ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
প্রকৃতির যাদুঘরে কয়েকদিন: পর্ব ০১

"আমি শুনতে পাচ্ছি তোমরা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন নিয়ে অনেক কথা বলছ, তাহলে আমার দিকে তাকাও, আমিই গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন"। ১৯৭১ সালে আমেরিকান সরকার যখন হাভাসুপাই (Native American Havasupai tribe) আদিবাসীদের ভূমির একটা বড় অংশ ন্যাশানাল পার্কের অন্তর্ভূক্ত করতে চেয়েছিল, সেই সময় তাদের নেতা এই অসামান্য কথাটি বলেছিলেন।। প্রথম গ্রান্ড ক্যানিয়ন যাই ২০১১ সালে, তখন সেখানের মিউজিয়াম স্টোরে বই নাড়াচাড়া করার সময় এই উক্তিটি পড়েছিলাম, সে যাবৎ যতবার এই অতুলনীয় ভূমিতে এসে দাঁড়িয়েছি সেই বলিষ্ঠ স্বরের অনুরণন হয়েছে আমার কানে । তীব্র লাল, কমলা, কোমল গোলাপি, মরচে, বাদামি , মেঘ কালো, সব রঙের বিচিত্র মিলমিশ পাথরের ক্যানভাসে, ক্যানিয়নময় এই ভূমি যেন হাভাসুপাই নেতার মত বলে চলেছে , তোমরা কারা ?তোমরা এ ভূমির কী জান? সত্যিই এ যেন পৃথিবীর মধ্যে অন্য কোন গ্রহ, অথবা আমি ও আমরা এখানে ভীনগ্রহী। যাদের ত্বকে এই মাটির রঙের ছোঁয়া, যাদের চওড়া নাক, চোয়াল, চিবুক পাথুরে ভূমির মত দৃঢ় তাদেরই যেন মানায় এই অদ্ভূত আশ্চর্য ভূমিতে।

এবারের বসন্তের ছুটিতে হঠাৎ সুযোগ এল আর একবার ' ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট(Wild Wild West)' যাওয়ার, এই নিয়ে চতুর্থ বার। বারবার যাই ,প্রতিবার বাকি রেখে আসি এমন কিছু আশ্চর্য সুন্দর জায়গা যে নিজেরা বলাবলি করি "এ মা এটা তো জানা ছিল না, আবার কি আসতে পারব ?" পূর্ব পাড়ে বাসা বাঁধার পর আশা করিনি আর মধ্য পশ্চিমে বেড়াতে যেতে পারব, ফ্লোরিডার টাম্পা থেকে আমি আর আমার আট বছরের ছেলে নিমো রওনা দিলাম সান ফ্র্যান্সিস্কো , নিমোর বাবার প্রজেক্ট বর্তমানে সিলিকন ভ্যালিতে, এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। আমাদের বেড়ানো সবসময় পরিকল্পনাহীন, এ বারও ব্যাতিক্রম নয়, শুধু ঠিক ছিল 'ঊটাহ্‌' রাজ্যের ' মাইটি ফাইভ ন্যাশ্‌নাল পার্ক্‌স্‌ (Mighty Five National Parks)' যেটুকু সম্ভব হয় দেখব, আর আগের ট্যুরগুলোয় বাদ যাওয়া ক্যালিফর্নিয়ার 'ডেথ ভ্যালি'। শাশ্বতর প্ল্যান অনুযায়ী শুরু করব ডেথ ভ্যালি দিয়ে, তারপর 'জায়ন ন্যাশান্যাল পার্ক' হয়ে 'ব্রাইস ক্যানিয়ন', বাকি প্ল্যান সুবিধা বুঝে হবে। তারপর পাগলের মত দিবারাত্র ড্রাইভ করে, আধপেটা খেয়ে, মধ্যরাতে কাকস্নান সেরে, অতিরিক্ত শুকনো আবহাওয়ায় গায়ের চামড়া ফাটিয়ে , নাকে রক্ত ঝড়িয়ে, মস্তিষ্ক ও ফোনের মেমারী ভর্তি তো হল, কিন্তু এবারে তা লেখে কে? বন্ধুরা , ভাই বোনেরা, মা মাসীরা ,সক্কলে বললে- আহা , এমন সব ছবি, ট্র্যাভেল স্টোরি একটা লিখে ফেলা উচিত। মুশকিল হল, হাজার হাজার বর্গমাইল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির আশ্চর্য সব মণিমুক্তো মাথার মধ্যে দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়, ভ্রমণ নথিবদ্ধ করতে বসে কোথায় যে শুরু কোথায় যে শেষ তাই ঘেঁটে যায় ।

