সূচীপত্র -বর্ষা-শরৎ যুগ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

দু’ মাস হয়ে গেল ডেনমার্কে এসেছি। ছোটবেলা থেকেই ইউরোপ-এর একটা টান আমাদের ভারতবাসীর মধ্যে থাকে। বিদেশ বলতে “ইউরোপ টুর”-এর কথাই আমাদের প্রথম মাথায় আসে। এর আগেও যখন কার্ডিফ-এ থাকতাম, তখন ভিসা বানিয়ে ইউরোপ টুরে এসেছিলাম ব্রিটেন থেকে। তবে এখন আমার কর্মসূত্রে আসা উত্তর ইউরোপের ডেনমার্কে। এই নিয়ে তৃতীয় বার ইউরোপ, আর এবারেই সব থেকে বেশি দিনের জন্যে।

যতবারই এসেছি এসেছি ইউরোপের গ্রীষ্মে। এখন ইউরোপের বরফ ঢাকা চেহারা দেখার সু্যোগ পাইনি। কিন্তু দেখেছি এখানে রাত ১১ টার সময়েও আকাশে লালচে রঙের ছোঁয়া। এখানে গ্রীষ্মকালে আকাশ কালো হয়না, নীলচে থাকে। অন্তত জুন-জুলাই মাসে। সূর্য ওঠে ভোর ৪টেরও আগে, ডোবে রাত দশটার পর। আমি এখন আছি ডেনমার্কের পশ্চিম জাটল্যান্ড-এর আরহুস শহরে। এখানের লোকেরা উচ্চারন করে – অহুস্‌। এখানে নামের বানান এক, উচ্চারন আরেক। প্রথম প্রথম এসে খুব অসুবিধে হত। অনেক লোক ইংরেজি বোঝেনা। কিন্তু ডেনমার্ক খুব সুন্দর, ইউরোপের সমস্ত আস্বাদ আছে এখানে।

সে যাই হোক, এখন একটা বেড়ানোর গল্প করি। অহুস-এর থেকে ১ ঘন্টার দুরত্বে “হিমেলবিয়েরে” বলে একটা জায়গা। ইংরাজিতে অনুবাদ করলে তার মানে দাঁড়ায়ে Sky Mountain বা আকাশ পাহাড়। শুনলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। কিন্তু ড্যানিশ লোকেরা আগে থেকেই বলে দেয়, ডেনমার্কে “মাউন্টেন” বলে কিছু নেই, সামান্য টিলা বিশেষ। তাও পাহাড়ের টানেই সেই বিশেষ দর্শনীয় স্থান ভ্রমণে আমাদের যাত্রা। চার বন্ধু মিলে চললাম অহুস থেকে ট্রেনে চেপে। সুন্দর রোদ ঝলমলে দিন, আকাশে একটা মেঘের চিহ্ন মাত্র নেই। সিল্কেবর্গ ষ্টেশনে নামলাম। সেখানে ষ্টেশনে এনকোয়্যারিতে-তে খোঁজ নিয়ে জানলাম, সেখান থেকে কোনো বাস ছাড়ে না, ফেরিতে চেপে যেতে হবে।

হাঁটতে হাঁটতে একটা লেকের ধারে এলাম। টিকিট কাটা হল। একটা ছোট ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করলাম কখন ফেরি আসবে। রোদ ঝলমলে দিন, সবুজ জলে লাল নীল ছোট ছোট কায়াক্‌ চালাচ্ছে যুবক থেকে বয়স্ক। এখানে বয়সের কোনো সীমারেখা নেই। এখানে ষাট বছরের বুড়ো কেও দেখেছি সমুদ্রের ওপর একা কায়াক্‌ চালিয়ে নিয়ে যেতে। আমাদের দেশেও এরকম হয়, তবে তা নিতান্ত প্রয়োজনে, জীবিকার খাতিরে; এখানে বয়স্করা দুঃসাহসিক সব কান্ড করেন নিছক শখে। ফেরি এল যথাসময়ে। ফেরিতেই ভাড়া দিতে হবে ১৩০ ক্রোনার। ফেরি সিল্কেবর্গ থেকে নিয়ে যাবে হিমেলবিয়েরে, আবার ফিরিয়ে আনবে সিল্কেবর্গে। তবে আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ি আমরা ফিরব না, হিমেলবিয়েরেতে নেমে পড়ব। সেখান থেকে হেটে উঠব আকাশ পাহাড়ের মাথায়ে। ফেরি ছাড়ল। শহরের গন্ডি ছাড়াতেই দুধারে সুন্দরবনের মতন ঘন গাছপালা, মাঝখান দিয়ে জলপথ। শুধু তফাৎ এই যে জলে কুমির নেই, জঙ্গলে বাঘ নেই। এখানে মানুষ জন নির্দ্বিধায় বেড়াচ্ছে নৌবিহারে।

জুলাই মাস ডেনমার্ক-এ ছুটির মাস বলা যায়। আমাদের যেমন গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে স্কুলে, এখানে স্কুল থেকে অফিস সবেরই “summer vacation” চলে এই সময়ে। আমাদের যেমন শীতকাল মানে আরামের সময়, এখানকার মানুষ অপেক্ষা করে কখন একটু গরম পড়বে। কলকাতায় যেমন লোকেরা আশা করে থাকে, এই বছর শীত যেন বেশী দিন থাকে, হুট করে গরম যেন না পড়ে যায়। এখানে ঠিক উল্টো। এইদিন ছিল ডেনমার্ক-এর তুলনায় প্রচন্ড গরমের দিন, তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির ওপর আর গন্‌গনে রোদ।

