
'ইচ্ছামতী'র সঙ্গে আমার একটা আত্মিক বন্ধন রয়েছে। প্রথম সংখ্যায় লীলা মজুমদারকে নিয়ে ছোট্ট একটা লেখা লিখেছিলাম 'সত্যি আর স্বপ্নের লুকোচুরি'। তার ঠিক এক বছর আগে, সেপ্টেম্বর মাসেই ডক্টরেট গবেষণার জন্য নিবন্ধীকরণ করাই - যে গবেষণার অন্যতম মুখ্য শিশুসাহিত্যিক ছিলেন লীলা মজুমদার। সেভাবে দেখতে গেলে, ওটাই আমার গবেষণা শুরু করার পরে প্রথম প্রকাশিত লেখা। বন্ধু কল্লোল জানত আমার গবেষণার বিষয় এবং সেইই চাঁদের বুড়ি মহাশ্বেতাকে আমাদের সবার অত্যন্ত প্রিয় লেখককে নিয়ে কিছু লেখার জন্য আমার কথা বলে। ব্যস! সেই শুরু হল। সেই প্রথম সংখ্যাতেই 'মনের মানুষ' বিভাগে আমার লেখা ছিল আর 'ফিরে দেখা' বিভাগে আমার মেয়ের হবু বাবার লেখা ছিল। তারপরে মেয়ের জন্ম এবং একটু বড় হতে না হতেই ক্রমে ইচ্ছামতীর সঙ্গে পারিবারিক সংযোগ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। ২০০৮ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর ইচ্ছামতীর আত্মপ্রকাশ আর তার ঠিক এক বছর দুদিন পরে আমার আত্মজার ধরাধামে আগমন। আমার কন্যারত্নের প্রথম আঁকা ছবি, প্রথম লেখা গল্পের প্রয়াস, এমনকী প্রথম সিনেমার রিভিউ অবধি সবই তার হাত ধরে। বাংলায় হাত মকশো করার জন্য এত সুন্দর এক আবোল তাবোল মঞ্চ যেখানে লেখা আঁকার মধ্যে দিয়ে শিশু মনের কল্পনা জগত প্রসারিত হয়, সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটে , এমন একটা জায়গা পেয়ে সত্যিই যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলাম এবং সেকারণে আজও চাঁদের বুড়িকে আন্তরিক এবং অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জানাই। একদম প্রথম দিকে, এবং পড়তে না পারলেও নিজেকে 'লেখক' ভাবতে পারার প্রথম গর্ব আর ভালোলাগাটুকু আমার শিশুকন্যাকে উপহার দিয়েছে 'ইচ্ছামতী'। মনে আছে প্রথম একটা উৎসবের ছবি বলে ফিঙ্গার পেইন্টিং করা একটা নানা রঙের সমাহার যেবার প্রকাশিত হয়েছিল তখন তার তিন বছর। তারপরে আরেকটা ছবি এঁকেছিল চাঁদিপুর বেড়াতে গিয়ে। সেই ছবির সঙ্গে যে গল্পটা বা ঘটনাটা ও বলেছিল সেটা আমি লিখে দিয়েছিলাম। ছবিটা ছিল নীল আর গাঢ় সবুজের মিলমিশ একটা অসমান পুঞ্জীভূত প্রায় বৃত্ত। ছবিটা সম্পর্কে বলেছিল - 'নীলটা সমুদ্র আর সবুজটা গাছপালা। সমুদ্রে বৃষ্টি পড়ছিল। গাছটা উড়ে এসে সমুদ্রে পড়ল। দুই ডানায় উড়ে উড়ে এল...কিন্তু গাছের কি ডানা থাকে? না, না...গাছটা ঝড়ে উড়ে এসে সমুদ্রে পড়ল - বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ও হচ্ছিল তো...এই ছবিটা আমি এঁকেছি।' এভাবেই শুরু, তারপর গল্প, ফিল্ম রিভিউ এসবও অগাধ স্নেহ আর প্রশ্রয়ে নিজের পাতায় স্থান দিয়েছে 'ইচ্ছামতী' আর সেসব রীতিমত পাঠকের বাহবাও কুড়িয়েছে! সে বাহবাও অনেকটা স্নেহের দান বটে কিন্তু আসল কথা হল একটি শিশু মনের সৃজনশীলতাকে এভাবে উৎসাহিত করে হাত পাকাতে দেওয়ার জায়গা যখন ক্রমে লুপ্ত প্রায়, সেখানে এইরকম যা ইচ্ছে তাই লিখে আর এঁকে কল্পনা আর বাস্তবের মিশেলে মনের ভাব প্রকাশ করতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই চাঁদের বুড়ির আভূমি কুর্নিশ প্রাপ্য।
আরও আছে। আজকের দিনে একক প্রচেষ্টায় বাংলায় এরকম একটি ওয়েব পত্রিকা আঠারো বছর ধরে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নাকি! মনে আছে, প্রথম প্রথম কেউ কেউ চাঁদের বুড়িকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিল এই বলে যে এসব ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর প্রচেষ্টার কোন মানে হয় না এবং এটা কতদিন চালাতে পারবে ও? সেই উত্তর আজ আলাদা করে দেওয়ার দরকার নেই। মাঝে মাঝে একটু বিরতি, একটু অনিয়মিত হয়েছে হয়ত নানাবিধ কারণে কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়নি সে। যখন চাঁদের বুড়ি আমাকে ব্যক্তিগত কথোপকথনে জানিয়েছিল সেই সব নেতিবাচক কথাবার্তা, আমি একদম নিজের স্বার্থেই বলেছিলাম ও যেন লেগে থাকে। 'ইচ্ছামতী' যেন বয়ে চলে আপন গতিতে। কারণ, আমার মত একজন অভিভাবক মাত্রেই জানবে তাঁর ইংরিজি মাধ্যমে পড়াশুনো করা, শিশুর জন্য, বিশেষত সহপাঠীদের মধ্যে স্কুল পাঠ্যের বাইরে বাংলা বই পড়া, লেখা এসবের সেভাবে প্রচলন না থাকা পরিস্থিতিতে,বাংলায় ভাবা, এবং লেখা অভ্যাসের জন্য এমন একটা মঞ্চের মূল্য ঠিক কতটা! যদিও সম্পাদকের মতে, কতজনকেই তো উনি বলেছিলেন বাচ্চার আঁকা লেখা দেওয়ার জন্য, কিন্তু বাচ্চাকে দিয়ে আঁকিয়ে লিখিয়ে উৎসাহ দিয়ে , নিজে বাংলায় টাইপ করে দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়ার কাজটুকু আমার মত কতিপয় অভিভাবকই করে থাকেন কাজেই ঋণ ইত্যাদি ওসব উভয়ত! কিন্তু আমি জানি যে আমার কাছে , আমার মেয়ের জন্য 'ইচ্ছামতী' ঠিক কতটা সদর্থক ভূমিকা পালন করেছে! এখন তিনি বড় হয়েছেন, ব্যস্ত হয়েছেন, আগামী বছর তিনিও প্রাপ্তবয়স্ক হবেন, বড়ই ব্যস্ত স্কুলের হাজারো পড়াশুনো এবং অন্যান্য সৃজনশীল এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ে। সময় পান না । কিন্তু এখনোও পুরোনো লেখা দেখলে আগের মতোই ছোট হয়ে যান। আনন্দ পান।
