চাঁদের বুড়ির চরকা চিঠি ১৪২৩/০৫- ৭০ বছরে ভারতের স্বাধীনতা

৭০ বছরে ভারতের স্বাধীনতাঃ  এস জেনে নিই আমাদের মৌলিক অধিকার ও মৌলিক কর্তব্য
৭০ বছরে ভারতের স্বাধীনতাঃ এস জেনে নিই আমাদের মৌলিক অধিকার ও মৌলিক কর্তব্য

আগামিকাল,সোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০১৬, ভারত-এর ৭০ তম স্বাধীনতা দিবস। সেদিন সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা ইংরেজ শাসনের থেকে মুক্তি পাওয়ার, স্বাধীন দেশ হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার আনন্দকে ফিরে দেখব; সেদিন দেশ জুড়ে ছুটি। স্কুল -কলেজ এবং বিভিন্ন অফিসে, আবাসনে, সর্বত্র উড়তে দেখা যাবে ভারতে ত্রিবর্ণ পতাকা। জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে, জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন করে আমরা আসলে সেলাম জানাব আমাদের দেশকে, আমাদের দেশের সেইসব বীর শহীদ এবং সৈনিকদের, যাঁদের অসীম সাহস এবং অদম্য উৎসাহ না থাকলে আমাদের দেশের স্বাধীন হতে আরো বেশ কিছু বছর লেগে যেত।

ভারত যখন স্বাধীন হল, তখন শুরু হল ভারতের সংবিধান তৈরির কাজ। প্রায় তিন বছর ধরে রচিত ভারতীয় সংবিধানের দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও মৌলিক কর্তব্য। সংবিধান অনুযায়ী , ভারতের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি হলঃ

১)সাম্যের অধিকার (Right to Equality) - জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী, পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ।
২) স্বাধীনতার অধিকার (Right to Freedom)-বাক ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন তৈরি, দেশের সর্বত্র স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার।
৩) শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার (Right against Exploitation)- বিনা বেতনে বেগার খাটানো, মানুষ ক্রয় বিক্রয়, ১৪ বছরের কম বয়সের শিশুদের কারখানা বা খনির কাজে লাগানো নিষিদ্ধ।
৪) ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার (Right to Freedom of Religion)- কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ধর্ম বদল হতে পারেন এবং কোনো নাগরিককে জোড় করে ধর্ম বদল করানো যাবে না । একজন ব্যক্তির নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী ধর্ম পালন করার অধিকার আছে ।
৫) সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিষয়ক অধিকার (Cultural and Educational Rights)- নাগরিকদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শিক্ষার অধিকার মৌলিক অধিকারের ভিতর ধরা হয়েছে ।
৬) সাংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার (Right to constitutional remedies)- কোনো নাগরিক ওপরে উল্লেখিত অধিকারগুলি বা কোনো একটি অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে, তিনি সুপ্রিম কোর্টে প্রতিকারের জন্য আবেদন করতে পারেন ।

এছাড়াও, ২০০৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আরেকটি মৌলিক অধিকার যুক্ত হয়েছেঃ
৭) শিক্ষার অধিকার (Right To Education)- যেখানে বলা হয়েছে ছয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়স অবধি সমস্ত শিশুর বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে।

কিন্তু স্বাধীনতার সত্তর বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও, আমাদের দেশের প্রতিটা নাগরিক এই সমস্ত মৌলিক অধিকারগুলি পাচ্ছেন কি?

উত্তর হল- না। একেবারেই না। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই এই সমস্ত মৌলিক অধিকারগুলিকে উপভোগ করতে পারে্ন না। ইচ্ছামতী আমার কাছে জানতে চেয়েছে, কেন এরকম হয়, আর কোথায় কোথায়ই বা হয়?এর উত্তর হল, আমাদের দেশের প্রতিটা প্রান্তে, বড় বড় শহর থেকে শুরু করে দূর দূরান্তের নাম -না-জানা গ্রামে-গঞ্জে, নানা কারণে কিছু কিছু মানুষ অন্য অনেক মানুষের ওপর অত্যাচার করে চলেছে; তাদের মৌলিক অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করছে। বিনা মাইনেতে বা খুব কম মাইনেতে কাজ করানো; শিশু শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো; ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করা; নিজস্ব সংস্কৃতির অধিকারে বাধা সৃষ্টি করা; পড়াশোনা করা থেকে আটকে রাখা; রোজগার করা থেকে আটকে রাখা; - ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে, কোন না কোন বিষয়ে কিছু মানুষ কিন্তু অন্য মানুষদের স্বাধীনভাবে, নিজের ইচ্ছামত, অধিকারমত জীবন যাপন করতে দিচ্ছে না।

ইচ্ছামতী শুনে অবাক হয়ে বলল- সে আবার কি? এই তো আমার বেশিরভাগ বন্ধুরা সবাই কেমন দিব্বি স্কুলে যায়, আঁকা- গান-নাচ-কারাটে শিখতে যায়, কই কাউকে তো আমি এরকম বঞ্চিত হতে দেখি না। এই তো কেমন আমাদের দেশের দূর দূর প্রান্ত অবধি ইন্টারনেট সংযোগ হয়ে গেছে, আমাদের দেশ অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে গেছে, আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দল বিশ্বের সেরা দলগুলির মধ্যে একটি; আমরা কেমন সবথেকে কম খরচে মঙ্গলগ্রহে মঙ্গলযান পাঠিয়ে দিলাম; আমাদের সেনাবাহিনী পৃথিবীর সব থেকে বড় বড় সেনাবাহিনীগুলির মধ্যে একটি; আমাদের সব বড় বড় শহর জুড়ে আকাশছোঁয়া বাড়ির সারি, দামি দামি দোকান-বাজার। তাহলে? তাহলে কারা, কোথায় , কিভাবে অন্যদের ওপরে অন্যায় করছে?

আমি বলি, যেটুকু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছ শুধু সেটুকু জানলেই তো হল না। তোমার চেনা জানা গন্ডীর বাইরেও একটা বিশাল দেশ পড়ে আছে। সেই দেশকে, সেই দেশের শ্রমিক, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষদের চিনতে, জানতে তোমার এক জীবন লেগে যাবে। আর অন্যায় বা অপরাধ? সে হয়ত হচ্ছে তোমার পাশের বাড়িতেই, অথবা তোমার পাড়ায়। তুমি দেখতেও পাও, কিন্তু সবসময়ে বুঝতে পার না; বা বুঝতে পারলেও প্রতিবাদ করতে পার না; অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পার না।বিকেলবেলা হাঁটতে বেরোলে, অথবা স্কুল থেকে ফেরার পথে, তুমি কি দেখনি তোমার বয়সী ছোট কোন ছেলে চায়ের দোকানে কাপ-প্লেট ধুচ্ছে? অথবা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পথে তোমারই মত এক ছোট মেয়ে খাওয়ার জন্য ভিক্ষা চাইছে? অথবা বলছে "একটা ধূপকাঠির প্যাকেট কিনবে? তাহলে আমি খেতে পাব।" পথের ধারে ছেঁড়া-প্লাস্টিক আর ত্রিপল বেঁধে আশ্রয় নিয়েছে কত-শত মানুষ। এখনো আমাদের দেশে কত কত ছোট ছোট মেয়েকে স্কুলে যেতে দেওয়া হয়না, শুধুমাত্র তারা মেয়ে বলে। কত কত মানুষকে জাতের দোহাই দিয়ে নিত্যদিন অপমান করা হয়। এমনটা আমরা দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তাই আর আমাদের চোখে লাগে না। মনে হয়, এটাই স্বাভাবিক।

৭০ বছর মানে তো শুধু বড় নয়, দেখতে গেলে স্বাধীন ভারত বেজায় বুড়ো একটা দেশ।কিন্তু যা হয় আর কী ! বড়রা কি আর সবসময়ে বুদ্ধিমানের মত কাজ করে? বেশিরভাগ সময়েই করে না। তাই এদেশে এখনো গরীব-ধনী-ফর্সা-শ্যামলা-মেয়ে-ছেলে-হিন্দু-মুসলমান-খ্রীস্টান-বৌদ্ধ-শিখ-ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শুদ্র-শ্রমিক-মালিক---মানুষে মানুষে এরকম নানা ধরণের বিভেদ তুলে, বহু বহু মানুষকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে কিছু ক্ষমতাশালী মানুষ। এবং দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশ চালান যাঁরা, সেইসব 'মন্ত্রীমশাই ষড়যন্ত্রীমশাইরা' এই সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না।

কিন্তু পারছেন না কেন? - জানতে চাইল ইচ্ছামতী। 'মন্ত্রীমশাই ষড়যন্ত্রীমশাই'-এর মত মানুষদের ইচ্ছামতী চিনেছে 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' ছবিটা দেখে; কিন্তু সেখানে তো গুপী আর বাঘা এসে কেমন সব সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিল; রাজ্যে রাজ্যে যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিল; শুন্ডির বোবা নগরবাসীদের অসুখ সারিয়ে মুখে বুলি ফিরিয়ে দিয়েছিল; আর হাল্লার না খেতে পাওয়া মানুষদের জন্য গান গেয়ে নিয়ে এসেছিল পেট ভরা খাবার। তাহলে কি সেরকম কোন উপায়ে আমাদের এই দেশে সবার জন্য সাম্য আসতে পারে না?

ইচ্ছামতীকে বললাম- 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' তো আসলে একটা রূপকথা।রূপকথাতে তো সব অসম্ভবই সম্ভব হয়। কিন্তু সত্যিকারের জীবনে সব অসম্ভব সহজে সম্ভব হয় না। কিছু কিছু অসম্ভবকে অবশ্যই সম্ভব করে তোলা হয়। আর সেটা করতে পারেন তোমার আমার মত কোন মানুষ-ই। চাই শুধু সাহস, ইচ্ছা আর অন্য সব মানুষদের জন্য সমান ভালবাসা।

মহাশ্বেতা দেবী

সেরকমই একজন মানুষ ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। এই মাত্র কয়েকদিন আগে, জুলাই মাসের ২৮ তারিখে তাঁর জীবনাবসান হল। মহাশ্বেতা দেবী আমাদের সবার কাছে যতটা পরিচিত একজন লেখক রূপে, ঠিক ততটাই, বা তার থেকেও বেশি পরিচিত একজন অগ্রনী সমাজকর্মী রূপে। ভারতের বিভিন্ন উপজাতির মানুষদের জন্য, তাঁদের অধিকারের লড়াইতে সারাজীবন তাঁদের পাশে থেকে কাজ করে গেছেন মহাশ্বেতা দেবী। তাঁর গল্পে-উপন্যাসে বারবার করে ফিরে এসেছে সেইসব প্রান্তিক মানুষদের জীবনযাত্রার গল্প, অধিকারের জন্য লড়াইয়ের গল্প। সেগুলি আসলে গল্পও ঠিক নয়, এই দেশের হাজার হাজার সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবন সংগ্রামের কথা, গল্পের আকারে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি, চিনিয়ে দিয়েছেন আমাদের । মহাশ্বেতা দেবীকে ইচ্ছামতী পরিবার জানায় সশ্রদ্ধ প্রণাম।

এই স্বাধীনতা দিবসে,স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসাবে নিজেদের মৌলিক অধিকারগুলি জেনে এবং বুঝে নেওয়ার সাথে সাথে জেনে নাও নিজেদের মৌলিক কর্তব্যগুলিও। দেশের কাছ থেকে নিজেদের অধিকার তো বুঝে নিলাম, কিন্তু দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্বগুলি কি কি? আমাদের দেশের সংবিধান চায়, প্রতিটা দেশবাসী তাদের দেশকে, জাতীয় পতাকাকে এবং জাতীয় সঙ্গীতকে যেন সম্মান করে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কর্মযজ্ঞের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ,নিজের দেশের একতা ও শান্তি বজায় রাখে, দেশের মর্যাদা বজায় রাখে। একে অপরের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলে; ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল বা জাতের নিরিখে একে অপরকে অসম্মান না করে; দেশের সমস্ত প্রান্তের সংস্কৃতিকে সম্মান জানায়, দেশের সমস্ত সম্পদ রক্ষা করে; দুনিয়ার সামনে এককভাবে এবং দলবদ্ধ ভাবে দেশের হয়ে নজির স্থাপন করতে পারে - ঠিক যেমনভাবে এই মূহুর্তে , রিও ডি জেনেইরোতে অলিম্পিকে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন ১১৮জন খেলোয়াড়ের ভারতীয় দল।

দীপা কর্মকার

আর আজ, এই ১১৮ জনের মধ্যে যাঁর দিকে আমাদের সবার চোখ সবথেকে বেশি, তিনি হলে আর্টিস্টিক জিমন্যাস্ট দীপা কর্মকার। অলিম্পিকে নির্বাচিত হওয়া প্রথম ভারতীয় মহিলা জিমন্যাস্ট হিসাবে তিনি তো আলোড়ন তুলেইছিলেন। আর এখন, স্ত্রী- পুরুষ নির্বিশেষে তিনিই প্রথম ভারতীয় জিমন্যাস্ট, যিনি নিজের বিভাগে অলিম্পিকের ফাইনালে অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। আজ, ১৪ই আগস্ট, ২০১৬, ভারতীয় সময় রাত ১১-১৫ মিনিটে সরাসরি এই ফাইনাল টেলিভিশনে দেখতে পাওয়া যাবে। আরো ৭ জন সেরা বাছাই প্রতিযোগীর সাথে লড়াইতে নামবেন দীপা। ফলাফল যাই হোক না কেন, ত্রিপুরার আগরতলা থেকে রিও অবধি দীপার সাফল্যে পরিপূর্ণ দীর্ঘ সফরের কাহিনীর মধ্যেও রয়েছে নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার কথা; সাথে রয়েছে নিজের দেশের প্রতি কর্তব্যের কথাও। দীপার গল্পও এক স্বাধীনতার গল্প। এই সাহসী মেয়ের জন্য ইচ্ছামতী পরিবারের তরফ থেকে রইল অকুন্ঠ ভালবাসা ও শুভেচ্ছা।

আগামিকাল, ১৫ই আগস্ট, জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন করার সময়ে আর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময়ে মনে রেখ একটা কথা - একশো তিরিশ কোটিরও বেশি মানুষে ভরা আমাদের এই দেশ। প্রতিটা মানুষ জুড়ে জুড়েই তৈরি আমাদের গোটা দেশটা। এদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ যদি মন খারাপ করে থাকে, তাহলে আমরা সবাই কখনই ভাল থাকতে পারব না। তাই আমাদের সবার চেষ্টা হোক - একে অপরকে ভাল রাখার, ভালবাসার।

চাঁদের বুড়ি

ছবিঃ ঈশিতা চন্দ্র

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা