খেলাঘরখেলাঘর

প্রথমেই বলে রাখি যে, আমার এই লেখা ইউরোপের শিল্পের ইতিহাস বর্ণনা নয়, বা ইউরোপের নামী শিল্পীদের কোনো কাহিনীও নয়। ইউনাটেড কিংডামে কাটানোর সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায়ে বেড়াতে গেছি। ছোটোবেলা থেকেই শিল্পের দিকে একটা টান ছিল। এক কাকুর কাছে আঁকা শিখেছিলাম কদিন, সেইখানে কাকুর অনেক বই দেখতাম, কত বিখ্যাত বিদেশি শিল্পীর আঁকা দেখে মুগ্ধ হতাম। এখন ভেবে রোমাঞ্চ হয় যে তার মধ্যে বেশ কিছু ছবি, ভাস্কর্য্য আমি সামনে থেকে দেখে এসেছি। তেমনি কিছু স্মৃতি কিছু ছবি নিয়ে আমার এই ফটো ফিচার।

এই পর্বে রয়েছে ইউনাটেড কিংডামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা, খ্রীষ্ট পূর্ব থেকে অদূর অতীতের শিল্পের কিছু নিদর্শন নিয়ে আমার এই ছবির ডালি।

minarva-head

১) রোমানরা ইংল্যান্ডে আসে খ্রীষ্ট পূর্ব সময়ে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ড-এর “বাথ” শহর আজ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ঠান্ডার দেশে এসে এই জায়গাতেই রোমানরা খুঁজে পেয়েছিল উষ্ণ প্রস্রবন, আর গরম জলের উৎস আর অ্যাভন নদীর পাশেই গড়ে তুলেছিল এই অসাধারণ শহর।
একটা গোটা শহর জুড়ে শিল্পের এরকম ছড়াছড়ি সারা বিশ্বে বিরল। ওখানকার মিউসিয়ামে রাখা আছে দুই শহস্রাব্দ আগেকার খুজে পাওয়া রোমান শিল্প।
২০০০ বছরেরও বেশী পুরোনো ব্রোঞ্জের তৈরী দেবী মিনার্ভা-র মস্তকের এই ভাস্কর্য রাখা আছে সেই মিউসিইয়ামে।

gorgon's head



২) “গর্গন” - গ্রীক রূপকথায়ে ভয়ঙ্কর তিন বোনের গল্প আছে, স্থেনো, ইউরায়েল আর মেডুসা। সেই রূপকথারই অঙ্গ “গর্গন্স হেড” বা গর্গনের মস্তকের এক সুপ্রাচীন ভাস্কর্য রাখা আছে বাথ মিউসিয়ামে। সেই ভাস্কর্যেরই ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলাম আমার রোমান বাথ ভ্রমণে।

 

hipocampi

৩) প্রাচীন গ্রীক গ্রন্থকার হোমার লিখেছিলেন ঘোড়ার তথা সমুদ্রের দেবতা পসেইডন রথে চড়ে সাগরের ওপর দিয়ে যেতেন। পসেইডনের সেই রথ টেনে নিয়ে যেত সামুদ্রিক ঘোড়া “হিপোক্যাম্পি”।
সেই হিপোক্যাম্পি-র এক মোসেক চিত্র এই ছবিতে আমরা দেখতে পাই। কোনো এক সময়ে এটি এক রোমান প্রাসাদের মেঝেতে শোভা পেত। অসাধারণ এই শিল্পকীর্তির স্রষ্টা কে তা কেউ জানবে না। কিন্তু তার শিল্প অমর হয়ে থাকল যুগ যুগান্ত ধরে। এই ছবি রোমান বাথ মিউসিয়ামে তোলা।

