সূচীপত্র -বর্ষা-শরৎ যুগ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

দণ্ডকারণ্যের কথা।উড়িষ্যার মালকানগিরি নামক জাগায় পরিবার নিয়ে তখন বাস করি।গ্রামের নাম পদমগিরি।সেখানে আমি আর আমার স্ত্রী শিক্ষকতা করতাম। সে ছিল অজ পাড়াগাঁ।গাঁ থেকে বড় রাস্তা ছিল পাঁচ কিলো মিটার দূরে।মেঠো রাস্তায় সাইকেল ছাড়া কখনো সখনো দু একটা বাইক চোখে পড়ত।গরুর গাড়ির যাতায়াত ছিল সবচে বেশী।রাত হলে মনে হতো জন মানবহীন কোন দ্বীপে বাস করছি।কেরোসিনের ল্যাম্প,বড় জোর হ্যারিকেন রাতের আলোর সম্বল ছিল। গ্রামের সব ঘর ছিল মাটির তৈরি।কেবল মাত্র স্কুল ঘর ছিল পাকা, সেটা সরকারের দেন।গ্রামবাসীরা দু এক ঘর ছাড়া দিন আনা,দিন খাওয়ার মত অবস্থায় ছিল। আমি আর স্ত্রী দু জনেই মাত্র শিক্ষক ও শিক্ষিকা।ছিলাম স্কুলের অফিস ঘরে।আমাদের দুই মেয়ে।দু জনই ছোট।বড় জন ক্লাস টুতে,ছোটজন আড়াই বছরের শিশু। অনেক সমস্যার মধ্যেও যেটা বেশী করে অনুভব করছিলাম সেটা হল দুধ--দুধ জোটানো মুস্কিলের ব্যাপার হয়ে উঠে ছিল। আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থাকলেও দুধের খুব অভাব ছিল!এর ওর কাছ থেকে জোটাতে হচ্ছিল।কিন্তু বড় অনিয়মিত ভাবে। বাচ্চাদের নিয়ম মত ও প্রয়োজন মত দুধ খাওয়ানো অসম্ভব প্রায় হোয়ে উঠে ছিল।

একদিন গ্রামের এক বয়স্কা জন এসে স্ত্রীকে বললেন,‘দিদিমণি, বাবুকে বলেন না,একটা গরু কিনতে--দুধ দেওয়া একটা গরু কিনলে আপনাদের দুধের চিন্তা আর থাকবো না।’

আমার স্ত্রী কথাটা আমায় পাড়লেন।একদিন,দুদিন শোনার পর ব্যাপারটা আমিও ভেবে দেখলাম।মন্দ নয়,যদি আমরা একটা গরু পুষি?তবে দুধ দোয়া আর চড়ানোর কি হবে?

সেই বয়স্কা জনের সামনে প্রশ্নগুলি রাখা হলে তিনিই জানালেন, ‘গ্রামে গরু চরাবার ছেলের অভাব হবে না,অভাবী গ্রামে গরু দোয়াবার লোকেরও অভাব নাই !’ কথাগুলি যুক্তিযুক্ত মনে হল।

সামনের রবিবার গরুর হাট ছিল।যেতে হবে পাঁচ কিলোমিটার সাইকেলে।সঙ্গে গরুর ব্যাপারে ভালো জানে এবং গরুকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসার জন্যে বিজ্ঞ,অভিজ্ঞ লোক নিয়ে হাজির হলাম গরুর হাটে।হাটে কত রকমের গরু--সাদা,কালো,খয়েরি কিম্বা সাদায় কালোয় মিশানো,খয়েরি সাদায় মেশানো,সব রঙের--আর আকার আকৃতি প্রকৃতিতে নানা জাতের গরু সব।

সাথের লোকটা একটা কালোয় সাদায় মেশানো,মাঝারি সাইজের নাদুস নুদুস গরু পছন্দ করল।আমার খারাপ লাগলো না,কিন্তু প্রকৃতি--মানে স্বভাব ওর ভালো ছিল না।ওটার পিঠে যেই হাত রাখলাম,ওটা আমার সামনে সিং উঁচিয়ে ধরল!আর পিছনের পা দুটো ছাঁটাতে থাকলো।ওটাকে দুষ্ট স্বভাবের মনে হল।ওর পাশের গরুটা খয়েরি রঙের ছিল,মোটা মুটি বড়সড় দেখলাম।ওটা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার গা শুঁকছিল।ওর দিকে নজর পড়ল, সাথীকে বললাম,‘আচ্ছা এ গরুটি কেমন হবে?’ সাথী বলল,‘বয়স সামান্য বেশী,দুধ খুব একটা দেবে না।’

বললাম,‘কিন্তু শান্তশিষ্ট আছে।’

সাথী বলল,‘কিন্তু বাচ্চা দেবে দেরীতে।এটার চে আমার পছন্দের সাদা কালো গরুটা বাচ্চা দেবে তাড়াতাড়ি।’

সাদাকালো গরু ভালো লাগছিল না--কথায় বলে দুষ্ট গরুর চে শূন্য গোয়াল ভালো।বললাম,‘আমার এই খয়েরি রঙের গরুটা ভালো লাগছে।’

--‘কিন্তু দুধ দিতে চার পাঁচ মাস দেরী হবে মাস্টামশাই !’সাথী বলে উঠলো।

আমার পছন্দের গরুটা আমার দিকে সামান্য এগিয়ে এলো। দেখলাম ওর কপালে চাঁদের মত সাদা গোল করা আছে।ওর চাঁদ কপালে হাত বুলিয়ে দিলাম।ওটাও আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। জীবনে ওই দিনই গরুর চোখের দিকে ভালো করে তাকালাম।বড় বড় সুন্দর দুটি চোখ হয় গরুর ! সাদার মধ্যে কালো চক্ষু মনির এমন মানানসই সৌন্দর্য ত আগে কখনো লক্ষ্য করিনি ! ভাবলাম, আহা মায়াময় চোখদুটি ! মনে হল কোন মানুষের যদি এমন চোখ থাকে নিঃসন্দেহে চোখের ভাষায় তাকে সরল,স্বচ্ছ ও উদার মনে হবে।সে চোখে যেন স্নেহ,প্রেম,ভালোবাসা মিলে মিশে একাকার হোয়ে আছে!কেন জানি না,সেই মুহূর্তে মা’র কথা খুব মনে হচ্ছিল!

--‘মাস্টামশাই ! এই গাভীকে মনে হচ্ছে আপনার খুব পছন্দ!’ আমার সঙ্গের সাথী বলে উঠলো।

--‘হ্যাঁ,দেখুন না দাম দর করে!’আমি বললাম।

শেষে চারশো পঁচাত্তর টাকায় সে গরু কিনে ঘরে ফিরলাম।গরু দিব্বি বিনা প্রতিবাদে হেঁটে হেঁটে আমাদের ঘরে এলো।পথে আসতে আসতেই ওর একটা নাম ঠিক করে ফেললাম,লক্ষ্মী।শান্ত শিষ্ট গরুর নাম লক্ষ্মী রাখা যেতেই পারে !

গ্রামে ফিরতে মাস্টারের গরু দেখতে গ্রামের অনেকেই এলো। একেক জন এক এক রকমের মন্তব্য করল।

কেউ বলল,‘মাস্টারমশাই,এ গরু বাচ্চা দেবার পর পা ছাঁটবে খুব, দুধ দুয়াতে বেশ অসুবিধা হবে !’

কেউ বলল,‘দেখতে খারাপ না,তবে দুধ এক কিলোর বেশী পাবেন না।’

গ্রামের এক মাতব্বর গোছের লোক বলল,‘আমার তো মনে হয় বাঁজা গরু,না হলে চেহারা এমন চকচকে সুন্দর হয়?’

কেবল আমাদের যে দুধ দিত বয়স্কা মাসি বলেছিল,‘না বাবা! ভালো গরু কিনেছ তুমি।’

আমার দেওয়া লক্ষ্মী নাম ঘরের সবার ভালো লাগলো বলে সবাই ওকে লক্ষ্মী বলেই ডাকত।রোজই সময় পেলে আদর করতাম ওটাকে।ও শান্তশিষ্ট হয়ে মাথা তুলে তাকিয়ে থাকত আমার দিকে। কত অতল গভীর সে তাকানো,মনে হত,বড় মায়াময়,ত্যাগের সে চাহনি!

গরু চরাবার ছেলে ঠিক করলাম।বাচ্চা দেবার পর দুধ দুয়িয়ে দেবার জন্যে আগে থেকে লোক ঠিক করে রাখলাম।

দিন যায়,দিন আসে।লক্ষ্মী বাচ্চা দেবে এটা ক্রমশ:ওর শরীরে স্পষ্ট হতে লাগলো।ঠিক চার মাস আঠার দিনের দিন লক্ষ্মীর সাদা ফুট ফুটে এক বাচ্চা হল।বাচ্চা দেখে আনন্দে আমার বাচ্চারা,আমরা আহ্লাদে আটখানা হোয়ে গেলাম!

দুধ দোয়ানো শুরু হল।প্রথম দিন দু লিটার দুধ হল।বাচ্চা দেবার পর তিন দিন পর্যন্ত নাকি দুধ জাল দিতে নেই।কি করা যাবে, এদিক ওদিক বিলিয়ে সামান্য দুধ আমরাও খেলাম।

সাত দিনের মাথায় দু কিলো দুধ চার কিলোয় গিয়ে দাঁড়ালো।দুধ দেওয়া মাসি এসে সব শুনে খুব আনন্দ পেল।বলল,‘আমি কই ছিলাম না!খুব ভালো গরু আনছ তুমি!’

রোজ সকালে দুধ দোয়ানো হয়ে গেলে গাই বাছুর চরাতে নিয়ে যেত রাখাল ছেলে।

বিকেলে দুধ দোয়ানো হতো না।সারা দিনের দুধ খেয়ে বাছুরের চেহারা বেশ নাদুস নুদুস হোয়ে উঠলো।ঘরের সবাই পছন্দ করে ওর নাম রাখলাম,চন্দা।চন্দা লাফায় ঝাঁপায়--কেউ ওকে ধরতে গেলে ছুটে পালিয়ে যায় ওর মা লক্ষ্মীর কাছে।আমার ছোট মেয়ে দুটোর তো আনন্দের শেষ নেই।অনেক সময় ধরে তারা দূরে দাঁড়িয়ে বাছুরের খেলা দেখে যায়।

একদিনের কথা--চন্দা আমার খুঁড়োতে খুঁড়োতে এলো।রাখাল ছেলেটি বলতে পারলো না কি ভাবে ও ব্যথা পেয়েছে।দেখলাম, পায়ের খুড়ের ওপর দিকে অনেকটা কেটে গেছে।সঙ্গে সঙ্গে আঘাতের জাগা ধুয়ে মলম লাগিয়ে জাগাটা বেঁধে দিলাম।পর দিন থেকে ওকে ঘরে রাখার ব্যবস্থা হল।তিন দিন পর বাঁধন খুলে দেখি ঘা আরও বেড়ে গেছে!বেশ কিছু দিন ধরে ঘায়ে ওষুধ পট্টি করতে লাগলাম।কিন্তু কেন জানি না ঘা বেড়েই যেতে লাগলো।সারার লক্ষণ দূরে থাক--ক্রমশ: ঘা বড় হতে থাকলো।কিছুতেই কোন ওষুধ কাজে লাগছিল না।একদিন স্কুল থেকে এসে দেখি চন্দা আমার মরে গেছে!দু মেয়ে কেঁদে ভাসাল।স্ত্রীর চোখে জল দেখলাম। আমার চোখ ঝাপসা হোয়ে এসেছিল।লক্ষ্মী তার মরা বাচ্চাকে বারবার শুঁকে যাচ্ছিল।

এর পর আরও একটা বছর কেটে গেলো।জানি না কেন লক্ষ্মী মত শান্ত গরু পেয়ে আমাদের আর একটা গরু কেনার ইচ্ছা হল।আর এক দিন হাটে গিয়ে সাদা একটা গরু কিনে আনলাম।এ গরু দেখেও গ্রামের লোকেরা বিভিন্ন মন্তব্য করল।এ গরুর নাম রাখলাম,গৌরী।দেখেছি গৌরী,লক্ষ্মী থেকে কিছুটা চঞ্চল বটে,তবু আমার যেন কেন ভালো লাগলো।গৌরীকেও আদর করতাম। শুরুতে একবার দুবার ও সারা শরীর নাড়িয়ে ছাঁটিয়ে উঠত--পড়ে শান্ত হোয়ে যেত।ওর চোখ দুটোও দেখেছি--লক্ষ্মী ও গৌরীর চোখ প্রায় এক মতন--ধীর স্থির--চঞ্চলতার লক্ষণ তাতে ধরা পড়ে না। চোখের গভীরতা হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। মনের সমস্ত দ্বেষ বিদ্বেষকে যেন ভুলিয়ে দিয়ে যায়! প্রকৃত ভালবাসা সবাই বোঝে।হোক না কেন সে পশু।আমার লক্ষ্মী,গৌরী আমার ভালোবাসা বেশ বুঝতে পারত।আমার আদরের ছোঁয়া ওরা মন ভরে গ্রহণ করত।ওরা জানত ওদের আমরা কি নামে ডাকি—লক্ষ্মী,ডাকলে ও মুখ তুলে তাকাত। গৌরী,ডাকলে ও কান খাড়া করে নিজের নাম শুনে তাকিয়ে দেখত কে তাকে ডাকছে!

এমনি এক দিনের কথা।সন্ধ্যে পার হোয়ে গেছে।স্ত্রী বললেন,‘তুমি ঘরে নেই,দেখো তো লক্ষ্মী,গৌরী এখনো বাড়ি ফেরে নি!’

আশ্চর্য হলাম,‘বললাম,কেন গরু চরানোর ছেলেটা ফেরেনি?’

--‘না,এখনো ফেরে নি’,স্ত্রী নিরাশ হোয়ে বললেন।

আরও আধ ঘণ্টা কেটে গেলো।গরু ফিরল না!‘দেখি’বলে ঘরের বাইরে বেরলাম।এমনি সময় রাখল ছেলে হন্তদন্ত হোয়ে এসে বলল,‘তোমাগ গরু খুঁজে পাচ্ছি না গো ! ওরা কোন দিকে জঙ্গলে চইলে গেছে—’

--‘বলিস কি?’ব্যস্ত হোয়ে বললাম,‘চল দেখি’,বলে,সঙ্গে টর্চ নিয়ে জঙ্গলের দিকে বেরিয়ে গেলাম।

রাখালেরা জঙ্গলের অনেক ভিতরে গরু চরাতে ঢুকে যায়--রাতে ওই ঘন জঙ্গলে ঢোকা ঠিক নিরাপদ নয়।এ জঙ্গলে সময়ে অসময়ে বাঘ ভাল্লুকের আনা গোনা আছে!তবু হাঁটতে হাঁটতে আধ কিলোমিটার জঙ্গল পার হলাম।লক্ষ্মী,গৌরীর দেখা নেই।আর এগোনো যায় না,কি করি,কি করি,ভাবছিলাম।রাখল ছেলেটি,‘লক্ষ্মী,গৌরী,আয়, আয়’,বলে ডাক ছাড়তে লাগলো।

ক্রমশ: জঙ্গলে নীরবতা ছেয়ে যেতে লাগলো।আশপাশের গ্রামের সামান্য চীৎকার চেঁচামেচিও কানে আসছিল না।তার বদলে ঝিঁঝির ডাক,আর জোনাকির আলো চমকে চমকে উঠছিল।আমি এত সময় চুপচাপ ছিলাম।খুব খারাপ লাগছিল,মনে একটা বিষণ্ণ ভাব জমে উঠছিল।তারপর কি মনে হল আমি গলা ছেড়ে চীৎকার করে উঠলাম,‘লক্ষ্মী,গৌরী..লক্ষ্মী,গৌরী বলে...’এক বার,দু বার,তিন বার,এবার গভীর জঙ্গল থেকে আমার লক্ষ্মী,গৌরী চীৎকার করে উঠলো,‘হাম্বা,হাম্বা’,বলে।আবার গলা চড়ালাম,তার প্রত্যুতর এলো, ‘হাম্বা,হাম্বা !’একটু পরেই দেখলাম,আমাদের দিকেই ছুটে আসছে ওরা!কাছে এসে ওরা হাঁপাচ্ছিল।জঙ্গলে ওরা হারিয়ে গিয়েছিল, ওদের হাবভাবেও কেমন একটা ভয় ভয় ভাব লেগে ছিল।জঙ্গলের চাঁদের আবছা আলোর ভিতরে আমি ওদের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করলাম।লক্ষ্মী,গৌরের চোখের দিকে চোখ পড়ল,ওদের শান্ত চোখ তখন অন্ধকারে আবছা ডুবে ছিল,তবে চোখের কোল ঘেঁষে চিক চিক করছিল ওগুলি কি ! স্থিরতার অভ্যন্তরে অস্থিরতার প্রকাশ--ওদের চোখে সূক্ষ্ম জল বিন্দু ভরে আছে !

