খেলাঘরখেলাঘর

স্বাধীনতার গল্প

ওফ!পূজোয় কি আনন্দ! লেখাপড়ার বালাই নেই। টানা কত্তদিন ছুটি! তারপর আবার দুম করে স্কুল খুলে গেল। ব্যাস সব আনন্দের ইতি।আবার হাঁ করে সামনের বছরের দিকে চেয়ে বসে থাকে।


যাক গে! আসল গল্পে ফিরি, যদি মনটা একটু ভালো হয়।


১৭৭০ সালে কিন্তু বাংলার বুকে কোনো ভুমিকম্প হয় নি।বৃটিশ কোম্পানির তহশিলদাররা কোনোরকম বিচার না করেই কৃষকদের শেষ সম্বলটুকু খাজনার নামে কেড়ে নিতে লাগল। ইংরেজদের সাম্রাজ্য বিস্তারের অর্থ আর বিলেতে শিল্পের রসদ জোগাতে গিয়ে বাংলার কৃষক নিঃস্ব হল। বাংলার বুকে শস্যহানির জেরে দেখা দিল দুর্ভিক্ষ।বাংলার সন ১১৭৬ অনুসারে একে বলা হয় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। এই দুর্ভিক্ষে ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।ভাব তুমি, এই দুর্ভিক্ষ যে কোনো ভূমিকম্পের থেকেও ভয়ানক ছিল। আর বৃটিশরা ছিল পাথরের থেকেও হৃদয়হীন। যখন ১ কোটি মানুষ তাদের শোষণের জেরে প্রাণ হারাল, তখন বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস তাদের কোম্পানির মালিকের কাছে রিপোর্ট পাঠালেন যে, “দুর্ভিক্ষের ও মহামারীর জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হলেও রাজস্ব আদায়ে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি, বরং আগের চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে।“


কিন্ত এই মন্বন্ত্রও বাংলার মানুষের মনোবল ভেঙ্গে যায় নি; ইংরেজ অপশাসণ ও শোষণের বিরূদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছিল তারা অনেক আগে থেকেই।। তবে মন্বন্তরের সময় থেকেই তা বিদ্রোহের চেহারা নেয়।ইংরেজ-রা এর নাম দেয় সন্ন্যাসী বা ফকির বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের প্রথম সারির নেতারা হলেন  মজনু শাহ, দেবী চৌধুরানী, মতি গিরি, মুশা শাহ, পরাগল শাহ প্রমুখ।প্রধান নেতা মজনু শাহ তাঁর সংগঠন ক্ষমতা ও বীরত্বে ইংরেজের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ান। বিহার থেকে বাংলার পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত এই বিদ্রোহের আগুন সফল ভাবে ছড়িয়ে পড়ে, বিদ্রোহীদের প্রচারে ও সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রভাবে।


মুসলমান ফকির ও হিন্দু সন্ন্যাসীরা আলাদা সংগঠনের  অন্তর্ভুক্ত হলেও বিদ্রোহ পরিচালিত হত সঙ্ঘবদ্ধ ভাবেই। মজনু শাহ এক চিঠিতে রাণী ভাবানী-র কাছে প্রতিকারের দাবীতে সাহায্য প্রার্থনা করে লিখেছিলেন যে ইংরেজরা বিনা কারণে ১৫অ জন ফকিরকে হত্যা করেছে। এমনকি ইংরেজরা তাদের ধর্মস্থানে যেতে বাধা দেয়।


সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বিরূদ্ধেই জনবিদ্রোহ যা পরবর্তী শতাব্দীতে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের আন্দোলনের জন্ম দেয়। ইতিহাস সাক্ষী, সব জায়গায় স্থানীয় গরীব জনসাধারণ সন্ন্যাসী ও ফকিরদের সাহায্য  করেছে।১৭৬০-১৮০০ সাল পর্যন্ত এই বিদ্রোহের প্রসার।


পূর্ববংগ থেকে শুরু করে উত্তরবংগের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর এমনকি নেপালের সীমান্তবর্তী তরাই পর্যন্ত বাংলা আর বিহারের বিস্তৃত ভূখন্ড জুড়ে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহীরা গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে ইংরেজদের বিরূদ্ধে লড়াই করেছে।কোথাও কোথাও দূর্গ নির্মাণ করে, অস্ত্রসস্ত্র সংগ্রহ করে মুখোমুখি সংঘর্ষে অবতীর্ন হয়েছিল তারা।ঢাকা ও গোয়ালন্দে বজরা, ছিপ ও নৌকাতে জলযুদ্ধের মহড়া নিয়েছে তারা। দিনাজপুরের বালুরঘাটে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে ইংরেজবাহিনী পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়। রংপুরের যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি এডওয়ার্ড নিহত হন ও তাঁর বাহিনী পরাজিত হয়। গেরিলা যুদ্ধের সাহায্যে প্রথমে পিছিয়ে এলেও পরে দ্বিগুন শক্তিতে অতর্কিতে শত্রুর ওপর আক্রমণ চালিয়ে তারা বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে বহুবার। মজনু শাহের অনুগামীরা  ঘাঁটি কলকাতার ইংরেজদের কুঠি অভিযানের প্রস্তাব দেন। মজনু শাহ অবশ্য তা চান নি।তিনি ইংরেজদের শক্তিক্ষয় ও বিব্রত করে চূড়ান্ত আক্রমনের পক্ষপাতি ছিলেন।
কলকাতা আক্রান্ত হতে পারে এই ভয়ে ইংরেজরা বিরাট প্রস্তুতি নেয়। যশো্রের কাছে মোগলহাট নামে এক জায়গায় বিদ্রোহীরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, তখনই অতর্কিতে ইংরেজ সেনাপতি লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বে এক সুসজ্জিত বিশাল বাহিনী শেষরাত্রে আক্রমণ চালায়। মোগলহাটের যুদ্ধেই বিদ্রোহীদের চরম পর্যুদস্ত করে ইংরেজরা। এতে তাদের মনোবল বেশ আহত হয়।দুই ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহী নেতা নুরুল মহম্মদ ও পীতাম্বর এই যুদ্ধে নিহত হন। এরপর মজনু শাহ ইংরেজদের সাথে পর পর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাংলা ছেড়ে বিহারে আশ্রয় নেন।বিদ্রোহীদের সংগঠন অ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।


পলাশীর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য চল্লিশ বছর ব্যাপী সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ সফল হয় নি বটে, কিন্তু এটাই ছিল ইংরেজদের বিরূদ্ধে গণ আন্দোলনের প্রথম সোপান। ইতিহাসের তাই এই সাহস নেই যে এই বিদ্রোহ কে শুধুমাত্র একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাবে।

 

আর্য চ্যাটার্জি
কলকাতা