খেলাঘরখেলাঘর

হাসি কান্নার জাদুগর
 
 
পর্ব পাঁচ

সিনেমা গ্রিফিথের পরে দেখতে দেখতে বড় হয়ে উঠলো। আমেরিকার হাটে-বাজারে লোকালয়ে তার দাপট দেখা দিলো। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো সিনেমা তৈরির ব্যাপারটাকে একটু একটু করে একটা নিয়মের মধ্যে এনে ফেলা। এর জন্য তৈরি হয়েছিলো স্টুডিও ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় কাজকর্ম হতো প্রায় অফিসের মতো। প্রতিটি স্টুডিও তে থাকতো মাইনে করা অভিনেতা-অভিনেত্রি, পরিচালক এবং অন্যান্য কলাকুশলী। সবাই নিয়ম করে সকাল থেকে সন্ধ্যা স্টুডিও তে কাজ করতো।

যাঁরা এই কাজটা করছিলেন তাঁরা একই সঙ্গে বুঝতে পারছিলেন যে হাসি ঠাট্টা রঙ্গতামাশা মানুষের বেঁচে থাকার, বিশেষ করে তলার দিকে মানুষের জীবনধারার রসদ। হাসি আর মজা দিয়েই মানুষ নিজের জীবনের সব দুঃখ ভুলে থাকে। তাই আমরা ক্রমশঃ দেখতে পেলাম যে কারখানার মতো কতগুলি নিয়মকানুনের মধ্যে থেকেই নির্বাক যুগে গড়ে উঠলো নির্বাক কৌতুক বা কমেডি ছবির (silent comedy) একটি ধারা।

এই ধারার শুরু হয়েছিলো ম্যাক সেনেট নামের এক ছবি নির্মাতার হাত ধরে।সেনেটের ছবিগুলি ছিলো এক রিল বা দুই রিলের কমেডি। এগুলিকে বলা হয় স্ল্যাপস্টিক কমেডি। এই কমেডিতে গল্প খুব একটা জরুরি ছিলো না। এই ছবিগুলি তৈরি হতো খানিক সার্কাস, খানিক ভানুমতীর খেলা, খানিক মূকাভিনয় আর একটু ভাঁড়ামি নিয়ে। এইসব মিলে মিশে সেযুগের মার্কিন দেশের খানিকটা এলোমেলো চেহারা চোখে এনে দিতো হাসির ফোয়ারা। এই ম্যাক সেনেট ই প্রযোজনা করেছিলেন চ্যাপলিনের প্রথম ছবি। শুধু তাই নয়, চ্যাপলিন ছাড়াও বাস্টার কীটন, হ্যারি ল্যাংডন - এইসব বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতাদের জন্য তিনিই খুলে দিয়েছিলেন সাফল্যের দরজা।

ম্যাক সেনেট
ম্যাক সেনেট

নির্বাক মার্কিন যুগের সবচেয়ে বড় প্রতিভা হলেন চার্লি চ্যাপলিন, সেই ছোট্ট ভাঁড় যিনি হাসি দিয়ে সসাগরা পৃথিবীকে শাসণ করেন। কি করেছিলেন চ্যাপলিন? - দ্য কিড, গোল্ড রাশ, মডার্ন টাইমস, লাইমলাইট বা দ্য গ্রেট ডিক্টেটর - সব ছবিতেই তিনি আমাদের দেখিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের ইচ্ছাপূরণের স্বপ্ন, অন্ধকার রাস্তার কোন থেকে উঠে এসে রাজপুত্তুর হয়ে ওঠার গল্প। তাঁর বিখ্যাত 'ভবঘুরে' বা Little Tramp সাজে চ্যাপলিন ছিলেন পৃথিবীর অগনিত দুর্বল, গরিব, নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি।
 চ্যাপলিন
চার্লি চ্যাপলিন
 
তাঁর 'ভবঘুরে' সাজকে ভালোবেসে ফেলেছিলো সবাই। ঢোলা পাৎলুন, চাপা কোট, দু পায়ে দুই মাপের জুতো, মাথায় ডার্বি টুপি, হাতে বেতের ছড়ি আর সেই বিখ্যাত টুথব্রাশ গোঁফ নিয়ে সেই ভবঘুরে হারিয়ে দিতে পারতো সমস্ত শাসকদের -তা সে পুলিশই হোক, বড়লোকই হোক, বা হোক রাষ্ট্রনায়ক। সত্যি বলতে কি, উপন্যাসে চার্লস ডিকেন্স যে কাজটা করেছেন, সিনেমায় চার্লি চ্যাপলিন সেই কাজটাই করেন।
 