এমনি ভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল।দেখতে দেখতে চার পাঁচ বছর কেটে গেলো।ইতিমধ্যে লক্ষ্মীর বেশ কটি বাচ্চা হয়েছে--কিন্তু কোন বাচ্চাই বাঁচাতে পারিনি।কিছুটা বড় হবার পর কোন না কোন কারণে ওরা মারা যেত।এ যেন কোন অভিশাপেরই নামান্তর ছিল! গৌরীর তিনটে বাচ্চা,একটা ছোট আর দুটো বেশ বড়।আমার একে বারে গোয়াল ভরা গরু,যাকে বলে আর কি !

একদিন আমাদের স্থানান্তরণের আদেশ এসে গেলো।বহু দূরে আমাদের চলে যেতে হবে! ট্রেনে,বাসে করে দূরের এক শহরে।গরু বাছুর নিয়ে এত দূর পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না।আর শহর এলাকায় গরু বাছুর পালা ছিল এক ঝকমারি ব্যাপার।অগত্যা আগে ভাগে বাছুরগুলি সব বিক্রি করে দিলাম।ওদের জন্যে আড়ালে আবডালে আমি ও আমার স্ত্রী স্তব্ধ হোয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলাম।করার কিছুই ছিল না।মেয়েদের চোখগুলি জলে ভারী হিয়ে থাকত ! যখন চোখে জল আসে তখন নাকি সত্য মানুষকে ছুঁয়ে যায় !

অফিসে গেলাম রিলিভ অর্ডার হাতে নিতে।আর তিন দিন পরেই রওনা দিতে হবে বদলির জাগায়।আজ লক্ষ্মী ও গৌরীকে ওদের নতুন মালিক এসে নিয়ে যাবে।ওদের বিক্রি করে অনেক পয়সা পেয়েছি।নতুন মালিককে বলেছিলাম বাকি পয়সা দিয়ে দু দিন পরে ওদের নিয়ে যেতে।

আজ সেই দু দিন পর।রিলিভ অর্ডার হাতে নিয়ে সন্ধ্যের আগে আগে সাইকেলে ফিরছিলাম ঘরে।যখন ঘরে পৌঁছবো পৌঁছবো তখন দেখলাম,ঘরের পাশে বেশ কিছু লোকের জটলা ! তাড়াতাড়ি জটলার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম।দেখি স্ত্রী,মেয়েরা কাঁদছে।স্ত্রী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠলো,‘তোমার লক্ষ্মী—’

--‘কি হয়েছে !’ তাড়াতাড়ি জটলার মাঝখানে গিয়ে দেখি লক্ষ্মী মাটিতে পড়ে আছে।ওর দেহ স্থির হোয়ে আছে।আমি ওর মুখের কাছটায় গিয়ে বসলাম।আমার দিকে তাকিয়ে ওর চোখের পাতা দুবার কেঁপে উঠলো।আর তারপর সব কিছু স্তব্ধ হোয়ে গেলো। মেয়েরা চীৎকার করে উঠলো,স্ত্রীর অস্ফুট চীৎকার কানে এলো। আমি তখন স্থির নির্নিমেষ।কদিন যাবত লক্ষ্মীর শরীর ভালো যাচ্ছিল না।ও চরতে যেতে চাইছিল না।পরশু ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিয়ে গেলো।কি ধরনের রোগ,ডাক্তার বলতে পারলেন না।গত কাল ও চরতে না গিয়ে গোয়ালে বসে ধীরে ধীরে জাবর কাটছিল।আজ ও নেই ! ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।ওর চোখ তখনও খোলা ছিল।সে চোখের চাহনি কোন সুদূর লোকের দিকে পড়ে ছিল।না,আমি কাঁদি নি--শুধু অনুভব করছিলাম,চোখের দু ধার বেয়ে উষ্ণ কিছু গরম জলের ধারা গাল বেয়ে এসে বুক স্পর্শ করছিল!


লেখক পরিচিতি

তাপস কিরণ রায়

তাপস কিরণ রায় অর্থশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। স্কুলে শিক্ষকতা করেন বেশ কিছু বছর। পরে আয়কর বিভাগে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি মধ্য প্রদেশের জবলপুর শহরে বাস করেন। তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখালিখি করেন। ছোটদের এবং বড়দের জন্য লেখা তাঁর অনেকগুলি বই-ও প্রকাশিত হয়েছে।