ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
লেখা শেখা

সে এক অন্য সময়। মানুষ তখন সবে বিভিন্ন বস্তুর লেনদেন করতে শিখেছে। মানে ব্যবসা বাণিজ্যের একেবারে গোড়ার সময় আর কি। লেনদেন করতে গেলে তো একটা স্বীকৃত মাপ বা ওজনের প্রয়োজন। দরকার পরিষ্কার হিসেব রাখার। সে হিসেব শুধু নিজের জন্য রাখলেই চলবে না, হিসেব রাখতে হবে অন্যদের কাছে এমনকি ভবিষ্যত লেনদেনকারীদের কাছেও পরিষ্কার থাকার জন্য। তাই মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য যে কথা আমরা বলি প্রয়োজন হল তাকে একটি স্থায়ী রূপ দেওয়ার। প্রয়োজন হল লেখার।

তুমি জানলে অবাক হবে জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে কথা বলতে শিখলেও মানুষ লিখতে শিখেছে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগে। আদিমতম লেখা হল ছবি আঁকা। ধর আমার সামনে একটি কুকুর আছে। যদি আমি আর একজনকে সেটি বোঝাতে চাই,আমি তাহলে কি করবো? আমি কুকুরটির মোটামুটি একটা ছবি আঁকবো। তারপর আস্তে আস্তে বহুলোক একই ভাবে যখন কুকুরের ছবি এঁকে কুকুরকে বোঝাতে চাইবে তখন দরকার হবে আর একটু সহজ পদ্ধতির। নইলে প্রতিবার একটা কুকুর বোঝাতে চার পা লেজ মাথা সহ গোটা সারমেয় আঁকতে গেলে তো হয়েই গেল। তাই তখন তারা করল কি, আরও সংক্ষেপে কোন একটিমাত্র বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে কুকুরকে বোঝা্তে লাগল। তখন হয়ত কুকুরের লেজ এঁকে তারা কুকুরকে বোঝাল। আর সমাজের বাকি সবাই ওই বিশেষ লেজ চিহ্নটি দেখেই বুঝতে পারল যে ওটির অর্থ কুকুর।

লেখা শেখা
কীলক লিপি

ঠিক এভাবেই সৃষ্টি হল প্রাচীনতম লিপির। যার নাম চিত্র লিপি(Pictographic Script)। প্রাচীনতম এই লিপির নমুনা আমরা পাই সুমেরে। প্রাচীন সুমেরের মানুষ মন্দিরের হিসাবপত্র ঠিক রাখার জন্য নরম কাদামাটির চাকতি বা খণ্ডের ওপরে ধারালো করে কাটা নলখাগড়া দিয়ে লিখত। লেখা গুলো দেখতে কেমন হত বল তো? অনেকটা খুন্তি বা গোঁজের মত। তাই ঐতিহাসিকেরা এই লিপির নাম দিলেন কীলক লিপি। ইংরাজীতে কিউনিফর্ম(Cuniform)।

কিন্তু চিত্র লিপি দিয়ে লিখে বোঝাতে গিয়ে সুমেরের মানুষ দেখল যে সবকিছু চিত্র লিপি দিয়ে বোঝানো যাচ্ছে না। যেমন এক হাঁড়ি গম আছে, এটা বোঝাতে শুধু হাঁড়ি আঁকলে চলছে না, আবার যেখানে পাঁচ-সাতটা হাঁড়িতে গম, যব ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিস আছে সেখানেও শুধু পাঁচ সাতটা হাঁড়ি এঁকে কিছুই বোঝানো গেল না। তখন তারা কি করল? তারা হাঁড়িগুলোর গায়ে দাগ দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করল যে এক দাগওয়ালা হাঁড়িতে গম আছে, দু দাগওয়ালা হাঁড়িতে যব আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এর পর থেকে এক দাগওয়ালা হাঁড়ি দেখলেই সবাই বুঝে নিত তাতে গম আছে, দু দাগওয়ালা হাঁড়ি দেখলে বুঝত তাতে যব আছে। এইভাবে আস্তে আস্তে কীলক লিপি যা চোখে দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র তাই নয়, যা দেখা যাচ্ছে না সেই ভাবকেও বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগল। আস্তে আস্তে লিপি এগিয়ে চলল ছবি থেকে চিহ্নের দিকে।

চিত্র লিপি এবং তার পরে ভাব বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত চিহ্ন লিপিতে(Symbol Script) কিন্তু তখনো পর্যন্ত কথা বা ধ্বনি যুক্ত হয়নি। ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। ধরো বাংলাভাষায় 'কলম' এই শব্দটা লিখতে আমরা 'ক', 'ল', 'ম' এই তিনটে বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। এখন মজার কথা হল এই যে এদের কাউকেই কলম বা পেনের মতো দেখতে নয়। এরা হচ্ছে কলম শব্দটাকে আমরা যেভাবে উচ্চারণ করি সেই বিশেষ ভঙ্গিমার একটা লিখিত রূপ। এই যে সরাসরি কোন বস্তুর ছবি না এঁকেও তাকে তার উচ্চারণের সাপেক্ষে চিহ্নিত করাটাই হল মানুষের লেখার ইতিহাসের পরবর্তী ধাপ। এই ধাপে মানুষ চেষ্টা করল একটি ছবি বা ভাব দিয়ে একটি ধ্বনিকে বোঝাবার। যেমন সুমেরিয় ভাষায় একটি মানুষের মাথার ছবি একদিকে মানুষের মাথাকে বোঝাল আর একদিকে বোঝাল তার মৌখিক প্রতিশব্দ ‘কা’ এই ধ্বনিটিকেও। অর্থাৎ মানুষের সমাজে এল ধ্বনি লিপি (Phonetic Script)।

লেখা শেখা
রোসেটা দুর্গে পাওয়া পাথর

১৭৯৯ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসী সম্রাট (যদিও তখন তিনি সম্রাট হননি) নেপোলিয়ন মিশর আক্রমণ করেন। সেই সময় একজন মিশরীয় সৈনিক মিশরের রোজেটা দুর্গে একটি লিপিযুক্ত পাথর খুঁজে পান। এই পাথরটিতে প্রাচীন মিশরীয়, মধ্য যুগের মিশরীয় এবং গ্রীক - এই তিনটি ভাষার নমুনা ছিল। মিশরীয়রা তাদের প্রাচীন লিপিকে কি বলত জান? বলত 'দেব ভাষা'। তাই থেকে পরের যুগে গ্রীকরা এর নাম দিয়েছিল 'পবিত্র ভাষা' বা হায়ারোগ্লিফিক (Hieroglyphic)। এই প্রাচীন মিশরীয় লিপিতে দেখা যায় ভাব এবং ধ্বনি এই দুটোই এক-একটা চিহ্নে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

লেখা শেখা
প্রাচীন মিশরীয় লিপি

লেখাকে আরও সহজ করে আজকের বর্ণমালার আদি রূপ মানুষ তৈরী করতে পারল লেখা শেখার প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পর। এই সময় সিরিয়া, ক্রীট, প্যালেস্তাইন, সিনাই এইসব অঞ্চলে যে বর্ণমালার ব্যবহার হয়েছিল সেই আদি সেমেটিক(Proto-Semitic) বর্ণমালা থেকেই পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে সমস্ত আধুনিক বর্ণমালা তৈরী হয়েছে। আজকের পৃথিবীর সব জায়গাতেই কি লেখার জন্য বর্ণ লিপির ব্যবহার হয়? উত্তর হল না। এখনও পৃথিবীর অনেক জায়গায় চিহ্ন লিপির ব্যবহার দেখা যায়। উদাহরণ হিসাবে আমরা বলতে পারি চীন দেশের লিপির কথা। সেখানে লেখা চিত্র লিপি থেকে চিহ্ন লিপি পর্যন্ত এগিয়ে আর এগোয়নি। তাই আজও চীন দেশের লিখিত ভাষায় অনেক অনেক চিহ্নের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।

সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন ছোট বড় প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ চিহ্ন, বর্ণ, শব্দের লিখিত রূপ বিভিন্ন লিপির সৃষ্টি করেছে। কালের নিয়মেই তাদের মধ্যে কেউ কেউ হারিয়ে গেছে কেউ কেউ বা স্থান পেয়েছে বর্তমান জন জীবনে। ভারতবর্সের ইতিহাস ঘাঁটলেই আমরা এমন একটা ভাষার উদাহরন পাই আদতে যার কোন লিখিত রূপই নেই। জান কি কি সেই ভাষা? তার নাম পালি। গৌতম বুদ্ধের বাণী প্রচারিত হয়েছে এই পালি ভাষায়। এই কথ্যভাষার কিন্তু কোন লিখিত রূপ বা লিপি নেই। তাহলে এই ভাষায় লেখা হত কি করে বলত? আসলে যখন যে অঞ্চলের মানুষেরা এই ভাষা ব্যবহার করতেন, তখন তারা নিজেদের জানা লিপি ব্যবহার করে এই ভাষাকে লিখিত রূপ দিতেন। যেমন শ্রীলঙ্কা বা সিংহলে যখন এই ভাষা লিখিত রূপ পেল তখন ব্যবহৃত হল সিংহলী লিপি। আবার বর্তমানে পালি নিয়ে যারা পড়াশোনা করেন তারা এই ভাষার লিখিত রূপ দিতে ব্যবহার করেন রোমান লিপি।

লিখতে শেখার গল্প অনেক, এত সহজে শেষ হবার নয়।তাও আজ এখানেই শেষ করছি।পরে সময় সুযোগ মত তোমাকে লিপি নিয়ে আরও অনেক ঘটনা জানাবো।


ছবিঃ উইকিপিডিয়া

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা