খেলাঘরখেলাঘর

 গ্রিফিথ

পর্ব চার
 এবারে আমরা গল্প করবো ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ [১৮৭৫-১৯৪৮] কে নিয়ে। অনেকে বলেন তিনিই হলিউডের সেই বিখ্যাত গল্প বলা ছবির আবিষ্কর্তা। অনেকে তাঁকে বলেন ছায়াছবির জগতের শেক্সপিয়র। আসলে তাঁর হাত ধরেই নির্বাক সিনেমা প্রথম সত্যি সত্যি গল্প বলতে শিখল। তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছিল আধুনিক সিনেমার ব্যাকরণ। ভাবছো, সিনেমার আবার ব্যাকরণ হয় কি ভাবে? হয় বইকি! কোন ছবির পর কোন ছবি  কিভাবে দেখালে দর্শক একটা ঘটনাকে সবথেকে ভাল বুঝতে পারবে, সেই নিয়মগুলি একসঙ্গে করেই তো তৈরি হল সিনেমার ব্যাকরণ। আর এই ব্যাকরণের অনেকটাই প্রথম তৈরি হয় গ্রিফিথের হাতে।
গ্রিফিথ
ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ

গ্রিফিথ কে নিয়ে আজও আমাদের মনে কৌতূহলের শেষ নেই। গল্প বলা ছবির স্রষ্টা হিসাবে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরন করি। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে, তিনি ছিলেন ঘোরতর বর্ণবিদ্বেষী। তিনি পৃথিবীর যেকোন সমস্যাকেই সাদা-কালো মানুষের দ্বন্দ্বের ভিতর দেখতেন। তাঁর সাদারা সবসময়ই ভাল, কালোরা সবসময়ই খারাপ। এর একটা কারন হয়ত এই যে, গ্রিফিথ বড় হয়ে উঠেছিলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলে, যেখানে সে সময়ে, আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে, এই ধরনের ভাবনা চিন্তা গুলি খুব গুরুত্ব পেত। এখোনো কিন্তু অনেকে সেই ভাবনার শিকার। তুমি কিন্তু খবরদার এই ভাবনা চিন্তাকে গুরুত্ত্ব দিও না। মাথাতেও এনো না। আর কেউ ভাবলে তাকে বোঝাতে চেষ্টা কোরো যে গায়ের রঙ দিয়ে সত্যি মানুষকে বিচার করা যায় না...করা উচিত নয়...আমরা কোনো দিন তা করবো না।

যাইহোক যে কথা বলছিলাম...গ্রিফিথ জন্মেছিলেন খুব সাধারণ এক পরিবারে, তাই বড় হয়ে তাঁকে নানাধরনের কাজ করতে হয়েছিল। এমনকি তাঁর বিশ্বাস ছিল যে তিনি লিখতেও পারবেন, কিন্ত তাঁর লেখকজীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সবথেকে মজার ব্যাপার হল যে সিনেমা বিষয়ে তাঁর তেমন কোন উতসাহ ছিলনা, বরং বেশ একটু নাক উঁচু মনোভাব ছিল । তিনি ছবিতে গল্প বেচে চটজলদি কিছু পয়সা আয় করতে চেয়েছিলেন। পোর্টার সাহেব, মানে এডউইন পোর্টার, যাঁর কথা আমরা আগের সংখ্যায় পড়েছি, গ্রিফিথের সুন্দর চেহারায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে দৈনিক পাঁচ ডলারের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নায়কের কাজ দেন। সে কাজ বেশিদিন থাকে নি। কিন্তু ভাগ্যের জোর...আর বলতে পারো খানিকটা নিজের ইচ্ছায় গ্রিফিথ একদিন পরিচালক হয়ে গেলেন। তিনি যে কোম্পানিতে কাজ করতেন তারা টাকার অভাবে নতুন পরিচালক জোগাড় করতে পারছিল না। ফলে গ্রিফিথ কে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হল। তিনি তৈরি করলেন তাঁর প্রথম ছবি 'অ্যাডভেঞ্চারস অফ ডলি'।

এই ছবিটা তৈরি করার সময়েই কিভাবে ভাল গল্প বলবো এই কথা ভাবতে ভাবতে আবিষ্কার হয়ে গেল বিখ্যাত ১৮০ডিগ্রী ব্যবস্থা। ভাবছ সেটা আবার কি? নিচের ছবিটা দেখ।