দীর্ঘ লেক। খানিক্ষণ পরে দুধারের গাছপালা কমে এল। লেক আরও চওড়া হল। দূরে ছোট ছোট পাহাড় দেখা গেল। দৃশ্য সত্যিই চোখজোড়ানো। আমরা লঞ্চ-বোটের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, কখনও বা ছাওঁনির মধ্যে ঢুকে রোদের তাপ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছি। দেখা যাচ্ছে জলের ধারে কিছু কিছু জায়গায় কিছু কিছু ফার্মহাউস ধাঁচের বাড়ি, কিছু হয়তো হোটেল। কিছু বাঁধানো এলাকায় অনেকে স্নান করতে নেমে পড়েছে লেকের জলে বাচ্চা কাচ্চা সমেত। কিছু জায়গায়ে লেক খুব সংকীর্ণ, কিছু জায়গায়ে বিশাল চওড়া। কিছু কিছু জায়গায়ে জলের মধ্যে ছোটখাটো দ্বীপ মাথা তুলে রয়েছে লেকের জলে। লঞ্চ বিভিন্ন জায়গায়ে থেমে, লোক নামিয়ে লোক তুলে, আবার এগিয়ে পৌঁছোল শেষ গন্তব্যে। এখান থেকে ফিরে যাবে এই জলযান। কিন্তু আমরা চড়ব পাহাড়ে, তারপর ফিরব অন্য পথে। তাই ডাঙ্গায় নেমে পড়ে বিদায় জানালাম ফিরতি পথের ফেরির যাত্রীদের। লেকের ওপারে দেখা যাচ্ছে অনুচ্চ পাহাড়ের গায়ে বড় বড় উইন্ডমিল্‌। হয়তো বিদ্যুৎ উথপন্ন করার কাজে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়াও অনেক ছোটখাটো রংচঙে ঘরবাড়ি।

বিকেল পাঁচটা বাজছে, অথচ পেটে কিছু নেই। তাই প্রথমেই খাওয়ার কথা মনে এল। লেকের ধার থেকেই জঙ্গুলে পাহাড় শুরু। একটা লম্বা সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলাম এখানকার একমাত্র দোকানের সামনে। হট্‌ডগ্‌ খেলাম সবাই, তার সঙ্গে কোল্ড ড্রিঙ্কস্‌। শরীরে একটু বল ফিরল। এবারে ঘন গাছপালা ভরা পাহাড়ে সরু রাস্তা ধরে চড়াই পথ। গল্প করতে করতে ছবি তুলতে তুলতে উঠছি। মনে হচ্ছে গোটা পাহাড়ে আমরাই মানুষ, আর কেউই নেই। তবে যতই হোক, ইউরোপ বলে কথা। লোকজন যাতে জঙ্গলে পথ ভুল না করে, তাই মাঝেই মাঝেই দিক নির্ণয় করা রয়েছে। লেখা হয়তো ড্যানিশ-এ, তবে মানে বোঝা যাচ্ছে তীরচিহ্ণ দেখে। ১৫ মিনিট চলার পরেই জঙ্গল শেষ। নেড়া পাহাড়ে সবুজ ঘাস, আর পাহাড়ের চূড়ায় দেখা যাচ্ছে একটা টাওয়ার।

এখান থেকে নীচের লম্বা লেক আর নীচের জঙ্গলের দৃশ্য বড়ই মনোরম। পাহাড়ি আঁকা বাঁকা পথে, সাবলিল চড়াই পথে খুব সহজেই পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের মাথায়, টাওয়ারের সামনে। জাটল্যান্ডের দ্বিতীয় উচ্চতম স্থান এই হিমেলবিয়েরের পাহাড় চূড়া। উচ্চতায় হাজার ফিটেরও কম হবে। খুব সুন্দর রোদ ছিল যদিও তখন বাঙালী মতে সন্ধ্যে সাতটা। চারধারে পাহাড়ের গাছের মাথা ছুঁয়ে সোনালী আলো এসে পড়েছে, অনেক নীচে দেখা যাচ্ছে লেকের জলের বিস্তার।

প্রায়ে দেড় ঘন্টা বসে ছিলাম আমরা। কখনও গল্প করেছি বন্ধুরা; কখনও অন্যান্য ঘুরতে আসা টু্রিস্টদের গ্রুপ ফটো তুলতে সাহায্য করেছি; কখনও নিজের মনে একাকীত্ব অনুভব করেছি এই সুন্দর প্রকৃতির সঙ্গে, নিঃশ্বাস নিয়েছি মিষ্টি ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধ ভরা বাতাসে।

একসময়ে মনে হল ফেরার শেষ ট্রেনটা চলে যাবে আর এক ঘন্টার মধ্যে। তাই না চাইতেও পা বাড়াতে হল পাহাড় থেকে নামার উথরাই পথে। পাহাড়ের লাগোয়া একটা সুন্দর হোটেল আছে, কেউ যাইলে এই জঙ্গুলে পাহাড়ের থেকেও যেতে পারে রাতটা। তবে আমাদের মতন দিনের দিন ফিরে যাবার লোকই বেশী। ট্যাক্সিতে চেপে রী ষ্টেশনে এসে অপেক্ষা করতে করতে ট্রেন চলে এল।

খুব সাধারণ ভেবেছিলাম জায়গাটাকে। ভেবেছিলাম, ১০০০ ফিট উঁচু পাহাড় আবার পাহাড় নাকি। কিন্তু প্রকৃতি মানুষের জন্যে তার সেরা টুকুই রেখে যায়। কিছু সৌন্দর্য পিপাসু মানুষ তাকে বাঁচিয়ে রাখে, কিছু মানুষ তাকে নষ্ট করে।


ঋতম ব্যানার্জি
ডেনমার্ক