ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ইস্তানবুলের ডায়েরি

(১)

সবে কলকাতা শহরের মেঘসীমা পেরোতে যাচ্ছি, জানলা দিয়ে নীচে তাকিয়ে আক্কেল গুড়ুম। ও কী ও? ঘর বাড়ির ওপর অমন সার্চলাইট ফেলে কে? বোম টোম ফেলবে নাকি? যুদ্ধবিমান? টর্পেডো? বোমারু জাহাজ? সবাই ঘুমোচ্ছে যে!

চেঁচিয়েই ফেলতাম, এমনসময় চোখের সামনে এক থালা পূর্ণিমার চাঁদ দেখে গাঁক করে থেমে গেলাম। ঘাড় নীচু করে দেখি যেটা সার্চলাইট ভেবেছি আসলে সেটা পুকুরে খালে বিলে চাঁদের ছায়া। আর আমি বেকুবের মতন কিনা…

আসলে যে দেশে যাচ্ছি সেখানে একটার পর একটা যুদ্ধের ইতিহাস আছে। মানুষ গুহা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়েই হয়ত দেশটা আবিষ্কার করে ফেলেছিল। তারপর সাত হাজার বছর কেটে গেছে। যীশুখ্রীষ্ট জন্মেছেন। মহম্মদ জন্মেছেন। কিন্তু সে দেশের মাটি কখনও বাস্তুহারা হয়নি।

হওয়ার কথা ছিল না। কারণ দুনিয়ার যত বড় সম্রাট পীর যাজক হোক না কেন, সওদাগর সকলের দেবতা। কে না জানে সওদা ভালো হলেই মোহরের পাহাড়। অগত্যা মুলুকের নাম কখনও মেসোপটেমিয়া তো কখনও বাইজেন্টাইন। যখন যে মালিক মাটি তারই গুণ গাইবে এ আর অবাক কথা কী। যা ছিল কনস্ট্যান্টিনোপল হালে অটোমান তুর্করা তার গালভরা নাম দিল ইস্তানবুল। সে নাম এখনও বহাল আছে। তুরস্কের বাণিজ্যিক রাজধানী। সেখানেই যাচ্ছি।

সাবিয়া গোচেন এয়ারপোর্টটা ছোটো। লম্বা ছুটির সপ্তাহ বলে লোকজনও কম। সুটকেসটাকে বাছুরের মত টানতে টানতে বাইরে এসে পড়লাম। গায়ে ঠাণ্ডা পাহাড়ি হাওয়া লাগতেই কলকাত্তাইয়া হাড্ডিতে ভাদ্রের জমা গরম কৈ কৈ করে চিক্কুর ছাড়ল। শহরটা দেখতে খাসা। পাহাড়ের বাঁক ঘুরেছে এদিক সেদিক। আনাচে কানাচে নানা রঙের ফুল। আর সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হল কেউ একবর্ণ ইংরেজি বোঝেনা। ওদের মাতৃভাষা টার্কিশ। তাতেই দিব্যি সব কাজ চলে যায়। এই ভাষার চক্করে পড়ে আমার এক বন্ধুর যা দুর্দশা হয়েছিল। হোটেলে একটা হ্যাঙ্গার চেয়েছিল। তো রুম সার্ভিস সব শুনে টুনে হাসিমুখে চার বোতল জল নিয়ে এসেছিল। বন্ধু বেচারি ভিরমি খেতে খেতে হাত পা নেড়ে কোট টাই হ্যাঙ্গার এসব বোঝাল। তারা বিজ্ঞের মত নিয়ে এল ইস্ত্রী। শেষে বেচারা মরিয়া হয়ে ঝোলাঝুলি করতে থাকায় তারা দৌড়ে গিয়ে একটা কম্বল নিয়ে আসে। হ্যাঙ্গার আর জোটেনি বলাই বাহুল্য। আমি সব শুনে টুনে ফোনে ছবি রেখে দিয়েছি। চিরুনী সাবান তোয়ালে। কখন কোনটা লাগে। কী কপালে আছে!

