খেলাঘরখেলাঘর

সবরমতীর সাধু

ছোট্ট বন্ধুরা, আমার সবসময় মনে হয় কোনো একটা জায়গা ঘোরা মানে তো শুধু ওই জায়গাটা ঘুরে চলে আসা নয়;তার মানুষ,আশপাশ,রাস্তার অলি গলি, বাসের হর্ণ,রিক্সার প্যাঁক প্যাকঁ , বড় বড় বাড়ী, ছোট ছোট বস্তি সব মিলিয়ে পুরো শহরটাকে দেখা আর দেখতে দেখতে উপলব্ধি করা যে জায়গাটা ঘুরবো তার ব্যপারে। একটা কথা বলবো তোমাদের চুপি চুপি,বেড়াবার সময় শুধু বাবা মায়ের হাত ধরে জায়গাটা দেখেই চলে এসো না, জায়গাটা নিয়ে আগে থেকে একটু পড়ে,শহরটাকে ভালো করে চেয়ে দেখবে আর ভাববে কত কি আলাদা দেখছো তোমার রোজকার জীবন থেকে।এটাই কিন্তু ঘোরার আনন্দ।না হলে গেলাম, দেখলাম , চলে এলাম আর লোককে বলে বেড়ালাম এই এই ঘুরেছি এতে তোমাদের কিন্তু কিছু লাভ হবে না।যাই হোক এবার আমার একটা সেদিনের ঘোরার গল্প তোমাদের বলি।আমেদাবাদে গেছিলাম কাজে।কাজের ফাঁকে সবরমতী আশ্রম দেখার জন্য লোকজনকে জিজ্ঞেস করে একটা সরকারী বাসে চড়ে বসলাম।বাসের মধ্যে দেখি দেহাতী এক গুজরাতী বয়স্ক মহিলা যার নাকে পেল্লায় নথ আর মুখে কোঁচকানো চামড়া ওই কোনের সিটে বসি গান গাইছে আবার সামনের সিটে সাদা ফটফটে আধা-ধুতি আর চাপকানের সাথে মানান্সই সাদা পাগড়ী আর সাথে আবার তাগড়াই সাদা ইয়াব্বড গোঁফের রাজস্থানী বৃদ্ধ ছোকরা কন্ডাক্টরের সাথে গল্প জুড়েছে;আরো ছড়ানো ছেটানো নানা মানুষ এদিকে ওদিকে তবে অনেক সিটই ফাঁকা।বাসের জানলা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া ঢুকছে।বাস চলতে লাগলো ঝমঝমিয়ে। বাসে যেতে যেতেই দেখছিলাম ,আমেদাবাদ শহরটা খুব একটা ঘিঞ্জি নয়,ভেতরের পুরোনো আমেদাবাদের কিছু অংশ ছাড়া।বেশ ফাঁকা ফাঁকা।প্রত্যেক বাড়ীতে দোলনা।এটা বোধহয় গুজরাতিদের বাড়ীর বৈশিষ্ট্য ।এখানকার মাটিতে বালি আর মাটির মিশ্রন আছে মনে হলো,গাছপালাগুলো অতিসবুজ নয়, একটা রুক্ষতা আছে কিন্তু শহরটাকে এরা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে; ৪১ ডিগ্রী টেম্পারেচারেও বাস-জানলার ফুরফুরে হাওয়া সেই মুহুর্তে আমাকে বারবার ভাবাচ্ছিলো আমি যাচ্ছি সেই সবরমতী আশ্রম যেখানে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী তাঁর জীবনের অনেকটা সময় নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য কাটিয়ে গেছিলেন।