 180degree
১৮০ ডিগ্রী ব্যবস্থা

একজন নীল জামা পরা লোক,আরেকজন কমলা জামা পর লোকের সঙ্গে কথা বলছে। যতক্ষণ তাদের মধ্যে কথা চলবে, ততক্ষণ ক্যামেরা ছবির ডান দিকের সবুজ লাইন বরাবর যেখানে ইচ্ছা বসানো যেতে পারে। এইভাবে সবসময়ই কমলা জামা পরা লোকটি বাঁ দিকে থাকবে আর নীল জামা থাকবে ডান দিকে। ক্যামেরা যদি উল্টোদিকে বসে, তাহলে তো নীল জামা চলে যাবে বাঁ দিকে আর কমলা জামা যাবে ডান দিকে !! এবার যদি ক্যামেরা একবার এদিকে, একবার ওদিকে বসানো হয়, তাহলে দর্শকের চোখে বড় বেশি ঝাঁকুনি লাগবে যে। কিন্তু ক্যামেরা যদি এই ১৮০ডিগ্রী ব্যবস্থা মেনে এক শট থেকে অন্য শটে যায়, তাহলে আমরা আর গল্পটা দেখতে দেখতে চমকে উঠব না। আমাদের মনে হবে আমরা সিনেমা নয়, যেন সত্যি ঘটনা দেখছি -চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দুইজন মানুষ কথা বললে যে অনুভূতি হয়, সেইরকম লাগবে।

এইভাবেই, আমরা দেখতে পাই যে, ১৯০৮-০৯ সাল নাগাদ, গ্রিফিথ ক্যামেরা থেকে  বিষয়বস্তুর দূরত্ব অনুযায়ী নানারকম শট, যেমন ফুল শট বা ক্লোজ-আপ তৈরি করেছেন। ফুল শট মানে জানো তো? যখন একজন চরিত্রের মাথা থেকে পা অবধি পর্দায় দেখা যায়, তাকে বলে ফুল শট। আর যখন সেই চরিত্রের শুধুমাত্র মুখটাকে আমরা পর্দায় দেখতে পাই তখন তাকে বলা হয় ক্লোজ-আপ। বোঝানোর খাতিরে আমি এই সহজ উদাহরণ দিলাম। তাই বলে ভেবো না এটাই একমাত্র উদাহরণ। ক্লোজ-আপেরও নানা রকম ফের আছে আর ফুল শটেরও। সে না হয় অন্য কোনো দিন বলবো। কিন্তু এখন মনে হতেই পারে এই দুই রকম শটের দরকার কি? দরকার আছে, গল্প বলার খাতিরেই দরকার আছে। ফুল শট ব্যবহার করে একজন চরিত্রের অবস্থান বোঝানো যায়, যেমন, লোকটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে - রাস্তার ধারে, না বাগানে, সাথে কেউ আছে কিনা, আশেপাশে কে আছে; আর ক্লোজ-আপে দেখানো যায় সেই চরিত্রের মুখের ভাব - সে খুশি, না তার মন খারাপ।

গ্রিফিথের এইসব নিয়মগুলি দিয়েই শুরু হল হলিউডের এক নতুন যুগ...ছবির এক নতুন ভাষা। শুরু হল ধ্রুপদী বা ক্ল্যাসিকাল সিনেমার পথচলা। ধ্রুপদী কথাটার মানে হল যা কিনা চিরায়ত, এমন কিছু যা বহু বছর ধরে একইরকম ভাবে চলে আসছে, যার একটা নিজস্ব উতকর্ষ আছে যেটাকে মেনে চলা যেতে পারে। যেমন ধর, ভারতবর্ষের রাগপ্রধান সঙ্গীতের ধারা, যাকে বলা হয় ধ্রুপদী সঙ্গীত, যে গানের ধারা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। সেইরকমই হল সেই সময়ের সিনেমা তৈরির নিয়ম - সেই একশো বছর আগেও যা মেনে চলা হত, আর যা এখনও মোটামুটি ভাবে সবাই মেনে চলে।

গ্রিফিথের এই সমস্ত নিয়মগুলির কিন্তু দেশে-বিদেশে কদর বাড়তে থাকলো। এমন কি, সেই সময়ে আমেরিকার সঙ্গে যে দেশের মোটেও বন্ধুত্ব ছিল না, সেই সোভিয়েত রাশিয়াতেও তাঁর নিয়মগুলি নিজের ছাত্রদের শেখাতেন আরেক বিখ্যাত পরিচালক লেভ কুলেশভ।

