সূচীপত্র -গ্রীষ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

স্বাধীনতার গল্প

কত্তদিন পরে তোমার সঙ্গে দেখা, বল!! এই গরমে হাঁস-ফাঁস। আমাদের ক্রান্তীয় অঞ্চলের জলবায়ু ও বদলাচ্ছে বোধ হয় জান! নাহলে এই গরমে কিন্তু ঘাম এখনও বেশ কম। তবে হ্যাঁ, রোদ্দুরে বেরোলে কিন্তু বেশ বিপদ। কোনো ক্ষমাঘেন্না দেখাচ্ছেন না সূয্যিমশাই।তাই সাবধান সাবধান সাবধান।
রাজনীতি বোঝার বয়েস তোমার এখনও হয় নি বটে, তবে বড়দের দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে একটা টানাপোড়েন চলছে।যদিও এই অস্থিতিশীলতা আজকের নয়, অনেকদিনের; শুধু এখানে নয়, পৃথিবী জুড়ে। মানুষের বুদ্ধি বেশি তো, তাই অদরকারেও নিজেদেরকেই মারে, একজনের সব থাকতেও আরো চাই, তাই। আমাদের ইস্কুলের ইতিহাসের মাস্টারমশাই ছোটবেলায় শিখিয়েছিলেন যে ‘ইতিহাস সবসময় বিজেতারাই লেখেন’। মানেই বুঝিনি সেদিন। বাড়িতে এসে বাবা-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কি সব জটিল উত্তর দিয়েছিলেন, এইটুকুই মনে আছে।যেমন ধর, এই যে স্বাধিনতার গল্প তোমরা পড়ছ, এখানে নায়ক কারা, যাঁরা ইংরেজদের, অর্থাৎ সরকারের বিরূদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা এনেছেন; আর খলনায়ক কে, ইংরেজ সরকার, শাসক।কারণ এই ইতিহাস আমরা নিজেদের দেশের দখল পাওয়ার পরে লিখেছি আমাদের চোখ দিয়ে।বীরগাথা লিখেছি আমরা। বিপ্লবীরা হলেন আমাদের কাছে মহামানব।কিন্তু ধর, আমরা যদি এখনও পরাধীন ই থাকতাম, তাহলে ইতিহাস বই-তে পড়তাম যে, আমাদের চোখে দেখা এই মহামানবরাই ছিলেন খলনায়ক, তাঁরাই ছিলেন উগ্রপন্থী।
আমরা এখনো নানা রকমের বিচ্ছিন্ন আব্দোলনের কথা শুনি, বর্তমান সরকারের বিরূদ্ধে। সেই সুবাদে জঙ্গলমহলের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ বড়দের কাছে বা টিভি-তে।সেই জঙ্গলমহলের মানুষ ইংরেজ সরকারের বিরূদ্ধেও কঠিন আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ১৭৯০ সাল নাগাদ।
আমেরিকাতেও তখন ইংরেজদের ঔপনিবেশিকতার বিরূদ্ধে চলছিল ঘোর আন্দোলন।তা গিয়ে দাঁড়ায় বিদ্রোহে, তারপরে উত্তর আমেরিকার মানুষ যুদ্ধ ঘোষনা করে, ইংল্যান্ডের অপশাসনের বিরূদ্ধে। ১৭৭৬ সালে সেই যুদ্ধী জয়ী হয়ে আমেরিকার বৃটিশ উপনিবেশগুলি স্বাধীনতা ঘোষনা করে। জন্ম হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।ঠিক ওই দশকেই ইউরোপেও হয় আমূল পরিবর্তন ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে। অত্যাচারী রাজা ষোড়শ লুই ও সাম্রাজ্ঞী মারী আঁতোয়ানেতকে বিপ্লবী সরকার গিলোটিনে ঘ্যাচাং-ফু করে উচ্চারিত হল স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী-র বাণী। কিন্তু ঠেকে শেখে না অনেকে। শক্তির দম্ভে তখনো অন্ধ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ। ইতিহাস থেকে শিক্ষা হল না তাদের।চারিদিকে যখন অত্যাচারের জন্য বৃটিশ সাম্রাজ্য তার বিশাল উপনিবেশের জমি খোয়াচ্ছে, বাংলায় তখন যেন আরো বেশি করে শুরু হল বৃটিশ সামাজ্যবাদীদের নিষ্ঠুর শাসন।এক অনড়, পাষান অপশাসন, নির্বিচার, অত্যাচার শোষণ।
মেদিনীপুর আর বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের আদিবাসী আর কৃষকরা এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে লাঠি-সড়কি, তির-ধনুক নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।শ্রেনীবিদ্বেষবশতঃ আভিজাত্যগর্বী জমিদারেরা ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য ভরে এদের ‘চুয়াড়’ নামে ডাকত।এরা আসলে ছিল অরণ্যসন্তান।জঙ্গলের সম্পদের ওপরে ছিল এদের নির্ভরতা।চাষবাস ও করত তারা আদিম পদ্ধতিতে। চিরাচরিত ভাবে তারা যে জমি চাষ করে এসেছে এবং বনের ফল-মূল, কাঠ-পাতা সংগ্রহ করে এসেছে, সেখানেও ইংরেজরা তাদের থাবা বসাল নির্দ্বিধায়।আর জমিদাররা ইংরেজদের হুকুম তামিল করতে গিয়ে এই সব নিরীহ মানুষদের সব স্বাভাবিক অধিকার কেড়ে নিল আর গায়ের জোরে অতিরিক্ত খাজনাআদায় করতে লাগল।নিরীহ মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আত্ম্ররক্ষার চেষ্টা তো করবেই।তাই তথাকথিত চুয়াড়-রা এই ভয়ঙ্কর নির্বিচার অত্যাচারের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়াল।তাই ইতিহাসে এই বিদ্রোহ ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত।
এদের সঙ্গে আবার যোগ দিল কর্মচ্যুত পাইকরা।মুঘল আমলে গ্রামে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ভার ছিল পাইকদের ওপর। ইংরেজরা ক্ষমতায় এলে পাইকদের বরখাস্ত করা হয়। ক্ষোভ আর অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে পাইকদের মধ্যে। তাই সুযোগ বুঝে চুয়াড়দের সঙ্গে পাইকরাও হাত মেলাল চুয়াড়দের সঙ্গে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে।
বিদ্রোহীরা দুর্জন সিং নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ১৭৯৮ সালে রায়পুর পরগণায় অন্ততঃ ত্রিশটি গ্রামে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। সরকারী দপ্তরের অপর আক্রমণ চালায়।সারাদিন ধরে যুদ্ধ চলে দুই পক্ষের। শেষে চুয়াড়রা পরাজিত হয় ইংরেজ সৈন্যদের কাছে।কিন্তু আবার মেদিনীপুরের শালবনী অঞ্চলে বিদ্রোহীরা জয়ী হয়।চালায় তাণ্ডব। বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দেয় তারা ইংরেজদের ব্যারাক ধ্বংস করে, শোষক জমিদারদের কাছারী আক্রমণ করে দলিলপত্রে আগুন ধরিয়ে দিয়ে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে কিছু জমিদারও বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।মুশকিল হল, দীর্ঘ সংরাম চালানোর মত সংগঠন বা রসদ কোনোটাই পর্যাপ্ত ছিল না।আবার সেই একই উপায় অবলম্বন করে ধূর্ত সাহেবরা।বিভেদ। কৌশলে গ্রামবাসীদের মধ্যে ধুকিয়ে দেয় বিভেদ। সঙ্গে রয়েছে উন্নত অস্ত্র। মাত্র এক বছরের মধ্যে চুয়াড়দের বিদ্রোহ দমন করে ফেলে বৃটিশরা।এবার তাদের পালা প্রতিশোধের। নৃসংশভাবে বিদ্রোহীদের হত্যা করে তারা।গাছের ডালে তাদের ফাঁসি দিয়ে মৃতদেহ ঝুলিয়ে রেখে ত্রাস সৃষ্টি করে তারা গ্রামের সাধারণ মানুষদের মধ্যে।
তবুও ন্যায় বিচার আরা অধিকার দাবীর জন্য বাংলার ইতিহাসে চুয়াড়বীরদের দান স্মরনীয় হয়ে আছে।
গড়বেতা এখন রাজনৈতিকভাবে বহুচর্চিত জায়গা। তবে ১৮০৬ সালে সেই গড়বেতার কাছে গঙ্গানীর গভীর শালবন ঘেরা অঞ্চলে অচল সিংহ নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে লায়েকরা গেরিলা কৌশ্ল অবলম্বন করে ইংরেজ শাসকদের বিরূদ্ধে আক্রমণ চালায়।কারণ, কোনো কারণ ছাড়াই ইংরেজরা লায়েকদের সব জমি বাজেয়াপ্ত করে।বিদ্রোহের সূচনা সেখান থেকেই। তারাও চুয়াড়দের বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল।। বিদ্রোহী চেতনা গোটা লায়েক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। ইংরেজ শাসকের ওপরে আঘাত হানতে প্রেরণা দেয়।কিন্তু জান, ইংরেজরা তাদের শায়েস্তা করার জন্য কামান দেগে গোটা শালবন জ্বালিয়ে দেয়।অচল সিংহ কিন্ত অটল। তাঁর নেতৃত্বে কিন্তু গেরিলা পদ্ধতিতে চলতে থাকে আক্রমণ ইংরেজদের ওপর।অসমশক্তি নিয়ে যদিও এই বিদ্রোহ সফল হয় নি। অচল সিংহ আত্মগোপন করেন।কিন্তু আমাদের দেশের বীরদের বিশ্বাসঘাতকের অভাব হয়নি কোনোদিন। ১৮১৬ সালে তাদের সাহায্য অচল সিংহ গ্রেপ্তার হন ইংরেজদের হাতে। বিনা বিচারে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।অচল সিংহের ২০০ অনুগামীদের নৃশংসভাবে ফাঁসী দেয় বৃটিশ সরকার।শেষ হয় ক্ষণস্থায়ী তিনটি সমসাময়িক বিদ্রোহ যা পরবর্তী বিদ্রোহীদের শিখিয়ে যায় যে সংগঠন আর শক্তি দুটোই দরকার ইংরেজদের বিরূদ্ধে লড়তে গেলে।

আর্য চ্যাটার্জি
কলকাতা