
ছোটবেলায় যখন ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের ছড়া বা সুকুমার রায়ের আবোলতাবোল পড়েছিলাম তখন কীভাবে যেন আমার নিজেরও ছড়া লিখতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল। ছন্দ কী জিনিস বুঝতাম না, শুধু মনে হতো প্রতি লাইনের শেষ শব্দগুলো মিলিয়ে পরপর অন্তত চার লাইন লিখতে পারলেই ছড়া তৈরি হয়ে যায়। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন কতকটা এরকম ভেবেই আমি দুটো তিনটে আমার নিজস্ব ‘ছড়া’ লিখে ফেলেছিলাম। ছড়া তো লিখে ফেললাম, কিন্তু তারপর? অন্য স্কুলের মতো আমার স্কুলে মাসিক বা বার্ষিক ম্যাগাজিন বেরোত না, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের লেখা ছাপার অক্ষরে পাওয়া যেতে পারে। তাই বাবা-মায়ের সংযত প্রশংসা ‘মোটামুটি হয়েছে, তবে পড়াশোনায় মন দাও’ বা বন্ধুদের হাসাহাসি দেখে বুঝতেই পারতাম না আদৌ ভালো লিখেছি কী না। তাই মনে হতো কেউ যদি যত্ন করে লেখাগুলো পড়ে, ভালো কিছু বলে (ভালোটাই শুনতে মন চাইতো 😊) বা চিঠি লিখে উত্তর দেয় তাহলে খুব ভালো লাগবে। আমি তখন জানতামও না কোথাও ছোটরা লেখা পাঠাতে পারে কী না… আর আমি পঁচিশোর্ধ্ব হওয়ার পর সেই খবর জানতে পেরেছিলাম।
‘ইচ্ছামতী’ ছিল শুধুই ছোটদের জন্য। যখন আমার সবচেয়ে কাছের দিদি তিথিদির থেকে এই পত্রিকা বা ওয়েবজিনের খোঁজ পেয়েছিলাম তখন বিষয়বিভাগের রকমফের দেখে যারপরনাই চমকে গিয়েছিলাম। ছোটদের মনের আনাচেকানাচে যত প্রশ্ন, যত খোঁজ উঁকি দেয় সবকিছুর একটি আসর হলো ইচ্ছামতী। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল আমার ছোটবেলার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে - ইচ্ছামতীতে ছোটরা তাদের মন উপুড় করে দিতে পারে, গল্প বলতে পারে, ছড়া পাঠাতে পারে, কোনও বিষয় নিয়ে তাদের মতামত থাকলে তাও শোনাতে পারে, তাদের মনের অজানা কিছু যদি সাদা পাতায় বিভিন্ন রঙে সেজে ওঠে তাও তারা পাঠাতে পারে।
ছোটদের জন্য প্রতি মাসে ভালোবেসে সেজে উঠতো ইচ্ছামতী। ইচ্ছামতী ডিজিটাল পত্রিকার একদম প্রথমে থাকে চাঁদের বুড়ির চরকা-চিঠি। যখনই সেই চিঠি পড়ি মনে হয় কেউ সত্যিই অনেক দূরে কোথাও (চাঁদের মতোই) বসে ছোটদের দেখছে আর ভালোবেসে তাদের ইচ্ছেপূরণ করছে। আমার ছোটবেলায় চিঠি পাওয়ার যে আনন্দ খুঁজতাম, তাই ভেসে ওঠে মনে। চিঠি পড়ে নিয়ে ছোটরা আর তার সঙ্গে বড়রাও (তাদেরও পড়তে-দেখতে নেই মানা) ডুব দিতে পারে বিভিন্ন বিভাগের বিষয়গুলোতে।
যেমন কল্প জগতের গল্প পড়তে চাইলে ‘গল্প-স্বল্প’ বা ছড়া, কবিতা পড়ে দুলতে চাইলে ‘ছড়া-কবিতা’ বিভাগে ঢুঁ মারতেই হয়। নানা অজানা কাহিনীতে রোমাঞ্চিত অনুভব করলে ‘জানা-অজানা’, রূপকথা বা পুরাণ পড়তে ভালো লাগলে ‘রূপকথা’, ‘পুরাণকথা’ বা ‘মহাকাব্যের গল্প’ বিভাগে ঢুকে হারিয়ে যেতে হয়। ছোটদের চলচ্চিত্র বা বই নিয়ে আলোচনা পড়ে ঋদ্ধ হতে চাইলে ‘ছবির খবর’ বা ‘বইপোকার দপ্তর’-এ যেতেই হয়। খেলার নানা টুকিটাকি জিনিস নিয়ে জানতে চাইলে ‘এক্কা দোক্কা’, নিজে হাতে কিছু বানাতে চাইলে ‘সৃজনী’, বিশেষ কিছু মানুষ যারা জীবনে অনেক মানুষকে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের ব্যাপারে পড়তে চাইলে ‘মনের মানুষ’ বিভাগে যেতে হয়। এছাড়া ‘নাটক’, 'ফটোগ্রাফি’, ‘দেশে বিদেশে’, ‘টুকরো খবর’ আরও নানা বিভাগ রয়েছে। তবে এই এত বিবিধ বিষয়ের মাঝে আমার সবচেয়ে প্রিয় হলো ‘পরশমণি’ এবং ‘আনমনে’। বিজ্ঞান, আবিষ্কার, সভ্যতার অগ্রগতি, গবেষণার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আশ্চর্য অনেক কাহিনী জানতে পারা যায় ‘পরশমণি’ বিভাগে। যেকোনো সময়ে দাঁড়িয়ে শিশু-কিশোরদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে, ভাবাতে পারে এই বিভাগের লেখা, ছবিগুলো। আর মানুষের জীবনের নানা টুকিটাকি মনকেমন করা নিটোল অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া হয় ‘আনমনে’ বিভাগে, যেখানে আমি একসময় লেখক সন্তোষ কুমার রায়ের নিজের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা পড়েছিলাম। ছোটবেলায় নিছক গল্প শুনে যে শান্তি পেতাম, তাই অনুভূত হতো বারবার।
এতগুলো বিভিন্ন লেখাকে প্রতি মাসে সুচারুভাবে সুনির্দিষ্ট বিভাগগুলোয় ভাগ করে এই ওয়েবজিনকে বছরের পর বছর যিনি একা হাতে সামলে ছোটদের তথা বড়দের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি হলেন ইচ্ছামতীর সম্পাদিকা মহাশ্বেতা রায়, আমাদের মহাশ্বেতা দিদি ❤️।
ইচ্ছামতী ওয়েবজিনে আমারও একটি-দুটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তবে তার জন্য মহাশ্বেতাদিকে একটু সমস্যার মধ্যেই পড়তে হয়েছে বলে মনে হয়। আমি হলাম ট্রেন ফেল করা সেই সাধারণ ছাত্র, যে ট্রেন ধরতেও পারে না, কিন্তু ক্লাস কামাই করে আনন্দ করতে না পেরে কষ্ট পায়। তাই লেখা দিতে চেয়েও সময়ে দিতে না পারার জন্য দিদিকে ব্যস্ত হতে হয়েছে কিছুবার। দিদি নিজগুণে ক্ষমা করতে পেরেছে বলেই মনে হয়।
ইচ্ছামতী ওয়েবজিনের বয়স ১৮ হল। মহাশ্বেতাদির কথায়, ইচ্ছামতী সাবালক হয়ে উঠতে চলেছে এবার, তাই শুধু ছোটদের পৃথিবীর জন্য নয়, আমাদের দেশ-পৃথিবীর ব্যাপারে ছোটদের মতামতও গুরুত্ব পাবে। সমাজ-পৃথিবীর নানাস্তরের মানুষ, তাদেরকে প্রভাবিত করা বিভিন্ন ঘটনা, বিষয়ের ব্যাপারে এবার থেকে জানা যাবে ইচ্ছামতীতে।
ইচ্ছামতীর বয়স এভাবেই বাড়তে থাকুক। ইচ্ছামতী আর সম্পাদিকা দুজনেই ভালো থাকুক।