এতো গেল মেয়ের কথা। আমি নিজেও লেখক হিসেবে এখানে হাত খুলে লেখার অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছি। ছোটদের মনোজগত বরাবরই আমাকে আলাদা আকর্ষণ করে, তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে, গল্প করতে, তাদের জন্য লিখতে আলাদা সুখ , আলাদা শান্তি। এটা চাঁদের বুড়ি খুব ভালোভাবে জানে। তাই ঠিক লিখিয়ে নেয় সময়মতো। বিভিন্ন ধরণের লেখা লিখেছি এখানে। প্রবন্ধ, গল্প, ভ্রমণ বৃত্তান্ত এমনকি মেয়ের নানা কীর্তি নিয়ে 'কুটুস' বলে একটি কমিকস ধারাবাহিক অবধি! দুর্ভাগ্যবশত গ্রাফিক্স এর শিল্পী ও অন্যান্য কিছু জটিলতার কারণে কয়েকটি পর্ব প্রকাশের পরে আর এটি চালানো যায়নি কিন্তু আমি মেয়ের ছোটবেলার নানা মজাদার কাহিনী এই সুযোগে ছোট ছোট করে লিখে ফেলেছিলাম। ফিরে তাকালেই মন কেমনের ভালোলাগায় ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি অবধারিত ভাবে এসে পড়ে।
আবার 'ইচ্ছামতী'র দশ বছরের ভরসা পূর্তিতে একই সংখ্যায় পরিবারের তিনজনেই ঠাঁই পেয়েছিলাম । সেও তো এক অমূল্য অনাস্বাদিত মজার অনুভূতি ! কখনো মা মেয়ে দুজনেরই লেখা বেরিয়েছে একসঙ্গে! বড্ড দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্লভ সেসব মুহূর্ত আমার কাছে। পাঠক হিসেবে আরও অন্যান্য পারিবারিক পত্রিকা কিছু আছে হয়ত, কিন্তু 'ইচ্ছামতী' আমাদের সেই একমাত্র পারিবারিক বাংলা ওয়েব পত্রিকা যা কিনা আমাদের তিনজনেরই লেখক -শিল্পী সত্ত্বাকে সম্মান জানিয়েছে, কখনো আলাদা ভাবে কখনো বা একই সংখ্যায়! আমাদের লেখাগুলো ফিরে দেখতে বা নতুন করে পড়তে ইচ্ছে করলে আমার নাম মৌপিয়া, মেয়ের নাম মরমিয়া, কুটুস আর মেয়ের বাবার নাম শঙ্খ দিয়ে 'ইচ্ছামতী'তে অনুসন্ধান করলে পেয়ে যাবেন। সম্ভব হলে জানাবেন কেমন লাগলো। খুব ভালো লাগবে এবং কৃতজ্ঞ থাকব। আগাম ধন্যবাদ জানিয়ে রাখলাম। আসলে এই লেখাটা লেখার জন্য আমিও ফিরে ফিরে দেখছি পুরোনো পাতাগুলো আর কত যে স্মৃতি সব ভীড় করে আসছে! অদ্ভূত ভালোলাগায় মন ভরে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে মেয়ের চোখের কোণে বড় একটা ফোঁড়া অস্ত্রোপচার করতে হল। কিন্তু তার পরের দিন যখন ইচ্ছামতীর পাতায় নিজের আঁকা লেখা দেখলো…তখন সেই সদ্য ছ'য়ে পা দেওয়া বালিকার মুখে যে স্বর্গীয় অনাবিল হাসি ফুটে উঠেছিল তার মূল্য কীভাবে পরিমাপ করব? আগামী ২৯শে সেপ্টেম্বর সেই মেয়ে সতেরোয় পা দেবে । আর তার দু'দিন আগেই 'ইচ্ছামতী' তথাকথিত প্রাপ্তবয়স্ক হবে। এই আঠারোর জন্মদিনে, 'ইচ্ছামতী'র জন্য মেয়ের মুখের সব ব্যথা উপশম করে দেওয়া সেই হাসিটাই উপহার হিসেবে রইল আমাদের মা মেয়ের তরফ থেকে। আন্তরিক অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা সহ ধন্যবাদ চাঁদের বুড়িকে। ভালো থেকো তোমরা। আরও আঠারো আসুক। জন্মদিনের আন্তরিক অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা 'ইচ্ছামতী'।

