খেলাঘরখেলাঘর

দেশে-বিদেশে


'...রাজা এক দেশে এলেন। সে দেশে রাজকন্যের উপবনে নীল মানিকের গাছে নীল গুটিপোকা নীলকান্ত মণির পাতা খেয়ে, জলের মতো চিকন, বাতাসের মতো ফুরফুরে, আকাশের মতো নীল রেশমের গুটি বাঁধে। রাজার মেয়ে সারারাত ছাদে বসে, আকাশের সঙ্গে রং মিলিয়ে সেই নীল রেশমে শাড়ি বোনেন। একখানি শাড়ি বুনতে ছ-মাস যায়...'
বলতো কোন গল্পের অংশ এটা? - আচ্ছা, আমি বলে দিচ্ছি, এটা হল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ক্ষীরের পুতুল' গল্পের একটা অংশ। সেই গল্পের রাজা নিজের সুয়োরানীর জন্য এই শাড়ি সাত জাহাজ সোনা দিয়ে কিনে এনেছিলেন!!

ভাবছো, একটা শাড়ির দাম সা-আ-আ-ত জাহাজ সোনা? তাই কখনও হয়? - আসলে ওটা তো রাজকন্যার শাড়ি, তাই মনে হয় অত দাম। তবে সত্যি কথাটা কি জানো, একটা সুন্দর নক্সা করা শাড়ি বুনতে কিন্তু সত্যি অনেক সময় লাগে - ছ-মাস না হলেও এক থেকে তিন মাস তো লাগতেই পারে। আর সেইজন্যই, হাতে বোনা শাড়ি, যাকে তাঁতের শাড়ি বা হ্যান্ডলুম [handloom]  এর শাড়ি বলা হয়, সেগুলি কিন্তু মেশিনে বোনা শাড়ির থেকে বেশি দামী হয়।

ভাবছো , শাড়ি তো বড়দের ব্যাপার, তাই নিয়ে ইচ্ছামতীতে এতো গল্প কেনো? আসলে, আজকে আমি তোমাকে শোনাবো শাড়ি তৈরির গল্প। এই গল্পে কিন্তু কোন রাজকন্যা শাড়ি বোনে না, বোনেন হাজার হাজার দক্ষ কারিগর। আর কারিগরদের নানারকম ভাবে সাহায্য করার জন্য থাকেন আরোও নানা মানুষ। আমাদের দেশের প্রায় প্রত্যেক রাজ্যের কাপড় বোনার নিজস্ব ধারা আছে। কারোর কাপড় হয় ফুরফুরে হাল্কা, কেউ বোনেন জমকালো রঙ্গিন নক্সা, কোথাও আবার জরির কারিকুরি। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে পাওয়া যায় নানারকমের তাঁতের শাড়ি - শান্তিপুরি, ফুলিয়া, ধনেখালি - এগুলি কিন্তু একেকটা জায়গার নাম - একেক জায়গার শাড়ি একেকরকমের হয়, তাই জায়গার নাম দিয়ে বাহারের তফাত বোঝানো হয়। তবে আদতে মোটামুটি সব জায়গাতেই তাঁতের ব্যবহার প্রায় একইরকম।

আমি কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার ফুলিয়ায় বেড়াতে গেছিলাম। সেইখানে আমার এক পারিবারিক বন্ধুর সাথে আমি বেড়াতে যাই ফুলিয়াপাড়ায়। ফুলিয়াপাড়া হল এমন এক জায়গা, যেখানে প্রায় সবাই তাঁতী। প্রত্যেক বাড়িতেই তাঁত আছে। পুরুষরাই বেশিরভাগ তাঁতযন্ত্র চালান, আর বাড়ির মহিলারা নানাভাবে তাঁদের সাহায্য করেন, এমনকি ছোটরাও বাদ যায়না।ফুলিয়াপাড়ার একজন তাঁতীভাই আমাকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন কিভাবে একটা তাঁতের শাড়ি তৈরি হয়।

শাড়ি তৈরি করতে কি লাগে? -অবশ্যই নানা রঙের সুতো এবং ইচ্ছা হলে নক্সা করার জন্য জরি। এই সুতো কিন্তু আসে গুজরাতের সুরাট থেকে, আর জরি আসে মহারাষ্ট্র থেকে। সেই কোরা সুতোর লাছিগুলিকে প্রথমে মনোমত রঙ করে নেওয়া হয়।

লাছি
রঙিন সুতোর লাছি
জরি
নক্সা করার জন্য জরি

তারপর শুরু হয় সেই সুতোগুলিকে ঠিকমত করে গোটানো। এই কাজটি দুই ধাপে হয়, আর বাড়ির মহিলারাই এই কাজ বেশি করেন।
প্রথমে, সুতোগুলিকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে গোটানো হয়

সুতা পাকানো
সুতো পাকানোর প্রথম ধাপ

তারপর সেইগুলিকে আবার দ্বিতীয়বার আরো মিহি করে চরকা কেটে গোটানো হয় আর ছোট ছোট তকলি বানানো হয়।

সুতা পাকানো২
দ্বিতীয় ধাপে গোটানো সুতো থেকে কাটা হচ্ছে তকলি

তক্লি
তকলি

এরপর শুরু হয় শাড়ি তৈরির পালা। একটা সম্পূর্ন তাঁতযন্ত্রের অনেকগুলি অংশ থাকে। একদিকে থাকে একটি বিশাল রোলার। আরেকদিকে বসে থাকেন তাঁতীভাই। এর আগে যে তকলি গুলির কথা বললাম, সেই, তকলি গুলিকে ডিজাইন অনুযায়ী লাগানো হয় একটি লম্বা কাঠের ফ্রেমে। ফ্রেমে লাগানো তকলি থেকে সুতো ওই রোলার এর ওপর জড়িয়ে গিয়ে, আরো নানা পথ ঘুরে, পড়ে তাঁতীভাইয়ের হাতে। ব্যাপারটা যত সহজে বলে ফেললাম, মোটেও তত সহজ নয়। নিচের ছবিগুলি দেখলেই বুঝতে পারবে।

ফ্রেম

ফ্রেমএ লাগানো তকলি

রোলার
রোলার -এই রোলারটি ছবি তোলার সময় ব্যবহার হচ্ছিল না
তাঁত
তাঁতযন্ত্র - সামনে তাঁতীভাইয়ের বসার জায়গা

এর মধ্যেই আবার কোন এক জায়গায় থাকে কার্ডবোর্ডের পাঞ্চ কার্ড। এই পাঞ্চ কার্ডএর মধ্যে ফুটো , বা পাঞ্চ করে বানানো থাকে শাড়ির পাড়ের নক্সা। তকলির থেকে সুতো নানা কলকব্জার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময়ে এই পাঞ্চ কার্ডের মধ্যে দিয়েও যায়। আর তাতেই , ঠিক যেনো ম্যাজিকের মত, শাড়ির পাড়ে ফুটে ওঠে নানান নক্সা।

পাঞ্চ
শাড়ির পাড়ের নক্সা করার জন্য পাঞ্চ কার্ড

একজন দক্ষ তাঁতীর কিন্তু তাঁত চালানোর সময় হাত এবং পা দুই সমান ভাবে ব্যাবহার করতে হয়। আর আরেকটা জিনিষের কথা তো আলাদা করে বলতেই হবে। সেটা হলো মাকু।

মাকু
মাকু

 সেই যে একটা প্রবচন আছে-'মাকুর মত এদিক ওদিক করা ' -মাকু কিন্তু সত্যি সবসময় এদিক-ওদিক করে। তাঁতীভাইয়ের হাতের একটা খুব জরুরি যন্ত্র হল মাকু। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখো, একেকটি মাকুর মধ্যে জড়ানো আছে একেক রঙের সুতো আর জরি। এই মাকু ধরেই এপাশ- ওপাশ ক্রমাগত হাত নাড়িয়ে ধীরে ধীরে বুনে চলেন একটি শাড়ি। আর সেই হাত সে কত তাড়াতাড়ি নড়ে, সেটা চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। কোন ছবি সেই গতিকে দেখাতে পারবে না।

তাঁতীভাই
তাঁতীভাই

 একেকটা শাড়ি বানাতে সময় লাগে প্রায় একমাস। শাড়ির কারুকাজ যত বেশি হবে, বানাতে তত বেশি সময়ও লাগবে।

শাড়ি
অর্ধেক বোনা শাড়ি

ফুলিয়ার শাড়ি খুব হাল্কা হয়, গরমকালে পড়তে খুব আরাম হয়। আজকাল অন্যান্য ভারতীয় হাতে বোনা কাপড়ের মত, ফুলিয়ার কাপড়ও দেশে বিদেশে খুব কদর পাচ্ছে। ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্সে, ফুলিয়ায় বোনা তাঁতের কাপড় এবং ওড়না/স্টোল নিয়মিত রপ্তানি হয়।

শাড়ী
থাকদিয়ে রাখা তৈরি শাড়ি

কেমন লাগলো এই শাড়ি বোনার গল্প? এটা কিন্তু আমাদের দেশের এই বিশাল শিল্পের একটা খুব ছোট্ট গল্প। আমাদের রাজ্যের রেশমের শাড়ি বালুচরী আর বিষ্ণুপুরি, বাংলাদেশের জগতবিখ্যাত জামদানি - এদেরকে নিয়ে তো কোন গল্পই হল না। এদের প্রত্যেকের একেকটা নিজস্বতা আছে, আর প্রত্যেকটা শাড়ির পেছনে থাকে কোন একজন দক্ষ শিল্পীর পরিশ্রম। তুমি বরং এক কাজ করো - মা'কে বলো আলমারিটা খুলতে, আর মায়ের শাড়িগুলোর মধ্যে থেকে বেছে দেখতো - কোনগুলি হাতে বোনা আর কোনটা মেশিনে বোনা,  বুঝতে পারো কিনা!

 

 

লেখা ও ছবি
মহাশ্বেতা রায়
পাটুলী

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ
শ্রী নিমাই সরকার, ফুলিয়াপাড়া
শ্রীমতি সোমা ঘোষ, কলকাতা