সূচীপত্র -গ্রীষ্ম সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

ঘোড়সওয়ারি

রবিউলদের গ্রামটা নাকি ভারি সুন্দর। প্রথম আলাপেই রবিউল আমায় বলে। রবিউল পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। রবিউলের সাথে আমার আলাপ পাহেলগাওতে। রুবিউলদের গ্রামটা নাকি চুনাওয়ারি যাওয়ার পথে পড়ে। রাস্তা থেকে খানিকটা পাহাড়ের ওপরে। খুব কম লোকেরই বাস সেখানে। রবিউলের একটা ঘোড়া আছে, নাম বুক্কা। ছোট রবিউল বুক্কার পিঠে বসে টগবগিয়ে উঁচু থেকে সমতলে নেমে আসে। পাহেলগাওয়ের রাস্তায় গেলেই চোখে পড়ে অনেক ঘোড়া। সাধারনত আসেপাশে ঘোরার জন্য টুরিস্টরা ঘোড়ায় চড়ে। ঘোড়া ওখানকার একমাত্র স্থানীয় যাতায়তের মাধ্যম। তবে গাড়িও আছে কিন্তু দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার জন্য।
ভোরবেলায় পৌছয়, খানিক বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বেলায় একটু প্রাতরাশ করবার আশায়। সেখানে গিয়েই রবিউলের সাথে আমার আলাপ এক কাপ চা খাওয়ার মাঝে। রবিউল আমার কাছে এসে বারবার বলতে থাকে ওর ঘোড়া করে একটু ঘোরার জন্য। সকাল থেকে নাকি ওর বউনি হয়নি। আর সন্ধ্যেতে বাড়ি ফেরার আগে নাকি বোনের জন্য পেন্সিল, খাতা আর একটা কাঠিওয়ালা লজেন্স কিনে নিয়ে যেতে হবে। বোন নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, আর রবিউল বোনকে কথা দিয়েছিল সে নিজে স্কুলের জন্য তাকে খাতা পেন্সিল কিনে দেবে এবং সঙ্গে করে অবশ্যই একটা কাঠিওয়ালা লজেন্স আনবে। ওদের গ্রামে নাকি ওটা পাওয়া যায় না।
আমারও হাতে কোন কাজ না থাকায়, আর এমন মনোরম পাহাড় দিয়ে ঘেরা জনপদটা ঘোরার লোভ সামলাতে না পেরে চড়ে বসলাম রবিউলের ঘোড়া বুক্কার পিঠে। বুক্কা দেখলাম রবিউল কথায় ওঠে বসে। রবিউলকে নাকি বুক্কাকে কিছু বোঝাবার জন্য চাবুক ব্যবহার করতে হয়না, ওর কথা নাকি ও সব বুঝতে পারে। যেতে যেতেই বলল বুক্কার বয়স ৪ বছর, ও যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ে তখন নাকি বুক্কার জন্ম হয়, জন্মের কিছুদিন পড়েই রোগে আক্রান্ত হয়ে বুক্কার মা মারা যায়। সেই থেকে বুক্কা ওদের বাড়িতে খুব আদরের।
রবিউলদের বাড়িটা কাঠের, প্রবল শীতে এখানে যখন তুষারপাত হয়, সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন হয়ে যায়, তখন নাকি বেশ কিছুদিন ওকে ঘরে বসেই থাকতে হয়। মাঝে মাঝে মিলিটারিরা এসে ওদের জন্য খাবার আর পানীয় দিয়ে যায় সরকারের তরফ থেকে। শীতকালটা ওদের খুব কষ্টে যায়। রবিউলদের বাড়িতে নাকি দুটো আখরোট গাছ আছে। কিন্তু এখন কোন আখরোট নেই, ঝড়ে গেছে। আমাকে বলল ওদের বাড়িতে গেলে আখরোট খাওয়াবে। যেতে যেতে রবিউল আরও বলছিল ওদের বাড়ির সামনে ছোট একটু জমি আছে, বাবা ওখানেই চাষের কাজ করে। আর শীতের সময় নাকি প্রায়ই শ্রীনগর থাকে, সুতোর কাজ করে সেই সময়, কারন তখন চাষবাস নাকি হয় না।
খুব ভোরে রবিউল ঘুম থেকে ওঠে। উঠে এক কাপ আর একটা নিমকি খেয়ে সোজা স্কুলে যায়। আমাদের এখানে যেমন বিস্কুট খাওয়ার রীতি চায়ের সাথে ওদের ওখানে ঐ নিমকি খায় সবাই। স্কুল থেকে ফিরে এসেই সোজা চলে আসে বুক্কাকে নিয়ে পাহেলগাওতে। রবিউলদের গ্রামের নাম থুকাওয়ারি। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি এখানে থাকে। ঘোড়সাওয়ারি করে রোজ যা উপার্জন হয় রবিউল গিয়ে মার হাতে তুলে দেয়। মাকে নাকি সে বলেছে অনেক দূর অবধি সে পড়তে চায়। রবিউল দেখে শীতে যখন যান চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন হেলিকপ্টার করে মাল, খাবার ওদের ওখানে পৌঁছে দেওয়া হয়। স্কুলের স্যার বলেছে ঐ হেলিকপ্টার যে চালায় তাকে পাইলট বলে। রবিউলের সেই থেকে পাইলট হওয়ার খুব ইচ্ছা। নিজেই হেসে হেসে বলে ওঠে এখন ও বুক্কাকে চালায় আর বড় হলে হেলিকপ্টার চালাবে। মা নাকি কিছু কিছু করে টাকা জমানো শুরু করেছে রবিউলের পড়াশুনার জন্য। আমি রবিউলকে জিজ্ঞেস করি এই যে ও সারাদিন এখানে থাকে খায় কি? মা নাকি রুটি আর সবজি পাঠিয়ে দেয় সঙ্গে করে। আবার ফিরে গিয়ে সন্ধ্যেবেলা খায়, তারপর পড়তে বসে। রবিউলদের গ্রামে বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু দিনের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। মাঝে মাঝে বেশ কয়েকদিন বিদ্যুৎ থাকে না। তাই পড়তে বসে রবিউলকে নাকি ল্যাম্পের আলোতেই পড়তে হয়।
রবিউল আমায় বলেছে গত শীতে ও বাবার সাথে কিছুদিন ছিল শ্রীনগরে, তখন ও দেখেছে বরফ হয়ে যাওয়া ডাল লেকে বাইক নিয়ে স্কেটিং হচ্ছে। তবে রবিউলের নাকি ওটা ভালো লাগেনি। ওর নাকি খুব ইচ্ছা ও ওর বুক্কাকে নিয়ে সেই যে দৌড়ে দৌড়ে লাঠি নিয়ে বল সরিয়ে সরিয়ে নিয়ে যায়, সেই খেলাটা খেলবে, টি.ভি তে নাকি ও দেখেছে। আমি ওকে বলে দি ঐ খেলাটার নাম হল পোলো।
রবিউলকে এরপর জিজ্ঞেস করি ওর এখানে থাকতে ভালো লাগে? রবিউল অনেকক্ষণ কিছু বলে না। এরপর শুধু ঘাড় নারে। আমায় ও বলে বইতে নাকি ও পড়েছে মাতৃভূমি মায়ের সমান। আর এটা ওর মাতৃভূমি। তাই এখান থেকে কোথাও যাবে না। যেখানেই যাক আবার এখানে ফিরে আসবে। আমি হাসি, ওর কাছে থাকলে হয়ত ওর মাথার চুলগুলো নেড়ে দিতাম। কথার ফাঁকেফাঁকে আমরা কখন যেন আবার একই স্থানে চলে এসেছি যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমি বুক্কার পিঠ থেকে নামতে রবিউল আমায় বলল কাল আবার আসতে কাল নাকি ও আমায় ওদের গ্রামে নিয়ে যাবে, ওর বোনের সাথে আলাপ করিয়ে দেবে। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। একটা ১০০ টাকার নোট ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম বোনের সাথে সাথে নিজের জন্যও একটা ভালো পেন আর একটা কাঠিওয়ালা লজেন্স কিনে নিয়ে যেতে। রবিউল হাসে। আমি ওর সাথে হাত মিলিয়ে বিদায় নিলাম।
সেদিন আর কোথাও যাওয়া হয়নি। পরদিন আমাদের ঘুরতে যাওয়ার কথা। সকালবেলা উঠে ভাবলাম সেই চায়ের দোকানটার থেকে একটু ঘুরে আসি, যেখানে রবিউলের সাথে দেখা হয়েছিল, আর দেখা হলে ওকে বলব আজ আমরা চুনাওয়ারি যাব, পথে ওদের গ্রামটাকেও ঘোরাতে বলেছি ড্রাইভারকে। কিন্তু দেখা পেলাম না। স্থানীয় লোকজন নিজেদের মধ্যে ওদের স্থানীয় ভাষায় কিছু আলোচনা করছিল, আমি বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝতে পারলাম ওরা কোন একটা ব্যাপার নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন।
ঘুরতে বেরিয়ে প্রথমে খেয়াল না করলেও একটু পরে বুঝতে পারলাম ড্রাইভারজিও যেন কেমন চুপচাপ, অন্যদিন কত কথা বলে। আমিও আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। গাড়ি চলতে লাগল, আমিও মনোরম পরিবেশ দেখার দৃশ্যসুখ অনুভব করতে লাগলাম। চারিদিকে লম্বা লম্বা কত গাছ, নাম জানি না ওদের, আর দূরে নীল আকাশের সাথে মিশে আছে বরফাবৃত পর্বতমালা, এদিক সেদিক তাকালেই কত ঝর্না দেখা, কলকল শব্দ করে সেখান থেকে জলরাশি বেয়ে পড়ছে। এসব দেখার ফাঁকে ভুলেই গিয়েছিলাম অনেকক্ষণ ধরে গাড়িতে আছি, কিন্তু রবিউল তো বলেছিল গাড়ি করে গেলে ৩০ মিনিটের মত লাগবে ওদের গ্রাম আসতে, তাহলে হয়ত ফেরার সময় আসবো। আমি আবার বাইরে দেখতে লাগলাম। এরপর আমরা চুনাওয়ারিতে এসে পৌছালাম, এখান থেকে ৩২ কিলোমিটার গেলে অমরনাথ। বরফে হাঁটার জন্য যেখান থেকে জুতো নিচ্ছিলাম সেই ছেলেটাই একটা পর্বতকে ইশারা করে বলল ওটা পেরোলেই নাকি অমরনাথ, কিন্তু ওখান দিয়ে যাওয়া নিষেধ, অন্য রাস্তা আছে। আমি আবার সেই পর্বতেরই অনেকটা উঠে গেলাম, নিচের মানুষ গুলোকে তখন খুব ছোট ছোট লাগছে, আর বেশী সাহস হল না তাই নেমে এলাম, নামতে গিয়ে আবার বরফের ওপর পড়ে গিয়ে কিছুটা গড়িয়েও নামলাম বেশ মজা হল।
গাড়িতে উঠলাম, কিছুটা যাওয়ার পর এবারে ড্রাইভারজিকে জিজ্ঞেস করলাম এবারে আমরা থুকাওয়ারি গ্রামটা একটু দেখতে যাব তো? ড্রাইভার আমার দিকে তাকাল, তাকিয়ে আবার সামনে দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে লাগল, কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল, আপনি সকালে কোন খবর পাননি? আমি মাথা নেড়ে না বললাম। ড্রাইভার তখন বলল, আজ সকালে থুকাওয়ারি গ্রামে আগুন লেগে গেছে, তিনটি বাড়ি পুরো পুড়ে গেছে, তবে হতাহতের কোন খবর নেই, কিন্তু ঐ পথে গাড়ি চলাচল বন্ধ তাই আমরা ঘুর পথে অন্য রাস্তা দিয়ে এলাম।
আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না, শুধু বারবার এইটাই মনে হচ্ছিল, রবিউলদের কিছু হয়নি তো? গতকাল বোনের জন্য যে খাতা পেন্সিল কিনে নিয়ে গিয়েছিল সেগুলো ঠিক আছে তো? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন হোটেলে ফিরে রাত গভীর হয়ে এল আর ঘুমিয়ে পড়লাম।

আদিত্য ঢালি
বাটানগর।

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)