গ্রিফিথের আরেকটি অবদান হল যে তখনও পর্যন্ত যে টু-রিলার [দুই রিলের] ছোট ছবি বানানো হত, সেই রেওয়াজ তিনি ভেঙ্গে ফেললেন, এবং ১৯১৪ সালে তৈরি করলেন বিখ্যাত ছবি 'বার্থ অফ আ নেশন'। অনেকেই এই ছবিকে পৃথিবীর প্রথম পূর্ন দৈর্ঘ্যের আখ্যানচিত্র, বা গল্প বলা ছবি বলে মান্য করে থাকেন। এই ছবির নির্মাণে খরচ হয়েছিল সেই যুগের  এক লক্ষ দশ হাজার ডলার। এই ছবিতে আছে ১৫৪৪ টি শট, সেযুগের পক্ষে যা অতিরিক্ত বেশি। সেগুলিকে নানারকম ভাবে মাত্র তিন মাসের মধ্যে জুড়ে জুড়ে, গ্রিফিথ তৈরি করেছিলেন এক অসাধারণ সিনেমা এবং দেখিয়ে দিয়েছিলেন কিভাবে বিরতি না নিয়ে একটি গল্প বলতে পারা যায় এবং দর্শককে প্রায় বই পড়ার অনুভূতি দেওয়া যায়। সত্যি কথা বলতে কি, আজও গল্প বলা সিনেমা যেসব উপায়ে জমজমাট গল্প বলে, তার মধ্যে প্রায় সবকটিই প্রথম ব্যবহার হয়েছিল 'বার্থ অফ আ নেশন' ছবিতে। এর ফাঁকে একটা কথা বলে রাখি আমরা অনেকেই ভাবি ছবি দেখা তো একটা সহজ ব্যাপার। এই তো যা দেখছি...যেমন ভাবে দেখছি সেটাই তো একটা ছবি। এর জন্য আলাদা করে ভাবার...পড়াশুনো করার কি কোনো দরকার আছে? অনেকে বলেছিলেন নেই অনেকে বলেছিলেন আছে কেউ কেউ ছবি দেখা...বানানোর পাশাপাশি লেখালেখিও শুরু করেছিলেন। আর সেটা শুরু হয়েছিলো ছবি জন্মানোর প্রায় সেই সময় থেকেই। ওদিকে এখন যাবো না কারণ সে তো আর এক ইতিহাসের গল্প। বরং আমরা 'বার্থ অফ আ নেশনের' দিকে মনোযোগ দিই।

এই ছবিটি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের বিষয়ে গল্প বলে। আগেই বলেছি, গ্রিফিথ ছিলেন আদতে বর্নবিদ্বেষী। তাঁর এই ছবিটিও এইরকম ভাবনা চিন্তায় ভরা। 'বার্থ অফ আ নেশন' একদিকে যেমন প্রচুর জনপ্রিয় হয়, প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি উডরো উইলসন একে বলেন 'আলোয় লেখা ইতিহাস'; অন্যদিকে, জাতিবিদ্বেষের জন্য এই ছবিটিকে প্রচুর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়।

হয়ত সমালোচনার ফলেই, দুইবছর পরে তৈরি 'ইনটলারেন্স' [১৯১৬] ছবিতে গ্রিফিথ অনেক বেশি উদারতার পরিচয় দেন। এই ছবিটি আজও অবধি হলিউডের এক অন্যতম জমজমাট ছবি। এই ছবিতে গ্রিফিথ, তাঁর অন্যান্য নিয়মগুলির সাথে, প্রথম ব্যবহার করেন 'মন্তাজ'  নীতি। যে নীতিতে কয়েকটি ছবি পরপর বসিয়ে একটি ঘটনা বা অবস্থা বোঝানো যায়।

বলা যেতে পারে, ডেভিড ওয়র্ক গ্রিফিথই প্রথম প্রমান করেন যে আধুনিক শিল্প হিসাবে সিনেমা কতটা সম্ভাবনাময়। আবার বলি তাঁর হাত ধরেই আমাদের সামনে আসে সিনেমায় গল্প বলার কতগুলি দুর্দান্ত নিয়ম, যা আজও ব্যবহার হচ্ছে। এরপর থেকেই সিনেমার চেহারা আমূল পালটে গেল, শুধু আমেরিকাতেই নয়,সারা পৃথিবীতেই। ছবি আর তার ভাষা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে সবাই পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে লাগলেন। শুরু হল শিল্পের আর এক নয়া মাধ্যম চলচ্চিত্রের জয়যাত্রা। সেই গল্প আমরা পরের বার বলবো। সেই গল্প শুরু হবে বিখ্যাত নির্বাক মার্কিনী হাসির ছবিগুলি নিয়ে- চ্যাপলিন, কীটন, লয়েড, সেনেট - এইসব মজাদার মানুষদের নিয়ে।



সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক, চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগ,
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

ছবি

উইকিপিডিয়া