ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

এসে গেল আরেকটা ২১শে ফেব্রুয়ারি। ইউনেসকোর উদ্যোগে প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। হ্যাঁ, মনে রাখতে হবে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস নয়, মাতৃভাষা দিবস। ভাষা এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র এবং বহুভাষার অস্ত্বিত্বকে উৎসাহ এবং সমর্থন দেওয়ার জন্যই ২০০০ সাল থেকে ইউনেস্‌কোর উদ্যোগে প্রতি বছর পালিত হয় এই দিনটি। ২০১৫ সালে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পঞ্চদশ বছর।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপন করার জন্য এবছর ইউনেস্‌কোর থিম হল "Inclusion in and through education: Language counts" - বাংলায় বলতে চাইলে- শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এবং মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিকরণঃ প্রতিটা ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ।

যত দিন যাচ্ছে, এটা বোঝা যাচ্ছে যে পৃথিবীতে অনেক অনেক ভাষা আছে যেগুলি অব্যবহারের ফলে, বা যথেষ্ট গুরুত্ব বা মর্যাদা না পাওয়ার ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে। এবং ভাষাগুলির সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে সেইসব ভাষা ব্যবহারকারী মানুষদের সংস্কৃতি, নিজস্ব কৃষ্টি। ইউনেসকোর একটা ইন্‌টের‍্যাক্টিভ ম্যাপ আছে, যেখানে পৃথিবীর প্রতিটা দেশের কতগুলি করে ভাষা একেবারে হারিয়ে গেছে বা বিপদসীমা পেরিয়ে গেছে, সেগুলি খুঁজে দেখা যায়। সেখানে খুঁজে দেখলাম, ভারতের অন্তত পাঁচটি ভাষা - অহম/আহোম, অন্দ্রো/আন্দ্রো, রাংকাস, সেলমাই আর তোলচা- একেবারেই হারিয়ে গেছে। এই ভাষাগুলিতে আর একজন মানুষও কথা বলেন না। আর সারা পৃথিবীর হিসাব ধরলে, এই মূহুর্তে ২৩১ টি ভাষা সম্পূর্ণ রূপে হারিয়ে গেছে পৃথিবীর থেকে। সারা বিশ্ব জুড়ে এমন অনেক ভাষা আছে, যেগুলিকে ব্যবহার করেন একজন বা দুই-তিন জন মানুষ- পাপুয়া নিউগিনির 'লায়ে/ লাওয়া', ইন্দোনেশিয়ার 'দাম্পেলাস', উত্তর আমেরিকার 'প্যাটুইন', ব্রাজিলের 'কাইয়ানা'- হল এমন কতগুলি ভাষা যেগুলিতে মাত্র একজন থেকে দশজনেরও কম অতি বয়স্ক মানুষ কথা বলতে পারেন।এই ভাষাগুলির সাথে সাথে হারিয়ে গেছে একেকটি জনজাতির লোককথা, উপকথা, হারিয়ে গেছে বহুদিন ধরে অর্জন করা নানা ধরণের জ্ঞান। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলির সাথে সাথে বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাগুলিকেও সমান অধিকার দিয়ে নিত্যদিনের কাজেকর্মে ব্যবহার করে বাঁচিয়ে রাখার।

আমাদের বাংলা ভাষার অবশ্য সে সমস্যা নেই বলেই শুনি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে যে বাংলা পৃথিবীর সবথেকে বেশি ব্যবহৃত ভাষাগুলির মধ্যে মোটামুটি ষষ্ঠ বা সপ্তম স্থান অধিকার করে। বাংলা ভাষা এক্ষুনি এক্ষুনি হারিয়ে বা শেষ হয়ে যাচ্ছে না। নিজের চারিপাশে চোখ কান খোলা রেখে যা দেখি, শুনি বা পড়ি, তাতে তো বুঝি যে বাংলা বই-ও কম ছাপা হচ্ছে না, বাংলা গল্প-কবিতা-উপন্যাস ও কম লেখা হচ্ছে না, ছোটদের ও বড়দের জন্য পত্রিকার সংখ্যাও কম নয়। এই তো সবে শেষ হল কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা, সেখানে তো কয়েকশো বই-এর বিপনী ছিল, আর সেখানে বাংলা বই-এর সংখ্যা প্রচুর।

কিন্তু তাও কেন যেন মনে হয়, বাংলা ভাষাটা আসলে খুব একটা ভাল নেই। যখন দেখি, নতুন বাংলা গানে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় হিন্দি বা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার হচ্ছে, নামিদামী বাংলা পত্রিকাতে বাংলা বাক্যে বাংলার বদলে অসংখ্য ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বড় বড় খবরের কাগজে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনে, বা রাস্তার ধারের হোর্ডিং-এ, দোকানের গায়ে ভুল বানান, ভুল অনুবাদ, ভুল ছাপা- এবং সেগুলি নিয়ে কেউই বিশেষ মাথা ঘামায় না, তখন কিন্তু মনে হয়, নাহঃ, শুধুমাত্র কতগুলি সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকলেই কিন্তু বাঙলাভাষী মানুষ হিসাবে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যখন আমার আশেপাশের অনেক ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলে জানতে পারি যে তারা নাকি কেউই বাংলা গল্পের বই পড়তে পছন্দ করে না, স্কুলে বাংলা পাঠ্যবইটা প্রায় তেতো ওষুধ খাওয়ার মত লাগে, তখন মাঝে মাঝে মনে একটা আশঙ্কা চুপি চুপি উঁকি দেয়- ঐ ইউনেস্‌কোর অ্যাটলাসে কোন একদিন বাংলা ভাষাটাও বিপদসীমায় দাঁড়িয়ে থাকা ভাষার তালিকায় ঢুকে যাবে নাতো? নতুন প্রজন্মই যদি নিজেদের ভাষাকে ভালোবাসতে না চায়, তাহলে সেই ভাষার ভবিষ্যত কতটা নিশ্চিন্ত?

আমার এই আশঙ্কাকে খানিকটা কমিয়ে দিয়েছেন আমার কিছু নতুন বন্ধু। এঁদের সবার সাথে আমার আলাপ হয়েছে জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ওয়েবসাইট ফেসবুকের মাধ্যমে। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারতীয় নন, বাঙালি তো নন-ই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এঁদের বসবাস। ফেসবুকের একটি গ্রুপের সদস্য সবাই, যেখানে সবাই একসাথে বাংলা ভাষা শেখার চেষ্টা করেন, চর্চা করেন। এবছর যখন ভাবতে শুরু করেছিলাম, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিবস নিয়ে ইচ্ছামতীর বন্ধুদের জন্য কি লিখব, তখন ভাবলাম আমার এই বন্ধুদেরকেই জিজ্ঞাসা করি তাঁরা কেন বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করেছেন। ইচ্ছামতীর অনেক বন্ধুও তো শুনি আসলে বাংলা পড়তে চায় না, বা পড়তে পারে না, তারা বরং ভাষা হিসাবে বাংলার বদলে হিন্দী পড়তে বেশি উৎসাহী, তারাও নাহয় পরিচিত হোক বাংলাভাষাকে ভালবাসেন যাঁরা, সেইসব বন্ধুদের সাথে ।

আমার চিঠির প্রথম উত্তর দিয়েছিলেন গ্রীস থেকে ওলিন্ডা নিনোলাকিস। প্যারিসে সত্যজিৎ রায়ের ছায়াছবিগুলির একটি রেট্রোস্পেক্টিভ চলছিল।সেইখানে ছবিগুলি দেখার পরে তাঁর বাংলা ভাষা শিখতে উৎসাহ জন্মায়।উইলিয়াম রাদিচের লেখা বই "Teach Yourself Bengali" পড়ে তিনি বাংলা শেখা শুরু করেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাওয়া বেশ কিছু ভাল বন্ধুর সাহায্যও পেয়েছেন তিনি। বেশ কয়েকবার কলকাতায় বেড়াতে এসেছেন, তাই এই শহরেও বন্ধু আছেন বেশ কিছু। নিজের অগ্রগতি নিয়ে মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে পড়েন, কিন্তু কিছু দিন পরেই আবার উৎসাহ নিয়ে শিখতে শুরু করেন- বাংলা ভাষার মিষ্টতা তাঁর আকর্ষণের মূল কারণ। চিঠির শেষে ওলিন্ডা বলেছেন, বাংলা ভাষা শেখার পদ্ধতিটা হল খানিকটা কলকাতা শহরটার মত- মাঝে মাঝে সবকিছু দেখে প্রচন্ড রাগ হয়, কিন্তু আবার ভাল না বেসে পারাও যায় না। কিন্তু একবার এর স্বাদ পেলে, "আড্ডা" আর থামানো সম্ভব নয় !

ইংল্যান্ডবাসিনী অ্যারামিন্টা বার্লো বিয়ে করেছেন এক বাঙালি ছেলেকে। তাঁর স্বামীর পরিবার গত ষাটের দশকে বাংলাদেশ থেকে ইংল্যান্ডে গিয়ে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন। ইংল্যান্ডে জন্ম এবং বেড়ে ওঠার সূত্রে অ্যারামিন্টার স্বামীর বাংলা ভাষার সাথে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। তাঁর বাবা-মাও তাঁকে বা পরবর্তীকালে তাঁর সন্তানদের বাংলা শেখানোর কোন উৎসাহ বোধ করেন নি। কিন্তু গত বেশ কিছু বছর ধরে অ্যারামিন্টা তাঁর পরিবার নিয়ে কলকাতায় বেড়াতে আসা শুরু করেন। এখানে এসে দেখেন আত্মীয় পরিবারগুলির অনেক গুরুজনেরাই ইংরেজি ভাষা বলতে স্বচ্ছন্দ্য নন। এইসব আত্মীয়দের সাথে যাতে ভালভাবে গল্প করতে পারেন, তার জন্যই প্রায় বছর চারেক আগে থেকে বাংলা শেখা শুরু করেন অ্যারামিন্টা। গতবছর আমার সাথে তাঁর মুখোমুখি আলাপ হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। অ্যারামিন্টা আমায় নিজের পরিচিতি দিয়েছিলেন - "আমি একজন গৃহিণী" - কি আশ্চর্য! আধুনিক শহুরে বাংলাতে, সে সব মহিলারা শুধুই সংসারের কাজ করেন,অন্য কোথাও চাকরি করেন না, তাঁরা নিজেদের পরিচয় দেন 'হাউজওয়াইফ' বা 'হোমমেকার' বলে। "গৃহবধূ" শব্দটা কাগজে কলমে ব্যবহার হয়। কিন্তু কথ্য বাংলায় নিজেকে "গৃহিণী" বলে পরিচিতি দিচ্ছেন কেউ - এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। প্রথমে আমি খানিক্‌ বিস্মিত হয়েই ছিলাম। পরে খুব ভাল লেগেছিল।

দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র মিলিন্দ চক্রবর্তী থাকে রাজস্থানের জয়পুরে। ছোটবেলা থেকে সেখানেই বড় হয়েছে মিলিন্দ। তার মা যদিও বাঙালি নন, কিন্তু প্রথম থেকেই তিনি চেয়েছিলেন যে মিলিন্দ যেন নিজের পিতৃপুরুষের ভাষা, শিক্ষা সংস্কৃতির সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে। তাই অনেক ছোটবেলা থেকেই তিনি নিজের এক বাঙালি বন্ধুর কাছে মিলিন্দ কে বাংলা লিখতে শিখতে পাঠিয়েছিলেন। মিলিন্দ অত্যন্ত গর্বের সাথে জানিয়েছে, সে যত দ্রুত ইংরেজি আর হিন্দি লিখতে পারে, ঠিক তত দ্রুতই বাংলাও লিখতে পারে ! নিজের শিকড়ের সাথে সংযোগ রাখতে সবরকম ভাবে চেষ্টা করে যায় এই ছেলেটি। এবং এই বিষয়ে তাকে উৎসাহ যোগান তার মা। এইবছরে ইউনেস্‌কোর যে থিম - বহুভাষী পরিবারে সবগুলি ভাষাকেই, এবং সেই সূত্রে নানান সংস্কৃতিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া- মিলিন্দ এবং তার পরিবার সেই প্রচেষ্টার সফল উদাহরণ।

তবে আমাকে সবথেকে বেশি অবাক করেছেন সুইডেনের বন্ধু তুভা এরবেন। তিনি আমাকে পুরো উত্তরটা বাংলায় লিখে পাঠিয়েছেন, এবং তার পুরোটাই প্রায় সঠিক বাংলা! একফোঁটাও সম্পাদনা না করে, তুভার পুরো উত্তর এইখানে তুলে দিলামঃ

"আমার নতুন ভাষা শিখতে খুব ভালো লাগে। যখন আমি দশ বছর আগে হিন্দি ছবি দেখতে অরম্ভ করেছিলাম, তখন একটু পরে হিন্দি শিখতে লেগেছিলাম। এবং যখন কয়েক বছর পর একজন বাঙালির সাথে আলাপ করেছিলাম, যে আমাকে সত্যজিৎ রায়ের "অরণ্যের দিনরাত্রি" দেখিয়েছিল, তখন বাংলা শেখার ইচ্ছে ও উঠেছিল। আমি মনে করেছিলাম যে বাংলা একটা খুব সুন্দর আর নরম ভাষা। এই ভাষা আমি এখন তিন বছর থেকে নিয়মিত শিখছি। ফেইসবুকের একটা বাংলা শেখার দল আমাকে খুব সাহায্য করেছে এবং তাদের ছাড়া আমি বহু দিন আগে ত্যাগ করতাম! এটা নয় যে বাংলা খুব বেশি কঠিন ভাষা, তবে কঠিনতা আছে। বানান আর উচ্চারণের মধ্যে একটু discrepancy থাকে, এবং বাংলা ভাষার বিশাল একটা শব্দকোষ আছে। সংসদ বাংলা অভিদানে "sun" খুঁজলে অনেক entries পাবেন: অঞ্জিষ্ণু, অর্ক, অর্চিষ্মান, আদিত্য, তপন, ত্বিষাম্পতি, দিনেশ, পূষা, বিভাকর ... ভাল কথা পাওয়া মাঝে মাঝে কঠিন হতে পারে।"

বাংলা ভাষা নিয়ে উৎসাহী বিদেশী মানুষদের মধ্যে আরেকজনের নাম ও করতেই হয়। তিনি হলে এই মূহুর্তে কলকাতার বাসিন্দা স্টিভ ক্যাপেল। বাংলা খবরের কাগজ পড়তে নিজের সুবিধা হবে বলে ছোট ছোট কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করতে শুরু করেন। আর সেইভাবেই তৈরি হয়ে যায় 'বাংলা -টাংলা' নামের এক ওয়েবসাইট, যেখানে রয়েছে বাংলা অভিধান থেকে শব্দের মানে খুঁজে নেওয়ার এবং বাংলা ব্যাকরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ।

এরকম মানুষ আরো অনেক অনেক আছেন। তাঁদের সবার কথা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা সম্ভবও নয়। কিন্তু আমার মাতৃভাষাকে এঁরা আপন করে নিতে চাইছেন , এবং ভালবাসছেন, জেনে আমি একই সাথে আনন্দিত আর গর্বিত। এঁদের সবার প্রতি রইল ইচ্ছামতী পরিবারের তরফ থেকে অকুন্ঠ ভালবাসা।

শেষ করি আরো একটা মন ভাল করা তথ্য দিয়ে। নিউজিল্যান্ডের মাওরি জনজাতির কথা জানো নিশ্চয়? বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতার থেকে অনেক দূরে থাকার ফলে, এই জনজাতি সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করে চলেছিল তাদের নিজস্ব ভাষা, শিল্প, নাচ, গান এবং উপকথার ভান্ডার। মাওরি জনজাতিকে নিয়ে বিশদে আলোচনা না হয় অন্য কোনদিন হবে। এখানে যে কথাটা বলতে চাই, সেটা এইরকমঃ আধুনিক জীবন ও বিশ্বায়নের সাথে পা মিলিয়ে চলতে গিয়ে মাওরি জনজাতির মানুষেরাও ধীরে ধীরে আধুনিক নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হতে থাকেন। কাজের সন্ধানে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে এসে বাসা বাঁধেন শহরে। পরিসংখ্যান বলছে, এই মূহুর্তে, পৃথিবীতে সবথেকে বেশি ভাষা সমস্যায় ভুগছেন আজকের প্রজন্মের বাবা-মায়েরা। অনেকেই নিজেদের নিজস্ব ভাষা ভুলে গেছেন, বা ভুলে যাবেন খুব দ্রুত। আর এই ভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে অনেক ভাষা। মাওরি জনজাতির মানুষেরাও সেই একই সমস্যায় পড়েছিলেন। আর মাওরি বয়জ্যেষ্ঠরা সেই সমস্যার কথাটা বুঝেছিলেন। বুঝেছিলেন, কিভাবে ভাষার ব্যবধান দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে। শহরে এসে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করা বাবা-মায়েরা ভুলে গেছেন নিজেদের পিতৃপুরুষের ভাষায় কথা বলতে, আর নাতি নাতনিরা ভাষা বুঝতে পারছে না বলে দাদু-দিদিমা-ঠাকুমাদের সাথে টান ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে; ভেঙে পড়ছে পরিবার-নির্ভর এক সমাজ। তাই আজ থেকে অনেক দিন আগেই, সেই ১৯৮২ সালে, মাওরি ঠাকুমা-দিদিমারা সবাই মিলে এই সমস্যার এক সমাধান বের করেন। তাঁরা তৈরি করেন langugae nest, বা "ভাষা নীড়", যেখানে ঠাকুমা দিদিমারা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এবং তাদের বাবা-মায়েদের সাথে নিজেদের ভাষায় কথা বলে, গান গেয়ে, গল্প শুনিয়ে , পরিচিত করান নিজেদের ভাষা এবং সংস্কৃতির সাথে। গত কয়েক দশকে এই সব ভাষা নীড় থেকে পড়াশোনা করে বেরিয়ে আসা ছেলেমেয়েরা যেমন স্বচ্ছন্দ্য আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজিতে কথা বলতে, ঠিক ততটাই গর্বিত নিজেদের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি নিয়ে।


মাওরি ভাষা নীড়ে গল্প শুনছে ছেলেমেয়ের দল

এই ভাষা নীড় বা language nest এর প্রচেষ্টাটি এতই সফল হয়, যে পরে নিউজিল্যান্ডে শুধুমাত্র মাওরি ভাষায় পড়াশোনা হবে, এমন বেশ কিছু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুলও প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর একদম ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদেরকে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সাথে পরিচিতি করিয়ে দেওয়ার এই প্রথাটি এখন ব্যবহার করা হয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে, যেখানে যেখানেই মানুষ মনে করেছেন আধুনিক জীবনযাপনের মধ্যেও তাঁদের নিজস্বতাকে রক্ষা করে চলবেন।

কেমন হবে, যদি বাংলা ভাষাকে আরো ভালভাবে রাখার জন্য বাংলা ভাষার জন্যেও ছোট-বড় শহরে তৈরি হয় এরকম ভাষা নীড়, যেখানে শুধুমাত্র বাংলা ভাষাতেই গল্প বলবেন, ছড়া কাটবেন দিদিমা-ঠাকুমা'রা? ঠাকুরমার ঝুলি, লালকমল-নীলকলম, বুদ্ধু-ভুতুম, গোপাল ভাঁড়, চাঁদ সদাগর, ক্ষীরের পুতুল, রামায়ণ, মহাভারত, গুপী-বাঘা, পাগলা দাশু, দুষ্টু রিদয় আর রামলালের গল্প শুনতে শুনতেই শেখা হয়ে যাবে নিজের ভাষাটা, জানা হয়ে যাবে উচ্চারণ আর বানান, স্কুলের পাঠ্য বইটাকে দেখে আর তত খারাপ লাগবে না...গলা খুলে গাইতে ইচ্ছা করবেঃ

মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা,
মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা ।।


আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস যদি আরেকবার মনে করে নিতে চাও, পড়ে দেখ পুরনো ইচ্ছামতী থেকে এই লিঙ্কগুলিতেঃ
অমর একুশে
গর্বিত হও ভেবে, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা

ইউনেস্‌কোর সঙ্কটাপন্ন ভাষা অ্যাটলাসের খোঁজ পাবেএইখানে

পোস্টারঃত্রিপর্ণা মাইতি
ফটোগ্রাফঃ ফ্রিইমেজেস, টেয়ারা

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা