খেলাঘরখেলাঘর

আনমনে
 
 
পর্ব -৫

গত সংখ্যায় প্রানগোপালদার কথা লিখেছি, যে কিনা রাতে মামার দোকান পাহারা দিতে আসতো। আর আসার সময় গান গাইতো আর হাতের বড়-সড় লাঠিটা মাটিতে ঠুকতো ঠকাস ঠকাস করে।
সে লাঠিটা অত জোরে ঠোকে কেন, জিজ্ঞাসা করাতে বলতো, গানের সাথে তাল ঠুকি, মনে সাহস জোগাই, আর একটা বড় কাজ করি - চলার পথ থেকে সাপ তাড়াই। শেষের ব্যাপারটা তখন বুঝতে পারিনি, আর প্রানগোপালদাকে জিজ্ঞেস করেও জানতে পারিনি।
পরে অবশ্য জেনেছিলাম যে সাপেরা কানে শুনতে পায় না, মাটি কাঁপলে বুঝতে পারে যে কেউ আশেপাশে আছে। তাই লাঠির ঘায়ে মাটি কাঁপলে ওরা ঝামেলা এড়াতে সরে যায় রাস্তা থেকে; ভীতু কিনা ! সুতরাং ছোবল খাবার ভয় থাকেনা লাঠি ঠুকতে ঠুকতে চললে।
পুজো তো এসে গেলো। এবার একটু আগেই এলো। খুব মজা করবে তো? আমিও করতাম সেই ছোট্টবেলায় যখন তোমার মতো ছিলাম। তবে সে মজাটা এখনকার মতো ছিলোনা। একটু অন্য রকম ছিলো।
পুজোর মজাগুলো কি বলোতো? বাবা-মায়ের সাথে বাজার করতে গিয়ে পছন্দ মতো নতুন জামা, জুতো কেনা, তারপর পুজো যত এগিয়ে আসবে, পাড়ার পুজো মন্ডপের সেজে ওঠা, এরপর মহালয়া, তারপর স্কুল ছুটি হওয়া- এসব হতে হতেই হুড়মুড় করে পুজো এসে পড়া। তারপর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দর্শন।
আমার ছোটবেলায় ঠিক এরকম ছিলো না পুজো ব্যাপারটা। নতুন জামা-প্যান্ট বড়রা কিনে আনতেন। যেমন দিয়ানী দিতেন। আমাদের বাড়ি, অর্থাৎ পাবনা থেকেও আসতো। বোধ হয় মোট দু-প্রস্থই হতো। 'বোধ হয়' বললাম এজন্য যে ঠিক মনে পড়ছে না কতগুলি করে পোষাক পেতাম পুজোতে।
আসলে মামার বাড়ির গ্রামে পুজোর নতুন জামা -কাপড় পড়ে অত ঘোরার জায়গাই ছিলো না। গ্রামে সম্ভবতঃ একটাই পুজো হতো কোন এক বড়লোকের বাড়িতে। ছোট একচালা প্রতিমা হতো সেটা। তখন আজকের মতো এতো নানা ধরনের প্রতিমা হতো না। মামারা কেউ একবার নিয়ে যেতেন প্রতিমা দর্শন করাতে, তাও দিনের বেলায়। ব্যস, ওই পর্যন্তই।
সেখানে তো বিদ্যুতের আলো ছিলো না, রেডিও-ও ছিলো না, তাই মহালয়ার ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী শোনারও কোন ব্যাপার ছিল না।
তাহলে আমরা কি পুজোয় কোন আনন্দ করতাম না? আমার কাছে আসল মজাটা ছিল অবশ্য অন্য জায়গায়। সে সব বললে তোমার ভালো লাগতেও পারে আবার নাও পারে। বর্ষাকালে বড় নদীর  (যমুনা নদী ) উপচে পড়া বেনোজলে চারিদিক থৈ  থৈ করতো। বাড়ি-ঘর সাধারনতঃ উঁচু জায়গায় করা হতো। তাই চারিদিকে জল থাকলেও বাড়ি ডুবতো না।
দীর্ঘ সময় জলে ডুবে থাকার কারণে মাঠের ঘাস আর অন্য সব জংলা গাছ মরে পচে যেতো। জল নেমে গেলেও পায়ে চলা ভারি অসুবিধা হতো, গা ঘিনঘিন করতো একেবারে।
কিন্তু কবে মাঠ শুকোবে তারপর হাঁটা হবে  -এভাবে তো বেশিদিন চলা যেত না। তাই কেউ না কেউ একদিন লম্বা লম্বা পা ফেলে সেই পচা ঘাস ডিঙ্গিয়ে যাওয়া শুরু করতো।
ব্যস, তারপর শুরু হতো প্রথম ফেলা পায়ের দাগের ওপর পা ফেলে চলার কসরত যাতে পায়ে কাদা না লাগে। সবাই তো আর পারতো না ঠিক  ঠিক জায়গায় পা ফেলতে- এদিক ওদিক হয়েই যেতো। ক্রমশঃ সেই পায়ের দাগের আকার বাড়তো। বাড়তে বাড়তে সেগুলো সব জুড়ে জুড়ে পায়ে চলা শুঁড়িপথ তৈরি হত একটা।
এর মধ্যে আশ্বিনের কড়া রোদে ভেজা মাঠ-ঘাট সব শুকোতে শুরু করতো। আর মড়া পচা ঘাসের মধ্যে গজিয়ে উঠতো কচি কচি নতুন ঘাস। ধীরে ধীরে কুৎসিত মাঠ-ঘাট ভরে যেতো সবুজ ঘাসে, যেন নতুন জামা পড়তো পুজোয়।
সেই আশ্বিন মাসের দিনে কড়া রোদ থাকলেও সন্ধ্যায় কিন্তু শুরু হত হিম পড়া। দিয়ানী সাবধান করতেন, যেন হিম লাগিয়ে অসুখ- বিসুখ না বাধাই।
হিমের সাথে শুরু হতো মিষ্টি গন্ধের আনাগোনা। কিসের বলতো? শিউলি ফুলের। সন্ধ্যা থেকে চারিদিকের বাতাস মাঠ-ঘাট সব শিউলির গন্ধে ম' ম' করতো; সবার বাড়িতেই শিউলি গাছ ছিলো কিনা।
ভোর বেলাতে শিউলি কুড়োবার ধুম পড়ে যেতো। বাড়ির নিত্য পুজোর কাজে তো লাগতোই, এছাড়া শিউলি কুড়োতাম আরো একটা কারণে। সেটা পরে কোনও সময় বলবো। কারণ ওটা পুজোর সাথে যুক্ত নয়, তাই এখন বলবো না।
শিউলির সাথে আরো দু'রকম ফুল পুজোর আগমন বার্তা নিয়ে আসতো। এর মধ্যে প্রথমটা হলো স্থলপদ্ম। বড় বড় থোকা থোকা সাদা বা গোলাপি রঙের ফুল, গাছ ভরে ফুটে থাকতো। সকালে ফুটে দুপুরের মধ্যেই আরো লালচে রঙের হয়ে গিয়ে নেতিয়ে পড়ে কুঁকড়ে যেতো।
আর অন্য ফুলটা ছিলো শাপলা। পদ্ম থাকলেও সর্বত্র ফুটতো না। পদ্মের থেকেও আমার ভালো লাগতো শাপলা।
পদ্মফুল তো নিশ্চয় দেখেছো? শাপলা দেখেছো কি? গ্রামাঞ্চলে যারা থাকো তারাতো দেখেইছো। শহরে যারা থাকো তারা একদিন গ্রামে বেড়াতে যেও, দেখা পেয়ে যেতেও পারো।
দু'রকমের শাপলা হতো। একরকম হলো লাল। আর অন্য রকমেরটা হলো সাদা, সাদা পাপড়ির তলার দিকটা আবার সবুজ।