খেলাঘরখেলাঘর

festival of lights

বহু বছর আগের কথা। তখন আসানসোল আজকের মত জনবহুল শহর ছিল না।ছিল না এত ব্যস্ততা। মহকুমা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে মাত্র। ধস ধস শব্দ করে হাজার রকমের কলকব্জা পেটে পুরে ই-আই-আর লাইনের ইঞ্জিন যাওয়া আসা করত হরদম। ভোঁস ভোঁস করে ধোঁয়া ছাড়ত বিশাল বিশাল স্টীম ইঞ্জিন গুলো। দূরে আকাশে কুন্ডলি পাকাতে পাকাতে মিশে যেত সেই ধোঁয়া। জানলায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে দেখত হিল্ডা। সামনে ফাঁকা মাঠ আর ঝুপড়ি জঙ্গল, তার ওপাশে কাঁটা তারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে ইঞ্জিনের চাকা ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক, ওর মনটাও যেন চলত সেই সঙ্গে। ফাদার বলতেন, "বাছা, জানলা বন্ধ করে দাও"। নিঃশব্দে জানলা বন্ধ করে সরে যেত হিল্ডা।

সেই কোন ছোট্টবেলায় ফাদার জেকব হিল্ডাকে এনেছিলেন এই মিশনারি স্কুলে, কোথায় তার বাড়ি ছিল, কিছুই তার মনে পড়েনা। এখানেই সে পড়াশোনা করে। শহরের একপ্রান্তে এই মিশনারি স্কুল ই তার বাড়িঘর সবকিছু। এই স্কুলে পড়াশোনা করে খনি অঞ্চলের গরিব দুঃখী ছেলেমেয়েরা আর থাকে অনাথ শিশুরা। ফাদার হিল্ডাকে একদম ছোট ছেলেমেয়েদের দেখাশোনার ভার দিয়েছেন। হিল্ডা তাদের সাথে গল্প করে, খেলা করে। মিশনের গরুগুলোকে জল দেওয়া, বাগানের ছোট ছোট চারাগাছগুলোর যত্ন নেওয়া তার কাজ। সন্ধ্যায় যখন গীর্জার ঘন্টা বাজে ঢং ঢং করে, সেই শব্দে উড়ে যায় ঝাঁকে ঝাঁকে বক, কাক, আরো কতরকমের পাখি। হিল্ডা অবাক হয়ে দেখে ওদের মুক্ত ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যাওয়া। এক চক্কর দিয়ে আবার এসে বসে গাছে। তখন ফাদার পিয়ানো নিয়ে বসেন। প্রার্থনা হয়ে গেলে হিল্ডা কে গান শেখান। বড়দিনের উতসবে হিল্ডা সেই গান গায়।

হিল্ডা হাঁটে চলে নিঃশব্দে, পরনে তার সাদা পোশাক, মুখে তার যেন সর্বদা এক বিষাদের ছায়া। দূরে দেখা যায় মস্ত ইঞ্জিন ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঘাসের গালিচা ভেদ করে আঁকাবাঁকা লাইনের উপর দিয়ে চলেছে। হিল্ডার মন চলে যেতে চায় তার সঙ্গে। সে ভাবে তার পরিবার কেমন ছিল, তার বাবা মা কারা ছিলেন, তার কোন ভাইবোন ছিল কিনা... ফাদার তাকে বলেছেন ঈশ্বরপুত্র যিশু যেমন সবার পিতা, তেমন তারো পিতা। চারিপাশের জীব -জন্তু মানুষ সবাইকে ভালবাসতে হবে , তাহলেই যিশুকে ভালবাসা হবে। ঈশ্বরের ভালবাসা পেতে হলে কোন কঠিন তপস্যার প্রয়োজন নেই, চাই শুধু নিঃস্বার্থ ভাবে নিজের কাজ করে যাওয়া।

দিন যায়, শরত গিয়ে হেমন্ত আসে, নিস্তরঙ্গ জীবনে মাঝে মাঝে এখানে ওখানে ছোট ছোট ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঢেউ ওঠে। হেমন্ত ও চলে যায়, আসে শীত। সন্ধ্যের আগেই অন্ধকার নেমে আসে। অন্ধকার যত গাঢ় হয়, শীত ও যেন জাঁকিয়ে বসে তত। দেখতে দেখতে খ্রিসমাস এসে গেল। ফাদার হিল্ডাকে এক নতুন দায়িত্ব দেন খ্রিসমাস এর জন্য গীর্জা সাজানোর।

স্কুলের বাগানের চারাগাছগুলো ভরে ওঠে নানারকম মরসুমি ফুলে। হঠাত হিল্ডার গতিবিধি যেন পালটে যায়। এখন হাঁটলে তার পায়ের শব্দ পাওয়া যায়, পোষাকে আশাকে যেন একটা উজ্জ্বলতার ছোঁয়া। হাতে নানা জিনিষ পত্র নিয়ে সে ফাদারের ঘরে দিনে কতবার যে আসাযাওয়া করে, তার হিসাব থাকে না। এখন আর সে জানলায় দাঁড়িয়ে থাকে না।

আজ খ্রিসমাস ইভ, কাল খ্রিসমাস ডে। স্কুলের পেছন দিকের ছায়া ঘেরা বনপথ দিয়ে ফাদার, স্কুলের শিক্ষকেরা, আর ছেলেমেয়েরা গীর্জায় আসে। দূর থেকে দেখা যায় দরজায় দরজায় প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে আলোর মালা যেন। মোম জ্বেলে আলোকময় করে তোলা হয়েছে চারদিক। সব দীপ জ্বালিয়েছে হিল্ডা। নিজের হাতে হিল্ডা তৈরি করেছে নানা জিনিস, আর অনেকগুলি ছোট চ্যাপেল। চ্যাপেলগুলিতে আছে পরমপিতা যিশুর জীবনের সমস্ত ঘটনার বর্ণনা। হিল্ডার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ফাদার দেখলেন, হিল্ডা তেমনি নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু মুখের উপর থেকে সরে গেছে সেই বিষাদের আবরন, আলোয় উদ্ভাসিত তার শান্ত মুখে যেন লেগে আছে একটুখানি মুক্তির হাসি। ফাদার বুঝলেন ঈশ্বরের কাজের মাঝে থেকেই হিল্ডা আজ অনুভব করেছে ঈশ্বরের ভালবাসা।

ই-আই-আর লাইনে ইঞ্জিন যাচ্ছে ধস ধস করে। অন্ধকারে ধোঁয়ার কোন আভাস ই দেখা যায়না। দেখা যায় শুধু শত শত মোমের আলোর রোশনি। সেই আলোয় সবার ই মুখ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ফাদার, হিল্ডা আর গীর্জায় আসা অনেক মানুষের।

 

 

ছন্দা দে
রূপনারায়ণপুর

এই লেখকের অন্যান্য রচনা