(২)

ইস্তানবুলের ডায়েরি
কুম্পির (Kumpir) জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড। খোসাশুদ্ধ আলুর মধ্যে চীজ, মেয়োনীজ আর সব্জি ঠেসে দেয়।

আমার আবার নতুন কোথাও গেলেই বেশি বেশি খিদে পায়। বোঁচকা বুঁচকি নামিয়ে চললাম খাদ্যশিকারে। হোটেলের পাশেই একগাদা রেস্তোরাঁ। চিকেন চাইতে গলদঘর্ম হতে হল, কারণ 'তাভুক' জিনিষটাকে যে অশিক্ষিত ম্লেচ্ছরা চিকেন বলে সেটা রাঁধুনি বা ওয়েটার কেউই জানার দরকার দেখে না। ছবি টবি দেখে ভয়ে ভয়ে দিলুম অর্ডার। জয় মা। উট ফুট দিলেও খেয়ে নেব।  বিদেশ বিঁভুইয়ে এসে হাসির খোরাক হলে বড়ই লজ্জার কথা। কেঠো টেবিলে রাখা নুন মরিচের প্যাকেট। লোকজন এন্তার খাচ্ছে, আর আড্ডা দিচ্ছে। একটু পরেই রেজাল্ট বেরোল। ওয়েটার প্লেটে করে কাগজে মোড়া একটা ব্যাপার এনে দিল। আলুভাজা। আর আর - ইয়েস! রুটির ভাঁজে লালচে ভাজা চিকেন। পাশ পাশ! বীরদর্পে মেনুকার্ডটা নিয়ে চোখ বোলালাম। দেখি টার্কিশ চা। মানে 'চায়ে' লেখা। বাহ, কে বলে হিন্দিস্তান এদের কাছে ম্লেচ্ছ দেশ? উল্লসিত হয়ে দু কাপ চা খেয়ে ফেললুম। তেমন খোশবাই নেই। বেঁচে থাক আমাদের দার্জিলিং। এবার শেষ পরীক্ষা। বিল মেটাতে হবে। চাইলাম বিল। ওয়েটার ছুটে গিয়ে মেনুকার্ড এনে দিল। আরেকটা হ্যাঙ্গার কেস হতে যাচ্ছে। বাতাসে অটোগ্রাফ দেবার ভঙ্গি করে বললাম বিল। চেক। ওয়েটার একমুখ বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে। হয়ত পুলিশ ডাকার আগে এমন মুখ করে এদেশে। শেষে গোদা বাংলায় বললাম 'আরে বাপু হিসেবটা কী হল সে তো বলবে'? ও মা, সে বলে উঠল 'হিসাব'? থ হয়ে মাথা নাড়লুম। সে একদৌড়ে বিল এনে দিল। যাক, নিশ্চিন্ত হলাম। এদেশে আমার ইংরেজি বলার দরকার হবে না।

বেরিয়ে আসছি, সেই ওয়েটারটা একদৌড়ে এসে বলল 'আলুকান'? অন্তত আমি তাই শুনলাম। আমার বেকুব মুখ দেখে তার পরের প্রশ্ন 'হিন্দিস্তান? বোলিউদ? শালুক্ষান?'। ধড়ে প্রাণ এল। হাসতে হাসতে বললাম 'শাহরুখ খান?' সে ব্যাকুল হয়ে আমার হাতে নুন মরিচের একগাদা প্যাকেট আর টিস্যু পেপার গুঁজে দিয়ে বলল 'আই লাব শালুক্ষান। বোলিউদ ইজ গুত। ভেলি গুত'। নুন মরিচের প্যাকেটগুলো আমি নিয়ে এসেছিলাম। বিদেশের অনামী রেস্তোরাঁর কোন ইউসুফ বলিউডের তারকাকে দেখে আমার দেশকে ভালোবেসেছে, আমাকে ভালোবাসতে শিখেছে, এ তার প্রমাণ।

ইস্তানবুলের ডায়েরি
টার্কিশ কফি- এক কাপ খেলেই নিশ্চিন্দি। ভালুক জড়িয়ে থাকার মত গরম হবে

(৩)

এদেশের লোককে যদি জিজ্ঞেস করা যায় সবচেয়ে প্রিয় দুটো জিনিস কী, উত্তর আসবে আড্ডা আর কিতাব। প্রায় সবক'টা রেস্তোরাঁতে বাইরে বসার  ঢালাও ব্যবস্থা। চা কফি সহযোগে 'কেবাব' সাঁটাও উইথ খোশগল্প অথবা বই। অনেক রেস্তোরাঁতে বই কিনতে পাওয়া যায়। মারমারা সমুদ্রের ধার ঘেঁসে দোকানের পর দোকান। নোনা ঘ্রাণ নিয়ে কিতাবে মগ্ন হয়ে যাওয়া যায়। সমুদ্র ভুলে যাওয়া গল্প বিড়বিড় করে কানের পাশে। শনি রবি অনেকে হ্যাট কোট টাই পরে হুইল নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন লাইন দিয়ে। নেশাগ্রস্তের মত মাছ ধরা চলে। পাশে বিক্রি হয় গরম হ্যাজেলনাট, টাটকা ঝিনুক। লেবু দিয়ে লোকে গপাগপ ঝিনুক খাচ্ছে যেমন আমাদের দেশে ফুচকা খায়। কেউ আবার আনমনে গীটার বাজিয়ে গেয়ে চলেছে। ভাষা না বুঝলেও সুরটা যেন বড়ো চেনা। বিদ্রোহী রাজপুত্র ছদ্মবেশে দেশ ছাড়ার সময় এমন সুরেই গেয়েছিল হয়ত।

ইস্তানবুলের ডায়েরি
এমিনোউ- ফেরিঘাট, আবার ট্রাম স্টেশনও। গীটার বাজিয়ে গেয়েই চলেন কেউ কেউ।

সরকারি ফেরিবাসগুলো ছাড়লেই ঝাঁক ঝাঁক সীগাল পিছু নেয়। যাত্রীরা ছুঁড়ে ছুঁড়ে কেক বিস্কুট দেয়। তারা আকাশে ভল্ট খেয়ে লুফে নেয়। মাঝসমুদ্রে ঠাহর করলে বোঝা যায় কৃষ্ণসাগর এসে মিলেছে মারমারার সাথে। ঐটেই বসফরাস প্রণালী। কোন দেশের যুদ্ধজাহাজ ঐ প্রণালী বেয়ে কোন দিকে যেতে পারবে সেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে আজ অবধি যত জল গড়িয়েছে তাতে আর একটা কৃষ্ণসাগর হয়ে যায়। দুই মহাদেশের মাঝখানে থাকলে যা হয়। সেই সওদাগরির হিসাব। মোহরের ঘড়া কার। কে বেশী শক্তিমান। বিদ্যার দেবী মুচকি হাসেন সার সার কিতাবের দোকান থেকে। অনেক পুরোনো বইয়ের দোকান আছে। দেখলে কলেজ স্ট্রিট মনে পড়বে। বই ঘাঁটতে থাকলে হয়ত মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন পুঁথিও বেরিয়ে আসতে পারে, বলা যায় না।

ইস্তানবুলের ডায়েরি
মসজিদের ব্যাকগ্রাউন্ড আলো করে বসফরাস

বড়ো বড়ো বন্দরগুলোর নামের শেষে 'কয়' থাকে। তুর্কীরা স্বাভাবিক বন্দরকে কয় বলে কিনা। কারাকয়, ওর্তাকয়। খুদে খুদে পাথর খোদাই করে ছবি এঁকে লোকে বিক্রি করছে। চার্লি চ্যাপলিন গম্ভীর হয়ে সমুদ্র দেখছেন। মেরিলিন মনরো হাসছেন। বিকেলের শেষ আলো দেখবার জন্য মস্ত হুড়োহুড়ি।

ইস্তানবুলের ডায়েরি
মর্মরা সাগর

সাত পাহাড়ের দেশে সূর্য অস্ত যেতে চান না। কারাকয়তে হয়ত ডুবে গেলেন, ওর্তাকয়তে তখনও দিগন্তে ভাসছেন। অনিচ্ছাভরে শেষে রাজপাট গুটিয়ে সূর্য ডুবেই যান। বসফরাস ব্রিজ যেন আমাদের সেই মেহের আলি। দিন রাত জেগে আছে যুগ যুগান্ত ধরে। যত বলে তফাত যাও সব ঝুট হ্যায়, তত সওদাগর আসে ঝাঁকে ঝাঁকে। মানুষ এশিয়া আর ইউরোপ করছে ঐ ব্রিজ ধরে নিশিদিন। এখন তিনখানা বসফরাস ব্রিজ হয়েছে। কিন্তু ট্র্যাফিক দেখলে মনে হবে হাওড়া ব্রিজ এর কাছে মাঠ ময়দান। এখন বিস্তর হইচই চলছে চতুর্থ ব্রিজ বানানো নিয়ে। সরকার এন্তার গাছ কাটছে কাঠের জোগান দিতে, সাধারণ মানুষ গেছে খেপে। এদেশের এক কণা ধুলোও তারা অপচয়ে নারাজ। বছর চারেক আগে গাজা পার্ক বাঁচাতে বুলডোজারের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল লক্ষ লক্ষ তুর্কী। পিছু হটেছিল সরকার। এবারে কী হয়!

ইস্তানবুলের ডায়েরি
গাজি পার্ক

রাত বাড়লে উৎসব বাড়ে। সমুদ্রের বুকে দুলে ওঠে ঝলমলে ক্রুজ। প্রমোদতরী। ঝলকে ঝলকে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে কাঁপুনি ধরায়। গরম টার্কিশ কফিতে চুমুক দিলে আরাম। তামার কড়া গন্ধ প্রতি চুমুকে। দুধে কফিগুঁড়ো দিয়ে তামার সসপ্যানে ফোটানো হয় কিনা। কাদা কাদা লিকার হলে তবেই ভালো কফি। কবে থেকে শিখল লোকে এমন করে কফি খেতে? ব্রোঞ্জ যুগের অভ্যাস? কফি চাষ জানত তখন মানুষ? আকাশে মেঘের ঢল দেখে উঠেই পড়লাম। দিশী গরম এখনও জমে আছে হাড়ে। বেশী বাতাস লাগলে মুশকিল।

(৪)

কথায় আছে রাজা সলোমনের জাঁকজমক ঐশ্বর্যকে টেক্কা দিতে সম্রাট জাস্টিনিয়ান তৈরী করিয়েছিলেন হায়য়া সোফিয়া ক্যাথিড্রাল। নামজাদা ইঞ্জিনিয়াররা বিশাল এই কীর্তিটি স্থাপন করেন বেশীদিন নয়। এই মেরেকেটে হাজার দেড়েক বছর। কত রক্তাক্ত ধর্মযুদ্ধ হয়ে গেছে এর সামনে দিয়ে। সম্রাট শপথ নিয়েছেন, শরণার্থীরা পেয়েছেন আশ্রয়, আর বিপন্ন রাজকোষ হয়ে গেছে গুপ্তধন কোনো লুকোনো গর্ভগৃহে। ক্যাথিড্রাল মসজিদ হয়ে সূচনা করেছে অটোমান সাম্রাজ্যের সেও পাঁচশো বছরের বেশী। মসজিদের একাংশ এখন মিউজিয়াম।

ইস্তানবুলের ডায়েরি
নীল মসজিদ

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নীল মসজিদ। পোশাকি নাম সালতানাহমেত বা ব্লু মস্ক। আর সব মসজিদের মত দুটো চারটে নয়, ছ'ছটা মিনার নিয়ে সদম্ভে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মযুদ্ধের সাক্ষী হয়ে। এর ছাদ থেকে মণিমাণিক্য ঝুলত আলোর ঝলকানি বাড়াতে।  অস্ট্রিচের ডিম আর স্ফটিক রাখা হত মশালের পাশে। নীল মার্বেলে বাঁধানো দেওয়াল। লাপিস লাজুলি অর্থাৎ নীলা এখানে বড়ো সুলভ। রসিক শিল্পী রত্ন গুঁড়ো করে মিশিয়ে দিয়েছিলেন রঙে।

ইতিহাস বলছে এই মসজিদ তৈরী হয় বাইজেন্টিয়ামের পতনের শদুয়েক বছর পরে। অথচ অটোমান সুলতান স্থাপত্যে ভাস্কর্যে বাইজেন্টিয়াম প্রথার ছোঁয়াচ এড়াতে পারেননি। শিল্প কি আর ধর্ম বোঝে?

ইস্তানবুলের ডায়েরি
দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো শপিং মল গ্র্যান্ড বাজারে ঢোকার দরজা

বাণিজ্যও ধর্মের পরোয়া করেনি। গ্র্যান্ড বাজারে গেলেই সেটা বিলক্ষণ বোঝা যায়। না কলকাতার বড়োবাজার নয়। দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো শপিং মল বলা যেতে পারে। পনেরো শতকের ঘটনা। অটোমানরা সদ্য সিংহাসন পেয়ে কীভাবে ঢাক পেটাবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। সওদাগররা যুদ্ধের ভয়ে গা ঢাকা দিলে ভাঁড়ে মা ভবানী। অতএব আনো পাথর। কাটো পাহাড়। সেই তৈরী হল গ্র্যান্ড বাজার। বাতি, চামড়া, পশম, রত্ন আর কাপড় চোপড় পসরা সাজিয়ে হইহই করে দোকান বসে গেল। দেখলে মনে হয় সিন্দবাদের দুনিয়া। জাফরি কাটা কাঁচবাতি দিয়ে আলো ছিটকে পড়ছে অ্যাম্বারের গয়নার ওপরে। গাছের রস খেতে গিয়ে কোন পোকা কবে ঘুমিয়ে পড়েছিল- সবসুদ্ধু কাঁচের মধ্যে পুরে আজ তাকে লকেট বানিয়ে দিয়েছে। ঘুম যদি কখনও ভাঙে দেখবে আজও ডঙ্কা বাজালে সওদা ওঠে সওদা বসে। ঢেলে 'সাবুন' বিক্রি হচ্ছে। নবাব বাদশাদের গোসল করার শখ। অজানা আঁকিবুকি দেখে একটা ঘন দুধ রঙের চৌকো সাবান তুললাম। দোকানদার বলল 'সিরিয়া সিরিয়া'। এলাচ মরিচ মেশানো গন্ধ। বুলেট বারুদ নেই, রক্তের দাগ নেই। শিল্পী নাকি নিজের নাম খোদাই করে রাখেন সাবানে। ব্যাগে পুরে নিয়েছি একটুকরো দামাস্কাস। বউনি করে দোকানদার মহাখুশী।  হরেকরকম্বা চারিদিকে। খুলি আঁকা চুরুট পাইপ, সোনার দূরবীন, পুরোনো ট্যাঁকঘড়ি। লাপিস লাজুলীর হার দুল বালা মায় চাবির রিং চতুর্দিকে। একরকম তেচোখো চিহ্ন বেশীর ভাগ চাবির রিঙে। ওটা শুভ চিহ্ন। আমাদের লেবু লঙ্কার মত। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। একছড়া মালা দেখে কৌতূহল হল। পাথর না চোখ ওগুলো? দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মার্কো। আমাকে আলাপ করে ভেতরে নিয়ে গেল যেন কতদিনের চেনা। তা চেনাই বটে। যে দেশ কখনও দেখি নি, হ্যাঙ্গার বন্ধুর মুখে শুনে শুনে সেই তুরস্ক নিয়ে গপ্পো লিখেছিলাম এখানে আসার বছর দুই আগে। মার্কো ছিল তার চরিত্র। সামনে যে লোকটা হাসিমুখে চা খেতে দিচ্ছে তার সাথে মিল ভাবলে গলা শুকিয়ে যায়। পেটানো চেহারা বয়সের গাছপাথর নেই - কিন্তু সে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোন্ আক্কেলে? যাই হোক, গুলি গুলি চোখের হারটা দেখে শিউরে উঠলাম। মার্কো হেসে বলল 'টাইগার্স আই নেকলেস। নেবে'? সর্বনাশ। এতগুলো বাঘ মেরে ফেলেছে এই একটা নেকলেসের জন্য? মার্কো ঘাড় নেড়ে বলল টাইগ্রিস নদীর খাতে এ পাথর পাওয়া যায়। তাই টাইগার্স আই নাম। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। টাইগ্রিস সহস্রচক্ষু নদী হয়ে বয়ে চলুক। ছিটকে পড়া নুড়ির মত তাকিয়ে দেখবে মেসোপটেমিয়া থেকে তুরস্ক। মার্কো অ্যাপেল টী খাওয়ানোর জন্য ঝুলোঝুলি করছিল। খাইনি। আমার গল্পের লোকটাও এরকম একবগ্গা ছিল। কোন আক্কেলে গল্প থেকে জ্যান্ত হয়ে বাইরে এল?  কোনোকালেই এদের বেশী প্রশ্রয় দিতে নেই।

