
ইচ্ছামতীর আঠারো বছর পূর্ণ হবে এ বছর। তার মানে ইচ্ছামতী খাতায়-কলমে সাবালক হবে; এটাই বলতে চাইছি কি? না না, ঠিক সেরকম ব্যাপার নয়। ওই সাবালক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটা বয়সকে বেছে নেওয়া ব্যাপারটারই আমি ঘোর বিরোধী l কানের কাছে ক্রমাগত “তুই সাবালক, তুই সাবালক” বলে বলে ভেতরে তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা নাবালক ইচ্ছে সুখের পুচ্ছচ্ছেদনের বিপক্ষে আমি কিন্তু সারাজীবন বলেই যাব।
যাই হোক, ইচ্ছামতীকে নিয়ে লিখতে বসে বারবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইচ্ছামতী’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কেন জানেন? কারণ আমাদের পরিচয় কিংবা প্রণয়ের পটভূমিটা বেশ কয়েক দশক জুড়ে বিস্তৃত। বিভূতিভূষণের সেই দীর্ঘদেহী নদীটির মতোই ইচ্ছামতী পত্রিকা আমার জীবনের গল্পটাকে নীরবে ছুঁয়ে রয়েছে তার সৃষ্টির আদিকাল থেকেই।
ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি।
২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকাকালীন এই পত্রিকাটি হাতে আসে হঠাৎ করেই। আমি যেহেতু কোনোদিনই শিশুসাহিত্য, কিশোরসাহিত্য ইত্যাদি মলাট-লেখন নিরীক্ষণ করে বই পড়ি না, কিংবা ওই পাত্রীর চেয়ে পাত্রের বয়স অন্তত দু-চার বছর বেশি হতেই হবে ইত্যাদি কুপ্রথার নাগপাশমুক্ত স্বাধীন জীবনে অভ্যস্ত, ইচ্ছামতী পত্রিকাটি এককথায় বেশ দারুণ লাগে।
ইউনিভার্সিটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে পাহাড়ের চড়াইটা পেরোতে রোজ কালঘাম ছুটে যেত, জানেন। সমতলে জন্ম যার, এসব বিপত্তিতে আপত্তি তো থাকবেই। কিন্তু ইচ্ছামতী হঠাৎ করে ব্যাপারটা বেশ সহজ করে দিল। হোস্টেলে আমার বিছানায় সন্ধ্যের অন্ধকারে নিজেকে কাঁধের ভারী ঝোলাটার মতো ঝপাং করে ছুঁড়ে দিয়ে প্রায় প্রতিদিনের প্রবাসে আমার ছায়াসঙ্গী তখন ইচ্ছামতী।
পরীক্ষার বিপুল চাপে ওই হেলথ ড্রিঙ্কের বিজ্ঞাপনের মতো ইচ্ছামতী সদা-সর্বদা আমার পাশে। মাঝে মাঝে কিছু কিছু লিখেও পাঠাতাম ইচ্ছামতীকে। অনেকটা ওই দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে এর মতো। জগতের আনন্দযজ্ঞে কে বুঝি আমাকেও নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে। পত্রিকার সম্পাদিকা মহাশ্বেতার সঙ্গেও ই-মেইলে নানা কথা হতো সেই সময় থেকেই।
এর পর আমি তুরস্কে চলে গেলাম কয়েক বছরের জন্য। তখন কাজের চাপে লেখার সময় বের করতে পারতাম না ঠিকই, কিন্তু পড়তাম প্রায় প্রতিটি সংখ্যা।
এর মধ্যেই ২০১৪-তে ঘুঁটে-কুড়ুনির ঘরে একটা বাঁদরছানা এলো l নাম তার জেরি সলিটন। সেও মায়ের মতোই চেঙ্গিস। রাতে ঘুমোতে হয় আর দিনে জাগতে হয় এইসব সনাতন ধর্মাচারের ধার ধারে না মোটেওl
অগত্যা ঘুঁটে-কুড়ুনি মা আবার হাতে তুলে নেয় ইচ্ছামতী। সে সময় চুপিচুপি দরজায় রাত দুটোর সময় কান পাতলেও শোনা যেত 'পুরাণ কথা' কিংবা 'জানা-অজানা' গড়গড় করে পড়ে চলেছে মা, আর তার অতি ভব্য ছা সবেগে হাত-পা নেড়ে ব্যক্ত করছে মতামত।
গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ শুনতে শুনতে আমার ছয় মাসের বাঁদরছানার সেই বেবাক হাসি আমায় তখন যারপরনাই উদ্বুদ্ধ করত পরের সংখ্যাটার জন্য অপেক্ষা করতে। এইভাবে কেটে গেল বেশ কটা বছর।
সম্পাদিকা মহাশ্বেতা ঠিক কবে, কী করে সলিটনের প্রিয় মাসিমণি হয়ে উঠল, সেটা এখন মনে করে বলা শক্ত। আমি বহুদিন অবশ্য ছানাকে মহাশ্বেতার কোনো ছবি দেখাইনি। কিছুটা কৌতূহলের বশে হয়তো। লেখার মধ্য দিয়ে মানুষটাকে কী করে আঁকে শিশুমন, জানতে চেয়েছিলাম বোধহয়।
এক সময় মায়ের মতোই পত্রিকা পড়ার পাশাপাশি লেখা আর আঁকা পাঠানো শুরু করল জেরি সলিটন।
শান্ত, বিপুলকায় ‘নদী ইচ্ছামতী’র মতো ‘পত্রিকা ইচ্ছামতী’ সুখদা, আবার বরদাও কি ?
কোভিডের সময় ইচ্ছামতী যেন আমাদের অনন্ত কারাগারের দুয়ারে অনেক অনেক কল্পনার পানসি ভাসিয়ে দিচ্ছিল। ছোটোদের ভোলানো অনেক সহজ, বড়োদের ভোলাতে কত যে কাঠ আর খড় পোড়ে!
আমি কিছুই ভুলি নি, ইচ্ছামতী। ঠিক যেমন তুমি ভোলোনি আমায়, তোমার আঠারো বছরের জন্মদিনে।
নতুন সূর্য আরও অনেক আলো ফেলুক তোমার পাতায়। আমরা ঠিক শিশির খুঁজে আনব তোমায় সাজাতে।

