
চলো এবার টাইম মেশিনে চড়ে ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর পৌঁছে যাই । স্থান কলকাতা। ওই দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলেন এই তিনজন। তিনজনেরই মন উৎফুল্ল , নেই কোন চিন্তা । যদিও খুব ভাল করেই জানেন এই অভিযানই তাদের শেষ অভিযান । আর তাঁদের জীবনেরও । কারন রাইটার্স এ একবার ঢুকলে আর জীবিত অবস্থায় বেরনো যাবে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে না হলে সব বানচাল হয়ে যেতে পারে। টার্গেট ছিল কারা বিভাগের অধ্যক্ষ সিম্পসন সাহেব। সিম্পসন এর নির্দেশে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের রাজবন্দীদের ওপর চরম অত্যাচার করা হয়। সুভাষ চন্দ্র বসু এই সময় আলিপুর জেলে বন্দি ছিলেন। তিনিও পুলিশের নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি । সুভাষ বসুর গায়ে হাত তোলা বিপ্লবীরা কোন মতেই বরদাস্ত করতে পারেননি । মুলত এই কারনেই বিভি দল পরিকল্পনা করে সিম্পসনকে উচিত শাস্তি দেবার। রাইটার্স-এ তাবড় তাবড় ইংরেজ অফিসাররা বসতেন । রাইটার্স অভিযানের গুরু দায়িত্ব পেয়ে তিনজনই খুব খুশি। কিন্তু রাইটার্স সম্পর্কে এরা বিশেষ কিছু জানতেন না। কলকাতার রাস্তা ঘাটও ভাল চিনতেন না। তাই আগের দিন বাদল গুপ্ত একজন বিপ্লবী বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ভাল করে রাইটার্স বিল্ডিংস এর বাইরেটা চিনে নিয়েছিলেন। পরের দিন ৮ ই ডিসেম্বর একটা ট্যাক্সি থেকে তিনজন সুসজ্জিত যুবক রাইটার্স এর সামনে নামলেন । সময় তখন বেলা বারোটা । সিকিউরিটির নজর এড়িয়ে একটা মাছিরও গলার সাধ্য নেই। কিন্তু বিনয় বাদল দীনেশ কোন বাধা পেলেন না। উল্টে সিকিউরিটির লোকজন তাদের লম্বা সেলাম ঠুকে বসল । হ্যাট কোট টাই পরা তিন সুদর্শন যুবককে তারা ভেবে বসলো বড় দরের অফিসার নিশ্চয়ই সাহেবদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। কাজেই কেউ তাদের পথ আটকাল না। কেউ কোন সন্দেহ করলো না। ওরা তিনজন কোন কিছু ভ্রুক্ষেপ না করে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলেন। তারপর দরজা ঠেলে সিম্পসন এর ঘরে ঢুকলেন । সাহেব কিছু বোঝার আগেই গর্জে উঠল ওদের পিস্তল। সাহেবের প্রাণহীন দেহ পড়ে রইল চেয়ারে। এদিকে গুলির শব্দে সবাই হই হই করে ছুটে এসেছে। দাবানলের মত খবর ছড়িয়ে পড়ল যে রাইটার্স দখল করে নিয়েছে বিপ্লবীরা। কয়েকজন জাঁদরেল অফিসার প্রান নিয়ে পালিয়ে বাঁচলেন ।

শহীদ বাদল গুপ্ত
এর পরের কিছুক্ষণ শুধু পুলিশের সাথে গুলি বিনিময়। চারদিকে কান ফাটানো গুলির শব্দ, বারুদের গন্ধ আর কান ফাটানো চিৎকার বন্দে মাতরম। বাইরে কৌতূহলী লোকজন ভিড় জমিয়েছে। সবার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা । লালবাজারের পুলিশ কমিশনার টেগার্ট সাহেব কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে দোতলায় উঠে পড়লেন । দুপক্ষের মধ্যে চলল গুলি বিনিময়। বেশ কয়েকজন ইংরাজ কর্মচারী আহত হলেন। অসাধারন ক্ষিপ্রতায় ওরা এতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের রক্ষা করে আসছিল । ইতিমধ্যে বাদলের গুলি ফুরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে পটাশিয়াম সায়ানাইডের পুরিয়া বার করে মুখে ঢেলে দিলেন। আঠারোর তরুন বাদল যাত্রা করলেন অমৃত লোকে । আঠারো বছর বয়স কি দুঃসহ । বিনয় এবং দীনেশ নিজেদের পিস্তলের শেষ গুলি নিজেদের ওপরই প্রয়োগ করলেন। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু হল না। তাঁদের দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হল। কিছু দিন পর দুজনেরই অবস্থার উন্নতি হল। বিনয় জানতেন যে সেরে উঠলেই পুলিশ তাঁকে জেলে পুরবে অকথ্য অত্যাচার চালাবে। তাই তিনি ঠিক করলেন আর সুস্থ হবেন না। এরপর যা করলেন ভয়াবহ! নিজের ক্ষতস্থান এর ব্যান্ডেজ খুলে আঙ্গুল দিয়ে খুঁচিয়ে দিলেন। ভীষণ কষ্ট হয়েছিলো তাঁর । ক্ষতস্থান সেপ্টিক হয়ে তিনি মারা যান । বয়স হয়েছিল চব্বিশ । ভাবতে অবাক লাগে যে একজন মানুষ কতখানি ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন নিজের দেশ মায়ের জন্য। বেঁচে থাকলে তিনি ডাক্তার হতেন। তাই তিনি জানতেন ক্ষতস্থান এর ঠিক কোথায় আঘাত করলে মৃত্যু ত্বরান্বিত হবে। একজন সন্তান তাঁর কেরিয়ার জীবন সব কিছুই বিসর্জন দিলেন। দীনেশ সুস্থ হলে তাঁকে ফাঁসী দেওয়া হয়।
এই পুরো ঘটনা আমরা সবাই জানি। তবু আর একবার তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। যাদের জন্য আজ আমরা স্বাধীন হয়েছি তাদের ভুলে গেলে চলবে না। সেই সংগ্রামের দিনগুলিতে কতো মায়ের কোল যে খালি হয়েছে তার হিসেব হবে না। সেই সংগ্রামের কাহিনী সেই আত্মত্যাগের কথা মনে রাখতে হবে আজীবন । আর সেই আদর্শ থেকে কখনই যেন আমরা সরে না আসি। আমাদের দেশে একের পর এক মহান বীর জন্ম নিয়েছেন তাই আমরা গর্বিত যে আমরা ভারতবাসী ।
চলো সবাই জোর গলায় বলি একবার বন্দে মাতরম।
ছবিঃসংগৃহীত

