খেলাঘরখেলাঘর

 

বায়োস্কোপের বারোকথা

 

(গত সংখ্যার পর)

ধীরে ধীরে ছবি তোলার রাজত্বেও একটা শৃঙ্খলা ও নিয়ম কানুনের পত্তন হল। যেমন তেমন করে ছবি তোলার বদলে ছবিরও কারখানার মত স্টুডিও তৈরি হল, যেখানে নিযুক্ত থাকতেন ক্যামেরাম্যান, সম্পাদক, অন্যান্য কলাকুশলী এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। এরকম স্টুডিও বলতে আমাদের মনে আসে কলকাতার নিউ থিয়েটার্স, মহারাষ্ট্রের পুনেতে প্রভাত স্টুডিও আর বম্বে টকিজ, আর চেন্নাইয়ের চন্দ্রলেখার কথা। এই স্টুডিওগুলির ঘরানাই ছিল আলাদা আলাদা। বম্বে টকিজের হিমাংশু রায় আর দেবীকা রানীর ছবির সঙ্গে প্রভাত স্টুডিওর ধর্মমূলক ছবির তেমন কোন মিল ছিল না। যেমন, দক্ষিণের নাচ গান আর দেব-দেবী ভরা ছবির সাথে নিউ থিয়েটার্সের সাহিত্যধর্মী ছবির কোনও মিল ছিল না।

বায়োস্কোপের বারোকথা
দেবীকা রানী

যাক, আমরা কলকাতায় ফিরে আসি। এসময়ে দেখতে পাব, শব্দ ও সনলাপ ব্যবহার করার সুযোগ বাংলা ছবিকে অনেকটাই পালটে দিয়েছে। এই বদলে দেওয়ার প্রথম বড়মাপের চিহ্ন ১৯৩৩ সালে তৈরি 'চন্ডীদাস'। মধ্যযুগের বাঙালি বৈষ্ণব কবি চন্ডীদাসের সঙ্গে সমাজের নীচুতলার মানুষ রামি ধোপানির ভালবাসার গল্পটিকে সিনেমার পর্দায় নিয়ে এলেন দেবকী কুমার বসু। সেই যুগে, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে রাজনীতির স্তরে যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে ,সেই ভাবনা এই ছায়াছবিকেও ছুঁয়ে গেছিল। 'সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই'  - চন্ডীদাসের এই মর্মকথা সেদিন মানুষের মনকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছিল, যে আমাদের দেশে এই ছবিটিই প্রথম সিল্ভার জুবিলি করে।

যখন জনপ্রিয়তার কথাই বলা হল, তখন আমাদের ১৯৩৫ সালে মুক্তি পাওয়া 'দেবদাস' ছবিটির কথা বলতেই হবে। এই ছবি ৩০ দশকের মাঝামাঝি ডবল ভার্সানে (হিন্দি এবং বাংলাতে) তৈরি করা প্রথম ছবি ও আজকের ভাষা ব্যবহার করে বললে- সত্যিকারের ব্লক-বাস্টার। এই ছবিতেই আমরা প্রথম স্টার সিস্টেম বা নক্ষত্রব্যবস্থার সূচনা দেখলাম। আসামের জমিদার ও প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র প্রমথেশ বড়ুয়া বা বড়ুয়াসাহেব দর্শকের কাছে হয়ে উঠলেন ভালবাসার আঘাতে চুরমার হয়ে যাওয়া যুবকদের প্রতিনিধি। এই 'দেবদাস' ছবির যে কত পুণঃনির্মান হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবেনা। মাত্র কিছুদিন আগেইন তৈরি হয়েছে একই গল্পের ওপর ভিত্তি করে 'দেব-ডি' ছবিটি। আজ হয়ত অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু একসময়ে বড়ুয়াসাহেবের চলন বলন সব কিছুই সারা দেশে অনুকরণ করা হত।

বায়োস্কোপের বারোকথা
প্রমথেশ বড়ুয়া আর যমুনা বড়ুয়া

দেবকী কুমার বসু এবং প্রমথেশ বড়ুয়া দুজনেই মূলতঃ নিউ থিয়েটার্সের ছাদের তলায় বার করতে পেরেছিলেন কিভাবে ছবিতে গল্প বলতে হয়। বড় বড় লেখকদের চিত্রনাট্য এবং সংলাপ রচনার কাজে ডেকে নিয়ে নিউ থিয়েটার্স তাঁদেরকে সেই সুযোগ করে দিল। সে যুগের অনেক বড় লেখকই- যেমন প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, সলিলানন্দ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, পরে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়- ছবির চিত্রনাট্য লেখার কাজে মন দেওয়ায় আমাদের সিনেমাতে একটা ভাল গল্প বলার ঘরানা গড়ে ওঠে।
তার সঙ্গে সঙ্গে প্রমথেশ বড়ুয়ার ছবিতে সম্পাদনার বৈশিষ্ট ও ইন্ডোর শুটিং এ আলোর ব্যবহার বেশ অভিনব ভিল। ঋত্বিক ঘটক একথার উল্লেখ করেছেন। যেমন সত্যজিৎ রায় স্বীকার করেছেন দেবকী কুমার বসুর ছবিতে নতুনত্বের কথা।যদি আমরা বাংলা ছবির ইতিহাসের এই সব পথীকৃৎদের কথা ভুলে যাই, তাহলে ইতিহাসকেই তো ঠিক ভাবে চিনতে পারব না।

এইরকমই আরেকটি প্রচন্ড জনপ্রিয় ছবি ছিল ১৯৩৭ সালে ভারতলক্ষ্মী পিকচার্সের পক্ষ থেকে মধু বসুর তৈরি করা 'আলিবাবা' ছবিটি। এই ছবির  "ছি ছি এত্তা জঞ্জাল" গানটি আজ পর্যন্ত আমরা গুন গুন করে গাই।

বায়োস্কোপের বারোকথা
কানন দেবী

কারিগরী দিক থেকেও যথেষ্ট উন্নতি হচ্ছিল। মধু বসু রিফ্লেক্টর আর ব্যাক লাইট খুব সফল্ভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। পরিচালক হিসাবে বড়ুয়া সাহেবের ছিল হলিউড ঘরানার আলোকসম্পাতের প্রতি তীব্র মনো্যোগ। ইতিমধ্যে নীতিন বসু বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক প্রবর্তন করেন। ফলে খুব সহজেই বিখ্যাত গায়ক গায়িকাদের ঠোঁটে বসিয়ে দেওয়া যাচ্ছে।  ছবিঘরগুলি আর শুধু বিদেশী ছবির আধিপত্যে থাকল না, আমাদের বাঙালি পরিবারের ভাই বোন বন্ধুরা সবাই বড়ুয়াসাহেব আর কাননবালার ভক্ত হয়ে উঠলেন।

বলতেই হবে, এত কিছুর পরেও সিনেমা ঠিক প্রকৃত অর্থে শিল্প হয়ে ওঠেনি। কিন্তু চল্লিশের দশকে এল কিছু রূপান্তর। মুক্তি পেল প্রথমে ১৯৪৪ সালে 'উদয়ের পথে', ১৯৮৭ এ 'কল্পনা' আর ১৯৫১ সালে 'ছিন্নমূল' । সেই রূপান্তরের গল্প পরের পর্বে।


সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক
চলচ্চিত্র বিদ্যা বিভাগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

 

ছবিঃ
উইকিপিডিয়া