দ্য কিড
দ্য কিড ছবিতে চ্যাপলিন ও শিশুশিল্পী
 
সে যুগের আমেরিকায় টাকার ঝনৎকারের মধ্যে যে কান্না লুকিয়ে ছিলো, আলোর পেছনে যে অন্ধকার, সেই কান্না, সেই অন্ধকারের গল্প বলার সময় চ্যাপলিন কিন্তু বড় বড় কথা বলেন না, বরং হাসেন এবং হাসান। এবং হাসতে হাসতেই কঠোর সমালোচনা করেন সমাজের অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। যেমন দ্য গ্রেট ডিক্টেটর ছবিতে তিনি বলেন - "যদি একটি মানুষকে মারো, তবে তুমি খুনি। যদি লক্ষ লক্ষ মানুষকে মারো তবে তুমি বীর। সংখ্যাই পবিত্র করে।" এই কথা শোনার পর এই যুদ্ধ আর রক্তে ভরা পৃথিবীতে আমরা সবাই সিনেমাকে অন্য ভাবে দেখি।

অবশ্য চ্যাপলিন একলা ছিলেন না, তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পথ হেঁটেছেন বাস্টার কীটন - সেযুগের আরেকজন প্রতিভাবান অভিনেতা এবং চলচ্চিত্রকার। তিনি আমাদের দেখিয়েছিলেন কত ভালো করে ইতিহাসকে দেখানো যায়, শরীরের ভাষা দিয়ে  কি করে কথা বলা যায়। তাঁর 'আওয়ার হসপিটালিটি' এবং 'দ্য জেনরল' খুব লঘুস্বরে মার্কিন ইতিহাসের হিংসা ও রক্তপাতের দিকে মন্তব্য করে। কীটনের ছবিতেও হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে চাপা হাহাকার।
 
 বাস্টার কীটন
বাস্টার কীটন

এছাড়াও যদি আমরা আর কারোর নাম করি তাহলে হ্যারল্ড লয়েড এর কথা বলতে হবে, যিনি সিনেমায় নিজের দৈহিক বিপদের সম্ভাবনা দেখিয়ে হলের মধ্যে হাসির বন্যা বইয়ে দিতে পারতেন। এছাড়া ছিলেন ফ্যাটি আরবাকল্‌ , যিনি চ্যাপলিন, কীটন প্রমুখের সমসাময়িক ছিলেন।
হ্যারল্ড লয়েড
হ্যারল্ড লয়েড
 
ফ্যাটি আরবাকল্‌
ফ্যাটি আরবাকল্‌
 
আর ছিলেন মার্ক্স ব্রাদার্স -চিকো, হারপো আর গ্রুচো - এই তিন ভাইয়ের কৌতুক ছবিগুলিকে প্রথম একশোটা নির্বাক কমেডি ছবির মধ্যে গন্য করা হয়।
মার্ক্স ব্রাদার্স
মার্ক্স ব্রাদার্স
 
তবে সব ছোটরাই বোধ হয় সব থেকে খুশি হবে, যদি লরেল আর হার্ডির কথা বলা হয়। লরেল ও চ্যাপলিনের মতোই ভ্রাম্যমাণ নাটকের দলের সঙ্গে আমেরিকায় এসেছিলেন; আর হার্ডি ছিলেন জর্জিয়ার লোক। পরে তাঁরা জুটি বাঁধেন। দুজনে মিলে একসঙ্গে ১০৬ টি ছবিতে কাজ করেন। রোগা লরেল আর মোটা হার্ডি হয়ে ওঠেন এক জনপ্রিয় জুটি। বলা যেতে পারে, লরেল-হার্ডি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন।
 
লরেল আর হার্ডি
লরেল আর হার্ডি

সিনেমাকে যদি সাধারণ মানুষের শিল্প বলি, যদি বলি সিনেমা সমাজের আয়না, তাহলে আমেরিকান নির্বাক কমেডি যুগের গুরুত্ব এই যে এই যুগে হাসি, ঠাট্টা,রঙ্গ, কৌতুকের মধ্যে দিয়ে সিনেমা সত্যি করে হয়ে উঠলো সাধারণ মাণুষের জীবনযুদ্ধের কথা বলার মাধ্যম। আমাদের পৃথিবীতে ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার কতটা জরুরি, হোঁচট খেলে কতটা ব্যথা লাগে, কেমন করে মুছিয়ে দিতে হয় অসহায় মানুষের চোখের জল, এ কি আমরা চার্লি চ্যাপলিনের ছবি না দেখলে জানতে পারতাম?
 
 
 
 
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক, চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগ,
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

ছবি

উইকিপিডিয়া