খেলাঘরখেলাঘর

বায়োস্কোপের বারোকথা

জীবনের বা শৈশবেরও কিছু খোলা নীল আকাশ দরকার, যেখানে যুক্তি কাজ করেনা। এই যে লাভ ক্ষতির বাইরে এক ছুটির জগত,  ক্রমশই টেনে নিয়ে যায়  আমাদের ছোটবেলায়, সে তো ইতিহাসের ও ছোটবেলাঃ রূপকথা। এমনিতেই ছোটদের নিয়ে কথা বলা মুশকিল, কেননা, সে সব কথায় ছোটরা হোঁচট খায়, বড়রা ছেলেমানুষী ভাবে। সেদিক থেকে রূপকথা ছোটদের ভারি পছন্দের, কারণ কৈফিয়ত দেওয়ার দায় নেই। আর আমরা, যারা বড় হয়েছি, তাদেরো ভাল লাগে, কেননা এই রূপকথার আড়ালে মুখ লুকিয়ে আমরাও যেন ছোট হয়ে যাই। এই যেমন,

"ওপারেতে লঙ্কা গাছটি টুকটুক করে,
গুণবতী বোন আমার মন কেমন করে"

-এইখানে, লঙ্কাগাছের লাল টুকটুকে  হওয়ার সাথে মন কেমন করার কি সম্পর্ক, সেটা কেউ কোনদিন বোঝাতে পারবেনা বলেই রূপকথার জিৎ। আর এই কারণেই, সত্যজিৎ রায়ের 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' আজ পর্যন্ত বাঙালি ছেলেমেয়েদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়, কারণ এই ছবি একদম ছোটদের মত করেই ভেবেছে, কোন 'জ্যাঠামি' করেনি।

গুগাবাবা

গল্পটা সত্যজিতের ঠাকুরদাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরির লেখা। সত্যজিত পড়েছিলেন বছর আটেক বয়সে। তার মধ্যে বেশ কিছু মানে না বোঝাও ছিল। সত্যজিত রায় যে প্রতিভাবান, তার প্রমাণ, তিনি এই মানে না বোঝার তোয়াক্কা করেন নি; তিনি জানতেন, ছোটরা মহাভারতও পড়ে, তাতে 'গীতা'র গুরুগম্ভীর দর্শনও থাকে, কিন্তু ছোটরা সেইসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। এইভাবেই গুপী আর বাঘা দুই অপদার্থ - যেমন রূপ তাদের, তেমনি গুণ - চলে এল। তাদেরকে গ্রাম থেকে বার করে দেওয়ায় ছোটদের মনে ভারি দুঃখ।

গুগাবাবা

তাই ওদের ভূতের রাজার বর দিয়ে দেওয়া হল। 'জবর জবর তিন বর' - ওরা যা ইচ্ছে তাই খেতে পারে, যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে, আর মনের আনন্দে গান গাইতে পারে।

গুগাবাবা

গুগাবাবা

ওদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নেই। কিন্তু সত্যজিত এরই মধ্যে চমৎকার করে দেশি অ্যানিমেশনের সাহায্যে ভূতের সমাজের শ্রেণী ভাগ দেখিয়েছেন - বামুন ভূত, কায়েত ভূত, সাহেব ভূত- এইসব। পরিচালকের এই সমাজ সচেতনতায় বড়রা ভারি খুশি, কিন্তু ছোটদের কিছুই এসে যায় না। তারা দেখতে থাকে। আর ছোট্টবেলা থেকে তারা যে স্বপ্নগুলো দেখেছে, সেইগুলি ঘটতে থাকে। কি ভালই না ছবিটা! গুপীর গান শুনে যে রাজা চটে গেলেন, তাকে দেখে আমাদের একবারও কোন দুর্ধর্ষ রাজা হর্ষবর্ধন বা অশোকের কথা মনে হয়নি। সে  গ্রাম্য ভাষায় কথা বলে, তাকে দেখলে মজা লাগে। আর যখন সত্যিকারের রাজা রাজড়ার কাহিনী এল, তখন আমরা রাজপুতানায় চলে গেলাম যেখানে সবই সম্ভব। অবন ঠাকুরের রাজকাহিনীর পাতায় পাতায় এই সব আমরা জেনেছি। সত্যজিত রায় সেইসব আবার আমাদের জন্য সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন। এই যে হাল্লার রাজা, আর শুন্ডীর রাজা মধ্যে বিবাদ, এই যে মানুষ খেতে পায়না, অথচ তাদেরকে যুদ্ধ করতে বলা হয়, এতে বড়দের রাজনীতি, সমাজব্যাবস্থা- এইসব নিয়ে নানা কথা আছে, কিন্তু তা অনাবিল। আমরা জানি শেষ পর্যন্ত এইসব দুঃখ পদ্মপাতায় জলের মত, রাজারা বদলে যাবেন, প্রজাদেরও যে খুব রক্ত পড়বে তা নয়।

গুগাবাবা

গুগাবাবা

আর সবচেয়ে বড় কথা, যখন একজন রাজকন্যা , গুপী অথবা বাঘা, কার গলায় মালা দেবেন এই নিয়ে আমরা মাথা ঘামাচ্ছি, তখন ছবিটা চট করে রঙিন হয়ে যায়, কোথা থেকে আরেকজন রাজকন্যা এসে যায়, গুপী আর বাঘা দুজনেই রাজার জামাই হয়ে যায়। এতক্ষণ ছোটরা দম ধরে বসে ছিল, এখন যেন তাদের সমস্ত ইচ্ছাপূরণ হল।

গুগাবাবা

'গুপী গাইন বাঘা বাইন' আমাদের সংস্কৃতিতে ছোটদের জন্য এক মাত্র ছবি, যেটা ছোটদের ছোট ভাবেনি। আর তাই এই ছবি ছোটরা বারে বারে দেখে। দেখেন তাদের বাবা-মায়েরাও। ভাবেন, যদি আরেকবার ছোট হওয়া যায়!