খেলাঘরখেলাঘর

রান্নাঘরে গিয়ে মাঝে মাঝেই তো আমরা কিছু না কিছু পরীক্ষা নিরিক্ষা করে ফেলছি। মা মাঝে মাঝে রান্না ঘরে তোমাকে বিজ্ঞানের পরীক্ষা করতেও দিচ্ছেন। তাই বলে রান্না করাটা কিন্তু মোটেও সহজ ব্যাপার বলে ভেব না। সব উপকরণ ঠিক মাপমত না থাকলে, হাতের নাগালে ইন্ধনের যোগান না থাকলে,  মা সুস্বাদু, পুষ্টিকর খাবার করতেই পারবেন না। তবে আমরা এখানে মায়ের রান্না নিয়ে গল্প করব না, এখানে আমরা আলোচনা করব গাছেদের রান্না-বান্না নিয়ে। তার জন্য আমাদের আবার যেতে হবে রান্নাঘরে।

রান্নাঘরটা হল গিয়ে বিজ্ঞানের একটা আড়তবিশেষ। এই দেখনা, খুঁজিলদারি করতে গিয়ে আবার এমন  একটা বিষয় বেরিয়ে এল ঐ রান্নাঘর থেকেই যা কিনা গাছেদের কথা জানতে গেলে একান্তই জানা দরকার।

ব্যাপারটা বুঝতে হলে হাতে কলমে কাজ করতে হবে। মা-বাবা, দু'জনেরই সাহায্য একটু দরকার হবে।   কি ভাবে, সেটা দেখা যাক,কি বল ?

         গাছেদের রান্নাবান্না

একটু বায়না করলেই মা-এর কাছ থেকে এক জোড়া কাঁচা ডিম পেয়ে যেতে পার। তেমন একজোড়া যোগাড় করে নাও।‌‍‌ এবার একটা গোলমেলে জিনিষ যোগাড় করতে হবে। তাই বাবাকেও  গিয়ে ধরতে হচ্ছে, কেননা বাবা না হলে কাজটা করাই যাবে না কিনা!                         

একটু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড দরকার যে ! বাজার থেকে কিনে আনতে হবে না ? কে করবে বল ? যেখানে পাওয়া যাবে সে জায়গাটা তো তুমি চেনই না, তাছাড়া দোকানি কাকুও তো তোমাকে দেবেনই না। ছোটদেরকে কেউ কখনও অ্যাসিডের মত জিনিষ বিক্রি করে নাকি ?

(অবশ্য বাজার  থেকে অ্যাসিড না কিনে অন্য ভাবেও সংগ্রহ করতে পার। বাড়ীতে ওয়াশ বেসিন ইত্যাদি পরিষ্কার করার জন্য একটা অ্যাসিড কেনা হয় যার নাম 'মিউরিয়েটিক' অ্যাসিড; এটাও আসলে হাইড্রক্লোরিক অ্যাসিড। এ দিয়েও কাজ চলতে পারে। খবরদার, এটা নিয়ে নিজে কিছু করতে যেও না কিন্তু।)

অ্যাসিড যেমন বাবাকে সংগ্রহ করতে  হবে, কাজটাতেও তাঁকেই সাহায্য করতে হবে, না হলে তুমি অ্যাসিডে হাত পুড়িয়ে ফেলবে। একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে আর তার দায় আমার ওপর পড়বে! জেনেবুঝে আমিই বা সেটা চাই কি করে!

আসল কাজ কিভাবে হবে সেটা বলি এবার। ডিম দুটো ডুবে যায় এমন একটা কাচের বাটিতে খানিকটা অ্যাসিড নিয়ে নাও। এবার ডিম দুটো ভাল করে পরিষ্কার করে ধুয়ে, বাবাকে বল বাটির অ্যাসিডে আস্তে করে ডুবিয়ে দিতে। লক্ষ্য কর, ডিমের গা থেকে কেমন বুরবুরি কেটে গ্যাস বেরোতে শুরু করেছে।

কেন এমন হচ্ছে বল দেখি ? আসলে ডিমের খোলাটা হল ক্যালসিয়াম কার্বনেট নামের (ব্ল্যাকবোর্ডে লেখার চকও ক্যালসিয়াম কার্বনেট) একটা রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরী। এই রাসায়নিকটি অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে। এতে ডিমের খোলাটা অ্যাসিডে গলে গিয়ে ক্রমশঃ পাতলা হতে থাকে, আর বুরবুরি কেটে কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস বের হয়।

এমন হতে থাকলে ত খোলাটা গলে গিয়ে ডিমের ভেতরের সাদা অংশ আর কুসুমটা অ্যাসিডের সাথে মাখামাখি হয়ে যাবার কথা, তাই না ? কিন্তু তা হবে না!এইখানে একটা মজা হবে!

সেদ্ধডিম ছাড়িয়েছ কখনও ? ওপরের শক্ত খোলার ঠিক নীচে একটা পাতলা পর্দা থাকে, দেখেছ ত ? এটা থাকে বলে ডিমটা চট করে ভেঙ্গে বা ফেটে যায় না। এই পর্দাটা হল একটা 'সেমি-পারমিয়েবল মেমব্রেন'। বাংলাতে বলা যায় 'আংশিক-ভেদ্য পর্দা'। এমন বলার কারণ হল, পর্দার এক পাশ থেকে অন্য পাশে কোন তরল পদার্থ যেতে চাইলে খুব অল্প অল্প করে যেতে পারে। কি অবস্থায় পারে সেটা একটু পরেই জানতে পারবে।

এখন অ্যাসিডে ডুবে থাকা আমাদের ডিম দুটোর কি হল দেখি। অ্যাসিডে ডিমের খোলা গলে গেলেও তলাকার পর্দা ত আর গলবে না! তাহলে ব্যাপারটা কি হল বল  দেখি ? কুসুমসুদ্ধ ডিমের সাদা অংশ পাতলা পর্দার থলের মধ্যে অ্যাসিডে ভেসে থাকবে, যেন পাতলা একটা ক্যারিব্যাগে জেলির মত কিছু রয়েছে!

একখানা বড় চামচ দিয়ে নরম ডিম দুটোকে তুলে এক বাটি জলে ভাল করে সাবধানে নাড়াচাড়া করে ধুয়ে নাও। এই কাজটাতেও মা বা বাবার সাহায্য নাও।

এবার দুটো আলাদা বাটি নাও, যার একটাতে রাখো কিছুটা জল (পাতিত জল হলেই ভাল), আর একটাতে রাখো নূন জলের 'গাঢ় দ্রবণ'। জলের মধ্যে কয়েক চামচ নূন ভাল করে গুলে নিলেই 'গাঢ় দ্রবণ' তৈরী হয়ে যাবে।

এখন ঐ দুটো বাটিতে তুলতুলে ডিমদুটো ডুবিয়ে দাও। অর্থাৎ একটা ডিম জলে, আর একটা ডিম নূনজলের মধ্যে ডুবে থাকল।

এবার কিছুক্ষনের অপেক্ষা। একটু এখানে পড়াশোনা করে নিতে পার, আর তা না করলে খেলাধুলো করেও আসতে পার। ফিরে এসে কি দেখবে বল দেখি!

একটু আশ্চর্য একটা ব্যাপার ত দেখবেই! সেটা হল, জলের বাটিতে রাখা ডিমটা বেশ বড় আর নূনজলে রাখা ডিমটা আকারে ছোট হয়ে গেছে! কি, ম্যাজিকের মত আশ্চর্য লাগছে ত' !

কারণটা বলি এবার। ডিমের ঐ পাতলা পর্দার ধর্ম হল এই যে, এর দুপাশে দুটো আলাদা ঘনত্বের জলীয় দ্রবণ রেখে দিলে কম ঘনত্বের দিক থেকে বেশী ঘনত্বের দ্রবণের দিকে জল ঐ  পর্দার ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারে। (ঐ পর্দার কথা বিশেষভাবে বললাম না, বড় হয়ে পরে জানতে পারবে, এখনকার মত এটুকুতেই কাজ হয়ে যাবে)।

জলের বাটির কথা ভাব এবার। পাতলা পর্দার থলের মধ্যে রয়েছে ডিমের ঘন সাদা অংশ আর কুসুম, আর বাইরে রয়েছে পাতলা জল। সুতরাং বুঝতেই পারছ যে পাতলা জলটা ডিমের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, আর সেটা ফুলে গিয়ে বড় হয়ে গেছে। পর্দাটা রবারের মত কিনা!

অন্য বাটিটাতে কি হবে সেটা নিজেরাই বুঝে যাবে, তাও বলে দি। নূনের দ্রবণ আবার ডিমের ভেতরের সাদা অংশ আর কুসু্মের থেকে ঘন। তাহলে এবার উল্টোটাই তো হবে! নাকি ? অর্থাৎ পর্দার থলের ভেতর থেকে জল বেরিয়ে বাইরে চলে আসবে, আর ডিমের আকারটা হয়ে যাবে ছোট, থলেটা একটু চুপসে যাবে আর কি ! এমন ব্যাপার-স্যাপারকে বলে 'অসমোসিস' (osmosis) প্রক্রিয়া।

তা'তো হল, কিন্তু এটা জেনে আমাদের কি লাভ   হল ?

লেখক পরিচিতি

সন্তোষ কুমার রায়

সন্তোষ কুমার রায় অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক। বিষয় পদার্থবিজ্ঞান। শৈশব ও কৈশোর যথাক্রমে বাংলাদেশে এবং কলকাতায় কাটলেও, কর্মজীবন কেটেছে বাংলা বিহার সীমান্তের হিন্দুস্থান কেব্‌ল্‌স্‌ শিল্পনগরীতে। শিল্পনগরী থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকায় ছোটদের এবং বড়দের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা লিখেছেন বহুবছর। বর্তমানে ইচ্ছামতীর পরশমণি বিভাগে নিয়মিত লেখা ছাড়াও তিনি একটি গ্রুপ ব্লগের সদস্য রূপে লেখালিখি করেন ।