অন্তহীন 'মৃত্যু উপত্যকা' Dantes Peak থেকে
অন্তহীন 'মৃত্যু উপত্যকা', 'দান্তেস পিক' থেকে

বহু প্রতিক্ষিত বৃষ্টি নেমেছে ক্যালিফর্নিয়ায়, দাবানলে জ্বলে যাচ্ছিল সব, বিকেল নাগাদ যাত্রা শুরু করলাম ১৫২ পূর্ব (152 East )রাস্তায় সিয়েরা পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে, সবুজ গড়ানো পাহাড় , ফসল ভর্তি মাঠ, আর কিছু চেরি ফুলের গাছে বেশ সজল শ্যামল উপত্যাকা, রাতে পৌঁছলাম তেহাছাপি নামে বেশ বড় একটা শহরে। আমি কোনকালে নামই শুনিনি এর, চারদিক সবুজ পাহাড়ে ঘেরা, পাহাড়গুলোর মাথায় সাদা বরফ, অপূর্ব শহরটি সকালের আলোয় ঝলমল করছিল , দেখলাম ডেথ ভ্যালির ঊদ্দেশ্যে বেরোনোর সময়। সেদিন ১২ই মার্চ আমাদের প্রকৃত যাত্রা শুরু। একটু পড়েই প্রকৃতির রূপ বদল, মোহাভে(Mojave) মরুপ্রান্তর শুরু, এরই উত্তর অংশ ' ডেথ ভ্যালী ন্যাশান্যাল পার্ক'। আলাস্কার অতিকায় ন্যাশান্যাল পার্কদের বাদ দিলে এদেশের মূল ভূখন্ডের সবচেয়ে বড় পার্ক, পাঁচ হাজার বর্গমাইলের থেকেও বেশী ভূখন্ড নিয়ে তৈরী, যার নব্বই শতাংশ ই পর্যটকদের অধরা থেকে যায়, সে সব অংশ অতি সতর্কভাবে রক্ষা করা হয় ' ডেজার্ট ওয়াইল্ডারনেস (Desert Wilderness)' হিসাবে। এ মহাদেশের সবথেকে তপ্ত, শুষ্ক, সর্বনিম্ন জাতীয় উদ্যান। যেহেতু ডেথ ভ্যালি নিয়ে একটা সম্পূর্ন ভ্রমণ লেখা যায় তাই খুব সামান্য কিছু কথা এই লেখাতে দেব।

সারাদিন অনেক কিছু দেখলেও বলব শুধু ' আর্টিস্ট'স্‌ প্যালেট (Artist's palate)' -এর কথা, সেটা দেখার মত জিনিসই বটে, তুলনাহীন। ব্যাড ওয়াটার (Bad Water) বেসিনের পথেই পড়বে আর্টিস্ট্‌'স্‌ ড্রাইভ; বেসিন-এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮২ ফুট নীচে , সাদা নুন ক্রিস্টাল জ্যামিতিক প্যাটার্নে পুরো বেসিন জুড়ে, নীচে চটচটে কাদা। 'শিল্পীর পথ' - আহা কি মধুর নাম! 'বাজে জল', 'শয়তানের গলফ্ ময়দান', 'মৃত মানুষের পথ', 'শয়তানের ভুট্টাক্ষেত' ইত্যাদি নাম ছড়িয়ে আছে গোটা ডেথ ভ্যালি জুড়ে সেসব শোনার পর একটু বেশীই মিঠে।

