করতে গিয়ে ছোটদের জন্য লেখা, তাদের নিয়ে ভাবা, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো এইটা যেন আমাদের কাছে মস্ত ফাঁকি হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ আরও মজার জিনিস করে তখন। ছোটদের জন্য লিখলে তাকে এমন ভাবে দাগিয়ে দেওয়া হয় যেন তিনি এই সমাজের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কই একটা বাড়িতে সবাই মিলে একসঙ্গে থাকলেও আলাদা করে মনে করিয়ে দিতে হয় না ছোটরা আলাদা মানুষ ঠিক তেমনই বারবার কোথাও মনে করিয়ে দেওয়ার আজ আর দরকার নেই এটা শুধুমাত্র ছোটদের জন্য লেখা বা আঁকা বা ছোটদের জন্য নির্মিত ছবি।

কেন আজ ইচ্ছামতীর এই বয়ে চলার আঠারো বছর বয়সে এই কথাগুলো বারবার মনে হচ্ছে বলো দেখি চাঁদের বুড়ি? কারণ আমার মনে হয় একটা মানুষের তার নিজের ছোটবেলার মনটাকে বাঁচিয়ে রাখাটা খুব দরকার। বিশেষ করে আজকের পৃথিবীতে। যে মন পরশ পেয়েছিল আদরের, আলিঙ্গনের, সবার স্নেহ-ছায়ার। সেই ছায়াটা বেঁচে না থাকলে কী করে আবার সেই মন অন্যকে আলিঙ্গন করবে? ভালোবাসবে? আজ পৃথিবীতে সেই সরল মনটার খুব দরকার। ঠিক ইচ্ছামতীর টলটলে জলের মতোই।

আমার অনেক ভালোবাসা, শুভকামনা থাকলো সেই মনগুলোর প্রতি, সেই মানুষগুলোর জন্য যারা এখনও নিজেদের ছোটভাবে, যারা এখনও অবাক চোখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পৃথিবীকে দেখে। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে।

আর তোমার জন্য চাঁদের বুড়ি রইলো একরাশ রক্তকরবীর মুগ্ধতা। কাঠি লজেন্সের ভালোবাসা। লুকিয়ে তেঁতুলের আচার খাওয়ার আনন্দ। ইচ্ছামতী তার রঙীন পাল তুলে এগিয়ে চলুক। সবার মন রাঙিয়ে রাখো ঠিক আগের মতোই। বৃষ্টির দিনে গরম ধোঁওয়া ওঠা খিচুড়ির ঘ্রাণের মতো লেগে থাকুক প্রাণের পরম তৃপ্তি। আর চরাচর ব্যপ্ত হোক এই শরতের আলোয়, মানুষের কল্যাণে।

সবাই ভালো থেকো।

কল্লোল।

উত্তরপাড়া খেয়াঘাট, ২২ সেপ্টেম্বর।

চলচ্চিত্রবিদ্যা বিষয়ে অধ্যাপনা, তথ্যচিত্র নির্মাণ, ফিল্ম ও টেলিভিশন ধারাবাহিকের চিত্রনাট্যরচনা, এবং ফাঁকে ফাঁকে পেলে নিজের ব্লগে নানা স্বাদের লেখালিখি - বিবিধ ধারার ব্যস্ততার মধ্যে চাঁদের বুড়ির সাথে ইচ্ছামতীর প্রথম পায়ে হাঁটার দিনগুলিতে হাত ধরেছিলেন কল্লোল । এখনো সময় পেলে মাঝেমধ্যেই ইচ্ছামতীর জন্য কলম ধরেন হুগলী, উত্তরপাড়া নিবাসী কল্লোল।

আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথগ্রহণ করছি এবং তার সকল নাগরিক যাতে : সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা,মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার স্বাধীনতা; সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি-সম্ভ্রম ও জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুনিশ্চিত করে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে; আমাদের গণপরিষদে, আজ,১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর, এতদ্দ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ করছি, বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা