খেলাঘরখেলাঘর

পরশমণি


সেই ছোট্টবেলার পড়ার বইয়ের ছড়াটা মনে আছে ? সেই যে -


'ওল খেও না ধরবে গলা, ঔষধ খেতে মিছে বলা' ?
      
কথাটার অর্থ কি বল ত ? একটা ত' ও আর ঔ শেখা। আর একটা হল ওষুধ খাও আর না-ই  খাও, ওল খেয়ে গলা ধরলে ভারি মুশকিল। দুর্ভোগ যা পোয়াবার সেটা পোয়াতেই হবে! কোন কিছুতেই - কোন ওষুধেই ধরা গলা সারবে না।   
    
কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। একবার ছোট বেলায় শাকালু ভেবে ভুল করে কচু খেয়ে যে কষ্টে পড়েছিলাম তা আর কি বলব। শেষে তেঁতুলের আচার খেয়ে রেহাই পাই-- গলার জ্বালা, ব্যথা কমতে তিন চার দিন সময় লেগেছিল!
      
তা, তোমার বাবা এমনিতে ত খুবই ভাল, তাই'ত ? তবে  মাঝে মাঝে  ঝামেলার  একেকটা কাজ যে করেন, এটাও ত সত্যি, নাকি ? আজ কি করেছেন সেটা রান্না ঘরে এখন একবার গেলেই টের পাবে। রান্নাঘরে গিয়ে বাজারের ব্যাগটাতে উঁকি দিয়ে দেখ। এক টুকরো মানকচু রয়েছে। তার মানে সেই গলা চুলকানি আর ব্যাথা।

 

কচু      
কচু

কচু দেখে মাথাটা বিগড়ে গেল ত ? বাবাকে নিয়ে হয়েছে এই এক জ্বালা, বাজারে কচু জাতিয় কিছু দেখতে পেলেই হল, কেনা চাইই চাই! কি না, 'খেয়ে দেখ, খুব ভাল খেতে!' যত্তো সব!  
     
কিন্তু কি আর করবে! কোনও উপায়ে গিলতে হবে আর গলা ধরবে, আর সেটা সারাতে টকও খেতে হবে। ঝাল, মিষ্টি, নোনতা না খেয়ে শুধু টকই খেতে হবে কেন বল দেখি? এত না ভেবে তার  চেয়ে চল , 'যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল' প্রবাদটা কেন এসেছে সেটা দেখি বরং। সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তাতে।
     
ওল ছাড়াও অন্য কচু জাতীয় সবজি, যেমন মান বা অন্যান্য কচু--এসব খেলেও গলা ধরে। বাড়িতে এসব সবজি এলে বা রান্না হলে বেশির ভাগ মানুষই বিরক্ত হন। স্বাভাবিক। কে আর সাধ করে খেতে গিয়ে কষ্ট পেতে চায় বল!
      
কিন্তু মানুষের স্বভাবটা ত জান, সে প্রায় সব কিছুই খায়। কোনওটা খেতে খারাপ হলে খাওয়ার উপযোগী করে নেয় নিজের মত করে। এটা ওটা করে একদিন মানুষ আবিষ্কার করে ফেলল যে টক খেলে গলা ধরা সেরে যায়। আর হরেক রকম টকের মধ্যে তেঁতুলই বেশী টক। তাই সাংঘাতিক ধরনের বুনো ওল খেয়ে গলা ধরলে তেঁতুল ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তাই ওই প্রবাদটা এসেছে।

তেঁতুল
তেঁতুল

       
তবে শুধু যে তেঁতুলই খেতে হবে এমন কোন কথা নেই, অন্য টকেও কাজ হয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে রান্না করার সময়ই প্রয়োজন মত টক দিয়ে দেওয়া হয় যাতে গলা ধরার ব্যাপারটা না ঘটে।
       
কি, জানতে ইচ্ছা হচ্ছে ত' যে ওল খেলে গলা কেন ধরে আর টক খেলে সারেই বা কেন! সেটা বলি এবার।
 
কিন্তু সে সব জানতে হলে আর অন্য দু'একটা কথা জানতে হয় যে আগে! তেমন কথা গুলো সেরে নি।
'কৃষ্ট্যাল' বা কেলাস কাকে বলে সেটা দেখি আগে, দরকার লাগবে। আমাদের চারপাশে যে সব কঠিন পদার্থ দেখি তাদের কোনও কোনটা দানাদার, যেমন চিনি মিছরি বা ফিটকিরি কিংবা তুঁতে। এদের দানাগুলো নানা আকারের দেখতে হয়, কেউ চৌকো, কেউ বা পিরামিডের মত, বা কারও আকার আবার লম্বাটে সুচের মতও হয়। এছাড়া আরও অনেক রকম দানাদার বস্তু আছে। এদের মধ্যে যাদের সহজেই আমাদের আশপাশে দেখা যায় তেমন কয়েকটির নাম করলাম। 

চিনির কেলাস              
চিনির কেলাস

       
এখানে তোমাদের একটা কেলাসের কথা জানিয়ে রাখি, যদিও এ লেখাটার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। জল তরল পদার্থ, কিন্তু সেটা জমে যখন বরফ হয়ে যায় তখন এরও কেলাস তৈরী হয় অন্য কঠিন পদার্থের মত। সে কেলাস অনুবীক্ষনের নীচে দেখা যায়। ভারি চমতকার দেখতে সেগুলো- নানা নক্সার বৃত্তাকার ফুলের মত! 

তুষার কেলাস                     
তুষার কেলাস


এবার আমরা আমাদের কথায় আসি।                       
কোন কোনও কঠিন পদার্থ  আবার একেবারে মিহি পাউডারের মত, আটা বা ময়দা, গায়ে মাখা ট্যালকম পাউডার। এমন অনেক জিনিষ আছে। এরা কেউই কেলাসের দলে পড়ে না। ওপরে লেখা ঐ দানাদার বস্তু গুলোই হল কৃষ্ট্যাল বা কেলাস। বড় হয়ে যখন রসায়ন বা কেমিস্ট্রি বই পড়বে তখন এ বিষয়ে আরও অনেক কিছু জানতে পারবে।
        
যে দোকানে  সাজা পান বিক্রি হয় সেখানে গিয়ে দেখো একদিন কি কি জিনিষ দিয়ে পান সাজা হয়। এর মধ্যে প্রধান হল খয়ের আর চুন। শুধু খয়ের তেতো, খুব বিচ্ছিরি খেতে আর শুধু চুন যদি খাওয়া হয় জিভ গাল সব কেটে যায়, খুব যন্ত্রনাদায়ক ব্যাপার হয় সেটা। তা সত্ত্বেও পানের প্রধান উপকরন এ দুটিই।
         
পরিমানমত এ দুটি মিশিয়ে দিলে পান সুস্বাদু হয়। কোনটা কম বা বেশী হয়ে গেলে হয় তেতো লাগবে আর না হয় গাল কাটবে। ঠিকঠাক এরকম মেশানোর ব্যাপারটাকে বলে 'প্রশমন'। অর্থাৎ খয়ের চুনকে প্রশমিত করল বা চুন খয়েরকে প্রশমিত করল। এতে এমন একটা জিনিষ তৈরী হল যেটা খয়েরও না আবার চুনও না।
        
রসায়নশাস্ত্রে প্রশমন ব্যাপারটা একটা সাধারন ঘটনা। হামেশা ঘটে। আমাদের চার পাশে যেসব পদার্থ দেখি সেগুলো সব তিন শ্রেনীতে ভাগ করা যায়, যেমন অম্ল, লবন আর ক্ষার। যারা টক তারা হল অম্ল, যেমন হাইড্রোক্লোরিক বা সালফিউরিক অ্যাসিড, লেবু, তেঁতুল এই সব। আরও অনেক নাম করা যায়।
       
আমরা যে নুন খাই সেটা একটা লবন। এর নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। তবে এটা ছাড়াও আরও রাশি রাশি লবন আছে। নাম শুনবে আর কয়েকটার ? যেমন, ক্যালশিয়াম সালফেট, মাগনেশিয়াম ক্লোরাইড,পটাশিয়াম ক্লোরাইড-- এমন অজস্র সব নাম। আর কাপড়কাচা সোডা, সাবান, পান খাওয়ার চুন-- এরা হল ক্ষার জাতিয় পদার্থ।
       
পানের ক্ষেত্রে চুন আর খয়েরের যা সম্পর্ক, অম্ল আর ক্ষারের সম্পর্কও প্রায় সেই রকম। দুটোকে পরিমানমত মিশিয়ে দিলেই ওদের মধ্যে  বিক্রিয়া হবে আর একে  অপরকে প্রশমিত করবে। তার ফলে তৈরী হবে দু'একটা নতুন জিনিষ যাতে অম্ল বা ক্ষার কারও গুনাগুন বজায় থাকবে না। অম্লের টক ভাব থাকবে না আর ক্ষারের কষা বা কটু ভাবও থাকবে না।  রসায়ন শাস্ত্রে এ ব্যাপারটাকে বলা হয়'প্রশমন'। নতুন তৈরী হওয়া পদার্থগুলোর সংখ্যা একাধিক হতে পারে। এদের একটির নাম হল  লবন।                                            
কেলাস, প্রশমন, অম্ল, ক্ষার - এমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বললাম কেন তা এখনই বুঝতে পারবে। তৃনভোজি প্রানিরা গাছপালা খেয়ে বেঁচে থাকে। আবার গাছপালারও ত বেঁচে থাকার ইচ্ছে আছে, বল ! তারা কি ভাবে আত্মরক্ষা করবে সেটাওত  ভাবার! তবে আমাদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সেটা প্রকৃতি দেবী নিজেই ঠিক করে রেখেছেন। প্রত্যেকের জন্যই নানা রকমের ব্যবস্থা করা আছে তাঁর। কচু,ওল, মান - এসব গাছেরও তেমনি আছে, আর সেটার সাথেই যুক্ত এই গলা ধরার ব্যাপারটা।

 

কচু গাছ     
কচু গাছ

এই সব গাছের গোড়া, কান্ড, পাতা - সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এক ধরনের সুচের মত সরু সরু কিন্তু শক্ত শক্ত কেলাস। অনেক সময় কেলাসগুলো আবার গোছা করে বাঁধা রয়েছে বলে মনে হয়, যদিও বাঁধাছাঁদার কোনও ব্যাপার নেই।খালি চোখে এদের দেখতে পাবে না, অনুবীক্ষন যন্ত্রে দেখতে হয় । খুব ছোট কিনা। এদের নাম হল 'রাফাইড' (raphide)। বাংলায় কি বলে তা বলতে পারব না। 

রাফাইড
রাফাইড

      
আমরা বা অন্য কোন প্রানী এই সব গাছকে আক্রমন করলে তাদের ওই সব সরু কেলাস আমাদের গায়ে- হাতে অথবা  খেয়ে ফেললে মুখে গলায় -- সর্বত্র বিঁধে যায় আর সেখানে আটকে থাকে।
      
তোমার হাতে সরু সুঁচ যদি বিঁধিয়ে রাখা হয় তাহলে যন্ত্রনা হয় কিনা বল। আর মুখের মধ্যে যদি সেটা হয় তাহলে ত চিত্তির একেবারে!
      
কিন্তু মুশকিল কি জান ? আমাদের মুখের লালা কিন্তু এদের গলাতে বা সরাতে পারে না। কেন পারে না সেটাও একটা অবাক ব্যাপার! এটা নিয়ে একটু পরে বলছি।
       
সুঁচগুলো কি দিয়ে তৈরী সেটা বলি।  এরা তৈরী ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা ক্যালসিয়াম অক্স্যালেট নামের এক ধরনের ক্ষারধর্মী পদার্থ দিয়ে। এরাই  সুচের মত  সরু সরু কেলাস।
       
ক্ষারধর্মী পদার্থকে প্রশমন করতে পারে এমন একটা পদার্থ না পেলে ওই কেলাসগুলোকে সরাবে কে ? অম্ল বা টক ছাড়া আর কে পারবে ? তেঁতুল হল তেমনই একটা খাদ্য  যার মধ্যে কিনা রয়েছে অম্ল। এটা খাওয়া মাত্র মুখের ভেতর থাকা ক্ষার জাতিয় কেলাসগুলোর সাথে বিক্রিয়া করে সেগুলোকে প্রশমিত
করে ফেলে। অর্থাৎ কেলাসরা আর কেলাস থাকে না, যেন গলে গিয়ে, অন্য বস্তুতে পরিনত হয়, তারপর খাবারের সাথে পেটের মধ্যে চলে যায়।
      
একটু পরে গলাধরা সেরে যায়। সুতরাং ওল খেলে যতই গলা ধরুক তেঁতুল বা লেবুর মত কোন টক খেলেই হল। তাই যত জংলী ওলই হোক, বাঘা তেঁতুল থাকলে নিশ্চিন্ত ! তাহলে  ওল খেতে আর আপত্তি কি ?   
       
আমাদের মুখের লালার কথা বলব বলেছিলাম, মনে আছে ত ?আমাদের লালা হল ক্ষারধর্মী। তাই লালা অন্য আর এক ক্ষারধর্মী কেলাসের সাথে বিক্রিয়া করতে পারে না, সে কারনে লালা নিজে গলা ধরা সারাতে পারে না। আর একটা কথা। আচার দেখে মুখে জল আসে না এমন মানুষ আছে ? হলফ করে বলা যায় যে নেই। তার মানে কি সবাই ভীষন হ্যাংলা ? না তা নয়। এই ব্যাপারটা আসলে আমাদের নিয়িন্ত্রনের বাইরে। তুমি চাও আর না-ই চাও, গল গল করে লালা বেরবেই। আর আচার মুখে দিলে যে কি হয় সেটা'ত তোমাদের জানাই আছে।              

যে কোন আচারই হল অম্ল। অম্ল মুখের ভেতর এলেই ক্ষারধর্মী লালা তার সাথে বিক্রিয়া করতে পারবে, এটা বুঝতে পেরে মুখে থাকা লালাগ্রন্থি গুলো ভারি সক্রিয় হয়ে পড়ে। এতে যে পরিমান লালা ঝরে, সুড়ুত করে টেনে নিতে না পারলে ভারি মুশকিল !




সন্তোষ কুমার রায়
রূপনারায়ণপুর, বর্ধমান

 

ছবিঃ
উইকিপিডিয়া

লেখক পরিচিতি

সন্তোষ কুমার রায়

সন্তোষ কুমার রায় অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক। বিষয় পদার্থবিজ্ঞান। শৈশব ও কৈশোর যথাক্রমে বাংলাদেশে এবং কলকাতায় কাটলেও, কর্মজীবন কেটেছে বাংলা বিহার সীমান্তের হিন্দুস্থান কেব্‌ল্‌স্‌ শিল্পনগরীতে। শিল্পনগরী থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকায় ছোটদের এবং বড়দের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা লিখেছেন বহুবছর। বর্তমানে ইচ্ছামতীর পরশমণি বিভাগে নিয়মিত লেখা ছাড়াও তিনি একটি গ্রুপ ব্লগের সদস্য রূপে লেখালিখি করেন ।