বাইরে থেকে ভীষনই সাদামাটা দেখতে এই আশ্রম। গেট দিয়ে ঢুকে আশ্রমের প্রথমেই মিউজিয়ম যার মধ্যে গান্ধীজীর আশ্রমবাসকালীন নানা ফটোগ্রাফ,চিঠিপত্র,আশ্রমের নিজস্ব পত্রিকায় গান্ধীজীর লেখা, আশ্রমে ব্যবহৃত নানা রকম চরকা, ডান্ডি অভিযানের ঘটনাকে লক্ষ্য রেখে তৈরী মাটির মডেল,লাইব্রেরী এসব আর সাথে বইপত্রের কাউন্টার ।এই বিল্ডিং-এ বহু মানুষকে দেখলাম (ছাত্রছাত্রীও) পড়াশোনা করছে মন দিয়ে ; আমার মনে হলো ওরা এই সময়ে দাঁড়িয়েও গান্ধীজীর ভাবনাচিন্তা নিয়ে কত ভাবছে।আশ্রমের পথে চলতে চলতে সামনে এসে পড়লো উন্মুক্ত প্রার্থনাস্থল ।

 প্রার্থনা স্থল
প্রার্থনা স্থল

মনে আছে তো তোমাদের গান্ধীজীর প্রার্থনা সংগীত…রঘুপতি রাঘব রাজা রাম? সামনের শুকনো সবরমতী নদী , সাদা মাটা প্রার্থনাস্থলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো ওই সেই সবরমতী যার তীরে ১৯৩০ সালের মার্চ মাসের ১২ তারিখের হাল্কা শীত মাখা সকালে ভারতীয় রাজনীতির এক অহিংস সাধু গান্ধীজী ডান্ডী অভিযান শুরু করেছিলেন ৭৮ জন সাথীকে নিয়ে।ইতিহাসে নিশ্চয়ই পড়েছো তোমরা অনেকে কেন ডান্ডী অভিযান; বৃটিশ সরকার বিদেশী নুনকে ভারতে বিক্রীর সুবিধে করে দেওয়ার জন্য ভারতীয় দেশী নুনের ওপরে কর চালু করেছিলেন যাতে মানুষ বিদেশী নুন বেশী করে কেনে! কি চক্রান্ত দেখেছো তো?

প্রার্থনাস্থল থেকে হাঁটতে হাঁটতে ডানদিকে এসেই “হৃদয় কুঞ্জ” যেখানে গান্ধীজী থাকতেন; সামনে গান্ধীজীর ঘর; বিছানার পাশে চরকা রাখা।সাদা তোষক পাতা আছে সাদামাটা মেঝেতে।এই ঘর ছিলো ভারতীয় রাজনীতির একসময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাস্থল।

 হৃদয় কুঞ্জ
হৃদয়কুঞ্জের সামনে

 

গান্ধিজীর ঘর
গান্ধীজির ঘর

পাশে প্রশস্ত বারান্দা। পেছনেই রয়েছে কস্তুরবা গান্ধীর ঘর, আর তারপাশে চৌকো উঠোন।আমি উঠোনে বসেছিলাম কিছুক্ষন।আমার মনে হচ্ছিলো আমি ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে চলে গেছি সেই দিনগুলোতে যখন বৃটিশ সরকারের অত্যাচারে সারা ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন তুঙ্গে ।একপক্ষ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে যুদ্ধ করে বৃটিশ সরকারকে পরাজিত করবে বলে।আর গান্ধীজী পথ দেখিয়েছেন অহিংস সত্যাগ্রহের।ভাষাটা খটমট হলেও মানেটা সহজ কিন্তু পালন করা কিন্তু ভীষন কঠিন।তোমাকে যখন কেউ অত্যাচার করবে তুমি তখন তার বিরুদ্ধে হাত না তুলে তাকে শান্ত ভাবে বোঝাবে তুমি কি চাইছো।এতে একদিন না একদিন অত্যাচারী নিজের ভুল বুঝবেই।কিংবা সারা পৃথিবীর মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করবেই যাতে অত্যাচারী আর হাত না ওঠায়।তোমরা কিন্তু নিজেদের জীবনেও এটা প্রয়োগ করতে পারো।ভীষন কাজের একটা কথা জানোতো এটা।গান্ধীগিরির ভক্ত মুন্নাভাই এর কাছে তো সিনেমাতেও দেখেছো তাই না?

উঠান
হৃদয়কুঞ্জের ভেতরের উঠোন

হৃদয় কুঞ্জ থেকে বেরিয়ে এসে গেলাম আচার্য্য বিনোবা ভাবের কুটিরে।যে মারাঠী সুপন্ডিত মানুষটি গান্ধীজীর যোগ্য উত্তরসূরী ছিলাম অহিংস আন্দোলনের।সেই কুটিরটি আবার মীরাবেনের কুটির নামেও পরিচিত কারন একসময় এখানে বৃটিশ অ্যাডমিরালের এক অহিংস ভাবের মেয়ে মীরাবেন(গান্ধীজীর দেওয়া নাম) গান্ধীজীর পথে জীবন কাটিয়েছিলেন নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে।

 আচার্য বিনোবা ভাবের ঘর
আচার্য্য বিনোবা ভাবের কুটির

এর পরে হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম হরিজন্-সেবা হসপিটাল,গো-শালা,খাদি-প্রতিষ্ঠান আরো নানা সেবামূলক ও শিক্ষামূলক সেন্টার।গান্ধীজী এক নতুন ভারতবর্ষের কথা ভেবেছিলেন যে ভারতবর্ষ হবে প্রাচীন বৈদিক সমাজ-অনুসারী অথচ চিন্তাভাবনায় আধুনিক আর মানুষের সেবায় নিয়োজিত। সেই ভাবনাকেই এই আশ্রমের জীবনযাত্রায় জুড়ে দিয়েছিলান , যাতে সেখানে হরিজনদের কেউ অস্পৃশ্য বলে ঘেন্না না করে কাছে টেনে নেয়; আরাম-আয়েস বাদ দিয়ে সাধারন চরকায় কাটা খাদি পোশাক করে অতি সাধারন কুটিরে থেকে আর অতি সাধারন খাওয়াদাওয়া করে কিন্তু উচ্চ চিন্তা-ভাবনা আর দেশের কাজের কথা ভেবে যায় আশ্রমিকেরা দিনরাত; আর ঈশ্বর বলে যিনি আছেন তাঁকে স্মরণ করেই জীবনের প্রতিটা দিঙ্কাটিয়ে যেতে পান এই মানুষেরা ,শুধু সত্যের পথ ধরে।

আশ্রম থেকে বেরিয়ে এলাম হাঁটতে হাঁটতে।মনে হচ্ছিলো এত দিন হলো ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো আমরা কি গান্ধীজীর স্বপ্নকে এখনো সঠিক রুপ দিতে পেরেছি।হ্যাঁ , কিছু কিছু তো হয়েছেই মানুষের সেবা।আরো অনেক কাজ বাকি।ছোট্ট বন্ধুরা আমরা যদি আমাদের কাজ ভালো করে করি তাহলেই আমাদের দেশ অনেক এগিয়ে যাবে।তোমরা যদি ভালো করে পড়াশোনা করো,বাবা মায়ের সাথে তর্ক না করে শান্ত হয়ে তোমাদের কথাটা বলো, টিচারকে কখনো মিথ্যে না বলো,তোমাদের থেকে যারা কম পেয়েছে জীবনে তাদের একটু হলেও সাহায্য করো তাহলেই দেখবে তোমরা দেশের জন্য অনেক কাজ করে ফেলেছো।কারন তবেই তো তোমরা সঠিক ভাবে বড় হবে আর মানুষের মতো মানুষ হবে।আর মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে পারলে আমাদের এই দেশ তোমাদের জন্য গর্বিত হবে ... যেমন করে মৃত্যুর ৬২ বছর পরেও গান্ধীজীর ত্যাগ আর দেশভক্তির কথা মনে এলেই আমাদের মাথা শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়,সারা পৃথিবীতে ভারতবর্ষের গর্ব হয় এই ভেবে যে মহাত্মা গান্ধী এই দেশের মাটিতেই জন্মেছিলেন।

তোমরা সবাই ভালো থেকো আর সুযোগ পেলে ঘুরে এসো এই মহাতীর্থ।আজকের মতো ... টা...টা।

 

লেখা ও ছবিঃ
অতনু ব্যানার্জি
কলকাতা

মহাত্মা গান্ধীর ছবিঃ
উইকিপিডিয়া

 

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)