সূচীপত্র -বর্ষা-শরৎ যুগ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

কিছুদিন আগে এ বছরের জুন মাসে, ভয়ঙ্কর একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল আমাদের দেশের উত্তরাখন্ড রাজ্যে। ভূস্খলন আর হটাৎ বন্যা অনেক লোক মারা গেল। সরকারি মতে দশ হাজারের ওপর মানুষ মারা গেছে্ণ। হতাহতদের মধ্যে বেশিরভাগই তীর্থ যাত্রী। কিছু স্থানীয় মানুষ ও মারা গেছেন। এক লাখের ওপর তীর্থ যাত্রী ও পর্যটক ওই ভীষণ বিপর্যয়ে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন। ভারতীয় আর্মি, এয়ার ফোর্স, প্যারামিলিটারি ফোর্স প্রায় এক লাখ দশ হাজার মানুষকে ওই এলাকা থেকে বাঁচিয়ে বের করেছে।

আসলে ৩-৪ দিন ধরে ক্রমাগত ভীষন বৃষ্টি হয়েছিল ওই এলাকায়। প্রতি বছরের তুলনায় ৩৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে কি হল ? ৩৮০০ মিটার উচ্চতায় থাকা স চোরাবারি হিমবাহ গলে নিচে নেমে এল। মন্দাকিনী নদী ফুলে ফেঁপে উঠে ভয়ানক বন্যা নিয়ে নেবে এল গোবিন্দ ঘাট, কেদারনাথ, রুদ্রপ্রয়াগ ইত্যাদী তীর্থস্থানে। কিন্তু বৃষ্টি শুধু যে ওই স্থানে হয়েছিল, তা নয়। পশ্চিম নেপাল, উত্তর প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, তিব্বতের কিছু অংশ আর হরিয়াণাতেও ভীষন বৃষ্টি হয়েছিল। অথচ, ৯৫% জীবন এনং সম্পদের ক্ষতি কিন্তু উত্তরাখন্ডের এই সব তীর্থস্থানে হয়েছে।

তোমরা কি জান যে হিমাচল প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ রাজ্য এই সব এলাকা হিমালয় পর্ব্বতমালার অংশ। ভীষন জঙ্গল আর বরফে ঢাকা পাহাড়-পর্ব্বত এই সব জায়গা কে দুর্গম করে তুলেছে। গঙ্গা নদী ও তার বেশ কিছু শাখা প্রশাখার সঙ্গমস্থলে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক হিন্দু তীর্থস্থান ও পর্যটন কেন্দ্র। ইদানিংকালে এই সব জায়গায় উত্তরোত্তর জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। প্রতি বছর লক্ষ্য লক্ষ্য তীর্থযাত্রী আর পর্যটক এসে বাড়িয়ে চলেছিল দুষণের মাত্রা। বিনা বাছ বিচারে কাটা হয়েছিল জঙ্গলের গাছ গাছালি। মানুষের লোভের সামনে নগন্য হয়ে পড়েছিল প্রকৃতি সংরক্ষন। কিন্তু তার ফলে কি হল সেটাই দেখলাম আমরা। এর পরে কি আমরা চোখ বুজে থাকবো ? কিছুই করবো না ? কমপক্ষে আমরা কি জানার চেষ্টা করব না যে এসব কেন হল ? এর কারন কি ?

তোমরা কি জান, ভূস্খলন কেন হয় ? কি করে হয় বা এর থেকে বাঁচার উপায় কি ?

চলো আজ তোমাদের আমি এই বিষয়ে কিছু বলি। আসলে পৃথিবী মাধ্যাকর্ষন বলের টানে যখন মাটি, বরফ, জল বা পাথরের একটা ধস্ দ্রুতগতিতে পাহাড়ের কোল বেয়ে নিচে নেবে আসে, সেটাকেই আমরা ভূস্খলন বলি। /

ভূস্খলন কেন হয় ?

পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষন বলে, পৃথিবীর বুকে যাই থাক না কেন, সব কিছুই নিচের দিকে টেনে চলেছে। এই টানার প্রভাবে আরো বেশি হয় পাহাড়ী এলাকায়, কারন পাহাড়ের ধারে খাড়া ঢাল (steep slope) থাকে। বৃষ্টির জল মাটিতে মিশে ওপরের মাটিকে আলগা করে দেয়। এই ভারি আর আলগা মাটির পক্ষে পাহাড়ের ঢালে লেগে থাকা মুশকিল হয়ে ওঠে। যখন মাটিতে জলের পরিমান বাড়ে যায়, তখন মাটি আর পাথর মেশানো এই পাহাড়ের ঢাল আর স্থির থাকতে পারে না আর মাধ্যাকর্ষন বলের কাছে হার মেনে নিচের দিকে নেমে আসে। এবার তোমরা বুঝলে, বেশি বৃষ্টি হলে, ভূস্খলনের সম্ভাবনা কেন বেড়ে যায় ?

অনেক সময় ভূমিকম্প হলে ভূস্খলন হতে পারে। আসলে পাহাড়ের ঢালে যেসব মাটি আর পাথর থাকে সেগুলো ভূমিকম্প হলে আলগা হয়ে যেতে পারে। সেই মাটি-পাথরের মিশ্রণ ভূস্খলন রূপে নিচে নেমে আসতে পারে।

ভূস্খলনের একটা আধুনিক কারণ হল মানুষ বা মানুষ-সৃষ্ট। পাহাড়ের বুকে খনি কাটা (mining), অবারিতভাবে জঙ্গল কেটে ফেলা, বা ভুল কৃষি পদ্ধতি (cut and slash farming), বিনিময় স্থান বাছবিচার না করে বাঁধ (Dam) গড়ে তোলা ইত্যাদি কারনে ভূস্খলন বা বন্যা হওয়াটা আজকাল খুবই সামান্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছের শেকড় মাটিকে বেঁধে রাখে। মাটিকে বৃষ্টি, ভূমিকম্প বা অনান্য কারনে আলগা হতে দেয় না। আমরা যদি সব গাছ-গাছালি কাটে ফেলি, জঙ্গল উজাড় করে ফেলি, তাহলে মাটিকে বেঁধে রাখাটা সম্ভব হবে না। বৃষ্টি বা ভূমিকম্প হলেই ভূস্খলন হবে। পাহাড়ের বুকে খনি কাটা হলে জঙ্গল কেটে ফেলা হয়। খনির কারনে মাটির ঢাল বেড়ে যায়। এই সব জায়গায় ভূমিস্খলনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

তোমাদের মনে নিশ্চয় প্রশ্ন আসছে যে তাহলে আমাদের কি করা উচিৎ যাতে এই ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। আসলে মানুষ যদি একটু ভেবে চিন্তে কাজ করতে শিখে নিত, প্রকৃতিকে বুঝে শুনে ব্যবাহার করত, তাহলে কিন্তু এই ধরনের দুর্ঘটনাকে সম্পূর্নভাবে এড়ানো না গেলেও, অনেকটা কম করা সম্ভব হয়ে উঠতো।

প্রকৃতিগত কারনগুলো হয়ত আমরা কোনদিন নিয়ন্ত্রন করতে পারবো না। কিন্তু মানুষ-সৃষ্ট যেসব কারন, সেগুলো কি আমরা কম করতে পারি না ?

আসলে পাহাড়ের বুকে বা ঢালু এলাকায় খনি, বাঁধ বা এই ধরনের কোন ক্রিয়া-কলাপ করার আগে আমাদের ঐ সব কাজের কি পরিনাম হতে পারে সেই বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করা উচিৎ। শুধু তাই নয়, খুব ভালভাবে পড়াশোনা করে দেখতে হবে যে ওই স্থানে ওসব কাজের কি প্রভাব হতে পারে। খুব বাছ বিচার করে গাছ-গাছালি কাটতে হবে। একটা গাছ কাটলে দশটা লাগাতে হবে।

বৃষ্টির মাসগুলোয় পাহাড় বা ঢাল এলাকায় ঘুরতে না যাওয়াই ভালো কারন সেই সময় ভূমিস্খলন বা বন্যার সম্ভাবনা অনেক বেশি হয়। পাহাড়ের ঢালে ঘর বানানো খুব বিপদজনক। ঢাল এলাকার পাথর-মাটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা উচিৎ। এবার তোমরা জানতে পারলে যে ভূমিস্খলনের কারনে কি বা তার থেকে বাঁচার উপায় কি ? আমাদের দেশের বড়রা তো এইসব ভাবনাচিন্তা খুব একটা করেন না। কিন্তু তোমরা যদি এখন থেকেই ভাবতে শুরু কর, তাহলে বড় হয়ে তোমরা অন্ততঃ এই ধরণের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করতে পার, তাই না?


ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্যি
উলান বাটার, মঙ্গোলিয়া

ছবিঃউইকিপিডিয়া