খেলাঘরখেলাঘর

নারায়ণ দ্য গ্রেট
ফ্যান্টম, ম্যানড্রেক, স্পাইডারম্যান এদের সবাইকে তো তুমি চেনো। আচ্ছা , একটা প্রশ্ন করি, তুমি কি এমন এক সুপার হিরোর নাম বলতে পারো যে বাংলায় কথা বলে, আর নানারকম বীরত্বের কান্ড ঘটায়...অন্যান্য গুরুগম্ভীর সুপার হিরোরা এই বাঙালি সুপার হিরোর কাছেও আসে না ! হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার অনুমান একেবারে ঠিক ! সে আর কেউ নয় - বাঁটুল দি গ্রেট!! এইয়া চওড়া ছাতি তার; গুলি-গোলা-বোমা-রকেট, কিছুই তাকে কাবু করতে পারে না। উলটে বাঁটুল ই চোর ডাকাত গুন্ডা বদ্মাশদের ধরে পুলিশকে সাহায্য করে। তার পরনে সব সময় একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর কালো হাফ-প্যান্ট। বাঁটুলের গল্প তো তুমি বইতেই পেয়ে যাবে, আর এখন তো অনলাইনেও পড়তে পারো। আমার কাছে শোনার থেকে বরং তুমি আরো নিজেই পড়ে ফেলো না...আরো বেশি মজা পাবে। বাঁটুল গি গ্রেট এর অনেকগুলি সংকলন আছে। যেকোন একটা হাতে নিয় দেখতে পাবে বড় বড় রংচঙে হরফে লেখা আছে বাঁটুল দি গ্রেট এর নাম, তার ঠিক তলায় আছে আরেকজনের নাম। তিনিই তো বাঁটুলের ছবি এঁকেছেন আর তাকে নিয়ে লিখেছেন নানা গল্প। আজ আমরা গল্প করবো তাঁকে নিয়ে - তিনি নারায়ণ দেবনাথ।

ছোটবেলা থেকেই ছোট্ট নারায়ণের ছিলো আঁকার ঝোঁক। পারিবারিক ব্যবসা ছিলো সোনার গয়নার দোকান। কিশোর নারায়ণ মাঝে মাঝেই সেখানে গিয়ে নানারকম নক্সা দেখতো। ভালো ছবি পেলেই সে দেখে দেখে এঁকে ফেলতো। তার এই আঁকার ঝোঁক বাড়ির লোকেদের চোখ এড়ায়নি। ষোলো-সতেরো বছর বয়সে প্রথম তাকে আঁকার স্কুলে ভর্তি করা হয়। দুই তিন বছর পর সেই স্কুলটি ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজের সাথে এক হয়ে যায়। নারায়ণ ও মন দিয়ে আঁকতে থাকে ল্যান্ডস্কেপ আর ফিগারস।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাদ সাধলো। কলেজের শেষ পরীক্ষা আর দেওয়া হলো না। তাই সার্টিফিকেট ও পাওয়া গেলো না। এমনিতেই তখনকার দিনে সবার ধারণা ছিলো যে ছেলে আর্ট কলেজে পড়ে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কিন্তু একটুও দমে না গিয়ে এবার নারায়ণ কাজ খুঁজতে থাকলো । সেই সময় আঁকিয়েদের আর কে কাজ দেবে, কার্টুনও কেউ আঁকতো না। শৈল চক্রবর্তী, প্রতুল চন্দ্র লাহিড়ীদের মতো প্রতিভাবান কার্টুনিস্টদের তেমন ভাবে কেউ চিনতো না বা উৎসাহ দিতো না। যাইহোক, নারায়ণ দেবনাথের হাতেখড়ি হয় বিজ্ঞাপনের স্লাইড-শো দিয়ে। এগুলো দেখানো হতো সিনেমা হলে বিরতির সময়। এছাড়াও বাণাটে হতো নানারকম জিনিষের লেবেল। এই সব করতে করতেই সে পৌঁছে যায় দেব সাহিত্য কুটিরের অফিসে।

সেখানে তাকে ছোট খাটো ছবি আঁকার কাজ দেওয়া হতো। আর নারায়ণের ও তো বহুদিনের ইচ্ছা ছিলো দেব সাহিত্য কুটিরের সাথে কাজ করার। তখন বাংলা ভাষার নিজস্ব কমিক্‌স বলতে মোটে একটি- শেয়াল পন্ডিত। প্রতুল চন্দ্র লাহিড়ীর আঁকা এই কমিক স্ট্রীপটি বেরোতো যুগান্তর দৈনিক পত্রিকায়। বিদেশি কমিক্‌সের রমরমাই বেশি। কিন্তু শেয়াল পন্ডিতকে সবাই পছন্দ করতো। দেব সাহিত্য কুটির থেকে নারায়ণ দেবনাথকে বলা হলো যদি হাঁদা-ভোঁদা নাম দিয়ে কিছু করা যায় -শুরু হলো সাদা-কালোতে আঁকা দুটো ডানপিটে ছেলের গল্প। রোগা হাঁদা আর মোটাসোটা ভোঁদার নানারকমের দুষ্টুমির গল্প পড়ে ছোটরা তো আনন্দ পেলোই, বড়রাও হাসতে হাসতে মাত!
হাঁদা ভোঁদা
 
তাই সাদা-কালো কমিক্‌সের পর রংচঙে কমিক্‌সের ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়ে গেলো। একদিন হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর মাথায় এসে যায় অদ্ভূত এক নাম - বাঁটুল দি গ্রেট! আর নামটা মনে হওয়ার সাথে সাথেই বাঁটুলের ছবিও মনে মনে তৈরি করে ফেললেন। ব্যস, এসে গেলো এক বাঙালী সুপার হিরো। কিন্তু প্রথম দিকে তেমন সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না। এমন সময়ে শুরু হলো বাংলাদেশের যুদ্ধ। সবাই যুদ্ধের নানান আলোচনায় মত্ত। দেব সাহিত্য কুটিরের নির্দেশে, নারায়ণ তখন বাঁটুল কে হাজির করলেন কামান, গুলি-গোলা, প্লেন এইসব নিয়ে। যুদ্ধের এইসব সরঞ্জাম বাঁটুলের কিছুই করতে পারেনা। সে একাই একশো। আর তার সাথে ছিলো বাচ্চু আর বিচ্ছু নামের দুটো অসম্ভব দুরন্ত ছেলের ভয়ানক দুষ্টুমি। তারা বাঁটুলের সাথেই থাকে। এইবার কিন্তু সবার মধ্যে সারা ফেলে দিলো বাঁটুল।
বাঁটুল

এরপর নারায়ণ দেবনাথের যোগাযোগ হয় কিশোরভারতী পত্রিকার সাথে। ব্ল্যাক ডায়মন্ড ও ইন্দ্রজিৎ নামে এক বিখ্যাত রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের ছবি আঁকেন তিনি। এরপর পত্রিকার সম্পাদক দীণেশ চন্দ্র রায় তাঁকে নতুন কমিক্‌ স্ট্রিপ তৈরি করার কথা বলেন। নারায়ণ তৈরি করলেন পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান। সে ম্যাজিক কে কাজে লাগিয়ে চোর ডাকাত ধরে। কিন্তু দীনেশবাবু আসলে হাঁদা-ভোঁদার মতো কিছু একটা চাইছিলেন। নন্টে-ফন্টের উদ্ভব এইভাবেই। এরা দুই বন্ধু থাকে স্কুল বোর্ডিংএ। এদের হস্টেল জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে চলতে থাকলো এই কমিক্‌সগুলি। এই গল্পগুলির আরেক প্রধান চরিত্র হলো কেল্টুদা, যে কিনা বোর্ডিংএ নন্টে-ফন্টের সঙ্গে থাকে। কেল্টুদা সবসময় নন্টে-ফন্টেকে বোকা বানানোর অথবা বিপদে ফেলার  চেষ্টা করে, কিন্তু উলটে শেষ পর্যন্ত নিজেই ফাঁদে পড়ে। আর আছেন হস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেণ্ট। বিশাল মোটা এই চরিত্রটির সঙ্গে হাঁদা-ভোঁদার পিসেমশাইএর চেহারার খুব মিল।
নন্টে ফন্টে

এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, বাংলা কমিক্‌সের নাম বলতে গেলে প্রথমেই নারায়ণ দেবনাথের কথা বলতে হবে। তাঁর মতে, কমিক স্ট্রিপ বা কার্টুন তৈরি করতে গেলে, আঁকা এবং লেখার ক্ষমতা ছাড়াও দরকার উপস্থিত বুদ্ধির আর সঠিক কৌতুকবোধের। আজ তাঁর বয়স হয়েছে, কিন্তু কাজ করা থামেনি। তাই বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে দের নতুন নতুন কান্ড-কারখানার ছক তৈরিতে তিনি আজও সমান ব্যস্ত। তাই তো তিনি নারায়ণ দ্য গ্রেট!!
 
 
 
 
লেখাঃ
পূর্বাশা
নিউ আলিপুর, কলকাতা
 
 ছবিঃ
উইকিপিডিয়া
ল্যামবিয়েক

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)