খেলাঘরখেলাঘর

বায়োস্কোপ


(গত সংখ্যার পর)

গত সংখ্যায় তো বলেছিলাম কিভবে ম্যাডান থিয়েটার হয়ে উঠেছিল কলকাতার প্রথম বায়োস্কোপ কোম্পানি, এবং বানিয়েছিলেন প্রথম কাহিনীচিত্র 'সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র'।
ম্যাডানরা দুবছর বাদে আরো বড় ছবি বানালেন, নাম 'বিল্বমঙ্গল'। এই ছবি এমনকি বাংলার সুদূর বরিশাল শহরেও দেখানো হয়েছিল। বাংলার পূবদিকে ( তখনও বঙ্গভঙ্গ হয়নি) ১৮৯৮ সালে ২৮শে এপ্রিল, ভোলার এস ডি ও বাংলোয় প্রথম ছবি দেখান হীরালাল সেন। তার কয়েকদিন পরেই ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারে কলকাতার ব্রেডফোর্ড কোম্পানি জনসাধারনের জন্য কয়েকটি ছবি দেখান।

বিল্বমঙ্গল
বিল্বমঙ্গল ছবির বিজ্ঞাপন

সে যুগের প্রযোজকদের ছবি, বিশেষভাবে ম্যাডানদের ছবি সিনেমার বানানোর নানা ঘরানার এক ধরনের অগোছালো মেলামেশা ছিল। চিত্রনাট্য তেমন কিছু থাকত না। ক্যামেরাম্যান ছিলেন সর্বেসর্বা।যেমন তেমন করে মাস চারেকের মধ্যে শেষ করে দেওয়া হত একেকটা 'বই' । সিনেমা সম্পর্কে ম্যাডানদের কি ধারনা ছিল বোঝা যায় যখন দেখি তাদের প্রথম দুজন পরিচালক ছিলেন তাদেরই প্রতিষ্ঠান এর টাইপিস্ট প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি আর অ্যাকাউন্ট্যান্ট জ্যোতিষ বন্দোপাধ্যায়। ম্যাডান কোম্পানির অভিনেতা অভিনেত্রীরা আসতেন পেশাদার রংগমঞ্চ ও কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজ থেকে।তখন তো সিনেমা তে শব্দ ছিল না; তাই বাংলা বলার কোন দায় ছিল না। যেজন্য সীতা দেবী (নীনা স্মিথ) বা ইন্দ্রা দেবী ( এফী হিপ্পোলেট) - এই দুজন দেশি মেমসাহেব হয়ে উঠেছিলেন আমাদের প্রধান নায়িকা। সঙ্গে ছিলেন দানীবাবু, দুর্গাদাসবাবু বা নির্মলেন্দু লাহিড়ী, যাঁরা সবাই আদতে নাট্য অভিনেতা ছিলেন। স্বনামধন্য নাট্য ব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ী যে চলচ্চিত্র জগতে আশে, তাও কিন্তু মূলতঃ ম্যাডানদের অবদান।

শিশির
শিশির কুমার ভাদুড়ি (বাঁদিকে)

কলকাতার ছবি, আমার মনে হয়, প্রথম একটু ছবি হয়ে উঠল, যখন ধীরেন গাঙ্গুলি মশাই 'বিলেত ফেরত' বা 'England Returned' নামে ছবিটিতে অভিনয় করলেন। সারা দেশই তখন ইংরেজদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণ পোষণ করছে। ধীরেন গাঙ্গুলি ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র এবং সূদূর হায়দ্রাবাদের নিজাম কলেজে কলা শিক্ষকতা করতেন। তাই তাঁর তৈরি করা ছবিতে একটু অন্যরকম ভাবনা চিন্তা এল। তিনি তাঁর ছবিতে নকল সাহেবদের ঠাট্টা করার সাহস দেখালেন। নিরস তথ্য বা পুরাণের মহিমা নয়, বললেন চোখে দেখা জীবনের গল্প। তাই এই ছবিটি অসম্ভব জনপ্রিয় হল।

ধীরেন বসু
ধীরেন বসু

ক্রমশঃই ছবির জগতে ভীড় বাড়তে থাকে। ১৯২২ সালে বছরে ১৫টি ছবি তৈরি হয়। আরেকটা হিসাব দেখায়, টাকাপয়সার অসুবিধা থাকা সত্বেও ১৯৩০ সালে ২২টি ছবি তৈরি হয়। বাঙালি প্রযোজকদের সঙ্খ্যাও ক্রমশঃ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই অনাদি বসু তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত অরোরা স্টুডিও। ১৯৩৬ সালের আগে অরোরার নিজস্ব স্টুডিও ছিল না। কিন্তু তা সত্বেও তারা ম্যাডান কোম্পানির সাথে পাল্লা দিয়ে তথ্যচিত্র বানিয়ে গিয়েছেন। এরা কংগ্রেস অধিবেশন এর দৃশ্য, রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্রের বক্তৃতার প্রামাণ্য নথিচিত্র বানিয়ে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন।
ইতিমধ্যে হায়দ্রাবাদের পাট চুকিয়ে ধীরেন গাঙ্গুলি কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। হ্যারিসন রোডের ফুটপাথে তিনি একজন শিক্ষিত ছেলেকে গামছা বিক্রি করতে দেখে উতসুক হয়ে জানলেন যে সে গান্ধীজীর অসহযোগ মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েই এমন স্বদেশী পেশা বেছে নিয়েছে। এই যুবকটিকে তিনি নবগঠিত বৃটীশ ডোমিনিয়ন ফিল্ম কোম্পানিতে সু্যোগ দিলেন। রাজপুতানার জহরব্রতের আদর্শে অনুপ্রাণিত 'ফ্লেইম্‌স্‌ অফ ফ্লেশ' তাঁরই চিত্রনাট্য। তিনিই বাংলার প্রথম স্বকীয়তায় ঝলমলে পরিচালক- দেবকী কুমার বসু। তার কিছুদিন পরেই এই কোম্পানি খুঁজে বার করেন বাংলা ছবির জগতের আরেক তারকা- প্রমথেশ বড়ুয়াকে।

সেইসব গল্প আগামি সংখ্যায়।

অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
চলচ্চিত্র বিদ্যা বিভাগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়