'আর্টিস্ট'স্‌ প্যালেট'
'আর্টিস্ট'স্‌ প্যালেট'

বিকেলের দিকটায় ঢুকলাম সেই নয় মাইল একমুখী রাস্তায়, একটু যেতেই সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে, লোকে চলেছে একটা টিলার ওপরে , আমরাও হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে উঠলাম এই ভেবে যে সেটাই 'আর্টিস্ট'স্‌ প্যালেট', বেশ কিছু সময় দাঁড়িয়ে দেখলাম কিছু রঙীন পাহাড়, সন্দেহ হল রং যেন ঠিক ততটা নয় যতটা ভেবেছিলাম বা ছবিতে দেখে এসেছিলাম, ঠিক তাই, আসল 'আর্টিস্ট'স্‌ প্যালেট' ঐ পথে আরও কিছুটা গেলে, ততক্ষণে সূর্য পাটে যেতে বসেছে, সময় নষ্ট করে ফেলেছি। সবুজ , গোলাপী , বেগুনী, হলদেটে পাহাড় সূর্যাস্তের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে ছুট্টে গেলাম, নাতিউচ্চ টিলার দিকে, সর্বনাশ, টিলা ও সমতল জমির মাঝখানে শুকনো নদীর খাদ, যা মোটেই দেখা যাচ্ছিল না, খাদটায় নেমে পেড়িয়ে টিলায় টিলায় হাইকিং করলে তবেই তুমি ছুঁতে পারবে শিল্পীর প্যালেট । পাহাড় না বলে টিলা বলাই ভালো , আসলে আগ্নেয় পাললিক টিলা বা 'volcanic sedimentary hills'। রঙ তৈরী হয়েছে বিভিন্ন মেটাল অক্সিডেশনের ফলে, যেমন- ম্যাগনেশিয়াম , টাইটানিয়াম , অ্যালুমিনিয়াম ,আয়রন বা লোহা ইত্যাদি। কপার বা তামা নেই বিশেষভাবে বলা আছে দেখলাম, কারণ রঙ দেখে কপারের কথা প্রথম মনে আসবে সকলের। এই রঙের পরিবর্তন হয় সময়ের সাথে,বৃষ্টির সাথে, এবারে যেমন দেখছি পরে এলে তেমন নাও দেখতে পারি।

উপরের কালো স্তরের নীচে গোলাপী খনিজ গুঁড়ো
উপরের কালো স্তরের নীচে গোলাপী খনিজ গুঁড়ো

টিলা নরম কাদামাটির মত, উপরের কালো মোটা কাদা শুকিয়ে ফাটা ফাটা হয়ে আছে, তার নীচে রঙিন গুঁড়ো খনিজ । ছবিতে আশাকরি ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

ডেসার্ট গোল্ড
ডেসার্ট গোল্ড

যেতে যেতে আর দুটো কথা, ২০১৫ র অক্টোবরে ভয়ানক বন্যায় ডেথ ভ্যালি ভেসে যায়, তাই আমরা যতোটা মৃত রুক্ষ তাকে ভেবেছিলাম ততটা দেখিনি, রাস্তার দু'ধারে দিগন্তছোঁয়া মাঠে ফুটেছিল 'ডেসার্ট গোল্ড' ফুল, বারো বছর পরে ফুটেছে তারা। 'সল্ট ক্রিক' এর ছোট্ট নোনা জলের নদীতে খেলে বেড়াচ্ছিল ক্ষুদে পাপ ফিস। ছিল অসংখ্য পাখিও।

জাব্রিস্কি পয়েন্ট
জাব্রিস্কি পয়েন্ট

ছোটোদের জন্যে জাব্রিস্কি পয়েন্ট খুব মজার, ডোরাকাটা জামার প্রিন্টের মত পাহাড়, পয়েন্ট থেকে নেমে 'গাওয়ার গালচ' এর কিছু টিলা দেখলে মনে হবে ডাইনোসররা শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, পিঠ ও পায়ের অংশগুলো দৃশ্যমান। যদি 'Star Wars, Episode 4' দেখে থাক তাহলে এই জায়গার একটা ধারনা পাবে, R2-D2 আর C3PO যেখানে 'জাবা' র হাতে বন্দী হয় সেই দৃশ্যে। কিন্তু এবারে আমাকে পালাতে হবে ডেথ ভ্যালি ছেড়ে, এত কথা বলার আছে যে শুধু এই পার্কটা নিয়েই পুরো কাহিনী ফুরোবে, যেটা আমার ঊদ্দেশ্য নয়।

লাস ভেগাস শহর থেকে একটু উত্তরে রাত্রিবাস স্থির হল, কারণ সিন সিটি বাচ্চাদের জন্যে বিগ নো নো, ভেগাস আগে দুবার এসেছিলাম,সেও ক্যানিয়ন অঞ্চলের কারণে ,শহর আমাদের টানেনা। সকাল সকাল বেরোনো, আজ গন্তব্য ' জায়ন ন্যাশ্‌নাল পার্ক (Zion National park)'। বেরোনোর মুখে দেখা এক স্বজাতির সাথে, ভদ্রলোক এ অঞ্চলে প্রথম, যাবেন অবশ্যই গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, আমরা জায়ন যাব শুনে জানতে চাইলেন সেটা কোথায়? আমরাও প্রথম যখন এসেছি এইভাবেই জেনেছি পথের সাথীদের থেকে, ভূগোল বই বলেছিল কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এক বিস্ময়, ব্যস আর কিছু জানতাম না, এ ভূমি যে ক্যানিয়নময়, এর বিস্ময় যে অন্তহীন, এবং এত তথ্যে ভরা ইন্টারনেটের যুগেও যে তুমি জানতেও পারবে না কোথায় কোন অপরূপ লুকিয়ে আছে, তা বহুবার আগমন অভিজ্ঞতায় জেনেছি।

জায়ন দেখলে আমার 'মহাকালের মন্দির' কথাটা মনে পরে , টেরাকোটা রঙের পাহাড়, সাদা চওড়া মাথা, উওর ভারতের হিন্দু মন্দির আকৃতির সারি সারি শৃঙ্গ, তীব্র লাল ছাড়াও সাদা, গোলাপী, কমলা রং বিভিন্ন স্তরে, সাদার আবার কত রকমফের। আবার সময়ের অর্থেও মহাকাল কথাটা খাটে, এখানের সব শৃঙ্গ তাদের বিভিন্ন রঙের পাথরের স্তরে ধরে রেখেছে পৃথিবীর আদিম সময়কে। ভার্জিন নদী এই পার্কের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে, শীতকালে পান্না সবুজ জলে বেশ শান্ত মেয়েটি, ইনি ফ্ল্যাশ ফ্লাড (বাংলায় বোধহয় হড়কা বান বলে) এর জন্যে বিখ্যাত, বহু দূর্ঘটনার ইতিহাস এনার তীরে তীরে।

জায়নের মনোহরন  শৃঙ্গরা
জায়নের মনোহরন শৃঙ্গরা

আমার ছেলে ডাইনোসরের ডিম দেখবে, ডাইনোসর নিয়ে সবকিছু গুলে খেয়েছে সে । আর তার মাথা খেয়েছে 'মাইনক্র্যাফট গেম' তাই রক ও মিনারেল স্টোরগুলোতেও তার অসীম কৌতুহল । গতবার বেশ ভালো দোকান দেখেছিলাম এসবের, তার মনে নেই, তাই বলেছিলাম "এবার দেখাব তোকে"। দেখালাম ডাইনোসর ডিম, ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার দাম, হাতে নেড়েচেড়ে রেখে দাও বাবা, কেনার ক্ষমতা হবে না ইহজন্মে। কিছু পাথর ও কৃস্টাল ইত্যদি কেনা হল পকেটের অবস্থা বুঝে।

জায়ন ক্যানিয়ন সিনিক ড্রাইভ শুধুমাত্র পার্কের বাসেই ঘুরে দেখা সম্ভব, কোনো নিজস্ব যান প্রবেশ নিষেধ। বাসের মাথা কাঁচে ঢাকা, সেই পথে দেখা যাবে অতিকায় গাঢ় লাল পাথরের প্রাচীর ঘাড়ে এসে পড়ব পড়ব করছে। পাশে ভার্জিন নদী পুরো পথ তোমার সঙ্গী থাকবে তার টুং টাং জলতরঙ্গ সাথে । এই পথের শেষে নদীর অতি সংকীর্ণ প্রবেশপথ এই জায়নে, ইংলিশে 'slot canyon' বলা হয়। সেখানে পৌঁছনোর আগে নামলাম ' এমেরাল্ড পুল (Emerald pool)' স্টপে, আধ ঘন্টার ছোট্ট ট্রেক, কিছু ঝরনা উঁচু পাহাড় থেকে নদীতে ঝরে পড়ছে, চাইলে স্নান করা যায়, কিন্তু ভেজা গায়ে বাসে ওঠে যাবেনা, আর কালটা এখানে এখনো শীত। এখানে চারপাশের নানা রঙের পাহাড় খুব স্পষ্ট দেখা যায় , বেশীর ভাগ শৃঙ্গর উপরের অংশ উজ্বল হলদেটে সাদা, দুপুরের রোদে সোনার বরণ, নিম্নভাগ ক্রমশ গাঢ়, কমলা থেকে মরচে, নীচের দিকে গাছপালার সবুজ আস্তরন। সাদাটে উপরিভাগকে বলে নাভাহো স্যান্ডস্টোন।

প্রাগৈতিহাসিক ল্যান্ডস্কেপ
প্রাগৈতিহাসিক ল্যান্ডস্কেপ

পথে পড়বে একই রকমের তিনটি শৃঙ্গ পরপর যাদের নাম ওল্ড টেস্টামেন্টের বৃদ্ধ পিতামহদের নামে আব্রাহাম, ইশাক ও জেকব, বাস থেকেই তেনাদের স্যালুট জানালাম, সব জায়গায় নামা সম্ভব নয়। বিখ্যাত এঞ্জেলস্ ল্যান্ডিং এর পাঁচ মাইল ট্রেক এবারে অধরাই থাকলো।

উইপিং রক
উইপিং রক

আমরা পৌঁছলাম 'উইপিং রক (weeping rock)', বাস থেকে নেমে হাঁটা, কিছুটা এগোলে ক্যানিয়ন এর প্রাচীর ঝুল বারান্দার ডোমের মত এগোনো, চারপাশ থেকে ঘিরে রয়েছে লাল কালো দেওয়াল, কতকটা মাংসপেশীর রং, এখানে রোদ প্রায় ঢোকেই না, বেশ একটা আদিম শিহরণ স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে, যেন এক্ষুনি ঐ দৈত্যাকার লাল পাহাড়ের সামনে গগনভেদী চিৎকার করে উঠবে প্রাগৈতিহাসিক টাইরানোসর। মাথায় ঝরে পড়ছে টুপ টাপ জল, কেঁদে চলেছে পাথর বছরভর, আর সেই কান্নার জলে ভিজে তৈরী হয়েছে ঝুলন্ত উদ্যান--মস্, ফার্ণ, কলাম্বাইন জাতীয় (columbine) অপূর্ব ফুলগাছ এবং আরও কত মনোহরণ গাছপালা আমার বোটানী জ্ঞানের নাগালের বাইরে বিরাজমান।

টেম্পল অফ সিনাওয়াভা
টেম্পল অফ সিনাওয়াভা, ভার্জিন নদীর সংকীর্ণ প্রবেশপথ

এই পথের শেষ বাসস্টপ ' টেম্পল অফ সিনাওয়াভা (Temple of Sinawava)' , এখানে নদীর খাতের মধ্যে (river bed ) একটা নাতিউচ্চ কালচে লাল গম্বুজ মত, যেটা দেখে আমার মানুষের মুখের মত লেগেছিল, চওড়া নাক চওড়া কপাল দুটো নেটিভ আমেরিকান মুখ, দুজন ঠিক বিপরীত দিকে তাকিয়ে , এটা হয়ত শুধু আমার কল্পনা, যাহোক ' সিনাওয়াভা (Sinawava)' এই অঞ্চলের নেটিভ আমেরিকান 'নেকড়ে দেবতা (wolf god)' এর নাম। এইখানে ট্রেক করে যেতে হবে মাইলটাক । ৩০০০ ফুট উঁচু পাহাড় প্রাচীর ঘিরে রয়েছে তিনদিক, একটা ফাটলের মত ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে ভার্জিন নদী, সেই সংকীর্ন খাতের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে নামতে হবে জলে কোথাও হাঁটু তো কোথাও বুকজল । চারপাশের প্রাচীর আরও চেপে ঘিরে ধরবে তোমাকে, দমবন্ধ করবার ইচ্ছে যেন। ফ্ল্যাশ ফ্লাডের উপযুক্ত পরিবেশ, এই বন্যা খটখটে শুকনো দিনেও হতে পারে, হয়তো উঁচুভূমির কোথাও বৃষ্টি হয়েছে জল ঢুকবে হুড়মুড়িয়ে চোখের পলকে, মনুষ্য শরীর তার কাছে খড়কুটো। তাই সতর্কতা থাকলে এখানে আসা যায় না।

চেকারবোর্ড মেসা
চেকারবোর্ড মেসা

এরপর একই পথে বাস ধরে ক্যানিয়ন জাংশনে ফিরে নিজেদের গাড়িতে চেপে বসা, যাব ব্রাইস ক্যানিয়ন ন্যাশান্যাল পার্ক। বিগহর্ন শিপের দল বাই বাই করল অদ্ভুত আকৃতির টিলা থেকে, খাদের ধারে লম্বা লাইন পড়ল গাড়ির, তাদের ক্যামেরাবন্দী করতে। জায়নের শেষ ল্যান্ডমার্ক চেকারবোর্ড মেসা দেখে আমার কলাইডালের বড়ির কথা মনে পরল, ঢিপির দুপুরের রঙ সাদা, বেশ মাপ করে দড়ি ধরে দাগ কাটা যেন গোটা গায়ে, মজার আকৃতি।

ব্রাইস ক্যানিয়ন পড়ন্ত বেলায়
ব্রাইস ক্যানিয়ন পড়ন্ত বেলায়

ফ্লোরিডা থেকে বসন্তের ছুটিতে আসার ফলে আমরা বারবার ভুলে যাচ্ছিলাম এখানে এখনো শীতকাল, নেট ঘেঁটে দেখেছি এখনও খোলেনি গ্রান্ড ক্যানিয়ন নর্থ রিম। ব্রাইস এর ভিজিটর সেন্টার সন্ধের অনেক আগে বন্ধ, পার্কের ফ্রী বাস ট্যুরও চালু হয়নি। ব্রাইস (Bryce) ক্যানিয়নের উচ্চতা ৮০০০ থেকে ৯০০০ ফুট। আমরা যতক্ষনে ব্রাইস পৌছলাম সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, প্রবেশপথ রেড রক্ ক্যানিয়ন বেশ একটা সুস্বাগতম তোরণ সৃষ্টি করেছে, টুকটুকে না হলেও বড্ড লাল, পড়ন্ত আলোয় অপরূপ, যেন এরপর কী দেখব তার একটা ঝলক দেখাচ্ছে।

পাইন জঙ্গলের মধ্যে পার্কিং, গাড়ি রেখে একরকম দৌড় লাগালাম আমরা সূর্যাস্ত দেখার জায়গায়, ঠাণ্ডা মালুম হল খাদের ধারে পৌঁছে। কিন্তু সামনে যা দৃশ্য ঠান্ডা ভুলে গেলাম মুহূর্তে, যেন কল্পকাহিনির নগর 'এল ডোরাডো' আমাদের সামনে উদ্ভাসিত । আশেপাশে দুচারজন দর্শনার্থী, সন্ধ্যের ঘনায়মান অন্ধকারে সবাই নিশ্চুপ, শুধু হাওয়ার হু হু শব্দ, দুচারটে ঘরে ফেরা পাখির শিস্, নীচের খাদে অর্ধচন্দ্রাকারে ছড়ানো অসংখ্য গম্বুজ , মিনার, হাতুরি ইত্যাদি নানা আকারের হুডু( Hoodo), সব যেন সোনার তৈরী। দূরে অনেক উঁচু এক টেবিল পাহাড়, অদ্ভূত গোলাপী তার উপরের স্তর- আরে এই পাহাড়টাকে তো আগেও দেখেছি, গতবার ‘পেজ’ (Page)শহর ছাড়ার সময় এস্ক্যালান্তের (Escalante) মধ্যে দিয়ে একটা ছোট্ট রাস্তা নিয়েছিলাম তখনো বহু দূর থেকে একে দেখেছি। আমার ধারনা ওটা নাভাহো ট্রাইব দের পবিত্র চারটি পাহাড়ের একটা। পরের দিনই সে ভুল ভাঙল, কিভাবে সে প্রসঙ্গে পরে আসব।

মাঝবেলায় ব্রাইস ক্যানিয়ন
ব্রাইস ক্যানিয়ন পড়ন্ত বেলায়

'দিবসের শেষ আলোক' বহুক্ষণ লেগে রইল সেই গোলাপি পাহাড়ে, ব্রাইসের অ্যাম্ফিথিয়েটারে তখন নিস্তব্ধতা ও অন্ধকার। একটা নীল পাখি আমাদের কাছের প্যান্ডোরোসা পাইনে এসে বাসায় ঢোকার আগে শিশ্ দিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে যেন বলল "বাড়ি যাও রাত হয়েছে"। আমরা যাব রিচফিল্ড বলে একটা শহরে ,অনেকটা উত্তরে ব্রাইস থেকে, পথে গাড়ির সংখ্যা খুবই কম, হেডলাইট ছাড়া কোনো আলো নেই রাস্তায়, মনুষ্য বসতির চিহ্নও প্রায় নেই, কারন আলো দেখিনি, পরে ম্যাপ দেখে বুঝেছিলাম রাস্তাটা 'ডিক্সি ন্যাশ্‌নাল ফরেস্ট( Dixie National Forest)'- এর মধ্যে দিয়ে। যখন রিচফিল্ড এল রাত প্রায় আটটা, শহর মাপে তো খুব ছোটো নয়, এমন ভূতের বাসার মত নিঃস্তব্ধ কেন ? শাশ্বত বলল ‘এরা যে সব ঘুমিয়ে পরেছে, খাবার জুটবে কোথায়?’ হায় ফ্লোরিডাবাসী! শীতকাল এখনও বিরাজমান এদেশে । শুকনো খাবার যা সঙ্গে আছে তাতে পুরো ট্যুর চলবে কিন্তু সেগুলো ডেথ ভ্যালি থেকে গিলতে গিলতে এখন দেখলে কান্না পাচ্ছে। বারপাঁচেক এ রাস্তা সে রাস্তা করে তিনটে বার্গার জুটলো কোনোমতে।

(পরের পর্বে সমাপ্য)


ছবিঃ লেখক

লেখক পরিচিতি

রুপসা মন্ডল দাশগুপ্ত

বহরমপুর মুরশিদাবাদে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, প্রথম দিকের পড়াশোনা বিঞ্জান নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে তুলনামূলক সাহিত্যে বিষয় বদল শুধু ভালবাসা থেকে। বর্তমানে আমেরিকার বস্টন শহরে বসবাস। কবিতা আবৃত্তি , লেখা আর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ানো শখ ।
এসে গেল ইচ্ছামতীর শারদসম্ভার ২০১৭
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা