খেলাঘরখেলাঘর

bioscoper barokotha

চার্লি চ্যাপলিন, লরেল -হার্ডি, গুপি গাইন বাঘা বাইন, বাড়ি থেকে পালিয়ে, সোনার কেল্লা, সাউন্ড অফ মিউজিক, স্পাইডারম্যান, হ্যারি পটার- নামগুলোকে একসাথে বললাম কেন? - কারণ, এগুলি সব আমাদের অত্যন্ত প্রিয় কতগুলো ফিল্ম বা ছবি এবং চরিত্রের নাম। প্রজাপতির মত গোঁফ ওয়ালা চার্লি, আর মোটা হার্ডি -রোগা লরেল এর কান্ডকারখানা দেখে আমরা হেসে লুটিয়ে পড়ি, গুপি-বাঘার গান শুনে মুগ্ধ হই, সোনার কেল্লায় ছোট্ট মুকুলকে খুঁজতে বেরই ফেলুদার সঙ্গে, আবার স্পাইডারম্যান আর হ্যারি পটার এর আশ্চর্য সব ক্ষমতা দেখে তো চোখ একেবারে গোল গোল হয়ে যায়! কিন্তু দেখতে দেখতে কখনো ভেবে দেখেছ কি, কিরকম ভাবে শুরু হল এই সব ফিল্ম বা ছবি তৈরি? কারা প্রথম ভেবেছিলেন এই আশ্চর্য মাধ্যমের কথা, যা কিনা জীবন কে অনুকরন করবে? যে মাধ্যমে চরিত্র রা সব কথা বলবে, গান গাইবে, নাচ করবে, যুদ্ধ -মারামারি ও করবে, আবার ভালবাসার কথাও বলবে! যে মাধ্যম ভালো বই এর মত আমাদের শোনাবে এবং দেখাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কত রকমের গল্প !

হয়েছিল কি, উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে, অর্থাৎ প্রায় একশো বছরের ও বেশ কিছু আগে, যাঁরা ছবি নিয়ে মাথা ঘামান, তাঁরা সবাই চাইছিলেন যে কি করে ছবিকে গতি দেওয়া যায়। কেননা তাহলে চলমান ছবির এই মিছিল হয়ত বাস্তবের আরো কাছাকাছি আসবে।আটলাণ্টিকের এপারে ও ওপারে নানা গুণী মানুষ এইসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন ইংল্যান্ড এর ফটোগ্রাফার এডোয়ার্ড মাইব্রিজ। তিনিই প্রথম একটি চলমান ঘোড়ার ছবি তোলেন , ঘোড়ার চলার পথের পাশে সারি সারি অনেকগুলি ক্যামেরা বসিয়ে। ওদিকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন টমাস আল্ভা এডিসন, যিনি আমাদের কাছে বেশি পরিচিত "লাইট বালব" এর উদ্ভাবক হিসাবে। তিনি উদ্ভাবন করেন "কিনেটোস্কোপ" নামে এক যন্ত্র, যেখানে একটি ছোট ছিদ্রে চোখ লাগিয়ে ভেতরের চলমান ছবি দেখা যেত।

শেষ পর্যন্ত কিন্তু শিকে ছিঁড়ল ফ্রান্সের লুমিয়ের ভাইদের কপালে। অগাস্ট এবং লুই লুমিয়ের ছিলেন দুই ভাই যাঁরা একই রকম পরীক্ষা -নিরিক্ষা চালাচ্ছিলেন। তাঁদের ব্যাবহার করা যন্ত্রের নাম ছিল সিনেম্যাটোগ্রাফ। বলা হয়ে থাকে, ১৮৯৫ সালের কনকনে ঠান্ডায় বড়দিনে তাঁরা প্রথমে লিঁও শহরে, তারপরে প্যারিসে তাঁদের প্রথম কয়েকটি ছবি দেখান। দিনটা স্মরণীয়, কারন আর কেউ তার আগে , যাকে আমরা ছায়াছবি বলি, তা দেখানোর সুযোগ পাননি মানুষ কে। এই ছবিগুলি ছোট ছিল, আর তাতে কথা বা শব্দ ছিল না।

ছবির বিষয় কিরকম? - যেমন, কারখানা থেকে বেড়িয়ে আসছে একদল শ্রমিক, বা ট্রেন ঢুকছে কোন রেল স্টেশনে, এইসব। আসলে , সেই আদিযুগে, কি করে আলো কমাতে বাড়াতে হয় তা জানা ছিল না। ক্যামেরাকে কিভাবে নড়াতে হয় তাও জানা ছিল না। ক্যামেরাকে দাঁড় করিয়ে রেখে এক রিলের মধ্যে যতটা দেখান যায়, ততটাই দেখানো হত। আজকের ছবির মত এত কারিকুরি সেখানে ছিল না।

একবার তো যা ঘটল তা রীতিমত মজার। লুমিয়ের ভাইয়েরা ছবির আয়োজন করেছেন। আর তাতে যথারীতি রেলগাড়ী পর্দা দিয়ে এগিয়ে আসছে। দর্শকরা ভাবল এই বুঝি ট্রেন তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হুড়োহুড়ি করে তারা দরজা দিয়ে বাইরে চলে যেতে চায় ভয়ে। তাদের বুঝিয়ে শান্ত করতে কত যে সময় গেল!!

সে যুগের মানুষ সিনেমাকে খুব যে শিল্প -টিল্প ভেবেছিল এমন কিন্তু নয়। তাদের ধারনা ছিল, গ্রামের মেলায় বা শহরের ফুটপাথে যেরকম কিছু মজার ভানুমতীর খেলা আয়োজন করা হয়, এ সেরকমই। ছবিগুলো নড়ছে, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে, হাসছে - আমরা বলতে পারছি বিজ্ঞান কত এগিয়ে গেছে!

ছবি কিন্তু গল্প বলা শিখবে আরো পর থেকে।

 [চলবে]

 

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
কলকাতা

লেখক পরিচিতি

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। ইচ্ছামতীর আবদারে ছোটদের জন্য প্রথম বাংলা ভাষায় বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন তিনি।