(৫)


থরে থরে সাজানো বাকলাভা, তুরস্কের জনপ্রিয় মিষ্টি

এরা দেখি বাকলাভা বলতে অজ্ঞান। পুঁচকে পুঁচকে প্যাটিস, ফল বাদাম ক্ষীরের পুরভরা। মধ্যপ্রাচ্যে বেশ পাওয়া যায় এ মিষ্টি। তবে কিনা সেসব শুকনো মিষ্টি। এদেশে আবার লোকে খায় রসে চোবানো বাকলাভা। আর আছে হরেক চীজ। হলুদ, শাদা। টক, মিষ্টি। খিদে পেয়েছে? চা দিয়ে অমনি একটা চীজকেক খেয়ে নাও। তাক্সিম স্কোয়ার হল সব মিষ্টির দোকানের আড়ত। সামনে গাজা পার্ক। বিপ্লব বিক্ষোভের পীঠস্থান। খোলা চত্বরে কামাল আতাতুর্ক পাশার চারটে মূর্তি পিঠোপিঠি। ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়। অটোমান সাম্রাজ্য তখন অস্তাচলে যাব যাব করছে। কুখ্যাত তিন পাশা ( উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারকে 'পাশা' বলা দস্তুর এখানে) আর্মেনিয়ানদের ওপর শুরু করলেন অকথ্য অত্যাচার। গণহত্যা, নির্বাসন, উচ্ছেদ। ক্ষোভে ফুটছিল সাধারণ মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন কড়া নাড়ছে দরজায়। আর এক সামরিক অফিসার কামাল পাশা রাজদ্রোহ করে বসলেন। বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিলেন মিত্রশক্তির সাথে। অটোমান রাজা বিপক্ষে। ভারত থেকে বৃটিশ সরকার বিরাট  বাহিনী পাঠালেন মেসোপটেমিয়াতে। চুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের সেই কিশোরও ছিল সেনাবাহিনীতে। কামাল পাশার যুদ্ধবিক্রমে মুগ্ধ হয়ে দুখু মিঞা লিখবে যুদ্ধসঙ্গীত

"ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্ সে সামাল সামাল তাই!
 কামাল! তু  নে  কামাল কিয়া ভাই!
 হো  হো কামাল! তু নে  কামাল কিয়া ভাই!"


`তাক্সিম স্কোয়ারে কামাল পাশার মূর্তি

 কাজী নজরুল ইসলাম সত্যদ্রষ্টা ছিলেন। কামাল আতাতুর্ক পাশা সত্যিই কামাল করেছিলেন। যুদ্ধে জিতে পাঁচটা মসজিদ চারটে প্রাসাদ বানানোর চেয়ে তিনি জোর দিলেন স্কুলে, হাসপাতালে, প্রযুক্তিবিদ্যায়। শিক্ষায় স্বাস্থ্যে ছেলে মেয়েদের সমান অধিকার। পর্দাপ্রথা মধ্যযুগের জিনিস। মেয়েদের মুখ তাদের নিজেদের সম্পত্তি। বোরখা পরার ফতোয়া হটল। দেশটা মজবুত হল। শক্তিশালী হল। পৃথিবী চিনল নতুন তুরস্ককে। এমন দেশ যা ইউরোপেও আছে, এশিয়াতেও আছে, কিন্তু তার ঐতিহ্য তার সংস্কৃতি নিয়ে মাথা উঁচু করে আছে।  ঐ মূর্তি চত্বরে এসে দাঁড়াও। মন দিয়ে শোনো হাওয়ার ভাষা। সে বলে মাতৃভাষা সবার বড়ো ধর্ম। তাকে ভালোবাসতে হয়। সম্মান দিতে হয়। সে বলে মাথার শেষ বুদ্ধি দিয়ে, বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আগলে রাখতে হয় নিজের দেশ। তবেই দুনিয়া কুর্নিশ করে বলবে সাবাশ! তবেই তুমি করতে পার কামাল। বাঙলার সন্তান হয়েও তুমি তাহলে তরুণ তুর্কী।

ছবিঃ লেখক
ব্লু-মস্কের ছবিঃ অনির্বাণ মন্ডল

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা