খেলাঘরখেলাঘর

স্বাধীনতার গল্প

কি বন্ধু কেমন আছ? খুব রঙ খেলেছ তো দোলে? ১৪১৮ সনের নববর্ষ কেমন কাটালে বলো? এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি তোমায় – নববর্ষ কিন্তু  ইংরেজী New Year  এর মতই গুরুত্বপূর্ণ, হয়তো খানিকটা বেশিই, কারণ আমরা আসলে বাঙ্গালী তো! যতই ইংরেজী মিডিয়াম স্কুলে পড় না কেন, নিজের ভাষা, মাতৃভাষা কে কোনদিন অবজ্ঞা কোরো না কিন্তু। তুমি কি জান, UNESCO নামে একটা বিশ্বসংস্থা বাংলা ভাষা কে ‘the sweetest language of all the languages in the world’ (বিশ্বের সমস্ত ভাষার মধ্যে সবথেকে মিষ্টি ভাষা) বলে গত বছর ঘোষণা করেছে! যে কোনো ভাষা বেঁচে থাকে তার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। শুনলে অবাক হবে যে সারা পৃথিবী তে প্রায় হাজার পাঁচেক ভাষা আছে। আগামী দশ বছরের মধ্যে প্রায় দু’হাজারের বেশি ভাষা শুধু ব্যবহারের অভাবে অবলুপ্ত হয়ে যাবে। মনে রেখো যে আমাদের দেশের মণীষীরা ইংরেজী তে দড় ছিলেন বটে, কিন্তু কোন অবস্থাতেই, বাংলা ভাষা, মাতৃভাষা কে অবজ্ঞা করে নয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত-র কথা তো তুমি জানই। ঈংরেজি ভাষার মোহে অন্ধ হয়ে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করলেন। চৌকস ছিলেন ইংরেজীতে। বহু ইংরেজ লেখকও তাঁর কাছে ম্লান। কিন্তু মাতৃভাষা নয় বলে যথেষ্ট মর্যাদা পেলেন না। নিজের ভুল বুঝতে পেরে লেখা শুরু করলেন মাতৃভাষা বাংলায়।তারপর তাঁকে আর আটকানো যায় নি।

যাই হোক, তুমি কিন্তু কখনই নিজের মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা কোরো না। কেউ হাসাহাসি করলে তাদেরকে বোঝাবে তুমি যে সারা পৃথিবীতে পাঁচ হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা কিন্তু মাত্র ছ’ নম্বরে, আর ইংরেজি কিন্তু তিন এ, প্রথমে নয়।ইংরেজি কিন্তু একটা বিশ্বব্যাপি ব্যবহৃত ভাষা বা Global Language হয়েও তিন নম্বরে আর বাংলা সেখানে একটা স্থানীয় ভাষা বা Local Language হওয়া সত্বেও মাত্র ছয় নম্বরে রয়েছে। বাঙ্গালী হিসেবে গর্ব হচ্ছে না তোমার? আমার ত’ হচ্ছে!

ঠিক এই রকম গর্ব আমার হয় বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার কথা ভাবলে। আওরঙ্গজেব তো ১৭০৭ সালে দেহ রাখলেন। মুঘাল সাম্রাজ্যের বাঁধন ভেঙ্গে পড়ল। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের সাথে হাত মিলিয়ে ভারতের নান প্রান্তে চুটিয়ে ব্যবসা করছে আর বাধা এলেই নানান ষড়যন্ত্র করে দখল নিচ্ছে সামন্ত রাজাদের। সৈন্য-সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে ছোটখাটো যুদ্ধও চালিয়েই যাচ্ছে।

তোমাকে তো আগেই বলেছি যে ইংরেজদের ঘাঁটি ছিল কলকাতায়। বাংলার নবাব তখন সিরাজদ্দৌলা। তিনি আবার ইংরেজ বণিকদের ঔদ্ধত্য আর স্বেচ্ছাচারিতা একদম পছন্দ করতেন না। ১৭৫৬ সালে ইংরেজদের শায়েস্তা করার জন্য সিরাজ বিশাল বাহিনী নিয়ে কলকাতা আক্রমণ করেন আর নিমেষে তার দখল নেন।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা
নবাব সিরাজদ্দৌলা

ইংরেজ বণিকদের সে দিনই শেষ দিন ছিল যদি না মীরজাফর থাকতেন।সিরাজের প্রধান সেনাপতি মিরজাফরই সেদিন ইংরেজ প্রধাণ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর অনুচরদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেন।শুরু হয় এক নতুন ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। লর্ড ক্লাইভ বোধ হয় নিজেও জানতেন না যে আগামী এক বছরের ষড়যন্ত্র সারা ভারতের ইতিহাস কে দু’শ বছরের জন্য বদলে দিতে চলেছে।

লর্ড ক্লাইভ
লর্ড ক্লাইভ

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ – ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় আমার। একটা আম বাগানে সামান্য একটা যুদ্ধ, যার নিয়তি নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ-এর অধীনে মাত্র হাজার তিনেক সৈন্য, যাদের মধ্যে আবার মাত্র আটশ’ জন হল ইউরোপীয়। আর লর্ড ক্লাইভ-এর সহযোগী এডমির‍্যাল ওয়াটসন। সিরাজের সৈন্য সে তুলনায় বিশালঃ শুধু ঘোড়সওয়ারই ছিল আঠারো হাজার, ছিল পঞ্চাশ হাজার পদাতিক। নবাব সিরাজের হারের কোন কারণই নেই; তিনি অতি বড় দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি যে এই যুদ্ধ তিনি হারতে পারেন।

কিন্তু সিরাজই হারবেন। ষড়যন্ত্র যে সে রকমই।ষড়যন্ত্রের প্রধাণ উদ্যোক্তা, সিরাজের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর নিজের দলে টেনেছেন জগত শেঠ আর উমীচাঁদ নামে প্রবল প্রতাপশালী দুই শ্রেষ্ঠী  কে। ইংরেজ বণিকরা আমাদের দেশের লোকের লোভকে ব্যবহার করে যে যুগান্তকারী পরাধীনতার ইতিহাসের ভূমিকা সুনিশ্চিত করেছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। তাই তো পলাশীর যুদ্ধের এত গুরুত্ব। এই যুদ্ধের ফলাফল বলতে গেলে আমার গলা বুজে আসে। পলাশীর আমবাগানে হয়েছিল এই যুদ্ধ। এখন সেখানে বেড়াতে গেলে পাবে শুধু একটা আমগাছ আর চাষের ক্ষেত। তার মাঝখানে অনেক খুঁজলে কোনোমতে একটা স্মৃতিফলক পাবে। ব্যাস।

পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লাইভ এবং মীরজাফর
পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লাইভ এবং মীরজাফর


কি হল তার পর?
সেটা বরং পরের সংখ্যায় বলব।ভাল থেকো কিন্তু।



আর্য চ্যাটার্জি
কলকাতা

ছবিঃ
ইন্টারনেট