picadelly

৪) লন্ডনের পিকাডেলি সার্কাস এক বিখ্যাত ও উল্লেখযোগ্য জায়গা, যে কোনো ভ্রমণকারীর অবশ্য গন্তব্য। কলকাতার শ্যামবাজারের মোড়ের মতন এটাও বিভিন্ন রাস্তার সংগমস্থল। এই সংগমস্থলেই,লর্ড  শাফট্‌‌সবেরীর স্মৃতিতে, ১৮৯২ সালে নির্মান করা হল “শাফট্‌‌সবেরী মনুমেন্ট মেমোরিয়াল ফাউন্টেন”। সেই ফোয়ারার চূড়ায়ে গ্রীক প্রেমের দেবতা “ইরস”-এর ভাই “অ্যান্টেরস”-এর এই কিংবদন্তী মূর্তি নির্মান করেন শিল্পী অ্যালফ্রেড গিলবার্ট। এই মর্তি পৃথিবীর সর্বপ্রথম ভাস্কর্য যা অ্যালুমিনিয়াম কাস্টে নির্মিত এবং সেই দিক থেকে এক যুগান্তকারী শিল্প। সর্বসাধারনের সামনে রাখার জন্যে তখনকার যুগে এই নগ্ন মূর্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরী হলেও জনসাধারণ একে গ্রহন করে।  একে অনেকে “দি এঞ্জেল অফ খ্রীসচান চ্যারিটি” বলে সম্বোধন করেন।

রানীর বাড়ির পরী

৫) লন্ডনে গেলে রানীর বাড়ি দেখতে সবাই যাবেই। রানী থাকেন বাকিংহাম প্যালেসে। প্রয়াত রানী ভিক্টোরিয়ার মেমোরিয়াল তৈরী হয়েছিল ১৯১১ সালে ঠিক বাকিংহাম প্যালেসের সামনে।
এই সোনালি মুর্তির নাম “এঞ্জেল অফ ভিক্টরি” যা অবস্থিত এই মেমোরিয়ালের চুড়া হিসেবে। শিল্পী সার থমাস ব্রোক এই মেমোরিয়াল তৈরী করেন।

ট্রাফেলগার স্কোয়ার

৬) “ট্রাফেলগার স্কোয়ার”। মধ্য লন্ডনের এই জায়গা সারা পৃথিবীর পর্যটক এক নামে চেনে। বিশ্বের সব থেকে বিখ্যাত “স্কোয়ার” গুলোর মধ্যে অন্যতম। সেখানকারই বিখ্যাত ফোয়ারার একাংশ আমাকে আকর্ষণ করেছিল খুব বেশি। সেই ছবি তুলেছিলাম যা মনে ধরেছিল। পাথরের গায়ে সঙ্গীতের ছোঁয়া রয়েছে এই শিল্প কীর্তির মধ্যে।

ক্যসেল কখ্

৭) “ক্যসেল কখ্‌” - কার্ডিফ। কাঠের তৈরী এই আসাধারণ ঝাড় লন্ঠন এক কথায়ে অনবদ্য। কোনও এক অজানা শিল্পীর এই অপূর্ব সুন্দর সৃষ্টি এখন সমান মন কাড়ে।

বাঁশি

৮) কার্ডিফের সেন্ট ফ্যাগান্স মিউসিয়ামে রাখা আছে ওয়েল্‌স্‌ দেশের বিভিন্ন সুপ্রাচীন অখ্যাত শিল্প। এই প্রস্তর মূর্তি জীবন্ত হয়ে আছে মেঘাবৃত ইউনাইটেড কিংডামের আকাশের নীচে।

মার্চেন্ট সীফেয়ারার’স ওয়ার মেমরিয়াল

 

৯) "মার্চেন্ট সীফেয়ারার’স ওয়ার মেমরিয়াল"। খুব আধুনিক এই বিরাট ধাতব শিল্পকীর্তি তৈরী হয় ১৯৯৭ সালে। যে সব যোদ্ধারা কার্ডিফ এবং পেনার্থ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেরিয়ে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি, তাদের স্মৃতির উদ্দেশেই এখানে আছে "ওয়ার মেমোরিয়াল"। বিকেলের পড়ন্ত রোদে এই শায়িত মস্তক সেই সৈনিকদের করুণ অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

খোদাই করে অসামান্য বেঞ্চ

১০) ইউনাটেড কিংডামের অনেক জায়গাতেই দেখেছি, অতি সাধারণ বস্তুকে অসাধারণ কি করে বানানো যায়ে। কোনো এক গাছের গুড়ি কেটে খোদাই করে এরকম অসামান্য বেঞ্চ বানানো যায়ে তা দেখে মন ভরে গেছিল। ৩০০ বছর ধরে শাষিত-শোষিত হবার পরেও এই ইংরেজ জাতের প্রতি এক সম্মান জেগে ওঠে। এখানে এখনও শিল্প বেঁচে আছে এবং এখানকার মানুষ তার যোগ্য মর্যাদা দিয়েছে।

 

লেখা ও ছবিঃ
ঋতম ব্যানার্জী
কলকাতা