ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

সিক্স-এর শতরূপা করিডোরে, তার পায়ের আওয়াজে গোটা স্কুল বাড়ি কাঁপছে। গত দেড় বছরে স্কুলের সবাই জেনে গেছে ক্লাস চলাকালীন এই ধরনের আওয়াজ মানেই শতরূপা বাইরে। একে ফার্স্ট গার্ল, তার ওপর ওর বাবা বিরাট ব্যাবসাদার। একটু আধটু অহংকার থাকতেই পারে। যদিও ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে ও বসে বলে সুমিতা ছাড়া আর কেউ বসার সাহস পায় না। ওর কোনো বন্ধু নেই। বিরাট টিফিনবক্স খুলে একা একা খায়। পাশের সুমিতা বেশীর ভাগ দিনই টিফিন আনে না। মাঝে মাঝে ভাজা ছোলা চিবোয়। ওর দিকে ফিরেও তাকায় না শতরূপা। সুমিতা একটাই ড্রেস পড়ে আসে তাও ইস্ত্রী করা থাকে না। ছেঁড়া ব্যাগ। বই খাতায় খবরের কাগজের মলাট। রেজাল্টেও ওর ধারে কাছে নেই। হা-ঘরের এমন মেয়ে যে ওর পাশে বসতে পারছে এটাই বেশী। নেহাত কথা কম বলে আর নিজের মত থাকে না হলে কবে কমপ্লেন করে দিত।

সুমিতা ভীষণ শেকি থাকে সবসময়। ওর রিফিউজি বাবা প্রাইমারী স্কুলে পড়িয়ে তার পাঁচ ছেলেমেয়েকে বড় করছেন। সবার চাহিদা মেটাতে পারেন না। প্রাইভেট টিউটর দেবার ক্ষমতা যে নেই তা বলাই বাহুল্য। তাই ক্লাসের অন্য মেয়েরা যখন মজা করে, খেলে ও তখন খাতা খুলে পড়ে। যাতে অসুবিধার জায়গাগুলো স্কুলের দিদিমণিদের থেকে বুঝে নিতে পারে। কারো সঙ্গে গল্প করাও হয় না। সামনের বেঞ্চের দুটি মেয়ে সম্পূর্ন ভিন্ন কারনে ক্লাসের সবার কাছে এলিয়েন হয়েই রইল।

সেদিন হাফ-ইয়ারর্লি ইংরেজি পরীক্ষার খাতা দিয়েছে। সবাই নিজের নিজের খাতায় ঝুঁকে আছে।  দিদিমণি কোনো কাজে বাইরে গেছেন। শতরূপার চিৎকারে পুরো ক্লাস চমকে উঠেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুমিতার গালে চুরাশি সিক্কার চড় পড়ল। ঠিক সেই মুহুর্তে  দিদিমণিও ঢুকছেন। দৌড়ে এসে শতরূপাকে থামালেন। দিদিমণিকে তোয়াক্কা না করেই সুমিতাকে বকাবকি করছে সে।  সুমিতার উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই। পুরো ক্লাস থম মেরে গেছে। দিদিমণির প্রশ্নের জবাবে শতরূপা বলল,
"ওর মতো স্টুডেন্ট যে মাত্র আটত্রিশ পেয়েছে সে আমার খাতায় ভুল ধরছে। হাউ ডেয়ার শি! ম্যাম! আপনি রাইট দিয়েছেন, মার্কস দিয়েছেন সেটা কি ভুল!"
"সে কী! সুমিতা! তোমার এত সাহস হল কী করে?"
মিনমিন করে সুমিতা জবাব দিল
" দিদিমণি একবার খাতাটা দেখুন প্লীজ! "
"কই দেখি! শতরূপা খাতাটা দেখাও তো!"
"ছাড়ুন না ম্যাম। ওর মতো স্টুডেন্ট আপনার ভুল ধরবে সেটা বিশ্বাস করছেন কেন? ও কোনো সাবজেক্টেই ফর্টির ওপরে পায় না। লাস্ট বেঞ্চে বসারও যোগ্যতা নেই ওর। আমি দয়া করে ওকে পাশে বসতে দিয়েছি বলে ধরাকে সরা ভাবছে।"
"আহা! দাওই না খাতাটা। দেখি কোথায় ভুল বলছে!"
"ও নিজেই কিছু পারে না। দেখুন কারো খাতা দেখে টুকে ঐ নম্বর পেয়েছে, আবার আমার ভুল ধরতে এসেছে!"
"এবার কিন্তু আমি তোমায় বকবো শতরূপা! আমি ক্লাসে আছি এখনো। যা বলার আমি বলব। তুমি খাতাটা দেখাও!"

পুরো ক্লাস অবাক হয়ে দেখছে ছোটখাটো শান্ত মেয়েটা শতরূপার মতো মেয়েকে কীভাবে নাড়িয়ে দিল। এখন সবকিছু দিদিমণির হাতে। খাতা দেখে অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে সুমিতাকে দেখলেন
"একদম ঠিক বলেছ তুমি সুমিতা। আমারই ভুল হয়েছে। গ্রামারের এই ভুল তুমি ধরতে পারলে অথচ এত কম নাম্বার পাও কেন?"
"আমার তো বই নেই, তাই পড়তে পারি না।"
"মানে? তুমি না পড়ে পরীক্ষা দিয়েছ?"
"হ্যাঁ! মানে বাবাতো সব বই কিনে দিতে পারে না!"
"কী কী বই নেই তোমার?"
"ইতিহাস ছাড়া অন্য বই নেই।"
"মানে? তুমি সব না পড়ে পরীক্ষা দিয়েছ?"

সুমিতা মাথা নাড়ে। বই না থাকার লজ্জায় মাটিতে মিশে আছে। শতরূপা খাপ্পা হয়ে গেল। দু নাম্বার কমবে ওর, তারচেয়েও বড় কথা সুমিতা জিতেছে আর ওর হার।
"মিথ্যে বলছে ম্যাম! নাম্বার কম পেয়েছে তো তাই দোহাই দিচ্ছে। আমি দেখেছি ওর কাছে বই থাকে। ব্যাগ দেখুন ওর।"
"তাই নাকি! কই দেখি ব্যাগ!"

সুমিতার ব্যাগ থেকে বেরোল পোকায় কাটা কয়েকটা পুরোনো বই, সবই অঙ্কের। বইগুলো সব উঁচু ক্লাসের।
"এই বই দিয়ে তুমি কী কর?"
"আমার অঙ্ক ভালো লাগে তো তাই দাদা কাগজওয়ালার কাছ থেকে এই বইগুলো চেয়ে এনেছে।"
"এগুলো তুমি বুঝতে পারো?"
"চেষ্টা করি।"
"অঙ্কে কত পেয়েছ?"
"খাতা পাই নি দিদিমণি।"
"আচ্ছা বেশ! মেয়েরা শোন, একটু চুপ করে বস। আমি ওকে নিয়ে বড়দির কাছে যাচ্ছি। কোন গন্ডগোল যেন না হয়।"

সুমিতাকে নিয়ে দিদিমণি বেড়িয়ে যেতেই ক্লাসে গুণগুণ। শতরূপা ফুঁসছে। একটু পরে ওরা ফিরে এল। ততক্ষনে ঘন্টা পড়ে গেছে। দিদিমণি বেড়িয়ে যেতেই বাঘ যেমন করে শিকারের ওপর ঝাঁপায় শতরূপাও ঝাঁপিয়ে পড়ল সুমিতার ওপর,
"কী মেয়ে রে তুই? তোর লজ্জা করল না বই নেই বলতে! তোর বাবা কি ভিখিরি যে বই কিনে দেয় না? নাকি করুণা পাবার জন্য মিথ্যে নাটক করছিস? ছি ছি, আমি তো ভাবতেই পারি না পড়াশুনায় এত খারাপ কেউ এমনভাবে সবার দয়া চাইতে পারে। বাবা – মা কিছুই শেখায় নি না রে?"
"আমার বাবা তো প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়, তাই শুধু দাদাকে বই কিনে দিতে পারে আমরা তিন বোন বই ছাড়াই পড়ি।"
"তা পড়িস কেন? পড়ে কী করবি? দুদিন পরে তো ফেলটুস হবি। তার চেয়ে বাড়ি বাড়ি বাসন মাজার কাজ করলেই পারিস! বাবার সাহায্য হবে। হি! হি! হি!"

পুরো ক্লাস হতভম্ব হয়ে গেল। কেউ তার সহপাঠিকে এইভাবে অপমান করতে পারে ভাবতেই পারে না। এমনিতেই শতরূপাকে কেউ পছন্দ করে না। এরপর সবাই মুখ ঘুরিয়ে নিল। সুমিতার কথা শুনে সবার মনে একরাশ কান্না জমে ছিল। টিফিনের সময় সেগুলো বেড়িয়ে এল। সুমিতাকে তারা নিজের বই একদিনের জন্য ধার দিতে চাইল। সুমিতা এবার খুশীতে মাটিতে মিশে গেল।

এরপর ক্লাসের সকলে সুমিতার বন্ধু হয়ে গেল। এখন টিফিনে সুমিতা  আর মুখে খাতা গুজে থাকে না। সবাই মিলে ওকে টিফিন খাওয়ায়, গল্প করে। একদিন করে তাদের বই সুমিতাকে দেয়। ভালোবাসা পেয়ে সুমিতা পাখা মেলে দিল। কিছুদিনের ভিতরই সব টিচার লক্ষ্য করলেন সুমিতার খাতায় উন্নতির ছাপ। মাস খানেক পর সব টীচার মিলে চাঁদা তুলে সুমিতাকে বই কিনে দিলেন। ক্লাসে বই দেবার সময় বড়দি বললেন আমাদের পরিশ্রম তোমায় দিলাম আশাকরি তার মান রাখবে। সুমিতার প্রকাশ কম। মাথা নীচু করে কোনরকমে হ্যাঁ বলল। বন্ধুরা সবাই খুশী, কেবল শতরূপার মুখে বিদ্রুপের হাসি।

ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে ক্লাসের মেয়েদের জটলা। শতরূপা উদয় হয়ে বলল,
"কীরে সুমিতা! এবার পঞ্চাশ পেরোবি তো! না ফেলটুস! এবার তো আর বইয়ের অজুহাত দিতে পারবি না! হি হি!"
"দেখি! "
"ঐ আনন্দেই থাক! হি হি! দুমদুম করে চলে গেল।"

রেজাল্ট বলতে গিয়ে ক্লাস টীচার কেঁদে ফেললেন। সুমিতা প্রথম হয়েছে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। বন্ধুদের উল্লাসে ভেসে যেতে যেতে শতরূপার কালো হয়ে যাওয়া মুখ দেখে সুমিতার মনে ঝড়। কাছে গিয়ে হাত দুটো ধরে বলল
"বিশ্বাস কর আমি এমনটা চাই নি! সব পেরে গেলাম যে! দেখবি পরের বার ঠিক তুই ফার্স্ট হবি।"

চুপ করে থাকা মেয়েটা এই প্রথম এত কথা বলল। না শতরূপা আর কোনদিনও প্রথম হতে পারেনি।

ছবিঃ শিল্পী ঘোষ

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা